বিডিআর (বাংলাদেশ রাইফেলস) বিদ্রোহের (পিলখানা ট্র্যাজেডি) ১৭ বছর পূর্ণ হচ্ছে আজ। ২০০৯ সালের ২৫ ও ২৬ ফেব্রুয়ারি তৎকালীন বিডিআর (বর্তমানে বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ-বিজিবি) সদর দপ্তরে বিপথগামী সদস্যরা কিছু দাবি-দাওয়া আদায়ের নামে নির্মম হত্যাযজ্ঞ, অগ্নিসংযোগ ও লুটপাট চালায়। এতে ৫৭ সেনা কর্মকর্তাসহ ৭৪ জন নিহত হন।
এ ঘটনায় হত্যা মামলার বিচার ১৭ বছরেও চূড়ান্ত নিষ্পত্তি হয়নি। বিচারিক আদালত ও হাইকোর্টের রায়ের পর মামলাটি এখন সুপ্রিমকোর্টের আপিল বিভাগে চূড়ান্ত নিষ্পত্তির অপেক্ষায় রয়েছে। রাষ্ট্র ও আসামিপক্ষ বলছে, শুনানির জন্য তারা প্রস্তুত রয়েছেন। এর জন্য উদ্যোগ নেওয়া হবে।
আর বিস্ফোরক দ্রব্য আইনের মামলাটি বিচারিক আদালতে এখনো সাক্ষ্য পর্যায়ে রয়েছে। প্রসিকিউশন জানিয়েছে, সাক্ষীদের জবানবন্দিতে বিডিআর হত্যাকাণ্ডে জড়িত থাকার বিষয়ে সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা, ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের সাবেক মেয়র শেখ ফজলে নূর তাপস এবং মির্জা আজম ও জাহাঙ্গীর কবির নানকসহ তৎকালীন বেশ কয়েকজন মন্ত্রী ও আওয়ামী লীগ নেতার নাম উঠে এসেছে। এ কারণে তাদের বিরুদ্ধে মামলা করা হবে।
পিলখানায় হত্যাযজ্ঞের ঘটনায় ২০০৯ সালের ২৮ ফেব্রুয়ারি হত্যা ও বিস্ফোরক দ্রব্য আইনে পৃথক মামলা হয়। এর মধ্যে হত্যা মামলায় ৮৫০ জনকে আসামি করা হয়। দেশের বিচার বিভাগের ইতিহাসে আসামির সংখ্যার দিক থেকে এটিই সবচেয়ে বড় মামলা। বিচারিক আদালত ২০১৩ সালের ৫ নভেম্বর এ মামলার রায় দেন। রায়ে ১৫২ জনকে মৃত্যুদণ্ড, ১৬০ জনকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড এবং ২৫৬ জনকে বিভিন্ন মেয়াদে কারাদণ্ড দেওয়া হয়। রায়ে খালাস পান ২৭৮ জন। রায় ঘোষণার আগে চার আসামি মারা যান।
আসামিপক্ষের অন্যতম আইনজীবী হলেন চিফ প্রসিকিউটর মো. আমিনুল ইসলাম। তিনি সোমবার যুগান্তরকে বলেন, আসামিপক্ষ ও রাষ্ট্রপক্ষ এরই মধ্যে আপিলের সারসংক্ষেপ জমা দিয়েছে। আপিল শুনানির জন্য কার্যতালিকায় রয়েছে। এখন ক্রম অনুসারে শুনানি হতে পারে। আপিল শুনানির জন্য আমরা প্রস্তুত রয়েছি। তিনি বলেন, এটি অনেক বড় মামলা। আলাদা বেঞ্চের প্রয়োজন পড়বে। বর্তমানে আপিল বিভাগে বিচারক সংকট রয়েছে। আশা করছি, শিগগিরই এর সমাধান হবে।
আইনজীবীরা জানান, ফৌজদারি কোনো মামলায় বিচারিক আদালতের রায়ে কারও মৃত্যুদণ্ড হলে তা কার্যকরে হাইকোর্টের অনুমোদন লাগে, যেটি ডেথ রেফারেন্স মামলা হিসাবে পরিচিত। পিলখানা হত্যা মামলার ডেথ রেফারেন্স ও আপিলের ওপর শুনানি শেষে তিন বিচারপতির সমন্বয়ে গঠিত হাইকোর্টের বিশেষ বেঞ্চ ২০১৭ সালের ২৬ ও ২৭ নভেম্বর রায় ঘোষণা করেন। হাইকোর্টের পূর্ণাঙ্গ রায় ২০২০ সালের জানুয়ারিতে প্রকাশিত হয়। রায়ে ১৩৯ আসামির মৃত্যুদণ্ড বহাল রাখা হয়। যাবজ্জীবন সাজা দেওয়া হয় ১৮৫ জনকে এবং বিভিন্ন মেয়াদে সাজা দেওয়া হয় ২২৮ জনকে। খালাস পান ২৮৩ জন। হাইকোর্টের রায়ের আগে ১৫ জনসহ সব মিলিয়ে ৫৯ জন আসামি মারা গেছেন।
