Image description

সম্প্রতি হৃদ্‌যন্ত্রের জটিলতা নিয়ে ময়মনসিংহের একটি মাধ্যমিক পর্যায়ের সরকারি হাসপাতালে ভর্তি হন চল্লিশোর্ধ্ব আজহার আলী (ছদ্মনাম)। চিকিৎসকের সুপারিশে তাঁকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করানো হয়। সেখানে ভর্তি থাকার চার দিনের মধ্যে তিন দিনই আজহারকে মেঝেতে বিছানা পেতে চিকিৎসা নিতে হয়েছে।

বিশেষায়িত চিকিৎসার জন্য পরে আজহার আলী জাতীয় হৃদরোগ ইনস্টিটিউটে ভর্তি হন। করোনারি কেয়ার ইউনিটে (সিসিইউ) চিকিৎসা শেষে তাঁকে সাধারণ ওয়ার্ডে পাঠানো হয়। সেখানেও শয্যার অভাবে মেঝেতে বিছানা পেতে চিকিৎসা নিতে হয়। আজহারের হৃদ্‌যন্ত্রে বাইপাস সার্জারি করার দরকার ছিল। অস্ত্রোপচারের জন্য অপেক্ষমাণদের দীর্ঘ তালিকা দেখে তিনি বাড়ি ফিরে যান। এর চার দিনের মাথায় আজহারের মৃত্যু হয়। জরুরি অস্ত্রোপচার তো হয়ইনি, জীবনের শেষ সময়ে চিকিৎসার বেশির ভাগ সময় একটি শয্যা পর্যন্ত জোটেনি তাঁর।

দেশের সরকারি হাসপাতালে বিপুলসংখ্যক রোগীকে শয্যার অভাবে মেঝেতে বিছানা পেতে চিকিৎসা নিতে হয়। কখনো ওয়ার্ডের মেঝেতে জায়গা হয়, অনেক ক্ষেত্রে বারান্দা, সিঁড়ির নিচে, এমনকি প্রক্ষালনকক্ষের বাইরে বিছানা পেতে চিকিৎসা নিতে হয় নিম্নবিত্তের মানুষকে।

দেশের স্বাস্থ্যসেবা খাতের বড় পরিসংখ্যানগত প্রকাশনা ‘হেলথ বুলেটিন’। সর্বশেষ ২০২৪ সালের জুনে হেলথ বুলেটিন ২০২৩ প্রকাশ করে সরকার। এর তথ্য অনুযায়ী, সরকারি হাসপাতালে মোট ৭১ হাজার ১০০টি শয্যা রয়েছে।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, দেশের সরকারি স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠানগুলোকে তিন পর্যায়ে ভাগ করা যায়। প্রাথমিক পর্যায়ে কমিউনিটি ক্লিনিক, ইউনিয়ন উপস্বাস্থ্যকেন্দ্র এবং ইউনিয়ন স্বাস্থ্য ও পরিবারকল্যাণ কেন্দ্র বাদে ৪২৯টি উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সসহ ১০, ৩১, ৫০ ও ১০০ শয্যাবিশিষ্ট ৪৮৩টি প্রতিষ্ঠান রয়েছে। মাধ্যমিক পর্যায়ে ১০০ থেকে ২৫০ শয্যার ৬২টি জেলা, জেনারেল হাসপাতালসহ মোট ২০৫টি প্রতিষ্ঠান রয়েছে। বিশেষায়িত পর্যায়ে আছে মেডিকেল কলেজ, ইনস্টিটিউট ও অন্যান্য মিলিয়ে ৬৪টি হাসপাতাল; যার প্রতিটিতে শয্যা ২০০ থেকে ৩ হাজার।

