ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে নিরঙ্কুশ বিজয় নিয়ে বিএনপি সরকার গঠনের পরপরই সিটি করপোরেশনের নির্বাচন নিয়ে জোরেশোরে আলোচনা উঠেছে রাজনৈতিক অঙ্গনে। জানা গেছে, তৃণমূলে সংগঠন মজবুত করেই স্থানীয় সরকার ভোটে নজর দিতে চায় বিএনপি। সরকার যখন স্থানীয় সরকার নির্বাচনের রূপরেখার দিকে যাবে, বিএনপিও তখন সুসংগঠিত ও শক্তিশালী সংগঠন নিয়ে ঐক্যবদ্ধভাবে নির্বাচনে যাওয়ার বিষয়ে মনোযোগ দেবে। আর স্থানীয় নির্বাচন দলীয় নাকি নির্দলীয়ভাবে হবে, সেই সিদ্ধান্তের পরই নির্বাচনের উদ্যোগ নেবে সরকার। আগামী ১২ মার্চ থেকে শুরু হতে যাওয়া ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের প্রথম অধিবেশনে এ ব্যাপারে সিদ্ধান্ত হতে পারে।
তবে ছয় সিটি করপোরেশনে সম্প্রতি নতুন করে প্রশাসক নিয়োগ দেওয়ায় শিগগির নির্বাচন অনুষ্ঠান নিয়ে এক ধরনের অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে বলে অনেকের অভিমত। এমন প্রেক্ষাপটে সিটি করপোরেশন নির্বাচনগুলো কবে হবে, কিংবা শিগগির অনুষ্ঠিত হবে কি না—সেই প্রশ্নও সামনে আসছে। অনেকে মনে করেন, প্রশাসক নিয়োগ দেওয়ায় এক থেকে দেড় বছরের আগে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হওয়ার সম্ভাবনা কম।
এদিকে ক্ষমতা গ্রহণের পর জনগণকে দেওয়া নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়ন এখন বিএনপি সরকারের মনোযোগের কেন্দ্রবিন্দুতে। বিএনপি জোটগতভাবে নির্বাচন করার পর দুই শরিককে মন্ত্রিসভায়ও স্থান দিয়েছে। তবে নির্বাচনের পর মিত্র দলগুলো সাংগঠনিকভাবে কার্যত স্থবির হয়ে পড়েছে। মতপার্থক্য ও রাজনৈতিক অবস্থানের ভিন্নতার কারণে বিএনপির নেতৃত্বাধীন ফ্যাসিবাদবিরোধী যুগপৎ আন্দোলনের গুরুত্বপূর্ণ মিত্র জোট গণতন্ত্র মঞ্চ এখন কার্যত বিলুপ্তির পথে। ১২ দলীয় জোট, জাতীয়তাবাদী সমমনা জোট এবং গণতান্ত্রিক বাম ঐক্যও সাংগঠনিকভাবে সক্রিয় নয়। তারা এখন বিএনপির কাছে ‘মূল্যায়নের’ প্রত্যাশায় রয়েছেন।
জানা গেছে, এমন অবস্থায় আসন্ন সিটি করপোরেশন নির্বাচন নিয়ে প্রধান শরিক বিএনপির সঙ্গে মিত্র দলগুলোর এখন পর্যন্ত কোনো আলাপ-আলোচনা হয়নি। তবে নির্বাচন নিয়ে দলগতভাবে কমবেশি আলোচনা আছে কয়েকটি দলে। তারা মেয়র পদে নির্বাচন নিয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত না নিলেও কিছু কাউন্সিলর পদে নির্বাচন করতে চান।
জানতে চাইলে বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান শামসুজ্জামান দুদু কালবেলাকে বলেন, বিএনপি নির্বাচনমুখী একটি রাজনৈতিক দল। বিএনপি চায়, গণতান্ত্রিক বিধি ব্যবস্থায় সর্বক্ষেত্রে নির্বাচিত প্রতিনিধির শাসনের বিষয়টি প্রাধান্য পাক। এ কারণে সিটি করপোরেশনের নির্বাচন বিএনপি দ্রুতই প্রত্যাশা করে। বিএনপির নির্বাচনী প্রস্তুতি আছে। একটা নতুন ব্যবস্থায় নতুন অবস্থায় নতুন সরকার এসেছে, এখন সংগঠনের কোথাও কোনো অসুবিধা থাকলে সেগুলো আগে ঠিক করে নিতে হবে।