সংশ্লিষ্ট সূত্র বলছে, হত্যা মামলায় হাইকোর্টের দেওয়া দণ্ডাদেশের বিরুদ্ধে ২২৬ জন আসামির পক্ষে পৃথক ৭৩টি আপিল ও লিভ টু আপিল (আপিলের অনুমতি চেয়ে আবেদন) করা হয়েছে। অন্যদিকে হাইকোর্টের রায়ে যারা খালাস পেয়েছেন এবং যাদের সাজা কমেছে-এমন ৮৩ জন আসামির বিষয়ে ২০টি লিভ টু আপিল করেছে রাষ্ট্রপক্ষ। এসব আপিল ও লিভ টু আপিল শুনানির অপেক্ষায় রয়েছে। এই শুনানি হবে আপিল বিভাগে।
সারা দেশে বিশেষ আদালত গঠন করে বিদ্রোহের বিচার করা হয়। বিশেষ আদালত ৫৭টি মামলায় ৫ হাজার ৯২৬ জওয়ানকে বিভিন্ন মেয়াদে কারাদণ্ড দেন। বিশেষ আদালতে বিচার চলার সময় মারা গেছেন ৫ জন।
সূত্রমতে, হাইকোর্টের রায় প্রকাশ হওয়ার পর ২০২০ সালে রাষ্ট্রপক্ষ পৃথক লিভ টু আপিল করে। অন্যদিকে আসামিপক্ষ ২০২১ ও ২০২২ সালে পৃথক আপিল ও লিভ টু আপিল করে। আসামিপক্ষের আপিল ২০২৩ সালের ১২ নভেম্বর আপিল বিভাগের চেম্বার আদালতে ওঠে। সেদিন চেম্বার আদালত বিষয়টি আপিল বিভাগের নিয়মিত বেঞ্চে পাঠান। এরপর আসামিপক্ষের আপিল ২০২৪ সালের ২৩ জানুয়ারি আপিল বিভাগের কার্যতালিকায় ওঠে। আসামিদের এই আপিল গত বছরের ফেব্রুয়ারি মাসে আপিল বিভাগের কার্যতালিকায় ছিল।
জানতে চাইলে ভারপ্রাপ্ত অ্যাটর্নি জেনারেল মোহাম্মদ আরশাদুর রউফ যুগান্তরকে বলেন, হত্যা মামলাটি অনেকদিন ধরে শুনানির অপেক্ষায় রয়েছে। শুনানির বিষয়ে রাষ্ট্রপক্ষের উদ্যোগের কোনো কমতি নেই। তিনি বলেন, আদালত এখন পুরোনো মামলা শুনছেন। তবে মামলাটি অগ্রাধিকার ভিত্তিতে শুনানি হওয়া দরকার।
বিস্ফোরক দ্রব্য নিয়ন্ত্রণ আইনে মামলা : হত্যা মামলায় খালাস পাওয়া ১৭৮ জন ১৯ জানুয়ারি বিচারিক আদালত থেকে জামিন (বিস্ফোরক দ্রব্য নিয়ন্ত্রণ আইনের মামলা) পেয়েছেন। অন্য আসামিরা কারাগারে আছেন। বিস্ফোরক আইনে করা মামলার সাক্ষী ১ হাজার ৩৪৪ জন। এখন পর্যন্ত প্রায় ৩০০ জনের সাক্ষ্যগ্রহণ শেষ হয়েছে। এ মামলার বিচারকাজ এখন কেরানীগঞ্জে কেন্দ্রীয় কারাগারে স্থাপিত বিশেষ আদালতে চলছে। এ মামলায় আসামি ৮৩৪ জন। তাদের মধ্যে ৫৭ জন মারা গেছেন। ২১ আসামি পলাতক।
বিস্ফোরক মামলার চিফ প্রসিকিউটর বোরহান উদ্দিন গণমাধ্যমকে জানিয়েছেন, গুরুত্বপূর্ণ সাক্ষীদের জবানবন্দিতে, বিডিআর হত্যাকাণ্ডে জড়িত থাকার বিষয়ে সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা, শেখ ফজলে নূর তাপস, মির্জা আজম, জাহাঙ্গীর কবির নানকসহ তৎকালীন বেশ কয়েকজন মন্ত্রী ও আওয়ামী লীগ নেতার নাম উঠে এসেছে। এ কারণে তাদের বিরুদ্ধে মামলা করা হবে।