Image description

ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের যৌথ সামরিক অভিযানের পর ইরানকে ঘিরে মধ্যপ্রাচ্যে উত্তেজনা দ্রুত ছড়িয়ে পড়েছে। পাল্টা প্রতিক্রিয়ায় উপসাগরীয় অঞ্চলে ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলার খবর আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে আসছে। পরিস্থিতি দীর্ঘায়িত হলে এর প্রভাব শুধু আঞ্চলিক নিরাপত্তায় সীমাবদ্ধ থাকবে না। বৈশ্বিক জ্বালানি বাজার, শিপিং রুট, বিমা ব্যয়, মুদ্রাবাজার ও বাণিজ্য প্রবাহে বড় ধরনের অস্থিরতা তৈরি হতে পারে।

আমদানি-নির্ভর জ্বালানি, মধ্যপ্রাচ্যনির্ভর রেমিট্যান্স এবং তৈরি পোশাকনির্ভর রফতানি কাঠামোর কারণে বাংলাদেশও এই অভিঘাত থেকে বিচ্ছিন্ন থাকবে না। বরং জ্বালানি মূল্য, বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ, মূল্যস্ফীতি ও রেমিট্যান্স—এই চার খাতেই তাৎক্ষণিক চাপ তৈরি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। নতুন সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর ব্যবসায়ীদের মধ্যে যে আস্থার সঞ্চার শুরু হয়েছিল, এই সংকট তা অনিশ্চয়তার মুখে ফেলতে পারে।

যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যৌথ বিমান হামলায় ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি নিহত হয়েছেন—এমন দাবি করেছে দুই দেশ। একই তথ্য জানিয়েছে, মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এবং ইরানের রাষ্ট্রীয় টেলিভিশন। ওয়াশিংটন ও তেল আবিব বলছে, ইরানে ‘শাসন পরিবর্তন’ লক্ষ্যেই এই অভিযান চালানো হয়েছে।

ইসরায়েলি কর্তৃপক্ষের দাবি, বিভিন্ন কৌশলগত লক্ষ্যবস্তুতে ব্যাপক হামলায় ইরানের একাধিক শীর্ষ সামরিক ও রাজনৈতিক নেতাও নিহত হয়েছেন। অস্ট্রেলিয়ার গণমাধ্যম এবিসি নিউজের এক প্রতিবেদনে বলা হয়, যুক্তরাষ্ট্র এই হামলার নাম দিয়েছে ‘অপারেশন এপিক ফিউরি’ এবং ইসরায়েল নাম দিয়েছে ‘অপারেশন রোরিং লায়ন’। জবাবে ‘অপারেশন ট্রু প্রমিজ ফোর’ নামে পাল্টা প্রতিশোধমূলক হামলা চালাচ্ছে তেহরান।

কয়েক মাসের পরিকল্পনার পর শনিবার (২৮ ফেব্রুয়ারি) সকালে ইরানে হামলা শুরু হয়। এর জবাবে ইসরায়েল এবং মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্রের মিত্র দেশগুলোতে অবস্থিত মার্কিন সামরিক ঘাঁটিগুলো লক্ষ্য করে ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা চালিয়েছে ইরান।

এদিকে কৌশলগতভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালি দিয়ে জাহাজ চলাচল বন্ধের ঘোষণা দিয়েছে বলে জানিয়েছে ইরানের আধা সরকারি সংবাদমাধ্যম ‘তাসনিম’ নিউজ এজেন্সি। শনিবার রাতে প্রকাশিত প্রতিবেদনে বলা হয়, হরমুজ প্রণালির আশপাশে অবস্থানরত জাহাজগুলোকে ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কোর (আইআরজিসি) ভেরি হাই ফ্রিকোয়েন্সি (ভিএইচএফ) বেতার বার্তার মাধ্যমে সতর্ক করেছে—এই জলপথ দিয়ে কোনও জাহাজ চলাচল করতে পারবে না।

বার্তা সংস্থা রয়টার্স ও ইউরোপীয় ইউনিয়নের নৌ-মিশনের এক কর্মকর্তার বরাত দিয়ে একই তথ্য জানিয়েছে। তবে এখনও আনুষ্ঠানিকভাবে প্রণালি বন্ধের ঘোষণা দেয়নি ইরান সরকার।