জাতীয় নির্বাচনে বিএনপির স্বতন্ত্র বা বিদ্রোহী প্রার্থীর কারণে অনেক জায়গায় তৃণমূল কার্যত বিভক্ত অবস্থায় রয়েছে। এ অবস্থায় স্থানীয় সরকার নির্বাচনে তার কোনো নেতিবাচক প্রভাব পড়বে কি না—এমন প্রশ্নের জবাবে আসাদুজ্জামান দুদু বলেন, গত নির্বাচনে যেখানে একাধিক ব্যক্তি প্রার্থী ছিল, হয়তো কিছু কিছু ক্ষেত্রে দলের স্বতন্ত্র প্রার্থী ছিল। এগুলোর মধ্যেই তো আমাদের সাংগঠনিকভাবে কাজ করতে হবে। যেখানে সমস্যা আছে, সেখানে আলোচনার মধ্য দিয়ে সমাধানের চেষ্টা হবে।
গণতন্ত্র মঞ্চের সমন্বয়ক ও বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টির সাধারণ সম্পাদক সাইফুল হক বলেন, গণতন্ত্র মঞ্চ একটা স্বাভাবিক বিলুপ্তির পথেই যাচ্ছে বলে অনুমান করি। মঞ্চের দলগুলোর মধ্যে মতপার্থক্য, রাজনৈতিক অবস্থানের ভিন্নতা তৈরি হয়েছে। ফলে মঞ্চগতভাবে আবার সক্রিয় হওয়ার সম্ভাবনা কম দেখছি।
এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, বিএনপির সঙ্গে আসন্ন সিটি করপোরেশন নির্বাচন বিষয়ে মঞ্চগত কিংবা দলীয়ভাবে এখন পর্যন্ত কোনো আলাপ-আলোচনা হয়নি। তাদের সঙ্গে জোটগতভাবে নির্বাচন করা কিংবা না করার ব্যাপারে আপাতত কোনো চিন্তাভাবনা নেই। আমরা কিছু কাউন্সিলর পদে নির্বাচন করব, তবে মেয়র পদে নির্বাচন করব কি না, সেটা নিয়ে এখনো দলগতভাবে আলোচনা চূড়ান্ত হয়নি।
জানা গেছে, নির্বাচনের তপশিলের পর দলীয় ফোরামে আলোচনা করে প্রার্থী চূড়ান্ত করবে বিএনপি। মূলত সংসদ নির্বাচনে বিএনপির বঞ্চিতরাই সিটির মনোনয়ন চান। ক্ষমতাসীন বিএনপি নেতাদের কেউ কেউ নির্বাচন করতে এরই মধ্যে মনস্থির করেছেন। অনেকে আবার প্রস্তুতি নিতে দলের গ্রিন সিগন্যালের অপেক্ষায় রয়েছেন।
ঢাকা উত্তর সিটি: খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, ঢাকা মহানগর উত্তর সিটিতে বিএনপির সম্ভাব্য প্রার্থীদের মধ্যে আলোচনায় আছেন শফিকুল ইসলাম খান মিল্টন, তাবিথ আউয়াল, মোস্তফা জামান, এবিএমএ রাজ্জাক, এম কফিল উদ্দিন আহমেদ ও এমএ কাইয়ূম।
শফিকুল ইসলাম খান মিল্টন ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের (ডিএনসিসি) নতুন প্রশাসক। তিনি যুবদলের কেন্দ্রীয় কমিটির সাবেক সহসভাপতি। এর আগে তিনি ঢাকা মহানগর উত্তর যুবদলের সদস্য সচিব ছিলেন। ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনে ঢাকা-১৫ আসনে বিএনপির প্রার্থী ছিলেন তিনি। জানা গেছে, আসন্ন মেয়র নির্বাচনে তিনি জোরালো প্রতিদ্বন্দ্বী।
