যুক্তরাষ্ট্র-ইসরাইলের হামলা ও ইরানের পাল্টা হামলায় উত্তপ্ত মধ্যপ্রাচ্য। যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইল হামলার পর হরমুজ প্রণালি দিয়ে কোনো জাহাজ চলাচলের অনুমতি দেয়া হচ্ছে না শনিবার থেকে। হরমুজ প্রণালি বন্ধের কারণে বাংলাদেশের এলএনজি ও তেল আমদানি ব্যাহত হবে বলে জানিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা। ফলে বিদ্যুৎ, শিল্প, পরিবহন এবং সাধারণ জীবনযাত্রায় ব্যাপক প্রভাব পড়বে। তেল ও গ্যাসের দাম বাড়বে, বাড়বে পণ্যের মূল্য। আর এর চূড়ান্ত বোঝা পড়বে সাধারণ মানুষের কাঁধে।
বিশ্বের গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি সরবরাহের পথ এই হরমুজ প্রণালি। এই প্রণালি দিয়ে জাহাজ চলাচল বন্ধের পদক্ষেপ বৈশ্বিক তেলের দামের ওপর মারাত্মক প্রভাব ফেলতে পারে বলে আগেই সতর্ক করেন বিশ্লেষকরা।
যুদ্ধের কারণে বাংলাদেশের জ্বালানিতে কী প্রভাব পড়বে জানতে চাইলে কনজুমারস এসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (ক্যাব)-এর জ্বালানি বিষয়ক উপদেষ্টা অধ্যাপক ড. এম শামসুল আলম মানবজমিনকে বলেন, যুদ্ধকালীন ঝুঁকির মধ্যে আছি আমরা। এতে তেলের সংকট তৈরি হতে পারে। আন্তর্জাতিক বাজারে দাম বাড়ার সম্ভাবনা বেশি দেখছেন তিনি। এসময় দেশে তেল এবং এলএনজির দাম বেড়ে যাওয়ার আশঙ্কা প্রকাশ করেন এই জ্বালানি বিশেষজ্ঞ। বলেন, নিরাপত্তার অজুহাতে জাহাজ মালিকরা চলাচল বন্ধ করে দিতে পারে। বা যারা নিরাপত্তার ঝুঁকি নিয়ে চলাচল করবে তারা আবার ভাড়া বাড়িয়ে দিবে। ফলে অর্থনীতিতে নেতিবাচক প্রভাব পড়বে। জ্বালানির কারণে দেশে পণ্যের উৎপাদনে লক্ষ্যমাত্রা পূরণ না হলে জীবনযাত্রায় প্রভাব পড়বে।
বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয় (বুয়েট) কেমিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের সাবেক অধ্যাপক ড. ইজাজ হোসেন মানবজমিনকে বলেন, এই যুদ্ধ কতোদিন চলবে তার উপরে নির্ভর করছে আমাদের জ্বালানির ক্ষেত্রে এর প্রভাব। যুদ্ধ যদি দুই সপ্তাহের মধ্যে শেষ হয় তাহলে আমাদের তেমন প্রভাব পড়বে না। এটা সামলানো যাবে। কিন্তু এটা দীর্ঘমেয়াদি হলে তেলের বাজারে বেশ প্রভাব পড়বে। তিনি বলেন, প্রতি মাসেই আমাদের এলএনজি কিনতে হয়। তবে পরিশোধিত তেল আসে সিঙ্গাপুর থেকে। তিনি উদাহরণ দিয়ে বলেন, ইউক্রেন ও রাশিয়ার যুদ্ধের কারণে তেলের দাম বেড়ে গিয়েছিল। সেটা আমাদের মনে রাখতে হবে। এই বিশেষজ্ঞ বলেন, জ্বালানির সরবরাহ ঠিক না থাকলে সর্বক্ষেত্রে এর প্রভাব পড়বে দেশে। সৌদি আরব এবং আমেরিকা যদি তেলের সরবরাহ বাড়িয়ে দেয় তাহলে দাম নিয়ন্ত্রণে রাখা যাবে বলেও মন্তব্য করেন এই অধ্যাপক।
