Image description

ইরানে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের সামরিক বাহিনীর হামলার পরপরই মধ্যপ্রাচ্য জুড়ে অস্থির পরিস্থিতি বিরাজ করছে। এমন পরিস্থিতিতে মধ্যপ্রাচ্যর দেশগুলো তাদের আকাশ সীমানা বন্ধ করে দিয়েছে। ফলে নিরাপত্তাজনিত কারণে পৃথিবীর অন্যান্য দেশের মতো বাংলাদেশ থেকে মধ্যপ্রাচ্যর দেশগুলোতে ফ্লাইট পরিচালনা করে এমন এয়ারলাইন্সগুলো ফ্লাইট পরিচালনা বন্ধ করে দিয়েছে। ২৮ই ফেব্রুয়ারি বিকাল থেকে ইরান, ইরাক, কুয়েত, সংযুক্ত আরব আমিরাত, বাহরাইন, কাতার ও জর্ডান তাদের আকাশসীমা সাময়িকভাবে বন্ধ ঘোষণা করে। এর সরাসরি প্রভাব পড়ে ঢাকার হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে। তাই তিনদিনে বিভিন্ন এয়ারলাইন্সের মোট ৭৪টি ফ্লাইট বাতিল ঘোষণা করা হয়েছে। ফ্লাইট বাতিল হওয়াতে মধ্যপ্রাচ্যগামী হাজার হাজার যাত্রী ভোগান্তিতে পড়েছেন।

অনিশ্চয়তার মধ্যদিয়ে সময় পার করছেন। বিশেষ করে ঢাকার বাইরে থাকা যাত্রীদের দুর্ভোগের শেষ নাই। বিমানবন্দরের সামনে যাত্রী ও স্বজনরা অপেক্ষার প্রহর গুনছেন। তবে বিমান প্রতিমন্ত্রী বলেছেন, স্থগিত হওয়া ফ্লাইটগুলো রিসিডিউল করে যাত্রীদের পর্যাপ্ত সময় দেয়া হবে। একইসঙ্গে পরিস্থিতির ওপর নজর রেখে যাত্রীদের দুর্ভোগ কমাতে বিশেষ ব্যবস্থা নিয়েছে বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রণালয়। প্রবাসী কল্যাণমন্ত্রী জানিয়েছেন, দুর্ভোগে পড়া যাত্রীদের সার্বক্ষণিক সেবা দিতে হট লাইন চালু করা হয়েছে। এর বাইরে একই মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী জানিয়েছেন, প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণ ও সমন্বিত সিদ্ধান্ত নিতে সংশ্লিষ্ট সব মন্ত্রণালয়ের সমন্বয়ে একটি বিশেষ কমিটি গঠন করা হয়েছে।

বিমানবন্দর সূত্র জানায়, উদ্ভূত পরিস্থিতিতে ৭৪টি ফ্লাইট বাতিল করা হয়েছে। ২৮শে ফেব্রুয়ারি রাত পর্যন্ত মোট ২৩টি ফ্লাইট বাতিল হয়। এর মধ্যে ছিল এমিরেটসের ১টি, গালফ এয়ারের ১টি, ফ্লাই দুবাইয়ের ১টি, এয়ার অ্যারাবিয়ার ৩টি, ইউএস-বাংলা এয়ারলাইন্সের ৬টি এবং বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের ১১টি ফ্লাইট। গতকাল সারাদিনে বাতিল ফ্লাইটের সংখ্যা ৪০টি। এদিন জাজিরা এয়ারওয়েজের ২টি, এমিরেটসের ৫টি, গালফ এয়ায়ের ২টি, ফ্লাই দুবাইয়ের ৪টি, কাতার এয়ারওয়েজের ২টি, সালাম এয়ারের ২টি, এয়ার অ্যারাবিয়ার ৮টি, কুয়েত এয়ারওয়েজের ২টি, ইউএস-বাংলা এয়ারলাইন্সের ৪টি এবং বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের ৯টি ফ্লাইট বাতিল করা হয়। এছাড়া এখন পর্যন্ত ২রা মার্চ সোমবারের ১১টি ফ্লাইট বাতিল করা হয়েছে। এর মধ্যে কাতার এয়ারওয়েজের ৪টি, এমিরেটসের ৫টি এবং গালফ এয়ারের ২টি ফ্লাইট রয়েছে। তবে নিরাপত্তা ঝুঁকি নাই এমন দেশগুলোতে কিছু এয়ারলাইন্স ফ্লাইট পরিচালনা করছে। এছাড়া ইউরোপ আমেরিকাসহ অন্যান্য অঞ্চলে সবকিছু স্বাভাবিক রয়েছে।

বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের মধ্যপ্রাচ্যগামী সব ফ্লাইট (শুধুমাত্র দোহা, দুবাই এবং আবুধাবী ব্যতীত) নির্ধারিত সময়ে যাত্রা করবে বলে জানিয়েছে এয়ারলাইন্স কর্তৃপক্ষ। বিমান থেকে গণমাধ্যমে পাঠানো একবার্তায় বলা হয়, সব যাত্রীকে নির্ধারিত সময়ের চার ঘণ্টা আগে এয়ারপোর্টে উপস্থিত থাকার জন্য অনুরোধ জানিয়েছে।

গতকাল ইউএস-বাংলা এয়ারলাইন্সের এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়, রোববার থেকে সৌদি আরবের রিয়াদ ও জেদ্দা এবং ওমানের মাসকাটে ফ্লাইট নির্ধারিত সময়সূচি অনুযায়ী পরিচালিত হবে। যাত্রীদের নির্ধারিত ফ্লাইট সূচির চার ঘণ্টা আগে বিমানবন্দরে উপস্থিত হতে অনুরোধ জানিয়েছে ইউএস-বাংলা এয়ারলাইন্স। সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে আরও বলা হয়, মধ্যপ্রাচ্যের সার্বিক পরিস্থিতি বিবেচনায় ইউএস-বাংলা এয়ারলাইন্স সংযুক্ত আরব আমিরাতের দুবাই, আবুধাবী, শারজাহ ও কাতারের রাজধানী দোহায় ফ্লাইট চলাচল সাময়িকভাবে স্থগিত করেছে। আরব আমিরাত ও কাতারে ফ্লাইট চলাচল উপযোগী হওয়া মাত্রই যাত্রীদের সঙ্গে যোগাযোগ করবে ইউএস-বাংলা এয়ারলাইন্স কর্তৃপক্ষ।

প্রবাসীকল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রী আরিফুল হক চৌধুরী বলেছেন, হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে মধ্যপ্রাচ্যগামী আটকে পড়া যাত্রীদের ২৪ ঘণ্টার সেবা দিতে ‘হটলাইন’ চালু করা হয়েছে। যাত্রীদের দুর্ভোগ লাঘবে সব ধরনের ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছে।

বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন প্রতিমন্ত্রী এম রশিদুজ্জামান মিল্লাত বলেছেন, ইরান-ইসরাইল পরিস্থিতির প্রেক্ষাপটে মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন রুটে স্থগিত হওয়া ফ্লাইটগুলো রিসিডিউল করে যাত্রীদের পর্যাপ্ত সময় দেয়া হবে। একইসঙ্গে পরিস্থিতির ওপর নজর রেখে যাত্রীদের দুর্ভোগ কমাতে বিশেষ ব্যবস্থা নিয়েছে বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রণালয়। প্রতিমন্ত্রী জানান, বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সেরও কিছু রুটের পরিকল্পনা স্থগিত রাখা হয়। তবে পরিস্থিতি বিবেচনায় পুনরায় ফ্লাইট কার্যক্রম শুরু হয়েছে। গতকাল স্থগিত হওয়া ফ্লাইটগুলো রিসিডিউল (সময় পরিবর্তন) করা হয়েছে। সিভিল এভিয়েশন চেয়ারম্যান, সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের সচিব এবং পররাষ্ট্র ও প্রবাসী কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে সমন্বয় করে আমরা কাজ করছি। আশা করছি, সোমবারের মধ্যে স্থগিত ফ্লাইটের যাত্রীদের গন্তব্যে পাঠানোর ব্যবস্থা সম্পন্ন হবে। দেশের বাইরে গন্তব্যে পৌঁছাতে না পারা যাত্রীদের সুযোগ-সুবিধার বিষয়ে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান নিজেই সার্বক্ষণিক খোঁজ নিচ্ছেন বলে জানান প্রতিমন্ত্রী।