বিএনপির নির্বাহী কমিটির সদস্য তাবিথ আউয়াল ২০২০ সালে অনুষ্ঠিত উত্তর সিটি করপোরেশন নির্বাচনে দলের মেয়র প্রার্থী ছিলেন। তিনি বলেন, রাজধানী ঢাকা নিয়ে তার নিজস্ব প্ল্যান রয়েছে। আগের নির্বাচনে ভোট কারচুপি করে শেষ রাতে তাকে হারিয়ে দেওয়া হয়েছিল, এটা দেশবাসী জানেন। এবার যদি দলের হাইকমান্ড তাকে মনোনয়ন দেয়, তাহলে নির্বাচন করবেন। মেয়র নির্বাচিত হয়ে রাজধানীবাসীর প্রত্যাশা পূরণ করতে চান তিনি।
এমএ কাইয়ূম বিএনপির কেন্দ্রীয় কমিটির ক্ষুদ্রঋণ বিষয়ক সম্পাদক। এর আগে ঢাকা উত্তর বিএনপির সভাপতি ছিলেন। ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনে ঢাকা-১১ আসনে বিএনপির প্রার্থী ছিলেন তিনি। এ ছাড়া উত্তরে মেয়র পদে জোরালো আলোচনায় আছেন ঢাকা মহানগর উত্তর বিএনপির যুগ্ম আহ্বায়ক (দপ্তর) এবিএমএ রাজ্জাক। ফ্যাসিবাদবিরোধী বিগত আন্দোলনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন তিনি। আলোচনায় আছে উত্তর বিএনপির আরেক যুগ্ম আহ্বায়ক এম কফিল উদ্দিন আহমেদের নামও। সদ্য অনুষ্ঠিত জাতীয় নির্বাচনে ঢাকা-১৮ আসনে বিএনপির অন্যতম মনোনয়নপ্রত্যাশী ছিলেন তিনি। সিটি করপোরেশন নির্বাচনে কফিল উদ্দিনকে মেয়র প্রার্থী হিসেবে দেখার প্রত্যাশা বিএনপি নেতাকর্মীদের।
মেয়র পদে জোরালোভাবে আলোচনায় আছেন ঢাকা মহানগর উত্তর বিএনপির সদস্য সচিব মো. মোস্তফা জামানও। তিনিও বিগত নির্বাচনে ঢাকা-১৮ আসনে বিএনপির মনোনয়নপ্রত্যাশী ছিলেন। মোস্তফা জামান কালবেলাকে বলেন, দল যদি ঢাকা মহানগর উত্তরকে সাজাতে চায় এবং আমার মাধ্যমে মানুষের দোরগোড়ায় সেবা পৌঁছে দিতে চায়; আর এ কাজে দল যদি আমাকে উপযুক্ত ও যোগ্য মনে করে, তাহলে আমি মেয়র পদে নির্বাচন করব। দল আমাকে যখন যে দায়িত্ব দিয়েছে, সেটা সততা ও নিষ্ঠার সঙ্গে পালন করেছি। নির্বাচনের আগে বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমান আমাকে ঢাকা-১৮ আসনে ধানের শীষের প্রার্থীর জন্য কাজ করতে বলেছিলেন। আমি শতভাগ আন্তরিকতা দিয়ে কাজ করেছি, বিএনপির প্রার্থী বিজয়ী হয়েছে। আগামীতেও কোনো দায়িত্ব দিলে সে দায়িত্ব যথাযথভাবে পালন করব। তিনি আরও বলেন, ‘আমার বিরুদ্ধে শতাধিক মামলা রয়েছে। তারপরও সুখে-দুঃখে সব সময় মানুষের পাশে ছিলাম, এখনো আছি, ভবিষ্যতেও থাকব। তবে দায়িত্ব পেলে সেক্ষেত্রে মানুষের জন্য কাজ করাটা আরও সহজ হয়।’
ঢাকা দক্ষিণ সিটি: দক্ষিণে আলোচনায় আছেন বর্তমান প্রশাসক ও বিএনপি চেয়ারম্যানের অন্যতম উপদেষ্টা মো. আব্দুস সালাম, যুগ্ম মহাসচিব হাবিব-উন-নবী খান সোহেল, মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক প্রতিমন্ত্রী প্রকৌশলী ইশরাক হোসেন, সাবেক ডেপুটি মেয়র কাজী আবুল বাশার, ঢাকা মহানগর দক্ষিণ বিএনপির সদস্য সচিব তানভীর আহমেদ রবিন ও জাতীয়তাবাদী মহিলা দলের সভাপতি আফরোজা আব্বাস।