এ বিষয়ে দেশের বিদ্যুৎ ও জ্বালানি বিশেষজ্ঞ, পাওয়ার সেলের সাবেক মহাপরিচালক প্রকৌশলী বিডি রহমত উল্লাহ মানবজমিনকে বলেন, যুদ্ধ দীর্ঘ সময় ধরে হলে জ্বালানি বাজারে অনেক প্রভাব পড়বে। বিশ্ববাজারে তেলের দাম বেড়ে যাবে। আমাদের তেল ও এলএনজি আমদানি করতে হবে বিদেশ থেকে। তা ঠিক মতো আমদানি করতে না পারলে সব ক্ষেত্রে প্রভাব পড়বে। কিন্তু ১৫-১৬ দিনের মধ্যে যুদ্ধ শেষ হলে প্রভাব পড়বে না। আমাদের সোলার শক্তি না থাকায় আমাদের সব সময়ে শঙ্কার মধ্যে থাকতে হয়।
বাংলাদেশের এলএনজি আমদানির প্রধান উৎস হিসেবে কাতার ও ওমান অন্যতম। পেট্রোবাংলার তথ্য মতে, কাতারের সঙ্গে বাংলাদেশের ১৫ বছরের ও ওমানের সঙ্গে ১০ বছরের এলএনজি আমদানির চুক্তি রয়েছে।
বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন সূত্র জানায়, আন্তর্জাতিক বাজারমূল্য অনুসরণ করে মাসিক গড় দামের ভিত্তিতে তেলের দাম নির্ধারণ করা হয় দেশে। হরমুজ প্রণালি বন্ধ হলে, লোহিত সাগর ও আরব সাগর ব্যবহার করে বিকল্প পরিবহন রুট বেছে নিতে হবে, যা জাহাজ ভাড়া ও পরিবহন খরচ বাড়াবে।
বাংলাদেশে এলএনজি ও তেল সরবরাহে হরমুজ প্রণালির গুরুত্ব বিবেচনায় নিয়ে সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এ রুট বন্ধ থাকলে দেশের গ্যাস সরবরাহে বড় ধরনের বিঘ্ন ঘটতে পারে। এতে বিদ্যুৎ উৎপাদন ও শিল্প খাত ক্ষতিগ্রস্ত হবে। বিশেষ করে তৈরি পোশাক শিল্প এলএনজি’র ওপর নির্ভরশীল, তাই এর দাম বৃদ্ধির ফলে উৎপাদন ব্যয় বেড়ে যাবে।
দেশের একমাত্র রিফাইনারি ইস্টার্ন রিফাইনারিতে বছরে প্রায় ১২-১৫ লাখ টন ক্রুড তেল পরিশোধন করা হয় জানিয়ে বিপিসি’র কর্মকর্তারা জানান, বিপিসি’র কাছে সর্বোচ্চ ৩৫ থেকে ৪০ দিনের জ্বালানি মজুত থাকে, যা প্রায় ৪ লাখ টন। এই মজুত কিছু সময়ের জন্য সংকট মোকাবিলায় সাহায্য করবে কিন্তু দীর্ঘমেয়াদি সংকটের ক্ষেত্রে বিকল্প পরিকল্পনা গ্রহণ করা আবশ্যক।
যুদ্ধের কারণে জ্বালানির বাজারে প্রভাব পড়বে কিনা জানতে চাইলে রাষ্ট্রীয় তেল আমদানিকারী প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশনের পরিচালক (অপারেশন ও পরিকল্পনা) ড. একেএম আজাদুর রহমান বলেন, যুদ্ধ দীর্ঘমেয়াদি হলে বিশ্ববাজারের সঙ্গে আমাদেরও প্রভাব পড়বে। বলেন, হরমুজ প্রণালি দিয়ে আমাদের তেল কম আসে। ফলে আমাদের তেমন সমস্যা নেই। আমাদের তেল আসে সিঙ্গাপুর, মালেশিয়া, চীন, ইন্দোনেশিয়া এবং ভারত থেকে। এ মাসে এক লাখ টন করে দুটি ক্রুড অয়েলের জাহাজ হরমুজ প্রণালি হয়ে আসবে দেশে। এরমধ্যে রোববার একটি জাহাজ চলে এসেছে। আর একটি এ মাসের ২২ তারিখে আসার কথা রয়েছে।
বলা হয়, হরমুজ প্রণালি পারস্য উপসাগরে যাওয়ার একমাত্র সামুদ্রিক প্রবেশপথ। এর এক পাশে ইরান, অন্য পাশে ওমান ও সংযুক্ত আরব আমিরাত। এ প্রণালি পারস্য উপসাগরকে ওমান উপসাগর ও আরব সাগরের সঙ্গে যুক্ত করেছে। ভৌগোলিকভাবে বলতে গেলে, প্রণালিটি পারস্য উপসাগরকে সরাসরি ওমান উপসাগরের সঙ্গে যুক্ত করে। সেই পথ ধরে জাহাজগুলো আরব সাগরে তথা ভারত মহাসাগরে প্রবেশ করে।