Image description

নিজের চেয়ারে আনুষ্ঠানিকভাবে পুরোপুরি বসার আগেই তুমুল আলোচনার কেন্দ্রে ছিলেন নতুন গভর্নর। নিয়োগের ধরন, পেশাগত পরিচয় ও রাজনৈতিক সংশ্লিষ্টতা নিয়ে এখনও প্রশ্ন উঠেছে বিভিন্ন মহলে। কিন্তু বিতর্কের এই আবহের মাঝেই বাংলাদেশ ব্যাংকের নতুন গভর্নর মো. মোস্তাকুর রহমান স্পষ্ট বার্তা দিয়েছেন—অর্থনীতিকে চাঙা করতে সুদের হার পুনর্বিবেচনা করা হবে, আর ব্যাংক খাতের চলমান সংস্কার কার্যক্রম কোনোভাবেই থেমে যাবে না।

গত ২৫ ফেব্রুয়ারি অর্থনীতিবিদ ড. আহসান এইচ মনসুরের নিয়োগ বাতিল করে একই দিনে মোস্তাকুর রহমানকে গভর্নর পদে নিয়োগ দেওয়া হয়। আকস্মিক এই পরিবর্তনে স্বাভাবিকভাবেই নীতিনির্ধারণী মহল, ব্যাংকার ও নাগরিক সমাজে আলোচনা শুরু হয়। কেউ কেউ নিয়োগ প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন, আবার অনেকে রাজনৈতিক সংশ্লিষ্টতার প্রসঙ্গ সামনে এনেছেন।

তবে দায়িত্ব নেওয়ার পর প্রথম বৈঠক ও সংবাদ সম্মেলনে নতুন গভর্নর যে নীতিগত অগ্রাধিকারের কথা জানিয়েছেন, তা অর্থনীতির বর্তমান বাস্তবতায় গুরুত্বের দাবিদার বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।

সুদের হার কমানোর ইঙ্গিত

দীর্ঘদিন ধরে উচ্চ ঋণসুদের চাপে ছিল শিল্প ও ব্যবসা খাত। ১৬-১৮ শতাংশ সুদে বিনিয়োগে অনীহা, উৎপাদন স্থবিরতা এবং কর্মসংস্থান কমে যাওয়ার অভিযোগ ছিল উদ্যোক্তাদের। নতুন গভর্নর জানিয়েছেন, মূল্যস্ফীতির পরিস্থিতি বিবেচনায় রেখে সুদের হার পুনর্বিবেচনা করা হবে।

তিনি ইঙ্গিত দিয়েছেন—ঋণপ্রবাহ বাড়াতে হবে, তবে তা এমনভাবে, যাতে মূল্যস্থিতি বিঘ্নিত না হয়। অর্থাৎ প্রবৃদ্ধি ও মূল্যস্ফীতির মধ্যে ভারসাম্য রক্ষা করেই নীতি সমন্বয় করা হবে। ব্যবসায়ী মহলের একাংশ তার এই বার্তাকে ইতিবাচক হিসেবে দেখছেন।

এ প্রসঙ্গে বাংলাদেশ গার্মেন্টস ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যান্ড এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের (বিজিএমইএ) সভাপতি মাহমুদ হাসান খান বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, “নতুন গভর্নর যেহেতু ব্যবসা বোঝেন, সেহেতু তার সিদ্ধান্তগুলো হবে বাস্তবতার নিরিখে। এতে দেশের অর্থনীতি সঠিক পথে থাকবে এবং নীতিগত স্থিতিশীলতা বজায় থাকবে।”

তিনি আরও বলেন, “আমরা প্রত্যাশা করছি তিনি তার বাস্তব অভিজ্ঞতা কাজে লাগিয়ে এমন নীতি গ্রহণ করবেন, যা সামগ্রিক অর্থনীতির জন্য কল্যাণকর হবে।”

একই সঙ্গে গভর্নরের প্রতি আহ্বান জানিয়ে বিজিএমইএ সভাপতি মাহমুদ হাসান খান বলেন, “কোনও চাপের কাছে নতি স্বীকার না করে তিনি যেন দায়িত্ব পালন করেন। শক্ত অবস্থানে থাকলে তার সুফল পুরো দেশবাসীই পাবে।”