বেসরকারি স্বাস্থ্যসেবায় শয্যার সংখ্যা হেলথ বুলেটিন ২০২৩-এ না থাকলেও আগের বছরের প্রকাশনায় তা ১ লাখ ৫৩৫ বলে উল্লেখ করা হয়েছিল। অর্থাৎ মোট শয্যার ৫৯ শতাংশই বেসরকারি হাসপাতালে।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (ডব্লিউএইচও) বৈশ্বিক স্বাস্থ্যসংক্রান্ত তথ্যভান্ডার গ্লোবাল হেলথ অবজারভেটরি বলছে, বাংলাদেশে প্রতি ১০ হাজার জনসংখ্যার বিপরীতে হাসপাতালের শয্যার সংখ্যা ৯ দশমিক ২। সংখ্যাটি এই অঞ্চলের ৮টি দেশের মধ্যে পঞ্চম। প্রতি ১০ হাজার জনসংখ্যার বিপরীতে মালদ্বীপে শয্যাসংখ্যা ৪৬, শ্রীলঙ্কায় ৩৯, ভুটানে ২২, ভারতে ১৬, পাকিস্তানে ৬, নেপালে ৫ দশমিক ৪ এবং আফগানিস্তানে ৪।

অলাভজনক সংস্থা ওয়ার্ল্ড পপুলেশন রিভিউর হিসাবে জনসংখ্যায় বিশ্বে বাংলাদেশের অবস্থান অষ্টম। সংস্থাটির তথ্য অনুযায়ী, এ দেশের জনসংখ্যা এখন ১৭ কোটি ৮০ লাখের কাছাকাছি। সংগত কারণেই দেশের সরকারি হাসপাতালগুলোর যে সক্ষমতা, তার তুলনায় রোগী ভর্তির হার অনেক বেশি। সর্বশেষ গত বছর সরকারি এক পরিসংখ্যানে দেখা গেছে, বিশেষায়িত হাসপাতালে শয্যার বিপরীতে রোগী ভর্তির হার ১৭৬ শতাংশ। জেলা হাসপাতালে এই হার ১৭৫ শতাংশ এবং উপজেলা হাসপাতালে ১১১ শতাংশ। স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের ২০২১ সালের (প্রাপ্ত সর্বশেষ) তথ্য অনুযায়ী, বিশেষায়িত সব সরকারি হাসপাতালে শয্যার তুলনায় ৫৩ শতাংশ বেশি রোগী ভর্তি হয়।

হাসপাতাল ব্যবস্থাপনা ও জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলছেন, দেশে রোগীর অনুপাতে হাসপাতালের শয্যা, চিকিৎসক, অর্থ বরাদ্দ ও লোকবল—কিছুই পর্যাপ্ত নয়। ১০০ রোগীর জন্য বরাদ্দ পাওয়া অবকাঠামো ও লোকবল দিয়ে ২০০ থেকে ৩০০টি শয্যার রোগীকে চিকিৎসা দিতে হচ্ছে। তার ওপর রোগী ভর্তির হার শয্যার তুলনায় অনেক বেশি। এর মধ্যে পরিকল্পনার ত্রুটিও দেখা যাচ্ছে। বলা হচ্ছে, প্রাথমিক ও মাধ্যমিক পর্যায় থেকে রোগী ব্যবস্থাপনা করা গেলে বিশেষায়িত হাসপাতালে এত চাপ পড়ত না। কারণ, সাধারণ মানুষ জানেই না, কোন রোগের জন্য কোথায় যেতে হবে। এ ছাড়া তারা রোগ প্রতিরোধের বিষয়েও তেমন সতর্ক নয়। যথাযথ সতর্কতা অনুসরণ করলে সব রোগের জন্য হাসপাতাল পর্যন্ত যাওয়ার প্রয়োজন হতো না।

