অন্তর্বর্তী সরকারের সঙ্গে সম্পর্কের স্থবিরতার জেরে গত ১৮ মাস ধরে বন্ধ ভারতের পর্যটন ভিসা। অন্যান্য ভিসাও সীমিত আকারে দেওয়া হচ্ছে। দেশের ১৬টি স্থানে ইন্ডিয়ান ভিসা অ্যাপ্লিকেশন সেন্টার আইভ্যাক থাকলেও বর্তমানে মাত্র ৫টি আইভ্যাক থেকে ভিসা ইস্যু করা হচ্ছে সীমিত আকারে। অন্তর্বর্তী সরকার বিদায় নেওয়ার নতুন সরকারের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ভিসা চালুর বিষয়ে উদ্যোগ নিলেও তা কিছুটা সময় সাপেক্ষ বলে ধারণা করছেন সংশ্লিষ্টরা। তবে জানা গেছে, রোজার ঈদের আগে দু-একটি নির্দিষ্ট পোর্ট অব এন্ট্রি ( আগরতলা, ডাউকি) দিয়ে পর্যটন ভিসা চালু হতে পারে। বাকিগুলো স্বাভাবিক হতে পারে পশ্চিমবঙ্গ-আসামের বিধানসভা নির্বাচনের পর।
ভিসা বন্ধ কেন
২০২৪ সালের ৫ আগস্ট দেশের রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট পরিবর্তনের পর নিরাপত্তা ইস্যুতে বন্ধ হয়ে যায় ভারতের সব ধরনের ভিসা ইস্যু। অস্থিতিশীল পরিস্থিতির কারণে ৪ আগস্ট থেকে বাংলাদেশে অবস্থিত ভারতীয় ভিসা আবেদন কেন্দ্রগুলো বন্ধ থাকায় পাসপোর্ট ফেরত ও জমা কার্যক্রম ব্যাহত হয়েছিল। তবে, আগস্টের শেষের দিকে বিশেষ ব্যবস্থায় সীমিত আকারে পাসপোর্ট ফেরত দেওয়া শুরু হয় এবং নতুন আবেদন সাময়িকভাবে স্থগিত রাখা হয়। তখন আইভ্যাক জানায়, সীমিত সেবার মধ্যে ভিসা ইস্যু বিলম্ব হতে পারে, তাই আবেদনকারীদের পাসপোর্ট ফেরত নেওয়ার অনুরোধ জানানো হচ্ছে। ভিসা অনুমোদিত হলে, পুনরায় পাসপোর্ট গ্রহণ করা হবে।
এরপর সীমিত আকারে ৫টি আইভ্যাক থেকে ভিসা ইস্যু চালু রাখে ভারতীয় হাইকমিশন। এগুলো হলো ঢাকা, চট্টগ্রাম, রাজশাহী, সিলেট এবং খুলনা। এসব আইভ্যাক থেকে মেডিক্যাল, ডাবল এন্ট্রি এবং ব্যবসায়িক ভিসা ইস্যু চলমান আছে।
নতুন সরকার আসার পর ভিসা চালু করেছে বাংলাদেশ
ভারত বাংলাদেশের মধ্যে কূটনৈতিক সম্পর্কের স্থবিরতার সূত্র ধরে সংখ্যালঘু ইস্যুতে গত বছর বাংলাদেশের বিভিন্ন মিশনের সামনে বিক্ষোভ প্রদর্শন করা হয়। নিরাপত্তা ইস্যুজনিত কারণে ২২ ডিসেম্বর থেকে দিল্লিসহ সব বাংলাদেশ মিশন থেকে ভিসাসহ কন্স্যুলার সেবা স্থগিত করা হয়। বিএনপি নেতৃত্বাধীন সরকার দায়িত্ব নেওয়ার ছয় দিনের মধ্যে সোমবার (২৩ ফেব্রুয়ারি) থেকে সব মিশনে পুনরায় এই সেবা চালু করা হয়েছে বলে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সূত্র নিশ্চিত করেছে।
এছাড়া ঢাকায় ভারতীয় হাইকমিশনের ঘেরাও কর্মসূচিকে কেন্দ্র করে সাময়িক বন্ধ রাখা হয় আইভ্যাক। একই কারণে চট্টগ্রাম, রাজশাহী এবং খুলনার আইভ্যাকও সাময়িক বন্ধ ঘোষণা করা হয়। তবে তা আবার পুনরায় চালু করা হয়েছে।
সম্পর্কের উন্নয়ন চায় ভারত
