রাজধানীর মোহাম্মদপুর ও আদাবর এখন ১৮টি গ্রুপের কাছে জিম্মি। চাঁদাবাজিসহ বিভিন্ন অপরাধে জড়িত এই অপরাধীরা দিনে দিনে বেপরোয়া হয়ে উঠছে। পুলিশের তৈরি করা অপরাধীর তালিকা পর্যালোচনা করে দেখা গেছে, এরা প্রত্যেকেই রাজনৈতিক দলের সঙ্গে সরাসরি জড়িত। এদের প্রত্যেকের বিরুদ্ধে রয়েছে একাধিক মামলা। এরপরও তারা সশস্ত্র অবস্থায় দাপিয়ে বেড়াচ্ছে গোটা এলাকা। তাদের কারণে আতঙ্কে রয়েছেন সেখানকার ব্যবসায়ীরা। স্থানীয়রা বলছেন, অজানা আতঙ্কে তাদের দিন কাটে। বাসা থেকে বের হয়ে আবার নিরাপদে বাসায় ফিরতে পারবে কি না, এ নিয়েই তারা আতঙ্কিত।
পুলিশ জানিয়েছে, চাঁদাবাজিতে যাদের নাম এসেছে তাদের বিরুদ্ধে অভিযান শুরু হয়েছে। গ্রেপ্তারের পর আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
অনুসন্ধানে জানা গেছে, মোহাম্মদপুর এবং আদাবরের অন্তত ১৭টি স্থান থেকে মাসে কয়েক কোটি টাকা চাঁদা আদায় করছে এ সন্ত্রাসীরা। শুধু চাঁদাবাজি নয়, ওই এলাকায় খুন, ছিনতাই, জমি-ফ্ল্যাট দখল, মাদক কারবার, অস্ত্রের মহড়া, মারধরসহ বিভিন্ন অপরাধের পেছনে রয়েছে ১৮ গ্রুপের সন্ত্রাসী-অপরাধীরা।
স্থানীয় এবং পুলিশের তথ্যানুযায়ী, আদাবরের জাপান গার্ডেন সিটির সামনে থেকে নুরজাহান বালিকা উচ্চবিদ্যালয় পর্যন্ত ফুটপাতে অর্ধশতাধিক দোকান আছে। এসব দোকান থেকে দৈনিক চাঁদা তোলেন ইমন মুন্সি। বাইতুল আমান হাউজিং সোসাইটির ৬ নম্বর রোড এবং শ্যামলী মোড় থেকে হক সাহেবের গ্যারেজ পর্যন্ত ফুটপাতের প্রতিটি দোকান থেকে সপ্তাহে প্রায় ১ হাজার টাকা হারে চাঁদা তোলেন রাকিব হোসেন বিশাল। আদাবরের ১০ নম্বর বালুর মাঠের ফুটপাতে অন্তত ৭০টি দোকান থেকে মাসিক প্রায় ৩ হাজার টাকা করে চাঁদা তোলেন আনোয়ার বয়াতি ওরফে কবজি কাটা আনোয়ার। সুনিবিড় হাউজিং সোসাইটির রাস্তার ফুটপাতের দোকান এবং অ্যামব্রয়ডারি ছোট-বড় কারখানা অন্তত ৫০টি। এসব কারখানা থেকে মাসে কয়েক লাখ টাকা চাঁদা তোলেন জালাল মাতবর। শ্যামলী হাউজিংয়ের ফুটপাতের দোকান এবং ছোট-বড় গার্মেন্টসের সংখ্যা শতাধিক। এসব থেকে মাসিক ৩ হাজার টাকা করে চাঁদা তোলেন মনোয়ার হোসেন জীবন ওরফে লেদু হাসান। একই ব্যক্তি নবোদয় হাউজিং এবং নবোদয় বাজার থেকেও চাঁদা তোলেন। এ এলাকায় শতাধিক দোকান থেকে মাসিক প্রায় ৩ হাজার টাকা করে চাঁদা তোলা হয়।
কথা হয় বাইজিদ পাঠান মারুফ নামে এক শিক্ষার্থীর সঙ্গে। তিনি বলেন, এসব চাঁদাবাজি নিয়ে আমরা কথা বললে আতঙ্কের মধ্যে থাকি। কয়েকদিন আগে আমরা সংঘবদ্ধভাবে পুলিশকে অবহিত করেছি এবং তারা আমাদের সহযোগিতা করেছে। চাঁদাবাজিগুলো কিন্তু রাজনৈতিক দলের মূল নেতৃত্বের কেউ করে না। যারা করে তারা দ্বিতীয় সারি কিংবা তার পরের সারির নেতা। অ্যামব্রয়ডারি কারখানায় কালা রাসেলের নেতৃত্বে হামলা হয়। সেখানে দেখবেন রাসেল কার সঙ্গে রাজনীতি করে, সেটি খতিয়ে দেখলে বুঝবেন কাদের ছত্রছায়ায় চাঁদাবাজি হচ্ছে।
সরেজমিন জানা যায়, মোহাম্মদপুরে আল্লাহ করিম মসজিদের বিপরীতে লেগুনা স্ট্যান্ডে প্রায় ৫০টি লেগুনা অবস্থান করে। দৈনিক লেগুনা প্রতি ৬০০ টাকা করে তোলেন শাহীন মিয়া। শ্যামলী স্কয়ার লেগুনা স্ট্যান্ডে থাকে অন্তত ৪০টি লেগুনা। এখানেও লেগুনা প্রতি ৬০০ টাকা করে তোলেন কাউসার। সলিমুল্লাহ রোডে পানির ট্যাঙ্কি খেলার মাঠের সাপ্তাহিক মেলা এবং টাউন হল বাজারের আশপাশের গলি ও ফুটপাতে অন্তত ৩০০টি দোকান বসে।