বর্ষীয়ান রাজনীতিবিদ আব্দুস সালাম ঢাকা মহানগর দক্ষিণ বিএনপির আহ্বায়ক ছিলেন। এ ছাড়া ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনে ঢাকা-১৭ আসনে বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমানের প্রধান নির্বাচনী এজেন্ট হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেন তিনি। আসন্ন সিটি নির্বাচনে অংশ নেওয়ার অভিপ্রায় ব্যক্ত করে বীর মুক্তিযোদ্ধা আব্দুস সালাম বলেন, দলের চেয়ারম্যান মনোনয়ন দিলে নির্বাচন করব। অতীতে ভারপ্রাপ্ত মেয়র হিসেবে কাজ করার অভিজ্ঞতা রয়েছে। তা ছাড়া আমি দীর্ঘদিন রাজধানী ঢাকার রাজনীতিতে যুক্ত। আশা করছি, নাগরিক সেবা নিশ্চিতে অতীতের অভিজ্ঞতার আলোকে কাজ করতে পারব।
বিএনপির ত্যাগী নেতাদের একজন হাবিব-উন-নবী খান সোহেল। ঢাকা মহানগর দক্ষিণ বিএনপির সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন তিনি। বাংলাদেশে রাজনীতির ইতিহাসে সবচেয়ে বেশি রাজনৈতিক মামলাও দায়ের করা হয় তার বিরুদ্ধে, ৪৫০টি। হাবিব-উন-নবী খান সোহেল বলেন, দলের সিদ্ধান্তই চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত। দল যাকে বলবে, তিনিই নির্বাচন করবেন।
ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনে ঢাকা-৬ আসন থেকে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হওয়ার পর মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক প্রতিমন্ত্রী হন প্রকৌশলী ইশরাক হোসেন। সম্প্রতি নিজের ভেরিফায়েড ফেসবুক পেজে এক পোস্টে দক্ষিণ থেকে নির্বাচন করার ঘোষণা দেন তিনি। এর আগে ২০২০ সালে অনুষ্ঠিত ঢাকা দক্ষিণে বিএনপির প্রার্থী হিসেবে মেয়র নির্বাচন করেন ইশরাক।
চট্টগ্রাম সিটি: মেয়র পদে বিএনপির সম্ভাব্য প্রার্থী হিসেবে আলোচনায় রয়েছেন নগর বিএনপির সাবেক সভাপতি ও বর্তমান মেয়র ডা. শাহাদাত হোসেন, অর্থমন্ত্রী আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরীর ছেলে দলের আন্তর্জাতিকবিষয়ক উপকমিটির সদস্য ইসরাফিল খসরু মাহমুদ চৌধুরী এবং মহানগরের সাবেক সাধারণ সম্পাদক আবুল হাশেম বক্কর। তা ছাড়া সাবেক মেয়র মনজুর আলমের নামও আলোচনায় এসেছে। তবে অনেকেই মনে করেন, তাদের মধ্যে বর্তমান মেয়র ডা. শাহাদাত হোসেনই দলীয় মনোনয়ন পেতে পারেন।
বরিশাল সিটি : সংসদ নির্বাচনে বিএনপির বঞ্চিতরাই সিটির মনোনয়ন চান। ২০২৪-এর গণঅভ্যুত্থানের পর থেকে বর্তমানে বিভাগীয় কমিশনার প্রশাসক হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন বরিশাল সিটি করপোরেশনে। খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, মেয়র পদে নির্বাচনে বিএনপির মনোনয়নপ্রত্যাশীদের তালিকা দীর্ঘ। কেন্দ্র থেকে শুরু করে স্থানীয় পর্যায়ের নেতারাও চাইবেন দলের মনোনয়ন। তাদের মধ্যে আলোচনায় রয়েছেন বিএনপি চেয়ারম্যানের উপদেষ্টা সৈয়দ মোয়াজ্জেম হোসেন আলাল, বরিশাল বিভাগীয় সাংগঠনিক সম্পাদক বিলকিস জাহান শিরীন, কেন্দ্রীয় নির্বাহী কমিটির সদস্য আবু নাসের মুহাম্মদ রহমাতুল্লাহ, এবায়দুল হক চাঁন, মহানগর বিএনপির আহ্বায়ক মনিরুজ্জামান খান ফারুক, সদস্য সচিব জিয়াউদ্দিন সিকদার, সাবেক সদস্য সচিব মীর জাহিদুল কবির জাহিদ এবং যুগ্ম আহ্বায়ক আফরোজা খানম নাসরীন। এর মধ্যে বিলকিস জাহান শিরীন পুনরায় জাতীয় সংসদের সংরক্ষিত নারী আসনের সংসদ সদস্য হতে পারেন বলে আলোচনা রয়েছে।
