রোহিঙ্গা সংকট আজ আর কেবল একটি মানবিক ইস্যু নয়; এটি দক্ষিণ এশিয়ার নিরাপত্তা, কূটনীতি ও আঞ্চলিক স্থিতিশীলতার অন্যতম বড় চ্যালেঞ্জ। সাত বছরের বেশি সময় ধরে লক্ষাধিক রোহিঙ্গা আশ্রয় নিয়ে আছে কক্সবাজারের শরণার্থী শিবিরে। মানবিক দায়বদ্ধতা থেকে বাংলাদেশ তাদের আশ্রয় দিয়েছে-এটি আন্তর্জাতিক মহলে প্রশংসিত। কিন্তু দীর্ঘস্থায়ী আশ্রয় কোনো স্থায়ী সমাধান নয়। বাস্তবতা হলো, নিরাপদ, স্বেচ্ছা ও মর্যাদাপূর্ণ প্রত্যাবাসন ছাড়া এই সংকটের টেকসই পথ নেই।
শুরু থেকেই বাংলাদেশ স্পষ্ট করেছে-রোহিঙ্গারা মিয়ানমারের নাগরিক, তাদের নিজভূমিতেই ফিরতে হবে। কিন্তু প্রত্যাবাসনের প্রশ্নে সবচেয়ে বড় বাধা হলো আস্থা। যারা সহিংসতা, দমন-পীড়ন ও বাস্তুচ্যুতির শিকার হয়েছে, তারা কেবল আশ্বাসে ফিরবে না; তারা চায় নিরাপত্তার নিশ্চয়তা, নাগরিকত্বের স্বীকৃতি এবং পুনর্বাসনের বাস্তব পরিকল্পনা। অতীতের অভিজ্ঞতা তাদের শিখিয়েছে, নিরাপত্তাহীন পরিবেশে ফেরা মানে আবারও অনিশ্চয়তার দিকে ঠেলে দেওয়া।
প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়ার তিনটি শর্ত আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত-নিরাপদ, স্বেচ্ছা এবং মর্যাদাপূর্ণ। এই তিনটি শব্দই সমান গুরুত্বপূর্ণ। নিরাপদ মানে কেবল সহিংসতা না থাকা নয়; সেখানে থাকতে হবে আইনি সুরক্ষা, চলাচলের স্বাধীনতা ও জীবিকার সুযোগ। স্বেচ্ছা মানে কোনো ধরনের চাপ, প্রলোভন বা জবরদস্তি ছাড়া নিজ ইচ্ছায় ফিরে যাওয়া। আর মর্যাদাপূর্ণ মানে মানবিক অধিকারকে সম্মান জানিয়ে পূর্ণ নাগরিক হিসেবে বেঁচে থাকার সুযোগ নিশ্চিত করা।
বাংলাদেশ দীর্ঘদিন ধরে দ্বিপাক্ষিক ও বহুপাক্ষিক কূটনৈতিক প্রচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। কিন্তু বাস্তব অগ্রগতি সীমিত। আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের ভূমিকা প্রশ্নবিদ্ধ। নিন্দা প্রস্তাব ও বিবৃতির বাইরে কার্যকর চাপ কতটা প্রয়োগ করা হয়েছে, তা নিয়ে সংশয় রয়েছে। জাতিসংঘের বিভিন্ন সংস্থা সহায়তা দিয়ে যাচ্ছে বটে, কিন্তু মানবিক সহায়তা কখনো রাজনৈতিক সমাধানের বিকল্প হতে পারে না। বরং দীর্ঘস্থায়ী শিবির-নির্ভরতা নতুন সামাজিক ও নিরাপত্তা জটিলতা তৈরি করছে।
কক্সবাজার অঞ্চলে জনসংখ্যার চাপ, পরিবেশগত ক্ষতি, স্থানীয় অর্থনীতির ভারসাম্যহীনতা-সব মিলিয়ে পরিস্থিতি জটিল হচ্ছে। তরুণ প্রজন্ম দীর্ঘদিন ধরে ক্যাম্পে বেড়ে উঠছে, শিক্ষা ও কর্মসংস্থানের সীমিত সুযোগ নিয়ে। এই প্রজন্মের হতাশা ভবিষ্যতে আঞ্চলিক নিরাপত্তার জন্যও ঝুঁকি তৈরি করতে পারে। তাই সংকট দীর্ঘায়িত হওয়া কারও জন্যই মঙ্গলজনক নয়।
