Image description

গত ২১ ফেব্রুয়ারি বিবিসি বাংলা একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করে যার শিরোনাম, "মাহদী হাসানের সঙ্গে দিল্লিতে ঠিক কী হয়েছিল?"

এই প্রতিবেদনে নিশ্চিতভাবে অন্তত দুটি ভুয়া দাবি চিহ্নিত করেছে দ্য ডিসেন্ট। পাশাপাশি আওয়ামী লীগপন্থী ফেসবুক পেইজে ছড়ানো ভিত্তিহীন প্রোপাগান্ডা বিবিসি বাংলা রিপোর্টে ভারতীয় অজ্ঞাতনামা 'গোয়েন্দা কর্মকর্তা'র বরাতে স্থান পেয়েছে।

দ্য ডিসেন্ট এর এই 'মিডিয়া ওয়াচ' প্রতিবেদনের আলোচ্য ভুয়া তথ্যগুলো খণ্ডন করা হয়েছে।

 

প্রেক্ষাপট

বাংলাদেশের বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের হবিগঞ্জের নেতা মাহদী হাসান ইউরোপের একটি দেশে যাওয়ার জন্য ভিসা সংক্রান্ত কাজে গত ১৬ ফেব্রুয়ারি ভারতের রাজধানী দিল্লিতে গিয়েছিলেন তার এক আত্মীয়সহ। পরদিন ১৭ ফেব্রুয়ারি সেখানকার ভিএফএস সেন্টারে যান ভিসার কাগজপত্র জমা দিতে। ভিএফএস সেন্টারে বসে থাকা অবস্থায় মাহদীর পেছন থেকে কেউ একজন তার ভিডিও রেকর্ড করে এবং তা সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে দেয়া হয়।

মাহদী সাম্প্রতিক সময়ে বাংলাদেশে আলোচিত হয়েছিলেন তার একটি বিতর্কিত বক্তব্যের জন্য। গত জানুয়ারি মাসের শুরুতে সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া একটি ভিডিওতে দেখা যায়, শায়েস্তাগঞ্জ থানায় বসে ওসি আবুল কালামকে হুমকি দিচ্ছেন মাহদী। তিনি ওসির উদ্দেশ্যে বলেছিলেন, "জুলাই আন্দোলনের মধ্য দিয়ে আমরা সরকার গঠন করেছি। এই জায়গায় আপনারা আমাদের প্রশাসনের লোক। আপনারা আমাদের ছেলেদের গ্রেপ্তার করে নিয়ে এসেছেন। আবার আমাদের সঙ্গে বার্গেনিং করছেন। আপনি (ওসি) বলেছেন, “আন্দোলনকারী হয়েছে তো কী হয়েছে?”’ একপর্যায়ে মাহদী হাসান বলেন, ‘বানিয়াচং থানা কিন্তু আমরা পুড়িয়ে দিয়েছিলাম, এসআই সন্তোষকে কিন্তু আমরা জ্বালাই দিয়েছিলাম। ওই জায়গা থেকে উনি (ওসি) কোন সাহসে এটা (আন্দোলনকারী হয়েছে তো কী হয়েছে) বললেন। আমি স্ট্রিক্টলি এখানে আসছি। আমরা এতগুলা ছেলে ভাইসা আসছি নাকি?"

এরপর ১ জানুয়ারি দিবাগত মধ্যরাতে মাহদীকে আটক করেছিল পুলিশ। আটক অবস্থায় তার বিরুদ্ধে পুলিশের কাজে বাঁধাদানের অভিযোগে মামলা দায়ের করা হয় এবং ৩ জানুয়ারি গ্রেফতার দেখানো হয়। যদিও পরদিন ছাত্রদের আন্দোলনের মুখে মাহদীকে এই মামলায় জামিন দেন আদালত।

মাহদী বিদেশে পড়াশোনার জন্য যাবেন বলে বহুদিন ধরে চেষ্টা করছিলেন। আলোচ্য ঘটনার পর তিনি ইউরোপের একটি দেশে স্টুডেন্ট ভিসায় যাওয়ার জন্য প্রয়োজনীয় কাগজপত্র জমা দিতে দিল্লিতে যেতে ভারতের ভিসার আবেদন করেন। ভিসা পেলে ১৬ ফেব্রুয়ারি বিমানযোগে দিল্লিতে পৌঁছে একটি হোটেলে উঠেন।

