Image description

মধ্যপ্রাচ্যের ভূ-রাজনীতিতে গত দুই বছর ধরে চলা অস্থিরতার মাঝে একের পর এক বড় ধাক্কা খেয়েছে ইরান ও তাদের মিত্র সশস্ত্র সংগঠনগুলো। ২০২৩ সাল থেকে শুরু হওয়া ইসরায়েলের বিশেষ অভিযানে হামাস, হিজবুল্লাহ এবং হুথি বিদ্রোহীরা তাদের ইতিহাসের সবচেয়ে প্রভাবশালী নেতাদের হারিয়েছে। এই ধারায় সবশেষ এবং সবচেয়ে বড় আঘাতটি আসে ২০২৬ সালের ২৮ ফেব্রুয়ারি, যখন যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের এক যৌথ সামরিক অভিযানে ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনি নিহত হন। 

১৯৮৯ সাল থেকে ইরানের শাসনভার সামলানো এই নেতা কেবল ইরানের প্রধান ছিলেন না বরং তিনি ছিলেন পুরো অক্ষশক্তির (অ্যাক্সিস অব রেজিস্ট্যান্স) প্রধান চালিকাশক্তি।

তার মৃত্যুর আগে ইরানজুড়ে চরম অর্থনৈতিক মন্দা ও অভ্যন্তরীণ অস্থিরতা দেখা দিয়েছিল, যা তিনি অত্যন্ত কঠোর হাতে দমন করেছিলেন।

খামেনির এই নাটকীয় পতনের আগে থেকেই ইসরায়েল তাদের লক্ষ্যবস্তু নির্ধারণ করে একে একে শীর্ষ নেতাদের সরিয়ে দিচ্ছিল। ২০২৪ সালের ২ জানুয়ারি বৈরুতে এক ড্রোন হামলায় নিহত হন হামাসের উপ-রাজনৈতিক প্রধান সালেহ আল-আরৌরি, যাকে কাসাম ব্রিগেডের অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা মনে করা হতো। এরপর জুলাই মাসে গাজার খান ইউনিসে বিমান হামলায় হামাস সামরিক শাখার প্রধান মোহাম্মদ দেইফ নিহত হন, যাকে ৭ অক্টোবরের হামলার মূল পরিকল্পনাকারী হিসেবে চিহ্নিত করেছিল ইসরায়েল।

একই মাসের শেষ দিকে বৈরুতে হিজবুল্লাহর অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা ফুয়াদ শুকুর এবং এর মাত্র কয়েক ঘণ্টার ব্যবধানে তেহরানে হামাসের রাজনৈতিক প্রধান ইসমাইল হানিয়াহ নিহত হলে পুরো অঞ্চল যুদ্ধের দ্বারপ্রান্তে পৌঁছে যায়।

সেপ্টেম্বরের শেষ দিকে ইসরায়েলি বিমান হামলায় হিজবুল্লাহর দীর্ঘদিনের প্রধান হাসান নাসরুল্লাহ নিহত হওয়ার ঘটনাটি ছিল লেবানন ভিত্তিক এই সংগঠনের জন্য এক অপূরণীয় ক্ষতি। নাসরুল্লাহর মৃত্যুর ঠিক পরদিনই হিজবুল্লাহর কেন্দ্রীয় পরিষদের উপ-প্রধান নাবিল কাউক এবং পরবর্তী মাসে তার সম্ভাব্য উত্তরসূরি হাশেম সাফিয়েদ্দিনও নিহত হন।

অন্যদিকে গাজায় হামাসের নতুন প্রধান হিসেবে দায়িত্ব নেওয়া ইয়াহিয়া সিনওয়ার ১৬ অক্টোবর সম্মুখ যুদ্ধে নিহত হলে সংগঠনটি নেতৃত্বশূন্য হয়ে পড়ে।

২০২৫ সালের মে মাসে ইয়াহিয়ার ভাই মোহাম্মদ সিনওয়ারকেও হত্যা করতে সক্ষম হয় ইসরায়েলি বাহিনী।

যুদ্ধের আঁচ যখন সরাসরি ইরানের ওপর আছড়ে পড়ে, তখন গত জুন মাসে ইসরায়েল-ইরান ১২ দিনের যুদ্ধ চলাকালীন আইআরজিসি প্রধান হোসেন সালামি নিহত হন। সংঘাতের এই বিস্তার কেবল ইরান বা গাজায় সীমাবদ্ধ থাকেনি। আগস্ট মাসে ইয়েমেনের হুতি প্রশাসনের প্রধানমন্ত্রী আহমেদ আল-রাহাওয়ি এবং একই দিনে হামাসের সুপরিচিত মুখপাত্র আবু ওবাইদা গাজায় পৃথক বিমান হামলায় প্রাণ হারান। একের পর এক এই শীর্ষ হত্যাকাণ্ডের ফলে বর্তমানে ইরানসহ গোটা মধ্যপ্রাচ্যের প্রতিরোধ গোষ্ঠীগুলো এক নজিরবিহীন নেতৃত্ব সংকটের সম্মুখীন হয়েছে।

খামেনির মৃত্যুর পর ইরানের পরবর্তী উত্তরসূরি কে হবেন, তা নিয়ে এখন বিশ্বজুড়ে জল্পনা তুঙ্গে, যার ওপর নির্ভর করছে আগামী দিনের মধ্যপ্রাচ্যের ভবিষ্যৎ।