হরমুজ প্রণালি কেন গুরুত্বপূর্ণ

বিশ্বের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি পরিবহন রুট হিসেবে পরিচিত হরমুজ প্রণালি। পারস্য উপসাগরে প্রবেশের একমাত্র সামুদ্রিক পথ এটি—এক পাশে ইরান, অন্য পাশে ওমান ও সংযুক্ত আরব আমিরাত। এই জলপথ পারস্য উপসাগরকে ওমান উপসাগর হয়ে আরব সাগর ও ভারত মহাসাগরের সঙ্গে যুক্ত করেছে।

যুক্তরাষ্ট্রের জ্বালানি তথ্য প্রশাসনের হিসাব অনুযায়ী, বিশ্বের মোট জ্বালানি তেলের প্রায় ২০ শতাংশ (প্রতিদিন প্রায় দুই কোটি ব্যারেল তেল) এই প্রণালি দিয়ে পরিবাহিত হয়। এই সরু জলপথ দিয়ে প্রতিদিন প্রায় ২০ মিলিয়ন ব্যারেল অপরিশোধিত তেল পরিবাহিত হয়—যা বৈশ্বিক সরবরাহের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ। সমুদ্রপথে পরিবাহিত এলএনজির বড় অংশও এই রুটনির্ভর।

বিজিএমইএ’র সাবেক পরিচালক মহিউদ্দিন রুবেল বলেন, ‘‘বিশ্বের প্রায় ২০ শতাংশ তেল এবং ২৫ শতাংশের বেশি এলএনজি এই প্রণালি দিয়ে যায়। এর ৮০ শতাংশের বেশি সরবরাহ যায় এশিয়ায়, বিশেষ করে এশিয়ার বড় অর্থনীতি—চীন, জাপান, ভারত ও দক্ষিণ কোরিয়া এই প্রণালির ওপর অত্যন্ত নির্ভরশীল। ফলে এখানে সামান্য উত্তেজনাও বিশ্ববাজারে তেলের দামে তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করে। ইতোমধ্যে ব্রেন্ট ক্রুডের দাম ব্যারেলপ্রতি ৭৩ ডলারে পৌঁছেছে।’’

তার ভাষ্য, সেখানে উত্তেজনা তৈরি হলেই বিশ্ববাজারে তেল-গ্যাসের দাম বেড়ে যায়। ফলে বাংলাদেশের জ্বালানি আমদানি ব্যয় বাড়ে, বিদ্যুৎ উৎপাদনে চাপ সৃষ্টি হয়, বাণিজ্য ঘাটতি বাড়ে এবং মূল্যস্ফীতি বৃদ্ধি পায়।

বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান সানেমের নির্বাহী পরিচালক ড. সেলিম রায়হান বলেন, ‘‘হরমুজ সাময়িকভাবে বন্ধ হলেও বিশ্ববাজারে জ্বালানির দাম দ্রুত বাড়বে এবং তার সরাসরি অভিঘাত পড়বে বাংলাদেশের অর্থনীতিতে।’’

প্রণালি বন্ধ হলে কী হতে পারে

বিশ্লেষকেরা সতর্ক করে বলেছেন, হরমুজ প্রণালি বন্ধ হয়ে গেলে বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারে বড় ধরনের অস্থিরতা দেখা দিতে পারে। ইতোমধ্যে আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম বাড়তে শুরু করেছে। ব্রেন্ট ক্রুডের দাম ব্যারেলপ্রতি প্রায় ৭৩ ডলারে পৌঁছেছে।

বিনিয়োগ প্রতিষ্ঠান গোল্ডম্যান স্যাকসের পূর্বাভাস অনুযায়ী, প্রণালিতে অবরোধ দীর্ঘস্থায়ী হলে তেলের দাম ১০০ ডলার ছাড়িয়ে যেতে পারে। ভারতের ইকুইরাস সিকিউরিটিস জানিয়েছে, সরবরাহে বড় ধরনের বিঘ্ন ঘটলে অপরিশোধিত তেলের দাম ৯৫ থেকে ১১০ ডলারের মধ্যে উঠে যেতে পারে।

