Image description

স্থানীয় সরকার নির্বাচনের জোর প্রস্তুতি চলছে। এরই মধ্যে দেশের সব জেলা প্রশাসককে (ডিসি) ইউনিয়ন ও পৌরসভার বর্তমান অবস্থা জানতে চেয়ে স্থানীয় সরকার বিভাগ থেকে চিঠি দেওয়া হয়েছে। 

আগামী জুলাইয়ে ইউনিয়ন পরিষদের নির্বাচন পর্যায়ক্রমে শুরু হতে পারে। পাশাপাশি দেশের সব পৌরসভার ভোটও সেরে ফেলতে চায় সরকার। জুলাই গণঅভ্যুত্থানের পর সব মেয়র ও কাউন্সিলরকে বরখাস্ত করায় এখন পৌরসভা চলছে প্রশাসক দিয়ে। এ কারণে নাগরিক সেবা এক রকম ভেঙে পড়েছে।

সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, গত ২৩ ফেব্রুয়ারি ডিসিদের কাছে পাঠানো চিঠিতে ১০টি তথ্য জানতে চাওয়া হয়েছে। সেগুলো হলো– জেলা-উপজেলার নাম, ইউনিয়ন ও পৌরসভার নাম, সর্বশেষ নির্বাচনের তারিখ, প্রথম পরিষদ সভার তারিখ, মেয়াদোত্তীর্ণের তারিখ, বর্তমানে কে দায়িত্ব পালন করছেন, কোনো আইনি জটিলতা আছে কিনা, সীমানা বিরোধের ব্যাপারে কোনো মামলা আছে কিনা এবং ওই ইউনিয়ন-পৌরসভা নির্বাচন উপযোগী কিনা। 

২৬ ফেব্রুয়ারির মধ্যে এসব তথ্য জানাতে বলা হলেও গতকাল পর্যন্ত সব জেলার ডিসি তথ্য পাঠাতে পারেননি। স্থানীয় সরকার বিভাগ ধারণা করছে, এই সপ্তাহের মধ্যে সব জেলা থেকে তথ্য পাওয়া গেলে একটি স্পষ্ট ধারণা পাওয়া যাবে। তারপর ধাপে ধাপে নির্বাচনের আয়োজন করা যাবে। 

স্থানীয় সরকার বিভাগের অতিরিক্ত সচিব (পৌরসভা অনুবিভাগ) খোন্দকার মো. নাজমুল হুদা শামীম ডিসিদের চিঠি দেওয়ার বিষয়টি স্বীকার করলেও বিস্তারিত তথ্য দিতে চাননি। 

বিশ্লেষকরা মনে করেন, সংসদ নির্বাচনে বিএনপির ভূমিধস জয়ের পর দলটির জনপ্রিয়তা তুঙ্গে রয়েছে। এই জনপ্রিয়তা থাকতে থাকতেই স্থানীয় নির্বাচন আয়োজন করতে চায় সরকার। 

স্থানীয় সরকার বিভাগের এক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে সমকালকে বলেন, মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর এই মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব নেওয়ার পরপরই ইউনিয়ন ও পৌরসভার নির্বাচন আয়োজনের প্রস্তুতি নিতে বলেন দায়িত্বশীলদের। এরপরই সব ডিসির কাছে হালনাগাদ তথ্য চেয়ে চিঠি পাঠানো হয়। 

জানা গেছে, ২০২১ সালের ২১ জুন প্রথম ধাপে ২০৪টি ইউনিয়ন পরিষদের নির্বাচন হয়। এগুলোর মেয়াদ আগামী জুলাইয়ের মধ্যেই শেষ হবে। মেয়াদ শেষ হওয়ার ১৮০ দিনের মধ্যে নির্বাচন আয়োজনের বিধান রয়েছে। পরে ২০২১ সালের নভেম্বর ও ডিসেম্বরে হওয়া ইউনিয়নগুলোর মেয়াদও শেষ হবে। দ্বিতীয় ও তৃতীয় ধাপে সেসব ইউনিয়নে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে। এ ছাড়া ২০২২ সালের বিভিন্ন সময়ে যেসব ইউনিয়নে নির্বাচন হয়েছিল, সেগুলোও ধাপে ধাপে অনুষ্ঠিত হবে। 

