দেশের ব্যাংক খাতে ঝুঁকির মেঘ কাটেনি। তবে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন সামনে রেখে ঋণ পরিশোধের বাধ্যবাধকতা এবং বিশেষ সুবিধায় পুনঃতফসিলের ফলে তিন মাসের ব্যবধানে খেলাপি ঋণ কমেছে প্রায় ৮৭ হাজার কোটি টাকা। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এই স্বস্তি মূলত ‘কাগুজে’; কারণ কাঠামোগত সংস্কার ছাড়া এ খাতের প্রকৃত উন্নয়ন সম্ভব নয়।
সোমবার (২ মার্চ) রাতে বাংলাদেশ ব্যাংক খেলাপি ঋণের হালনাগাদ বিবরণী প্রকাশ করেছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালের ডিসেম্বর শেষে ব্যাংক খাতে বিতরণ করা মোট ঋণের স্থিতি দাঁড়িয়েছে ১৮ লাখ ২০ হাজার ৯১৫ কোটি টাকা। এর মধ্যে খেলাপি ঋণের পরিমাণ ৫ লাখ ৫৭ হাজার ২১৭ কোটি টাকা, যা মোট ঋণের ৩০.৬০ শতাংশ।
এর আগের প্রান্তিকে (সেপ্টেম্বর শেষে) মোট বিতরণ করা ঋণের স্থিতি দাঁড়ায় ১৮ লাখ ৩ হাজার ৮৪০ কোটি টাকা। এর মধ্যে খেলাপি ঋণের পরিমাণ ছিল ৬ লাখ ৪৪ হাজার ৫১৫ কোটি টাকা। যা বিতরণ করা মোট ঋণের ৩৫ দশমিক ৭৩ শতাংশ।
২০২৫ সালের সেপ্টেম্বর প্রান্তিকের তুলনায় ডিসেম্বর শেষে খেলাপি ঋণ ৮৭ হাজার ২৯৮ কোটি টাকা কমলেও বার্ষিক চিত্র অত্যন্ত উদ্বেগজনক। ২০২৪ সালের ডিসেম্বরের তুলনায় মাত্র এক বছরে খেলাপি ঋণ বেড়েছে ২ লাখ ১১ হাজার ৪৫২ কোটি টাকা। নির্বাচনের আগে ২ শতাংশ ডাউনপেমেন্টের বিশেষ সুবিধা এবং ঋণ নিয়মিত করার সুযোগই এই সাময়িক ও ‘কাগুজে’ হ্রাসের প্রধান কারণ বলে মনে করছেন অর্থনীতিবিদরা
সেই হিসাবে সেপ্টেম্বর প্রান্তিকের তুলনায় ডিসেম্বর প্রান্তিকে মোট বিতরণ করা ঋণের পরিমাণ ১৭ হাজার ৭৫ কোটি টাকা বেড়েছে। একই সময়ে খেলাপি ঋণের পরিমাণ ৮৭ হাজার ২৯৮ কোটি টাকা কমেছে এবং খেলাপি ঋণের হার হ্রাস পেয়েছে ৫ দশমিক ১৩ শতাংশ পয়েন্ট।
কেন এই হ্রাস?
খাত-সংশ্লিষ্টদের মতে, ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানে আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পর কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কড়াকড়িতে বহু গোপন খেলাপি ঋণ সামনে আসে, ফলে সেপ্টেম্বর প্রান্তিকে খেলাপির অংক অস্বাভাবিক বেড়ে গিয়েছিল। তবে নির্বাচনকে কেন্দ্র করে অনেক ঋণখেলাপি তাদের বকেয়া আংশিক পরিশোধ করেছেন। এছাড়া মাত্র ২ শতাংশ ডাউনপেমেন্ট দিয়ে বিপুল অঙ্কের ঋণ পুনঃতফসিল বা নিয়মিত করার ‘বিশেষ সুবিধা’ দেওয়া হয়েছে। এসব কারণেই ডিসেম্বর প্রান্তিকে খেলাপি ঋণের অংক কমেছে।
আইএমএফ-এর ঋণের অন্যতম শর্ত হলো ২০২৬ সালের মধ্যে সরকারি ব্যাংকে খেলাপি ঋণ ১০ শতাংশের নিচে নামানো। অথচ বর্তমানে রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলোতে খেলাপির হার ৪৪.৪৪ শতাংশ, যা লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে চার গুণ বেশি। একইভাবে বেসরকারি ব্যাংকেও লক্ষ্যমাত্রা ৫ শতাংশ হলেও বর্তমানে তা ২৮.২৫ শতাংশে দাঁড়িয়েছে। এই বিশাল ব্যবধান কমিয়ে শর্ত পূরণ করা এখন কেন্দ্রীয় ব্যাংকের জন্য পাহাড়সম চ্যালেঞ্জ