প্রতি দোকান থেকে দৈনিক প্রায় ৩০০ টাকা এবং বিদ্যুৎ বিলের কথা বলে দৈনিক ৫০ টাকা হারে টাকা তোলেন জসিম উদ্দিন এবং সিয়াম আহমেদ। এরা সাজেদুল হক খান রনি এবং মোহাম্মদপুরের মিজানুর রহমান ইসহাকের লোক। চন্দ্রিমা মডেল টাউন ঈদগাহ মাঠ এবং ঢাকা উদ্যান নদীর পাড়ে সরকারি খাস জায়গায় সাপ্তাহিক মেলায় অন্তত ২৫০টি দোকান বসে। একটি রাজনৈতিক দলের আদাবর থানার সাবেক নেতা লেদু হাসানের হয়ে এসব দোকান থেকে দৈনিক প্রায় ৪০০ টাকা করে চাঁদা তোলেন ব্যাক হেলাল, কিশোর গ্যাং লিডার সাজু এবং জনি আহমেদ। চাঁদ উদ্যান হোসেন মার্কেটের সামনে ফাকা জায়গায় সাপ্তাহিক মেলায় ২০০টি দোকান বসে। ৩৩ নম্বর ওয়ার্ডের মান্নান শাহীনের হয়ে এসব দোকান থেকে দৈনিক ৪০০ টাকা করে চাঁদা তোলেন জসিম উদ্দিন, সিয়াম আহমেদ ও আবদুল করিম। একই সঙ্গে বিদ্যুৎ বিলের কথা বলে তোলা হয় আরও ৫০ টাকা করে। বুদ্ধিজীবী কবরস্থানের সামনে সড়কের পাশে সরকারি খাস জায়গায় সাপ্তাহিক মেলায় অন্তত ২০০টি দোকান বসে। এখানে মাসুম খান রাজেশ এবং ওসমান রেজার হয়ে দোকান প্রতি ২৫০ টাকা ও বিদ্যুৎ বিল বাবদ ৫০ টাকা করে তোলেন জসিম উদ্দিন, সিয়াম আহমেদ ও আবদুল করিম।
সূত্র জানায়, আল্লাহ করিম মসজিদের সামনে থেকে বেড়িবাঁধ তিন রাস্তার মোড় পর্যন্ত মেইন রাস্তার আশপাশে ফুটপাতে অন্তত ৩০০টি দোকান বসে। কাউসার মোল্লা ওরফে মোল্লা কাউসার, বাদল শরীফ ওরফে কাইল্যা বাদল এবং রুবেল মোল্লার হয়ে ওইসব দোকান থেকে দৈনিক ১৫০ টাকা করে চাঁদা তোলেন রুবেল হোসেন, আনোয়ার হোসেন এবং আল আমিন মিয়া। প্রিন্স বাজারের গলি থেকে কৃষি মার্কেটের আশপাশের ফুটপাত ও মেলায় প্রায় ৪০০টি দোকান বসে। মোহাম্মদপুরের লিটন মাহমুদ বাবু ওরফে তেরে নাম বাবুর হয়ে ওইসব দোকান থেকে দৈনিক ১৫০ টাকা করে চাঁদা তোলেন সোহেল রানা। সাদেক খান কৃষি মার্কেট এবং কাঁচাবাজার সংলগ্ন বেড়িবাঁধ রাস্তার পাশে সবজি নিয়ে আসা গাড়ি পার্কিং করলে চাঁদা নেওয়া হয়। তবে এসব চাঁদার নির্দিষ্ট কোনো হার নেই। মোহাম্মদপুর ৩৪ নম্বর ওয়ার্ডের মাসুম খান রাজেশ এবং ওসমান রেজার হয়ে এসব চাঁদা তোলেন ডালিম এবং জলিল হাওলাদার।
এ ছাড়া সূচনা কমিউনিটি সেন্টারের সামনে থেকে শিয়া মসজিদ পর্যন্ত রিং রোডে এবং শ্যামলী স্কয়ার মার্কেটের সামনে থেকে হকের গ্যারেজ পর্যন্ত মেইন রাস্তার আশপাশে ফুটপাতে অন্তত ২০০টি দোকান বসে। এসব দোকান থেকে শুক্কুর আল আমিন, রনি আহমেদ এবং আসাদুজ্জামান রুবেল ওইসব দোকান থেকে চাঁদা তোলেন।
ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) মোহাম্মদপুর জোনের সহকারী কমিশনার (এসি) আবদুল্লাহ আল মামুন এ প্রতিবেদককে বলেন, চাঁদাবাজির অভিযোগ পাওয়ার পর সঙ্গে সঙ্গে আমরা ব্যবস্থা নিচ্ছি। মামলা দিয়ে গ্রেপ্তারও করা হচ্ছে। যাদের নাম আমরা পেয়েছি তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য টিম গোছানো হয়েছে, যে কোনো সময় অভিযান চালানো হবে।