মন্ত্রণালয়ের কাছে থাকা সর্বশেষ তথ্য বলছে, চার হাজার ৫৭৮টি ইউনিয়নের মধ্যে চার হাজার ৫৭১টিতে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছিল। সীমানা ও মামলাজনিত জটিলতার কারণে বাকি সাতটিতে নির্বাচন হয়নি। এসব ইউনিয়নের কিছু জনপ্রতিনিধির মৃত্যু হলেও গত দেড় বছরে সেগুলোতে উপনির্বাচন হয়নি। এ ছাড়া বেশির ভাগ ইউপি চেয়ারম্যান আওয়ামী লীগের নেতাকর্মী হওয়ায় জুলাই অভ্যুত্থানের পর থেকে অনেকে আত্মগোপনে। এটারও সঠিক তথ্য মন্ত্রণালয়ের কাছে নেই। ডিসিদের পাঠানো তথ্য থেকে এ ব্যাপারে মন্ত্রণালয় অবগত হতে পারবে। 

এদিকে ২০২১ সালে ৩৩০টি পৌরসভায় নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। সেগুলোতেও দ্রুত নির্বাচন আয়োজন করতে চায় সরকার। কারণ জনপ্রতিনিধি না থাকায় প্রশাসক দিয়ে পরিচালনা করায় সেগুলোতে নাগরিক সেবা নানাভাবে বিঘ্নিত হচ্ছে। 

মন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব নেওয়ার দিনই স্থানীয় সরকারমন্ত্রী সিটি করপোরেশনের নির্বাচন আগে করার কথা বলেছিলেন। পরে ছয়টি সিটি করপোরেশনে প্রশাসক নিয়োগ করায় এ নিয়ে কিছুটা অস্পষ্টতা তৈরি হয়। তবে বাকি সিটি করপোরেশনগুলোতে এ বছরের মধ্যেই নির্বাচন অনুষ্ঠিত হতে পারে।   
স্থানীয় নির্বাচন কি দলীয় প্রতীকে?

স্থানীয় সরকারের পাঁচটি স্তরে দলীয় পরিচয় ও প্রতীকে নির্বাচন করতে ২০১৫ সালে আইন সংশোধন করে তৎকালীন আওয়ামী লীগ সরকার। এ জন্য স্থানীয় সরকার ব্যবস্থায় পাঁচটি আইন সংশোধন করা হয়। যদিও অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর সিটি করপোরেশন, জেলা পরিষদ, উপজেলা পরিষদ, পৌরসভা ও ইউনিয়ন পরিষদে দলীয় প্রতীকে নির্বাচনের বিধান বাতিল করে অধ্যাদেশ জারি করে। সংসদের প্রথম অধিবেশনে এ অধ্যাদেশ আইন আকারে পাস হবে কিনা এবং তাতে দলীয় প্রতীক ও পরিচয় থাকবে, নাকি বাতিল হচ্ছে– সে অপেক্ষায় রয়েছে স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয় ও নির্বাচন কমিশন। 

গত ২৪ ফেব্রুয়ারি স্থানীয় সরকারমন্ত্রী মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেছিলেন, দলীয় প্রতীকে সিটি করপোরেশনসহ স্থানীয় সরকার নির্বাচন অনুষ্ঠানের চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত জাতীয় সংসদ থেকে নির্ধারণ হবে। তবে বিএনপির একটি বড় অংশের মত স্থানীয় নির্বাচন দলীয় প্রতীকে না করার। অবশ্য ভিন্নমতও রয়েছে। 

এ ব্যাপারে স্থানীয় সরকার বিশেষজ্ঞ ও গবেষণা প্রতিষ্ঠান ইনস্টিটিউট ফর প্ল্যানিং অ্যান্ড ডেভেলপমেন্টের (আইপিডি) উপদেষ্টা অধ্যাপক আকতার মাহমুদ সমকালকে বলেন, স্থানীয় পর্যায়ে অনেক ভালো ও যোগ্য ব্যক্তি আছেন, যারা রাজনীতির সঙ্গে সম্পৃক্ত নন। কিন্তু এলাকার উন্নয়নে ভূমিকা রাখতে পারেন। দলীয় প্রতীকে হলে তাদের জয়ী হওয়া কঠিন হয়ে পড়ে। সেই সুযোগে অনেক অযোগ্য লোক নির্বাচিত হয়ে যায়। তখন সাধারণ মানুষ ভুক্তভোগী হন। এ ছাড়া দলীয় প্রতীকে ভোট হলে দলাদলি যেমন বাড়ে, তেমনি সহিংসতাও বেড়ে যায়। এ জন্য স্থানীয় সরকার নির্বাচন নির্দলীয় প্রতীকে হওয়াই বাঞ্ছনীয়।