Image description
♦ বন্ধ হতে পারে ব্যাচভিত্তিক রাজনীতি ♦ অফিস সময় নিয়ে কঠোর সরকার ♦ নিয়ম না মানলে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা

জনপ্রশাসনে শুরু হয়েছে শুদ্ধি অভিযান। অন্তর্বর্তী সরকারের সময় নিয়োগ পাওয়া বিশেষ রাজনৈতিক আদর্শের কর্মকর্তাদের হাতেই ছিল পুরো প্রশাসন পরিচালনার চাবি। সেই বিশেষ কর্মকর্তাদের বলয় ভেঙে নতুনদের নিয়োগ দেওয়ার উদ্যোগ নিয়েছে তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন নতুন সরকার। একই সঙ্গে সরকার কর্মস্থলে কাজের গতি ফেরানো এবং অফিস সময় নিয়ে কঠোর অবস্থান নিয়েছে। ইতোমধ্যেই সকাল ৯টায় অফিসে আসা নিশ্চিত করতে আদেশ জারি করা হয়েছে। যার ব্যত্যয় হলে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়ার কথা উল্লেখ রয়েছে। সংশ্লিষ্ট সূত্রে এসব তথ্য জানা গেছে।

সূত্র জানায়, ১৭ ফেব্রুয়ারি নতুন সরকার শপথের পরের দিন মন্ত্রিসভার সদস্যরা সচিবালয়ে অফিস শুরু করেন। শুরু থেকেই সচিবালয়ে অফিস করছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। একই সঙ্গে অফিসে মন্ত্রী-প্রতিমন্ত্রীরা ঠিকমতো আসছেন কি না, সেই খোঁজও রাখছেন। সচিবালয়ে সব শ্রেণির কমকর্তা-কর্মচারীর মধ্যে ফিরেছে কর্মচাঞ্চল্য। তবে বিগত অন্তর্বর্তী সরকারের সময় সচিব, অতিরিক্ত সচিব এবং বিভিন্ন সংস্থাপ্রধান হিসেবে গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পাওয়া বিশেষ রাজনৈতিক আদর্শের কর্মকর্তাদের মধ্যে আতঙ্ক বিরাজ করছে। বর্তমান বিএনপি নেতৃত্বাধীন সরকার তাদের নিয়োগ বাতিল করতে পারে এই আশঙ্কায় আছেন। সূত্র মতে জনপ্রশাসনকে ঢেলে সাজাতে চায় সরকার। ব্যাচভিত্তিক রাজনীতি বন্ধের নির্দেশনা আসতে পারে।

সূত্র আরও জানায়, বিগত বছরে প্রশাসনের বিভিন্ন স্তরে গুরুত্বপূর্ণ পদে একটি বিশেষ রাজনৈতিক দলের আদর্শের কর্মকর্তাদের পদায়ন করে। বিএনপিপন্থি কর্মকর্তারা বঞ্চিত ছিলেন এসব পদায়নের ক্ষেত্রে। যে কারণে ওই সব আদর্শের অতি উৎসাহী দলবাজ সচিব, অতিরিক্ত সচিব ও যুগ্ম সচিবদের বদলি এবং প্রয়োজনে ওএসডি করা হতে পারে। প্রকল্প পরিচালকদের নিয়োগও বাতিল হবে অনেকের। এ ছাড়া সুনির্দিষ্ট তথ্য-উপাত্তের ভিত্তিতে প্রশাসনের চিহ্নিত দুর্নীতিগ্রস্ত কর্মকর্তাদের তালিকা তৈরির উদ্যোগ নিচ্ছে সরকার।

এদিকে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান সচিবদের সঙ্গে প্রথম বৈঠকে সংবিধান ও আইনবিধি অনুযায়ী কাজ করার নির্দেশ দেন। প্রধানমন্ত্রী স্পষ্ট জানিয়েছেন, সচিবরা সরকারের অংশ। কোনো দলের নয়। সবারই একটা ভিন্ন মতাদর্শ থাকতে পারে। কে কোন দলের আদর্শ ধারণ করছেন, সেটা বিবেচ্য বিষয় নয়, আমরা মেধা এবং কাজ দিয়ে আপনাদের মূল্যায়ন করব।

অন্য একটি সূত্র জানায়, মেধাবী এবং যোগ্য কর্মকর্তা বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ পদে বসাতে বিশেষ আদর্শে নিয়োগ পাওয়াদের সরিয়ে নতুন মুখ আনতে চায় সরকার। ইতোমধ্যেই চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ পাওয়া ৯ সচিবের চুক্তি বাতিল এবং তিন সচিবকে দায়িত্ব থেকে প্রত্যাহার করা হয়েছে। গতকালও সচিব পর্যায়ে কিছু রদবদল হয়েছে।

২ সচিবের দপ্তর বদল হয়েছে। অবসরপ্রাপ্ত সচিব মনজুর মোর্শেদ চৌধুরীকে চুক্তিতে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সচিব করা হয়েছে।