মিয়ানমারের রাজনৈতিক বাস্তবতাও প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়াকে জটিল করে তুলেছে। অভ্যন্তরীণ সংঘাত ও ক্ষমতার টানাপড়েনের মধ্যে রোহিঙ্গা ইস্যু অগ্রাধিকার পাচ্ছে না। অথচ আন্তর্জাতিক আইন অনুযায়ী তাদের নিরাপত্তা ও নাগরিক অধিকার নিশ্চিত করা মিয়ানমারের দায়িত্ব। কেবল অবকাঠামো নির্মাণ বা গ্রহণকেন্দ্র প্রস্তুত করলেই চলবে না; প্রয়োজন বিশ্বাসযোগ্য পরিবেশ সৃষ্টি করা। রোহিঙ্গাদের জন্য নিরাপদ অঞ্চল, আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষণ ব্যবস্থা এবং নাগরিকত্বের সুস্পষ্ট রূপরেখা ছাড়া প্রত্যাবাসন কার্যকর হবে না।
এখানে আঞ্চলিক শক্তিগুলোর ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ। দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দেশগুলো যদি সমন্বিত অবস্থান নেয়, তবে কূটনৈতিক চাপ বাড়ানো সম্ভব। একই সঙ্গে বৈশ্বিক শক্তিগুলোরও দায়িত্ব আছে। মানবাধিকার প্রশ্নে নীতিগত অবস্থান কেবল বিবৃতিতে সীমাবদ্ধ থাকলে চলবে না; প্রয়োজন বাস্তব পদক্ষেপ। নিষেধাজ্ঞা, কূটনৈতিক চাপ ও আলোচনার সমন্বয়েই একটি কার্যকর পরিবেশ তৈরি হতে পারে।
বাংলাদেশের জন্য চ্যালেঞ্জ হলো-মানবিক দায়িত্ব পালন অব্যাহত রেখে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে সক্রিয় রাখা। একই সঙ্গে অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা ও সামাজিক ভারসাম্য বজায় রাখা জরুরি। ভাসানচরসহ বিভিন্ন পুনর্বাসন উদ্যোগ সাময়িক স্বস্তি দিলেও চূড়ান্ত সমাধান নয়। লক্ষ্য একটাই-নিজ দেশে নিরাপদ প্রত্যাবাসন।
প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়া তাড়াহুড়ো করে শুরু করলে তা উল্টো ফল দিতে পারে। অতীতে কয়েক দফা উদ্যোগ ব্যর্থ হয়েছে মূলত আস্থার অভাবে। এবার যদি উদ্যোগ নেওয়া হয়, তবে তা হতে হবে স্বচ্ছ ও আন্তর্জাতিকভাবে পর্যবেক্ষিত। রোহিঙ্গাদের প্রতিনিধিদের সম্পৃক্ত করা, তাদের মতামত শোনা এবং বাস্তব চাহিদা বোঝা জরুরি। সমাধান চাপিয়ে দেওয়া যায় না; তা গড়ে তুলতে হয় আস্থার ভিত্তিতে।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো মানবিক দৃষ্টিভঙ্গি। রোহিঙ্গারা কোনো পরিসংখ্যান নয়; তারা বাস্তুচ্যুত মানুষ। তাদের ভবিষ্যৎ অনিশ্চিত রেখে আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করা সম্ভব নয়। নিরাপদ, স্বেচ্ছা ও মর্যাদাপূর্ণ প্রত্যাবাসন তাই কেবল একটি কূটনৈতিক লক্ষ্য নয়; এটি মানবিক ও নৈতিক দায়িত্ব।
এই সংকটের স্থায়ী সমাধান একদিনে আসবে না। কিন্তু রাজনৈতিক সদিচ্ছা, আন্তর্জাতিক সমন্বয় এবং বাস্তবমুখী পদক্ষেপ থাকলে পথ তৈরি হতে পারে। দীর্ঘস্থায়ী শিবির-জীবন কোনো জাতির জন্য ভবিষ্যৎ নয়। রোহিঙ্গাদেরও একটি মাতৃভূমি আছে-সেই মাতৃভূমিতেই অধিকার ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করাই একমাত্র টেকসই সমাধান। অন্য সব পথ সাময়িক, অসম্পূর্ণ এবং অনিশ্চিত।
কালবেলা