কুমিল্লা সিটি: কুমিল্লা সিটি করপোরেশন নির্বাচন এলেই সাবেক দুইবারের মেয়র মনিরুল হক সাক্কুকে ঘিরেই সব জল্পনা-কল্পনা শুরু হয়। ২০২৪ সালের সর্বশেষ মেয়র উপনির্বাচনে অংশ নেওয়ায় বিএনপি তাকে বহিষ্কার করে। ওই বহিষ্কারাদেশ এখনো প্রত্যাহার হয়নি। তবে ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনে সদর আসনের নির্বাচিত এমপি মনিরুল হক চৌধুরীকে পাস করাতে তিনি প্রধান ভূমিকা রাখেন এবং প্রকাশ্যে নির্বাচনে কাজ করেন। এবারও তাকে ঘিরেই চলছে আলোচনা। এ তালিকায় আরও রয়েছেন বিএনপির সাবেক জ্যেষ্ঠ নেতা শাহ মো. সেলিম, বিএনপির কুমিল্লা বিভাগীয় সাংগঠনিক সম্পাদক মোস্তাক মিয়া, কুমিল্লা দক্ষিণ জেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক আশিকুর রহমান মাহমুদ এবং মহানগর স্বেচ্ছাসেবক দলের সাবেক সভাপতি নিজামউদ্দিন কায়সার। তিনি কৃষি, মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ এবং খাদ্যমন্ত্রী আমিন উর রশিদ ইয়াছিনের শ্যালক। ২০২৪ সালের শেষ মেয়র উপনির্বাচনে অংশ নিয়ে তিনিও দল থেকে বহিষ্কৃত হন। এ ছাড়া আলোচনায় আছেন এই আসনের সাবেক মন্ত্রী ও এমপি প্রয়াত কর্নেল (অব.) আকবর হোসেনের ছেলে ইসমাইল হোসেন সায়মন। তিনি সাবেক মেয়র মনিরুল হক সাক্কুর ঘনিষ্ঠ আত্মীয়। কাওসার জামান বাপ্পিও মনোনয়ন চান।
তবে কুমিল্লা মহানগর বিএনপির দুই শীর্ষ নেতা সভাপতি উদবাতুল বারী আবু ও সাধারণ সম্পাদক ইউসুফ মোল্লা টিপুর নাম বেশ জোরেশোরেই শোনা যাচ্ছে। এ দৌড়ে মহানগর বিএনপির সাংগঠনিক সম্পাদক সদ্য সাবেক কাউন্সিলর রাজিউর রহমান রাজিবও প্রার্থিতা জানান দিয়ে চলছেন। তিনি প্রধানমন্ত্রীর সহকারী একান্ত সচিব-২ আব্দুর রহমান সানির শ্বশুর।
গাজীপুর সিটি: গাজীপুর মহানগর বিএনপির সভাপতি শওকত হোসেন সরকারকে সম্প্রতি প্রশাসক হিসেবে নিয়োগ করা হয়েছে। দলীয় সংগঠন ও রাজনৈতিক অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে মেয়র পদে বিএনপির সম্ভাব্য শক্ত প্রার্থী তিনি। এ ছাড়া স্বেচ্ছাসেবক দলের কেন্দ্রীয় সহসভাপতি আরিফ হোসেন হাওলাদারও সম্ভাব্য মেয়র প্রার্থী হিসেবে তরুণ সমাজ ও কর্মীভিত্তিক জনপ্রিয়তার কারণে আলোচনায় রয়েছেন। তবে শ্রমিক রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত সালাউদ্দিন সরকার জনপ্রিয়তার দিক থেকে শীর্ষে রয়েছেন বলে দাবি তার সমর্থকদের। ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনে মনোনয়ন না পেয়ে গাজীপুর-২ আসনে শুরুতে বিএনপির বিদ্রোহী প্রার্থী হয়েছিলেন জাতীয়তাবাদী শ্রমিক দলের কেন্দ্রীয় কমিটির কার্যকরী সভাপতি সালাউদ্দিন সরকার। অবশ্য পরে মনোনয়নপত্র প্রত্যাহার করে নেন তিনি।