প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা এবং রোগ প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থাপনা ঠিক রাখলে হাসপাতালে রোগীদের ভিড় কমবে বলে মন্তব্য করেছেন বাংলাদেশের স্বাস্থ্য খাতের উন্নয়ন, পর্যবেক্ষণ ও গবেষণায় নিয়োজিত শীর্ষস্থানীয় নাগরিক প্ল্যাটফর্ম বাংলাদেশ হেলথ ওয়াচের আহ্বায়ক অধ্যাপক ড. আহমেদ মোস্তাক রাজা চৌধুরী। তিনি আজকের পত্রিকাকে বলেন, ‘দেশে জনসংখ্যা বৃদ্ধির সঙ্গে তাল মিলিয়ে হাসপাতালের শয্যা বাড়ছে না। প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা ও রোগপ্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা ঠিক রাখতে পারলে হাসপাতালে রোগীর ভিড় কমবে। তবে ভবিষ্যতে অসংক্রামক ও দীর্ঘমেয়াদি রোগের রোগী বাড়বে। এখন প্রতি ১০ হাজারের জন্য যদি ৯-১০টি শয্যা থাকে, তাহলে ৫ থেকে ১০ বছরের মধ্যে তা অন্তত ২০টিতে নিতে হবে।’

জাতীয় বাজেটে স্বাস্থ্যের বরাদ্দ মোট জিডিপির মাত্র শূন্য দশমিক ৭ শতাংশ থাকে উল্লেখ করে মোস্তাক রাজা চৌধুরী বলেন, ‘এই অবস্থার পরিবর্তনের জন্য বিনিয়োগ এবং দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা দরকার।’

বাংলাদেশে ঠিক কতগুলো হাসপাতালে শয্যা প্রয়োজন, এ বিষয়ে কোনো নির্ধারিত সরকারি লক্ষ্যমাত্রা নেই। জনসংখ্যার কাঠামো, রোগের বোঝা এবং স্বাস্থ্যব্যবস্থার ধরন অনুযায়ী দেশভেদে প্রয়োজন ভিন্ন হয় বলে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থাও (ডব্লিউএইচও) কোনো নির্দিষ্ট লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেনি। তবে ডব্লিউএইচও এবং বিশ্বব্যাংকের তথ্যভিত্তিক বৈশ্বিক স্বাস্থ্য সূচকগুলোতে বলা হয়েছে, দেশভেদে প্রয়োজনীয় শয্যার সংখ্যা নির্ধারণ করা উচিত জনসংখ্যা ও রোগের পরিস্থিতির ভিত্তিতে। সে হিসাবে ন্যূনতম আন্তর্জাতিক মান পূরণ করতে বাংলাদেশের এখনই আরও লাখের বেশি শয্যা প্রয়োজন।

দেশের হাসপাতালগুলোর মোট শয্যার মাত্র ৪১ শতাংশ সরকারিতে হওয়ায় সিংহভাগ মানুষ চিকিৎসার জন্য নির্ভর করতে বাধ্য হন ব্যয়বহুল বেসরকারি খাতে।

এমন অবস্থায় রোগীর অনুপাতে হাসপাতালে শয্যা বাড়ানোর ক্ষেত্রে পরিকল্পনা অনুযায়ী পদক্ষেপ নেওয়া হবে বলে জানিয়েছেন সদ্য দায়িত্ব নেওয়া স্বাস্থ্য ও পরিবারকল্যাণমন্ত্রী সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেন। তিনি আজকের পত্রিকাকে বলেন, ‘জনবহুল এই দেশে অনেক সংকট রয়েছে। এগুলোর মধ্য থেকে আমরা এগিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করছি। আমাদের অবকাঠামো, সরবরাহ ব্যবস্থাপনা এবং উপকরণ অনেক বাড়াতে হবে। রাতারাতি স্বাস্থ্য খাতে পরিবর্তন সম্ভব নয়। এটি অনেক সংবেদনশীল খাত। আগের তুলনায় স্বাস্থ্যসেবাকেন্দ্রে চিকিৎসকদের উপস্থিতি বেড়েছে এবং তাঁরা কর্তব্যপরায়ণ রয়েছেন। আমরা এই অবস্থাকে আরও উন্নত করার চেষ্টা করছি।’