এর আগে নতুন সরকার গঠন হলে সরানো হতে পারে এমন আশঙ্কায় নিজে থেকে সরে যান মন্ত্রিপরিষদ ও মুখ্য সচিব। তবে এখন এই দুটি পদে যারা আছেন তারাও চুক্তিতে নিয়োগ পেয়েছেন।

চুক্তির বাইরেও কিছু নিয়মিত সচিব পদে রদবদল আসতে যাচ্ছে। বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ে গুরুত্বপূর্ণ চেয়ার আঁকড়ে আছেন অনেক অতিরিক্ত সচিব ও যুগ্ম সচিব পর্যায়ের কর্মকর্তাদের আন্তমন্ত্রণালয় পরিবর্তন হবে। প্রশাসন ঠিক করার অংশ হিসেবে ওপর থেকে পর্যায়ক্রমে নিচের দিকে নামতে চায় সরকার। দ্রুতই জনপ্রশাসনে নিয়োগ পদোন্নতি ও প্রেষণ অনুবিভাগ (এপিডি) নিয়োগ দেওয়া হবে। এপিডি শাখা থেকেই সব পর্যায়ের নিয়োগ ও রদবদল হয়। অথচ এই গুরুত্বপূর্ণ পদটি কয়েক মাস ধরে শূন্য।

জানতে চাইলে সাবেক সচিব এ কে এম আউয়াল মজুমদার বলেন, নতুন সরকার হলে কিছু রদবদল হয়। কাজের গতি ফেরাতে নানামুখী উদ্যোগ নেয়। সত্যিকারের যোগ্য মেধাবী কর্মকর্তা হলে কাজের ক্ষেত্রে কোনো সমস্যা হবে না। কর্মকর্তাদের দলদাস হওয়া উচিত নয়।

এদিকে কর্মকর্তা-কর্মচারীদের অফিস সময় নিয়ে কঠোর অবস্থানে রয়েছে সরকার। অনেকেই ৯টার অফিস ১০টায় হাজির হতেন। এতে নিয়মিত কাজে ভাটা পরে। এ কারণে কাজের গতি বাড়াতে অফিস সময় নিয়ে ছাড় দিচ্ছে না সরকার। নির্ধারিত সময়ে অফিসে উপস্থিতি ও ত্যাগের একটি নির্দেশনা দিয়েছে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ। গতকাল মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ থেকে সরকারি, আধা সরকারি, স্বায়ত্তশাসিত ও আধা স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের এ নির্দেশনা দেওয়া হয়। সব মন্ত্রণালয় ও বিভাগীয় কমিশনার এবং জেলা প্রশাসককে এ নির্দেশনার চিঠি পাঠানো হয়েছে।

মন্ত্রিপরিষদের চিঠিতে বলা হয়, ‘সরকারি কর্মচারী (নিয়মিত উপস্থিতি) বিধিমালা, ২০১৯’ এবং ‘সচিবালয় নির্দেশমালা, ২০২৪’-এর নির্দেশ মোতাবেক সব সরকারি, আধা সরকারি, স্বায়ত্তশাসিত ও আধা স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তা/কর্মচারীর নির্ধারিত সময় অনুযায়ী অফিসে উপস্থিতি ও প্রস্থানের বাধ্যবাধকতা রয়েছে।

এ বিষয়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ এবং অধীন দপ্তর/সংস্থাকে এ বিষয়ে নির্দেশনা দেওয়ার জন্য অনুরোধ জানিয়ে চিঠিতে বলা হয়।? মাঠপর্যায়ের সব অফিসের কর্মকর্তা/কর্মচারীদের সাপ্তাহিক বা অন্যান্য ছুটির দিনে স্ব-স্ব কর্তৃপক্ষের অনুমতি নিয়ে কর্মস্থল ত্যাগ করতে হবে বলেও চিঠিতে উল্লেখ করেছে।

বিভিন্ন মন্ত্রণালয় ও দপ্তর অধিদপ্তর থেকে পৃথক চিঠি জারি হচ্ছে কর্মকর্তাদের অফিসে ঠিকমতো উপস্থিত হতে। আইন, বিচার ও সংসদবিষয়ক মন্ত্রণালয় চিঠি জারি করে জানিয়েছে, মন্ত্রণালয়ের আওতাধীন কর্মরত সব কর্মকর্তা-কর্মচারীকে সকাল ৯টার মধ্যে অফিসে না এলে বা বিলম্বে উপস্থিত এবং নির্ধারিত সময়ের আগে বিনা অনুমতিতে ত্যাগ করলে শাস্তির মুখে পড়তে হবে। আদেশে বলা হয়, সব কর্মকর্তা-কর্মচারীকে কর্মদিবসে সকাল ৯টার মধ্যে নিজ নিজ দপ্তরে উপস্থিত থাকতে হবে। অফিস সময় শেষ হওয়ার আগে কেউ দপ্তর ত্যাগ করতে পারবে না। রমজানে বিকাল ৩টা ৩০ মিনিটের আগে এবং রমজান-পরবর্তী সময়ে বিকাল ৫টার আগে অফিস ত্যাগ নিষিদ্ধ থাকবে।