খুলনা সিটি: খুলনা সিটি এলাকা বিএনপির ঘাঁটি হিসেবে পরিচিত। খুলনা মহানগর বিএনপির সাবেক সভাপতি নজরুল ইসলাম মঞ্জু খুলনা সিটি করপোরেশনের প্রশাসক হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। সদ্য অনুষ্ঠিত ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনে তিনি খুলনা-২ আসন থেকে ধানের শীষ প্রতীকে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেন। আসন্ন সিটি নির্বাচনেও তাকে দলের মেয়র প্রার্থী হিসেবে ঘোষণা করা হতে পারে। অনেকে মনে করছেন, খুলনা-২ আসনে নির্বাচনে হারার পরও তাকে মেয়র প্রার্থী দেওয়া মানে তার মাধ্যমে নাগরিক সেবা প্রদান করে তার ক্ষেত্র প্রস্তুত করা। তবে এ কথা আবার মানতে চান না বিএনপির একটি অংশের নেতারা। তারা এগিয়ে রাখছেন নগর বিএনপির সভাপতি এসএম শফিকুল আলম মনাকে। নেতৃত্বের এই অংশটি বলে, শফিকুল আলম মনা সারাজীবন বিএনপির রাজনীতির জন্য সংগ্রাম করেছেন। কোনোদিন কিছু পাননি। তাদের প্রত্যাশা, তাই এবার দল তাকেই সমর্থন দেবে।
ময়মনসিংহ সিটি: বিএনপি সূত্রে জানা গেছে, মসিক নির্বাচনে বিএনপির কয়েকজন শীর্ষস্থানীয় নেতা এরই মধ্যে প্রস্তুতি নিচ্ছেন। তাদের মধ্যে আলোচনায় রয়েছেন দক্ষিণ জেলা বিএনপির সদস্য সচিব রোকনুজ্জামান সরকার রোকন, মহানগর বিএনপির আহ্বায়ক অধ্যাপক একেএম শফিকুল ইসলাম, সিনিয়র যুগ্ম আহ্বায়ক অধ্যাপক শেখ আমজাদ আলী, যুগ্ম আহ্বায়ক অ্যাডভোকেট এম এ হান্নান খান। একেএম মাহাবুবুল আলম ও লিটন আকন্দও আলোচনায় আছেন।
রোকনুজ্জামান সরকার রোকন বলেন, ‘ময়মনসিংহ সিটি নিয়ে আমার নিজস্ব প্ল্যান রয়েছে। দলের হাইকমান্ড আমাকে মনোনয়ন দিলে নির্বাচন করব। মেয়র নির্বাচিত হয়ে নগরবাসীর প্রত্যাশা পূরণ করতে চাই।’
নারায়ণগঞ্জ সিটি: নারায়ণগঞ্জ মহানগর বিএনপির আহ্বায়ক অ্যাডভোকেট সাখাওয়াত হোসেন খানকে সম্প্রতি নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশনের প্রশাসক করা হয়েছে। দেশের আলোচিত নারায়ণগঞ্জের সাত খুন মামলার আইনজীবী ছিলেন এই সাখাওয়াত। এ ছাড়া তিনি বিগত ২০১৬ সালের সিটি নির্বাচনে বিএনপির প্রার্থী হয়েছিলেন। আসন্ন মেয়র পদের নির্বাচনে তিনি জোরালো প্রতিদ্বন্দ্বী। এ ছাড়া সম্ভাব্য প্রার্থী হিসেবে মহানগর বিএনপির সদস্য সচিব আবু আল ইউসুফ খান টিপু, জেলা বিএনপির আহ্বায়ক অধ্যাপক মামুন মাহমুদ, যুগ্ম আহ্বায়ক মাসুকুল ইসলাম রাজীব, সাবেক কাউন্সিলর মাকছুদুল আলম খন্দকার খোরশেদ এবং বিএনপি নেতা ও প্রাইম গ্রুপের মালিক আবু জাফর আহম্মেদ বাবুলের নামও আলোচনায় রয়েছে। সম্ভাব্য এই প্রার্থী তালিকার সবাই সদ্য সমাপ্ত জাতীয় সংসদ নির্বাচনে দলীয় মনোনয়নপ্রত্যাশী ছিলেন।