সব মিলিয়ে, হরমুজ প্রণালি ঘিরে উত্তেজনা বৈশ্বিক জ্বালানি বাজার ও বিশ্ব অর্থনীতির জন্য নতুন করে বড় ঝুঁকি তৈরি করেছে। পরিস্থিতি দীর্ঘায়িত হলে এর প্রভাব জ্বালানি আমদানিনির্ভর দেশগুলোর ওপর, বিশেষ করে উন্নয়নশীল অর্থনীতিতে, দ্রুত পড়তে পারে বলে আশঙ্কা করছেন বিশ্লেষকেরা। তারা বলছেন, ইসরায়েল-যুক্তরাষ্ট্রের হামলা ও ইরানের পাল্টা প্রতিক্রিয়া যদি পূর্ণমাত্রার আঞ্চলিক যুদ্ধে রূপ নেয়, তবে তার বহুমাত্রিক প্রভাব পড়বে বাংলাদেশের অর্থনীতিতে— জ্বালানি, রেমিট্যান্স, রফতানি, মূল্যস্ফীতি ও রিজার্ভ সবখানেই।

তবে আগাম প্রস্তুতি, নীতি সমন্বয়, আর্থিক শৃঙ্খলা ও কৌশলগত কূটনীতির মাধ্যমে সম্ভাব্য ধাক্কা সামাল দেওয়া সম্ভব। অস্থির বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ এখন— অভ্যন্তরীণ অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা ধরে রাখা। পলিসি এক্সচেঞ্জ বাংলাদেশের চেয়ারম্যান মাসরুর রিয়াজ মনে করেন, সংঘাত দীর্ঘ হলে সামষ্টিক অর্থনীতিতে চাপ বাড়বে— জ্বালানি ব্যয়, রফতানি রুট ঝুঁকি এবং শ্রমবাজার এই তিন কারণে।

বাংলাদেশের জন্য প্রথম ধাক্কা: জ্বালানি আমদানি ব্যয়

বাংলাদেশ বছরে প্রায় ৬-৭ বিলিয়ন ডলারের জ্বালানি আমদানি করে। আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম ব্যারেলপ্রতি ৫ ডলার বাড়লে অতিরিক্ত ব্যয় হতে পারে প্রায় ৪০-৫০ কোটি ডলার। যদি দাম ২০-৩০ ডলার বাড়ে, তাহলে অতিরিক্ত ব্যয় কয়েক বিলিয়ন ডলারে পৌঁছাতে পারে।

এর সরাসরি প্রভাবে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভে চাপ বাড়তে পারে, ডলারের বিপরীতে টাকার অবমূল্যায়ন হতে পারে, জ্বালানি ভর্তুকি বৃদ্ধি পেতে পারে, বিদ্যুৎ উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধি পেতে পারে ও শিল্প উৎপাদনে খরচ বাড়তে পারে। এছাড়া উচ্চ মূল্যস্ফীতির মধ্যে নতুন করে আমদানিকৃত জ্বালানির দাম বাড়লে খাদ্য ও নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দামেও প্রভাব পড়বে। পরিবহন ব্যয় বাড়লে কৃষিপণ্য থেকে শিল্পপণ্য সবখানেই মূল্যস্ফীতির নতুন ঢেউ তৈরি হতে পারে।

বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান সিপিডির নির্বাহী পরিচালক ড. ফাহমিদা খাতুন বলেন, ‘‘যুদ্ধ দীর্ঘায়িত হলে তেলের দাম বাড়বে, আমদানি ব্যয় বাড়বে এবং মূল্যস্ফীতি আরও তীব্র হবে। বর্তমানে উচ্চ মূল্যস্ফীতির মধ্যে নতুন করে আমদানিকৃত পণ্যের দাম বাড়লে সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রায় বড় চাপ তৈরি হবে।’’