রশিদুজ্জামান মিল্লাত বলেন, প্রধানমন্ত্রী বিষয়টি সরাসরি মনিটর করছেন। যাত্রীদের ইফতারসহ যাবতীয় দেখভালের বিষয়ে তিনি আমাদের নিয়মিত নির্দেশনা দিচ্ছেন। আমরা অত্যন্ত সফলভাবে যাত্রীদের সব সুবিধা নিশ্চিত করতে সক্ষম হয়েছি। যাত্রীদের প্রতি বিশেষ অনুরোধ জানিয়ে প্রতিমন্ত্রী বলেন, পরিস্থিতি যেহেতু পরিবর্তনশীল, তাই যাত্রীরা যেন বিমানবন্দরে আসার আগে সংশ্লিষ্ট এয়ারলাইন্স বা ট্রাভেল এজেন্সির সঙ্গে যোগাযোগ করে ফ্লাইটের সঠিক সময় জেনে নেন।

এদিকে, প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান প্রতিমন্ত্রী নুরুল হক নুর বলেছেন, মধ্যপ্রাচ্যে চলমান অস্থির পরিস্থিতিতে প্রবাসীদের সুরক্ষা ও প্রয়োজনীয় করণীয় নির্ধারণে সরকার সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে কাজ করছে। প্রধানমন্ত্রী নিজেই পুরো বিষয়টি তদারকি করছেন। এ পরিস্থিতিতে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণ ও সমন্বিত সিদ্ধান্ত নিতে সংশ্লিষ্ট সব মন্ত্রণালয়ের সমন্বয়ে একটি বিশেষ কমিটি গঠন করা হয়েছে। প্রবাসীদের নিরাপত্তা নিশ্চিতে দূতাবাসগুলোকে সতর্ক অবস্থানে রাখা হয়েছে।

দুর্ভোগে যাত্রীরা: সরজমিন হজরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে গিয়ে দেখা যায়, বিমানবন্দরের টার্মিনালগুলোর সামনে শত শত যাত্রী লাগেজসহ মালপত্র নিয়ে অপেক্ষা করছেন। দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে এসেছেন তারা। যাত্রীদের সঙ্গে তাদের আত্মীয়স্বজনরাও অপেক্ষা করছিলেন। তবে ওইসব যাত্রীদের কারও কারও ফ্লাইট বাতিল হয়নি, তারা কাঙ্ক্ষিত ফ্লাইটের জন্য কয়েকঘণ্টা আগেই পৌছে অপেক্ষা করছিলেন বিমানবন্দরে। ফ্লাইট বাতিল হওয়া যাত্রীরা জানেন না, কবে নাগাদ তাদের ফ্লাইট চালু হবে কিংবা আদৌ তারা যেতে পারবেন কিনা।

অন্যদিকে, বিভিন্ন এয়ারলাইন্সের নোটিশ ঝুলছিল টার্মিনালের মূল ফটকের পাশে। সেখানে ফ্লাইট বন্ধের বিষয়ে যাত্রীদের জানানো হয়েছে। যাত্রীদের মধ্যে উদ্বিগ্নতা দেখা গেছে। বেশির ভাগ যাত্রীই ঢাকার বাইরে থেকে এসেছেন। ফলে ঢাকায় থাকা নিয়েও সীমাহীন ভোগান্তিতে পড়ে যান তারা। মধ্যপ্রাচ্যে বাংলাদেশ থেকে বিপুলসংখ্যক শ্রমিক জনশক্তি হিসেবে রপ্তানি করা হয়। ফ্লাইট বাতিল হওয়াদের বেশির ভাগই ছিল বিভিন্ন পেশার শ্রমিক ও দক্ষ জনশক্তি। বিকাল সাড়ে চারটার দিকে বিমানবন্দরের টার্মিনাল-১ এর স্ক্রিনে দেখা গেছে- বর্হিগমন ফ্লাইটের মধ্যে চালু ছিল জেদ্দা, কুয়ালালামপুর, মাসকাট, মদিনাগামী ফ্লাইট; ইজিপ্টএয়ারের কায়রো; ইন্ডিগোর মুম্বই চেন্নাইগামী ফ্লাইট; সাউদিয়ার মদিনাগামী; ইউএস বাংলার মদিনা, দুবাই; ইন্ডিগোর কলকাতা; এমিরেটস এয়ারলাইন্সের দুবাইগামী ফ্লাইট।