১৭ ফেব্রুয়ারি সকালে দিল্লির ভিএফএস সেন্টারে যান। সেখান থেকে বের হয়ে ফেরেন। এবং বিকাল পৌনে চারটায় তার মোবাইলে হঠাৎ করে অনেক অপরিচিত নম্বরের কল ও বার্তা আসা শুরু হয়। এসব বার্তা এবং কল থেকে তিনি জানতে পারেন তিনি যে দিল্লিতে আছেন তার একটি ভিডিও (যা সকালে দুপুরে ভিএফএস সেন্টারে ধারণকৃত) এবং তার মোবাইল নম্বর কে বা কারা সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে দিয়েছে। এরপর মাহদী ওই হোটেলে অনিরাপদ মনে করায় বাংলাদেশে তার শুভাকাঙ্ক্ষীদের সাথে যোগাযোগ করেন এবং তাদের পরামর্শে হোটেল ত্যাগ করে ভিন্ন এক জায়গায় আশ্রয় নিয়ে রাত কাটা। এবং পরদিন ১৮ ফেব্রুয়ারি সকাল ৯টার দিকে ওই আশ্রয়স্থল থেকে বিমানবন্দরে হাজির হোন দেশে ফেরার জন্য। সেখানে তাকে ইমিগ্রেশনে আটক এবং জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়। জিজ্ঞাসাবাদ শেষে তাকে বাংলাদেশে ফেরার সুযোগ দেয়া হয়।

 

বিবিসির রিপোর্টে অসত্য তথ্য

এই ঘটনার বর্ণনা দিতে বিবিসি বাংলা তাদের "মাহদী হাসানের সঙ্গে দিল্লিতে ঠিক কী হয়েছিল?" শিরোনামের প্রতিবেদনটি প্রকাশ করে।

বিবিসি বাংলা জানিয়েছে, তাদের এই প্রতিবেদনে উল্লিখিত তথ্যগুলো ভারতের দুইজন গোয়েন্দা কর্মকর্তার দেয়া। তবে ওই কর্মকর্তা দুজনের নাম পরিচয় প্রকাশ করেনি সংবাদমাধ্যমটি।

দ্য ডিসেন্ট বিবিসি বাংলা এই প্রতিবেদনে অন্তত দুটি ভুয়া তথ্য চিহ্নিত করেছে। সেগুলো হলো:

১. মাহদী ও তার আত্মীয় পর্তুগালের ভিসা নেওয়ার জন্য ভারতে যাওয়ার বিষয়টি।

২. মঙ্গলবার সন্ধ্যায় বিমানবন্দেরর কাছাকাছি একটি হোটেলে মাহদীর ওঠার বিষয়টি।

এছাড়া মাহদীর কাছে ক্রিপ্ট কারেন্সি পাওয়া যাওয়ার যে দাবি একজন নামহীন গোয়েন্দা কর্মকর্তার বরাতে প্রকাশ করা হয়েছে সেটি প্রথমে ভুয়া একটি স্ক্রিনশটের ভিত্তিতে প্রথমে আওয়ামী লীগ সংশ্লিষ্ট প্রোপাগান্ডা পেইজ থেকে অনলাইনে ছড়ানো হয়। পরে সেই ভিত্তিহীন দাবিই বিবিসি বাংলার রিপোর্টে স্থান পেয়েছে।

 

পর্তুগাল নয়, ফিনল্যান্ডের ভিসার জন্য আবেদন করেছিলেন মাহদী

বিবিসি বাংলার রিপোর্টের ৬টি স্থানে দাবি করা হয়েছে, মাহদী ও তার আত্মীয় পর্তুগালের ভিসার জন্য আবেদন করতে দিল্লিতে গিয়েছিলেন।

যেমন, এক জায়গা লেখা হয়েছে, "জানা গেছে যে মি. হাসান এবং তার পাশে বসা নারী পর্তুগালের ভিসার জন্য আবেদন করতে গিয়েছিলেন।"

আরেক জায়গায় লেখা হয়েছে, "বিবিসি বাংলা যে দুজনের সঙ্গে কথা বলেছে, তাদের একজন জানিয়েছেন, মি. হাসান দিল্লি থেকেই ভিসা নিয়ে পর্তুগালের রাজধানী লিসবনে চলে যাওয়ার পরিকল্পনা করেছিলেন।"

তবে মাহদী জানিয়েছেন, তিনি এবং তার ওই আত্মীয় পর্তুগালের ভিসার জন্য কোন আবেদন করেনি।

দ্য ডিসেন্ট তাদের ভিসার আবেদন ফরম সংগ্রহ করেছে যেখানে দেখা যাচ্ছে, ফিনল্যান্ডের জন্য তারা উভয়ে আবেদন করেছিলেন।

