Image description
আজ জাতীয় শহীদ সেনা দিবস

শোকাবহ জাতীয় শহীদ সেনা দিবস আজ। ২০০৯ সালের ২৫ ও ২৬ ফেব্রুয়ারি ঢাকার পিলখানায় তৎকালীন বিডিআর (বর্তমানে বিজিবি) সদর দপ্তরে ৫৭ জন চৌকশ সেনা কর্মকর্তা ও ১৭ বেসামরিক নাগরিককে নৃশংসভাবে হত্যা করা হয়। নির্মম, নৃশংস ও ভয়ংকর এ হত্যাযজ্ঞের মাধ্যমে রচিত হয় স্বাধীন বাংলাদেশের ইতিহাসের এক কলঙ্কিত অধ্যায়। সরকারি সিদ্ধান্ত অনুযায়ী ২০২৫ সাল থেকে শোকাবহ পিলখানা ট্র্যাজেডির এ দিনটিকে ‘জাতীয় শহীদ সেনা দিবস’ হিসাবে পালন করা হয়। ‘জাতীয় শহীদ সেনা দিবস’ উপলক্ষ্যে বিভিন্ন কর্মসূচি হাতে নেওয়া হয়েছে।

এদিকে ভয়াবহ এই ঘটনা তদন্তে গত ১৭ বছরে বেশ কয়েকটি কমিটি ও কমিশন কাজ করে। এসব কমিটি-কমিশনের পক্ষ থেকে সরকারের কাছে দাখিল করা হয় প্রতিবেদন। কিন্তু বাস্তবায়ন হয়নি কোনো প্রতিবেদনের সুপারিশ। নতুন সরকারের পক্ষ থেকে বিষয়টি নিয়ে আবারও কমিশন বা কমিটি গঠনের ঘোষণা দেওয়া হয়েছে।

বিডিআর হত্যাকাণ্ডের পরপরই ২০০৯ সালে সাবেক আনিস-উজ-জামানের নেতৃত্বে ১২ সদস্যবিশিষ্ট জাতীয় তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়। একই সঙ্গে লে. জেনারেল জাহাঙ্গীর আলম চৌধুরীর (সদ্য সাবেক স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা) নেতৃত্বে গঠন করা হয় ২৪ সদস্যবিশিষ্ট সেনা তদন্ত কমিটি। জাতীয় কমিটি ২০০৯ সালের ১৪ মে ও সেনা তদন্ত কমিটি ওই বছরের জুনে সরকারের কাছে প্রতিবেদন জমা দেয়। কিন্তু সে অনুযায়ী নেওয়া হয়নি কোনো ব্যবস্থা।

২০২৪ সালের ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগের পতনের পর ডিসেম্বরে মেজর জেনারেল (অব.) আ ল ম ফজলুর রহমানের নেতৃত্বে গঠন করা হয় ৭ সদস্যবিশিষ্ট স্বাধীন তদন্ত কমিশন। এই কমিশন প্রায় ১১ মাস তদন্ত শেষে ২০২৫ সালের ৩০ নভেম্বর অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টার কাছে প্রতিবেদন দাখিল করে। কিন্তু ওই প্রতিবেদনের ভিত্তিতে কারও বিরুদ্ধে কোনো আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি।

অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে বিডিআর হত্যাকাণ্ড ছাড়া অন্যান্য বিষয়ে আরও কয়েকটি কমিশন গঠন করা হয়। অন্যান্য কমিশনের প্রতিবেদন প্রকাশ করা হলেও বিডিআর হত্যাকাণ্ড সংক্রান্ত স্বাধীন তদন্ত কমিশনের প্রতিবেদন প্রকাশ করেনি সরকার। ওই প্রতিবেদনে অনেকের সঙ্গে তৎকালীন স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা লে. জেনারেল জাহাঙ্গীর আলম চৌধুরী এবং আইজিপি ড. বাহারুল আলমের নাম উঠে আসে। জাহাঙ্গীর আলম চৌধুরীর বিষয়ে স্বাধীন তদন্ত কমিশনের প্রতিবেদনে বলা হয়, তার (জাহাঙ্গীর) নেতৃত্বাধীন ফরমায়েশি প্রতিবেদন দাখিল করে। আইজিপি বাহারুলের বিষয়ে বলা হয়, কমিশনের তদন্তে অনুমানভিত্তিক তথ্য দিয়ে বিভ্রান্তি সৃষ্টি করেছেন। রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে সরকারবিরোধীদের ফাঁসিয়েছেন। মিছিলকারীদের শনাক্ত না করেই বিরোধীদলীয় কর্মীদের ওপর দায় চাপিয়েছেন। এসবির তৎকালীন মাঠ পর্যায়ের টিমের পরিচয় না জানিয়ে এবং চাহিদা অনুযায়ী তথ্য-প্রমাণ না দিয়ে কমিশনকে অসহযোগিতা করেন।