সংস্কারের ধারাবাহিকতা অব্যাহত

ব্যাংক খাতে চলমান সংস্কার কার্যক্রম—বিশেষ করে সমস্যাগ্রস্ত ব্যাংকের বোর্ড পুনর্গঠন ও তদারকি জোরদার অব্যাহত থাকবে বলে জানিয়েছেন গভর্নর।

ব্যাংকের প্রধান নির্বাহীদের সংগঠন অ্যাসোসিয়েশন অব ব্যাংকার্স, বাংলাদেশের (এবিবি) সঙ্গে বৈঠকে তিনি বলেছেন ঋণ বিতরণ বা সুশাসনের ক্ষেত্রে কোনও রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ হলে সরাসরি তাকে জানাতে। তিনি স্পষ্ট করেছেন, কোনও রাজনৈতিক চাপের কাছে নতি স্বীকার করা হবে না। এই ঘোষণা ব্যাংক খাতে আস্থার সংকট কাটাতে সহায়ক হতে পারে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

কর্মসংস্থান ও উৎপাদনে জোর

নতুন গভর্নর অর্থনীতি পুনরুদ্ধারে কর্মসংস্থান সৃষ্টিকে অগ্রাধিকার দিয়েছেন। বন্ধ হয়ে যাওয়া শিল্পকারখানা পুনরায় চালু, সিএমএসএমই খাতে অর্থায়ন বাড়ানো এবং উৎপাদনমুখী বিনিয়োগে সহায়তার কথা বলেছেন তিনি।

তার ভাষ্য, সামষ্টিক স্থিতিশীলতার ভিতের ওপর দাঁড়িয়ে এখন লক্ষ্য হবে বিনিয়োগনির্ভর প্রবৃদ্ধি। অর্থনীতিকে ‘লো লেভেল ইকুইলিব্রিয়াম’ থেকে বের করে উচ্চতর প্রবৃদ্ধির পথে নিতে হবে।

এ প্রসঙ্গে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) চেয়ারম্যান মো. আবদুর রহমান খান বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, “আমরা প্রত্যাশা করছি নতুন গভর্নরের নেওয়া পদক্ষেপে ব্যাংক খাত ভালোভাবে পরিচালিত হবে। ব্যাংকিং খাত স্থিতিশীল থাকলে দেশের ব্যবসা-বাণিজ্যও ভালো চলবে, যার ইতিবাচক প্রভাব পড়বে সামগ্রিক অর্থনীতিতে।”

তিনি আরও বলেন, নতুন গভর্নর ব্যবসায়ী সমাজের সঙ্গে সম্পৃক্ত থাকায় বাস্তবভিত্তিক ও ব্যবসাবান্ধব নীতি গ্রহণে সক্ষম হবেন।’’

এনবিআর চেয়ারম্যান মনে করেন, গভর্নরের উদ্যোগ ম্যাক্রো অর্থনীতিতেও ইতিবাচক ভাবমূর্তি প্রতিষ্ঠায় সহায়ক হবে। “তার নেতৃত্বে নীতিগত ধারাবাহিকতা ও আস্থার পরিবেশ তৈরি হলে সামষ্টিক অর্থনীতিতে ইতিবাচক বার্তা যাবে,” যোগ করেন তিনি।

বিতর্ক বনাম বাস্তবতা

নিয়োগ ঘিরে সমালোচনা থাকলেও প্রশ্ন উঠছে—নীতি বাস্তবায়নের আগেই চূড়ান্ত রায় দেওয়া কতটা যৌক্তিক?

সমর্থকদের মতে, নতুন গভর্নরের বক্তব্যে স্পষ্ট—তিনি নিয়মভিত্তিক ব্যাংকিং, সুশাসন ও প্রাতিষ্ঠানিক মর্যাদা পুনর্গঠনে জোর দিতে চান।