রফতানি ও সরবরাহ চেইনের অনিশ্চয়তা

বাংলাদেশের রফতানির প্রায় ৮৪ শতাংশ আসে তৈরি পোশাক খাত থেকে। জ্বালানি ব্যয় বাড়লে উৎপাদন খরচ বাড়বে, আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিযোগিতা কঠিন হবে। ছোট ও মাঝারি রফতানিকারকরা বেশি ঝুঁকিতে পড়বেন।

যদি মধ্যপ্রাচ্য বা লোহিত সাগর রুট অনিরাপদ হয়ে পড়ে, তবে জাহাজগুলোকে আফ্রিকার কেপ অব গুড হোপ ঘুরে যেতে হতে পারে। এতে পরিবহন সময় ১০-১৫ দিন বাড়তে পারে এবং শিপিং খরচ ৩০-৪০ শতাংশ পর্যন্ত বৃদ্ধি পেতে পারে। বর্তমানে বৈশ্বিক বাণিজ্যের বড় অংশ সুইস ক্যানেল ও রেড সী রুটনির্ভর। এসব রুটে বিঘ্ন মানেই সরবরাহ চেইনে অস্থিরতা।

পাশাপাশি যুদ্ধ দীর্ঘ হলে ইউরোপ ও যুক্তরাষ্ট্রে ভোক্তা আস্থা কমে যেতে পারে। অ-অপরিহার্য পণ্যের চাহিদা কমলে বাংলাদেশের রফতানিতে নেতিবাচক প্রভাব পড়বে।

বিজিএমইএ’র সভাপতি মাহমুদ হাসান খান বলেন, ‘‘জ্বালানির দাম বাড়লে উৎপাদন ব্যয় উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়বে এবং আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিযোগিতা কঠিন হবে। ছোট ও মাঝারি রফতানিকারকরা বেশি ঝুঁকিতে পড়বেন।’’

সীমিত সরাসরি বাণিজ্য, তবু উদ্বেগ

ইরানের সঙ্গে বাংলাদেশের সরাসরি বাণিজ্য দীর্ঘদিন ধরেই আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞার কারণে সীমিত। বাংলাদেশ ব্যাংক ও রফতানি উন্নয়ন ব্যুরোর তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশ-ইরান দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্যের পরিমাণ সাধারণত এক কোটি মার্কিন ডলারের কিছু বেশি।

২০২৪-২৫ অর্থবছরে ইরানে বাংলাদেশের রফতানি হয়েছে ১ কোটি ৯ লাখ ডলার। এর মধ্যে ১ কোটি ৮ লাখ ৩২ হাজার ৮৯৮ ডলারের পাটের সুতা, ৯৫ হাজার ৩১০ ডলারের নিট পোশাক এবং ৯ হাজার ৩৫১ ডলারের ওভেন পোশাক। একই সময়ে ইরান থেকে আমদানি হয়েছে মাত্র ৫ লাখ ডলারের পণ্য।

এক দশক আগে আমদানির পরিমাণ তুলনামূলক বেশি ছিল। ২০১০-১১ অর্থবছরে ইরান থেকে ৪৪৯ কোটি টাকার পণ্য আমদানি হয়, যা পরের বছর নেমে আসে ৯৯ কোটি টাকায়। নিষেধাজ্ঞা ও ব্যাংকিং জটিলতার কারণে পরবর্তীতে আমদানি প্রায় শূন্যের কোঠায় চলে যায়।

বাংলাদেশ নিটওয়্যার প্রস্তুত ও রফতানিকারক সমিতির (বিকেএমইএ) সভাপতি মোহাম্মদ হাতেম বলেন, ‘‘যুক্তরাষ্ট্র ও মিত্রদেশগুলোর নিষেধাজ্ঞার কারণে ইরানের সঙ্গে ব্যাংকিং লেনদেন জটিল। ফলে সরাসরি তৈরি পোশাক রফতানি সীমিত। তবে দুবাইয়ের মাধ্যমে কিছু পোশাক ইরানে যায়।’’

রেমিট্যান্স: দ্বিতীয় বড় ঝুঁকি

বাংলাদেশের মোট রেমিট্যান্সের বড় অংশ আসে সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত, কাতার ও কুয়েত থেকে। মধ্যপ্রাচ্যে সংঘাত দীর্ঘ হলে—