স্বাধীন তদন্ত কমিশনের প্রতিবেদনে বর্বর হত্যাকাণ্ডের জন্য ৫১ জনকে দায়ী করা হয়। এদের মধ্যে আছেন ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাসহ ১৬ রাজনৈতিক নেতা, সাবেক ১২ সামরিক কর্মকর্তা, ৪ ডিজিএফআই, ২ এনএসআই, ৪ র‌্যাব, ৩ বিডিআর, ৫ পুলিশ কর্মকর্তা ও ৩ মিডিয়া কর্মী এবং তৎকালীন নৌ ও বিমানবাহিনী প্রধান। আনিস-উজ-জামানের নেতৃত্বাধীন জাতীয় কমিটির বিষয়ে স্বাধীন তদন্ত কমিশনের প্রতিবেদনে বলা হয়, ওই কমিটি ঘটনার প্রকৃত রহস্য উদ্ঘাটনে ব্যর্থ হয়েছে। কমিটির সদস্যরা নেপথ্য কুশীলবদের চিহ্নিত করার কোনো উদ্যোগ নেননি। যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের বিষয়টি অপ্রাসঙ্গিকভাবে প্রতিবেদনে উল্লেখ করে ঘটনাকে ভিন্ন খাতে নেওয়ার চেষ্টা হয়েছে। আনিস-উজ-জামানের কমিশন স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে যে প্রতিবেদন দিয়েছে, সেখানে সাক্ষীদের কোনো স্বাক্ষর নেই। প্রতিবেদনে যাদের সাক্ষ্য আছে তাদের অন্তত দুজন (সাবেক এমপি গোলাম রেজা ও সাবেক সেনাপ্রধান মইন ইউ আহমেদ) স্বাধীন তদন্ত কমিশনকে জানিয়েছেন, তারা ওই কমিটিকে কোনো সাক্ষ্য দেননি। ব্রিগেডিয়ার জেনারেল হাসান নাসির প্রতিবেদনে স্বাক্ষর করতে গিয়ে লিখেন, ‘একটি সুশৃঙ্খল বাহিনীর এহেন বিদ্রোহে সম্পৃক্ততা ও দায়বদ্ধতা জাতীয় স্বার্থে নিরপেক্ষতা ও গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা না করা মোটেই বিধেয় নয়।’

লে. জেনারেল জাহাঙ্গীর আলম চৌধুরীর নেতৃত্বে গঠিত সেনা তদন্ত কমিটির অনেকগুলো বিষয় প্রশংসা করে স্বাধীন তদন্ত কমিশন। তবে সেনা তদন্তে বিদ্রোহের কারণ অনুসন্ধানে ঘটনার গভীরে প্রবেশ না করে গতানুগতিকতার আশ্রয় নেওয়া হয়েছে বলে স্বাধীন তদন্ত কমিশনের প্রতিবেদনে বলা হয়। সেনা তদন্ত প্রতিবেদনে বলা হয়, বেসামরিক ও আওয়ামী লীগ ব্যক্তিরা বিষয়টিকে নিজেদের প্রতিশোধের হাতিয়ার হিসাবে ব্যবহার করে থাকতে পারে। স্থানীয় আওয়ামী লীগ নেতা তোরাব আলী, তার ছেলে লেদার লিটন, অবসরপ্রাপ্ত সুবেদার কাঞ্চনের সন্তান জাকের বিদ্রোহের ঘটনায় ওতপ্রোতভাবে জড়িত। বিষয়টি নিয়ে আরও উচ্চ পর্যায়ের তদন্ত হওয়া উচিত বলে ওই প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হলেও তৎকালীন সরকার পরবর্তীতে আর কোনো ব্যবস্থা নেয়নি। সেনা তদন্তের বরাত দিয়ে স্বাধীন তদন্ত কমিশনের তদন্ত প্রতিবেদনে বলা হয়, হত্যাকাণ্ডে ব্যাপক অংশগ্রহণ করলেও ৪৪ রাইফেল ব্যাটালিয়নের সদস্যরা তাদের সব অফিসারকে রক্ষা করেছেন। অপরদিকে ৩৬ ব্যাটালিয়ন সদস্যরা তাদের অধিনায়ক এবং উপ-অধিনায়কসহ অফিসারদের হত্যা করে। প্রতিবেদনে বিষয়টিকে রহস্যজনক উল্লেখ করা হলেও পরে এ নিয়ে কোনো তদন্ত হয়নি। সার্বিক মতামতে স্বাধীন তদন্ত কমিশন জানায়, সেনা তদন্ত কমিটি তথ্য উদ্ঘাটনে যথেষ্ট যত্নবান ও উদ্যোগী ছিলেন। তবে মতামত প্রদানের ক্ষেত্রে কিছুটা ‘ধরি মাছ, না ছুঁই পানি’ প্রক্রিয়ার শরণাপন্ন হয়েছে।

সোমবার সচিবালয়ে বিভিন্ন দপ্তরের প্রধানদের সঙ্গে মতবিনিময় সভা শেষে যুগান্তরের এক প্রশ্নেব জবাবে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, বিডিআর হত্যাকাণ্ড নিয়ে পুনরায় কমিশন বা কমিটি গঠন করা হবে। পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে দেখে সেই কমিটির সুপারিশ অনুযায়ী জড়িতদের বিচারের আওতায় আনা হবে। এটা আমাদের নির্বাচনি ইশতেহারেও আছে। আমরা ন্যায়বিচার নিশ্চিত করতে চাই।