এ প্রসঙ্গে বাংলাদেশ নিটওয়্যার ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যান্ড এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশন (বিকেএমইএ) সভাপতি মোহাম্মদ হাতেম বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, “অতীতের গভর্নররা পরিস্থিতি অনুধাবন করলেও শিল্প খাতে প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতার ঘাটতির কারণে অনেক সময় বাস্তবসম্মত সিদ্ধান্ত নিতে পারেননি।’’ তবে নতুন গভর্নরের ক্ষেত্রে তিনি আশাবাদ ব্যক্ত করে বলেন, “নতুন গভর্নরের বাস্তব অভিজ্ঞতা রয়েছে। আমরা আশা করছি তিনি সেই অভিজ্ঞতা কাজে লাগিয়ে শিল্পবান্ধব নীতি প্রণয়ন করবেন।”

রাজনৈতিক চাপের কাছে নতি স্বীকার নয়

বাংলাদেশ ব্যাংকের নবনিযুক্ত গভর্নর মোস্তাকুর রহমান রাজনৈতিক চাপের কাছে নতি স্বীকার না করে ব্যাংকিং খাতের চলমান সংস্কার কার্যক্রম অব্যাহত রাখার ঘোষণা দিয়েছেন। তিনি বলেন, ‘‘সুশাসন প্রতিষ্ঠা ও আর্থিক স্থিতিশীলতা ফেরাতে যে উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে, তা কোনোভাবেই থেমে থাকবে না।’’ রবিবার (১ মার্চ) কেন্দ্রীয় ব্যাংকে ব্যাংকের শীর্ষ নির্বাহীদের সংগঠন অ্যাসোসিয়েশন অব ব্যাংকার্স, বাংলাদেশের (এবিবি) প্রতিনিধিদের সঙ্গে বৈঠকে এসব কথা বলেন গভর্নর।

বৈঠক শেষে এবিবির চেয়ারম্যান মাসরুর আরেফিন জানান, সমস্যাগ্রস্ত ব্যাংকগুলোর পরিচালনা পর্ষদ পুনর্গঠনসহ চলমান সংস্কার কার্যক্রম নিরবচ্ছিন্নভাবে এগিয়ে নেওয়া হবে।

কেন্দ্রীয় ব্যাংকের মুখপাত্র আরিফ হোসেন খান বলেন, গভর্নর ব্যবসা ও উৎপাদনবান্ধব পরিবেশ গড়ে তুলে এক কোটি নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টির লক্ষ্য সামনে রেখেছেন। খেলাপি ঋণের কারণে স্থবির হয়ে পড়া সম্পদের উৎপাদনশীল ব্যবহার নিশ্চিত করার ওপরও জোর দেওয়া হয়েছে।

উল্লেখ্য, মোস্তাকুর রহমান শিক্ষাগতভাবে একজন হিসাববিদ এবং পেশাগতভাবে পোশাকশিল্পের উদ্যোক্তা। এই পরিচয়ে দেশে অসংখ্য দক্ষ পেশাজীবী রয়েছেন। কেউ কেউ বলছেন, নতুন গভর্নর সঠিক বার্তা দেওয়ার চেষ্টা করলেও তার বক্তব্যের চেয়ে তার পরিচয় নিয়েই বেশি আলোচনা হচ্ছে।

বেসরকারি গবেষণা সংস্থা সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগও (সিপিডি) নিয়োগ প্রক্রিয়া নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে। সিপিডির গবেষণা পরিচালক খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম হোসেন বলেন, গভর্নর নিয়োগের ক্ষেত্রে সরকার আরও স্বচ্ছ ও মানদণ্ডভিত্তিক প্রক্রিয়া অনুসরণ করতে পারতো।

সময়ই দেবে উত্তর

বাংলাদেশের ব্যাংক খাত এখনও বহুমাত্রিক চ্যালেঞ্জের মুখে—উচ্চ মূল্যস্ফীতি, খেলাপি ঋণ, বিনিয়োগ স্থবিরতা ও আস্থার সংকট। এই বাস্তবতায় নতুন নেতৃত্বের প্রতিশ্রুতি কত দ্রুত বাস্তব পদক্ষেপে রূপ পায়, সেটিই হবে মূল পরীক্ষা। এখন দেখার বিষয়, ঘোষণা থেকে বাস্তবায়নের পথে তিনি কতটা এগোতে পারেন এবং আস্থাহীনতার এই সময়ে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নেতৃত্বকে কতটা কার্যকরভাবে প্রতিষ্ঠা করতে সক্ষম হন।