রাজশাহী সিটি: দেশের ছয় সিটিতে দলীয় নেতাদের প্রশাসক নিয়োগ দেওয়ার পর রাসিকেও প্রশাসক নিয়োগ নিয়ে রাজনৈতিক অঙ্গনে শুরু হয়েছে জোর গুঞ্জন। প্রশাসক পদে নিয়োগের দৌড়ে রাজশাহীর পাঁচ শীর্ষ বিএনপি নেতার নাম শোনা যাচ্ছে। দলীয় সিদ্ধান্তের অপেক্ষায় রয়েছেন তারা। দলীয় সূত্র জানায়, প্রশাসক পদে নিয়োগ পাওয়ার সম্ভাব্য তালিকার মধ্যে বেশি আলোচিত হচ্ছেন বিএনপির কেন্দ্রীয় বন ও পরিবেশবিষয়ক সম্পাদক এবং সাবেক মেয়র মোসাদ্দেক হোসেন বুলবুল। এ ছাড়া আছেন মহানগর বিএনপির সভাপতি মামুন অর রশিদ, সহসভাপতি ওয়ালিউল হক রানা, সাধারণ সম্পাদক মাহফুজুর রহমান রিটন এবং আরেক সহসভাপতি আবুল কালাম আজাদ। জেলা বিএনপির সাবেক সভাপতি ও সাবেক এমপি প্রয়াত নাদিম মোস্তফার ভাই সাইদ হাসানও রয়েছেন আলোচনায়। বিএনপির স্থানীয় নেতারা বলছেন, রাজনৈতিক প্রশাসক পদে যাদের নাম আলোচনায় রয়েছে, মূলত তারাই আসন্ন সিটি নির্বাচনে মেয়র পদে বিএনপির প্রার্থী।
রংপুর সিটি: সংসদ নির্বাচনে যারা মনোনয়ন পাননি, তারা আসন্ন সিটি নির্বাচনে প্রার্থী হতে তৎপরতা শুরু করেছেন। আবার মনোনয়ন পেয়েও নির্বাচনে জয়লাভ করতে পারেননি—এমন নেতারাও রয়েছেন সম্ভাব্য প্রার্থী তালিকায়। বিএনপির সম্ভাব্য প্রার্থীদের মধ্যে জোর আলোচনায় রয়েছেন মহানগর বিএনপির আহ্বায়ক সামসুজ্জামান সামু, সদস্য সচিব মাহফুজ উন নবী ডন, সিনিয়র যুগ্ম আহ্বায়ক শহিদুল ইসলাম মিজু। দলীয় মনোনয়ন চান জেলা যুবদলের সাধারণ সম্পাদক নাজমুল আলম নাজুও।
তাদের মধ্যে সামসুজ্জামান সামু সদ্য অনুষ্ঠিত ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনে রংপুর-৩ আসন থেকে বিএনপির প্রার্থী হিসেবে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে পরাজিত হন। এই আসনে বিএনপির মনোনয়নপ্রত্যাশী ছিলেন মাহফুজ উন নবী ডন। অন্যদিকে, দলের দুঃসময়ে শহিদুল ইসলাম মিজু মহানগর বিএনপির সাধারণ সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।
সিলেট সিটি: সিলেট জেলা বিএনপির সভাপতি আব্দুল কাইয়ুম চৌধুরী সিলেট সিটি করপোরেশনের প্রশাসক হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। আসন্ন মেয়র নির্বাচনে তিনি দলের অন্যতম মনোনয়নপ্রত্যাশী। এ ছাড়া বিএনপির সম্ভাব্য মেয়র প্রার্থীরা হলেন দলের কেন্দ্রীয় সহ-সাংগঠনিক সম্পাদক মিফতাহ সিদ্দিকী, মহানগর বিএনপির ভারপ্রাপ্ত সভাপতি রেজাউল হাসান কয়েস লোদী, সাধারণ সম্পাদক ইমদাদ হোসেন চৌধুরী, মহানগর বিএনপির সাবেক আহ্বায়ক আব্দুল কাইয়ুম জালালী পংকী, সাবেক কেন্দ্রীয় সহ-স্বেচ্ছাসেবক বিষয়ক সম্পাদক শামসুজ্জামান জামান এবং জেলা বিএনপির প্রথম যুগ্ম সম্পাদক ইশতিয়াক আহমদ সিদ্দিকী।
প্রতিবেদন তৈরিতে কালবেলার সংশ্লিষ্ট প্রতিনিধিরা তথ্য দিয়ে সহায়তা করেছেন।