ব্যাংকভিত্তিক খেলাপি ঋণের হার
৩১ ডিসেম্বর ২০২৫ সালের হিসাব অনুযায়ী, রাষ্ট্র মালিকানাধীন বাণিজ্যিক ব্যাংকে খেলাপি ঋণের হার ৪৪ দশমিক ৪৪ শতাংশ, বেসরকারি ব্যাংকে ২৮ দশমিক ২৫ শতাংশ, বিদেশি ব্যাংকে ৪ দশমিক ৫১ শতাংশ এবং বিশেষায়িত ব্যাংকে ৩৯ দশমিক ৭৪ শতাংশ।
এর আগের প্রান্তিক অর্থাৎ ৩০ সেপ্টেম্বর ২০২৫-এ খেলাপি ঋণের হার যথাক্রমে ছিল— রাষ্ট্র মালিকানাধীন ব্যাংকে ৪৯ দশমিক ৬৫ শতাংশ, বেসরকারি ব্যাংকে ৩৩ দশমিক ৭৫ শতাংশ, বিদেশি ব্যাংকে ৪ দশমিক ৯২ শতাংশ এবং বিশেষায়িত ব্যাংকে ৪১ দশমিক ৯৫ শতাংশ।
অর্থাৎ তিন মাসের ব্যবধানে রাষ্ট্র মালিকানাধীন ব্যাংকে মোট ঋণের হার ৫ দশমিক ২২ শতাংশ কমেছে, বেসরকারি ব্যাংকে ৫ দশমিক ৫১ শতাংশ, বিদেশি ব্যাংকে ০ দশমিক ৪২ শতাংশ এবং বিশেষায়িত ব্যাংকে ২ দশমিক ২১ শতাংশ কমেছে।
এছাড়া ২০২৪ সালের ডিসেম্বরে তুলনায় ২০২৫ সালের ডিসেম্বরে খেলাপি ঋণ বাড়ে ২ লাখ ১১ হাজার ৪৫২ কোটি টাকা। ২০২৪ সালের ডিসেম্বরে খেলাপি ঋণ ছিল ৩ লাখ ৪৫ হাজার ৭৬৫ কোটি টাকা।
২০০৯ সালে আওয়ামী লীগ সরকার যখন ক্ষমতা গ্রহণ করে, তখন মোট খেলাপি ঋণ ছিল মাত্র ২২ হাজার ৪৮১ কোটি টাকা। বিগত দেড় দশকে নজিরবিহীন লুটপাট, অনিয়ম ও বিদেশে অর্থ পাচারের ফলে ২০২৫ সাল শেষে তা দাঁড়িয়েছে ৫ লাখ ৫৭ হাজার ২১৭ কোটি টাকায়। অর্থাৎ ১৬ বছরে খেলাপি ঋণ বেড়েছে প্রায় ২৪ গুণ, যা দেশের সামগ্রিক আর্থিক স্থিতিশীলতাকে চরম ঝুঁকির মুখে ঠেলে দিয়েছে
বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করে বলেছেন, রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত ঋণ ব্যবস্থাপনা এবং ব্যাংক পরিচালনায় সুশাসন নিশ্চিত না হলে এই সাময়িক স্বস্তি দ্রুতই বিলীন হয়ে যাবে। সংস্কার ছাড়া ব্যাংকিং ব্যবস্থা দীর্ঘমেয়াদে আরও বড় সংকটে পড়তে পারে।
তথ্য বলছে, ২০২৫ সালের জুন প্রান্তিক শেষে ঋণের পরিমাণ ছিল ১৭ লাখ ৭৮ হাজার ৩৭৮ কোটি টাকা। এর মধ্যে খেলাপি ঋণের পরিমাণ ছিল ৬ লাখ ৮ হাজার ৩৪৫ কোটি টাকা, যা ওই সময়ের বিতরণ করা ঋণের ৩৪ দশমিক ৪০ শতাংশ।
আইএমএফ-এর শর্ত ও বর্তমান চ্যালেঞ্জ
আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ)-এর ৪৭০ কোটি ডলার ঋণের অন্যতম শর্ত হলো ২০২৬ সালের মধ্যে বেসরকারি ব্যাংকে খেলাপি ঋণ ৫ শতাংশ এবং সরকারি ব্যাংকে ১০ শতাংশের নিচে নামাতে হবে। অথচ বর্তমানে সরকারি ব্যাংকগুলোতে খেলাপি ঋণের হার প্রায় ৪৪ শতাংশের ওপরে, যা লক্ষ্যমাত্রা থেকে অনেক দূরে।
২০০৯ সালে আওয়ামী লীগ যখন সরকার গঠন করে, তখন দেশে মোট খেলাপি ঋণ ছিল মাত্র ২২ হাজার ৪৮১ কোটি টাকা। অর্থনীতিবিদদের মতে, বিগত সরকারের আমলে নজিরবিহীন অনিয়ম, দুর্নীতি ও প্রভাবশালী মহলের লুটপাটের কারণে খেলাপি ঋণ এখন ৫ লাখ ৫৭ হাজার কোটি টাকা ছাড়িয়েছে।