প্রবাসী শ্রমিকদের কর্মসংস্থান ঝুঁকিতে পড়তে পারে। নির্মাণ ও সেবা খাতে প্রকল্প স্থগিত হতে পারে। শ্রমিক প্রত্যাবাসনের ঝুঁকি তৈরি হতে পারে।

রেমিট্যান্স কমে গেলে রিজার্ভে চাপ বাড়বে। একইসঙ্গে ডলার শক্তিশালী হলে টাকার অবমূল্যায়ন ত্বরান্বিত হতে পারে। এতে আমদানি ব্যয় আরও বাড়বে— যা ‘ডাবল শক’ তৈরি করবে।

বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ইন্টারন্যাশনাল অ্যান্ড স্ট্রাটেজিক স্টাডিজের (বিআইআইএসএস) গবেষণা পরিচালক ড. মাহফুজ কবীর বলেন, ‘‘সংঘাত দীর্ঘায়িত হলে প্রবাসীদের কর্মসংস্থান ও নিরাপত্তা ঝুঁকির মুখে পড়তে পারে। সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত ও বাহরাইন— এসব দেশ ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় রয়েছে।’’

রেমিট্যান্স কমে গেলে রিজার্ভে চাপ বাড়বে এবং টাকার বিনিময় হার দুর্বল হতে পারে। যুদ্ধ পরিস্থিতিতে বিনিয়োগকারীরা ডলার ও স্বর্ণে ঝুঁকলে ডলার শক্তিশালী হয়— যা আমদানিনির্ভর বাংলাদেশের জন্য দ্বিগুণ চাপ তৈরি করে

শিপিং, এলপিজি ও লজিস্টিক শঙ্কা

বাংলাদেশ কনটেইনার শিপিং অ্যাসোসিয়েশনের চেয়ারম্যান হারুন-উর-রশিদ বলেন, ‘‘ভূরাজনৈতিক অস্থিরতা শুরু হলেই বাংলাদেশ চাপের মুখে পড়ে। লোহিত সাগরে হুতি হামলার প্রভাব ইতোমধ্যে দেখা গেছে। যুদ্ধ দীর্ঘ হলে শিপিং খরচ ও সময় দুটোই বাড়বে।’’

এলপিজি অপারেটরস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের সভাপতি মোহাম্মদ আমিরুল হক বলেন, ‘‘জ্বালানি নিরাপত্তা কৌশল কার্যকর না হওয়ায় বাংলাদেশ আমদানিনির্ভর। বড় সংঘাত হলে এলপিজি সরবরাহ ও পরিবহনে অস্থিরতা দেখা দেবে, যা ভোক্তা পর্যায়ে দাম বাড়াবে।’’

এই মুহূর্তে কী করতে পারে বাংলাদেশ?

অর্থনীতিবিদদের মতে, সম্ভাব্য ধাক্কা মোকাবিলায় জরুরি পদক্ষেপ— জ্বালানি আমদানির বিকল্প উৎস ও দীর্ঘমেয়াদি চুক্তি, এলএনজি সরবরাহ স্থিতিশীল করা, নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে বিনিয়োগ বৃদ্ধি, রেমিট্যান্স প্রণোদনা বাড়ানো, খাদ্য ও জ্বালানি মজুত বৃদ্ধি, রফতানি বাজার বহুমুখীকরণ, রিজার্ভ ব্যবস্থাপনায় কৌশলগত সতর্কতা।

কূটনৈতিক ভারসাম্যের পরীক্ষা

বাংলাদেশ ঐতিহ্যগতভাবে ‘সবার সঙ্গে বন্ধুত্ব, কারও সঙ্গে বৈরিতা নয়’ নীতি অনুসরণ করে। যুক্তরাষ্ট্র, সৌদি আরব ও ইরানের সঙ্গে বাংলাদেশের গুরুত্বপূর্ণ সম্পর্ক রয়েছে। বর্তমান সংকট দীর্ঘ হলে প্রবাসী শ্রমবাজার ও জ্বালানি সরবরাহ অক্ষুণ্ন রাখতে সতর্ক কূটনৈতিক ভারসাম্য রক্ষা জরুরি হবে।