অন্তর্বর্তী সরকার বিদায় নেওয়ার আগ থেকে বাংলাদেশের নতুন সরকারের সঙ্গে ভারতের সম্পর্ক উন্নয়নে আগ্রহ দেখা গেছে। বাংলাদেশে নতুন সরকার গঠন প্রক্রিয়ায় ভারতকে বেশ সক্রিয় থাকতে দেখা গেছে। ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি সামাজিকমাধ্যমে শুভেচ্ছা জানানোর পাশাপাশি ফোন করে কথা বলেছেন। ঢাকায় শপথ অনুষ্ঠানে লোকসভার স্পিকারকে পাঠিয়েছেন চিঠি দিয়ে, সেখানে তিনি পরিবারসহ প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে ভারত সফরের আমন্ত্রণ জানিয়েছেন এবং বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্কের উন্নয়নে তারেক রহমানের সঙ্গে কাজ করার প্রত্যয় ব্যক্ত করেছেন। এর আগে সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার জানাজায় অংশ নিতে এসেছিলেন ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী এস জয়শংকর। তিনিও প্রধানমন্ত্রীর নরেন্দ্র মোদির একটি ব্যক্তিগত চিঠি নিয়ে তারেক রহমানের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেছেন।
অন্যদিকে, সিলেটে ভারতের সহকারী হাইকমিশনার অনিরুদ্ধ দাস সব ধরনের ভারতীয় ভিসা কার্যক্রম পর্যায়ক্রমে স্বাভাবিক পর্যায়ে ফিরে আসবে বলে জানিয়েছেন। এতে স্পষ্ট যে ভারত সম্পর্কের উন্নতি চায়।
সম্প্রতি ঢাকায় নিযুক্ত ভারতের হাইকমিশনার প্রণয় ভার্মা পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. খলিলুর রহমানের সঙ্গে সৌজন্য সাক্ষাৎ করেছেন। ভারতের হাইকমিশনার বলেছেন, বাংলাদেশের নতুন সরকারের সঙ্গে সব ক্ষেত্রে জনকেন্দ্রিক সহযোগিতা জোরদারে কাজ করতে ভারত আগ্রহী ।
তিনি জানান, নির্বাচনের পরপরই ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে অভিনন্দন বার্তা পাঠান ও টেলিফোনে কথা বলেন। গত ১৭ ফেব্রুয়ারি নতুন মন্ত্রিসভার শপথ গ্রহণ অনুষ্ঠানে ভারত সরকারের প্রতিনিধি হিসেবে লোকসভা স্পিকার ওম বিড়লার উপস্থিতির কথাও তিনি উল্লেখ করেন। প্রণয় ভার্মা বলেন, “এসব উচ্চপর্যায়ের যোগাযোগে বাংলাদেশ-ভারতের ঐতিহাসিক সম্পর্কের ভিত্তিতে বহুমাত্রিক দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক আরও শক্তিশালী করার আগ্রহ প্রকাশ করা হয়েছে। আমরা একটি গণতান্ত্রিক, প্রগতিশীল এবং অন্তর্ভুক্তিমূলক বাংলাদেশকে সমর্থন এবং আমাদের বহুমাত্রিক দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক আরও জোরদার করার প্রতিশ্রুতিও জানিয়েছি।”
দেশিদের জন্য ভারত কবে পর্যটন ভিসা পুনরায় চালু করবে—এ বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, “এটিও মানুষে মানুষে সহযোগিতার লক্ষ্যের আওতায় পড়ে।”
১৮ মাস পর আগরতলা-ঢাকা- কলকাতা বাস সার্ভিস চালু
২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর দেশের রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতা ও ভিসা জটিলতার কারণে আগরতলা-ঢাকা- কলকাতা বাস সার্ভিস বন্ধ করে দেওয়া হয়। এরপর মঙ্গলবার (২৪ ফেব্রুয়ারি) দুপুরে ঢাকা কমলাপুর বাস ডিপো থেকে পরীক্ষামূলক রয়েল মৈত্রীর একটি বাস আখাউড়া আন্তর্জাতিক ইমিগ্রেশন চেকপোস্ট সীমান্তপথে ত্রিপুরা রাজ্যের আগরতলায় প্রবেশ করে। ভারত ও বাংলাদেশের মধ্যে সংযোগ জোরদার করার জন্য আগরতলা-কলকাতা মৈত্রী এবং শ্যামলী বাস পরিষেবা প্রথম ২০০১ সালে চালু হয়েছিল। তবে, যাত্রীদের সুরক্ষার উদ্বেগের কথা উল্লেখ করে বাংলাদেশে রাজনৈতিক অস্থিরতার কারণে ২০২৪ সালের সেপ্টেম্বরে কার্যক্রম বন্ধ করে দেওয়া হয়।
ঢাকা হয়ে আগরতলা-কলকাতা বাস সার্ভিসের জিএম ওয়ারিছ আলম জানান, আপাতত সপ্তাহে দুদিন পরীক্ষামূলক চলবে। পরিস্থিতি স্থিতিশীল হয়ে গেলে সপ্তাহে তিনদিন করে নিয়মিত এ পরিষেবা শুরু হবে।
বাংলাদেশ-ভারত ট্রেন চালুর উদ্যোগ
ভারত-বাংলাদেশ রেল যোগাযোগ পুনরায় চালুর বিষয়ে পরীক্ষা-নিরীক্ষা চলছে বলে জানিয়েছেন সড়ক, রেল ও নৌপরিবহনমন্ত্রী শেখ রবিউল আলম। তিনি জানান, দেশের স্বার্থ বিবেচনায় ১৫ দিনের মধ্যে এই বিষয়ে সিদ্ধান্ত আসতে পারে।
কূটনৈতিক সূত্রে জানা গেছে, অন্তর্বর্তী সরকারের সময় দু’দেশের মধ্যে তিনটি ট্রেন চলাচল পুনরায় শুরু করতে আনুষ্ঠানিকভাবে তিন দফা ভারতকে চিঠি দেওয়া হয়েছে। কিন্তু নিরাপত্তা ঝুঁকির কথা বলে ভারত ট্রেনগুলো চালাতে রাজি হয়নি। ১৮ মাসের বেশি সময় ধরে মৈত্রী, মিতালি ও বন্ধন এক্সপ্রেস ট্রেনের চলাচল বন্ধ রয়েছে। বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের কর্মসূচি ঘিরে তৎকালীন সরকার উত্তপ্ত পরিস্থিতির মধ্যে ২০২৪ সালের জুলাইয়ে সারা দেশে ট্রেন চলাচল বন্ধ ঘোষণা করে। ওই সময় বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে চলাচলরত তিনটি আন্তদেশীয় ট্রেনেও যাত্রী পরিবহন বন্ধ হয়ে যায়।
তবে ভারত ট্রেন চলাচলে পদ্মা সেতু রেল লিংক ব্যবহার করতে চায়। আর তাতে ঢাকা ও কলকাতার শিয়ালদহের মধ্যে 'পদ্মা সেতু রেল সংযোগ' দিয়ে যেতে প্রায় পাঁচ ঘণ্টা সময় লাগবে। বর্তমান ঢাকা-কলকাতা ট্রেন যাত্রায় যমুনা সেতু দিয়ে ১০-১১ ঘণ্টা সময় নেয়।
কূটনৈতিক সূত্রে জানা গেছে, ভারতের ভিসা পুনরায় চালুর বিষয় আলোচনা চলছে। তবে নির্বাচন একটা বড় ফ্যাক্ট। পশ্চিমবঙ্গের নির্বাচনে বাংলাদেশকে ট্রাম্প কার্ড হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে। ক্ষমতায় যেই আসুক বাংলাদেশ ইস্যু সমাধানে দ্রুত করা জরুরি।
পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে একজন কর্মকর্তা জানান, দুই দেশই যার যার স্বার্থ অনুযায়ী সম্পর্ক উন্নয়নে আগ্রহী। আশা করা হচ্ছে দ্রুত ভিসা চালু করবে ভারত।
তবে কূটনৈতিক সূত্র বলছে, পশ্চিমবঙ্গে বিধানসভা নির্বাচনের আগে পুরোদমে ভিসা চালুর সম্ভাবনা কম। সীমিত আকারে হয়তো চালু হতে পারে। তবে সেই সিদ্ধান্ত আসবে দিল্লি থেকে।