মাহদীর ফিনল্যান্ডে যাওয়ার জন্য করা ভিসার আবেদনপত্র

মঙ্গলবার রাতে কোন হোটেলে ছিলেন না

বিবিসি বাংলা গোয়েন্দাদের বরাতে দাবি করেছে, "তবে মি. হাসানকে কেউ পরামর্শ দেন যে তিনি যেন পাহাড়গঞ্জের হোটেল থেকে সরে যান এবং বিমানবন্দরের কাছাকাছি কোনো হোটেলে ওঠেন। পাহাড়গঞ্জের হোটেল থেকে কাউকে দিয়ে তিনি নিজের ব্যাগ-সুটকেস আনিয়ে বিমানবন্দরের কাছাকাছি একটি হোটেলে ওঠেন মঙ্গলবার সন্ধ্যায়।"

মাহদী পাহাড়গঞ্জের উডল্যান্ড নামক একটি হোটেলে উঠেছিলেন ১৬ ফেব্রুয়ারি রাতে। পরদিন তার ব্যক্তিগত তথ্য ও অবস্থান সামাজিক মাধ্যমে প্রকাশিত হয়ে পড়ায় ১৭ তারিখ সন্ধ্যায় তিনি হোটেল ছেড়ে তার এক শুভাকাঙ্ক্ষীর ভাসান্ত বিহারস্ত বাসায় গিয়ে ওঠেন এবং সেখানে রাত যাপন করেন।

১৮ তারিখ সকালে দিল্লি বিমানবন্দরে যাওয়ার জন্য ওই শুভাকাঙ্ক্ষী নিজের মোবাইল থেকে রাইড শেয়ারিং অ্যাপ ওলা ক্যাবস-এর মাধ্যমে মাহদীকে একটি ট্যাক্সি ক্যাব ডেকে দেন (৯টা ২১ মিনিটে)। রাইডটিতে ৪০১ রুপি ভাড়া আসে। দ্য ডিসেন্ট ওই শুভাকাঙ্ক্ষীর কাছ থেকে এই রাইডের তথ্য সংগ্রহ করেছে। নিজের ব্যক্তিগত নিরাপত্তা ও পেশাগত স্পর্শকাতরতার কারণে ওই শুভাকাঙ্ক্ষী তার পরিচয় প্রকাশ করতে আগ্রহী হননি।

 

মাহদী জানান, আগের দিন সন্ধ্যায় উডল্যান্ড হোটেল কর্তৃপক্ষের সহায়তায় একটি ট্যাক্সি ভাড়া করে তিনি ওই শুভাকাঙ্ক্ষীর বাসায় যান। হোটেল থেকে বের হওয়ার আগে দেশে তার বেশ কয়েকজন শুভাকাঙ্ক্ষীর মোবাইলে তার লাইভ গুগল ম্যাপসের লোকেশন, গাড়ির নম্বর ও ছবি, এবং কখন হোটেল ছাড়ছেন, কখন গাড়িতে উঠছেন এসব তথ্য পাঠিয়েছিলেন। মোবাইলের এসব মেসেজের রেকর্ড দেখে তিনি জানান, ১৭ ফেব্রুয়ারি রাত ৭টা ৫৫ মিনিটে (দিল্লি সময়) হোটেল থেকে বের হন এবং ৮টা ৩মিনিটে তার ট্যাক্সি যাত্রা শুরু করে।

"আমি হোটেল আমার জন্য নিরাপদ ছিল না। তাই বাংলাদেশে আমার পরিচিত কয়েকজনের সহায়তায় দিল্লিতে একজন শুভাকাঙ্ক্ষীর বাসায় ওই রাত যাপন করেছি। বিবিসির রিপোর্টে যে হোটেলের বর্ণনা দেয়া হয়েছে তা কল্পিত", বলেছেন মাহদী।

এই গাড়িতে করে উডল্যান্ড হোটেল থেকে শুভাকাঙ্খীর বাসায় যান মাহদী

এই গাড়িতে করে উডল্যান্ড হোটেল থেকে শুভাকাঙ্ক্ষীর বাসায় যান মাহদী

বিবিসি বাংলা রিপোর্টে লেখা হয়েছে, "বিমানবন্দরের কাছের ওই হোটেলে সকালের জলখাবার খেয়ে ৮টা ১০ মিনিটে সে রওনা দেয়, আর ৮টা ৫০ মিনিট নাগাদ সিকিউরিটি চেক করতে এগোয়," বিবিসিকে জানিয়েছে দুটি সূত্রই।"

এই তথ্যের বিষয়ে মাহদী বলেন, "এ কেমন গোয়েন্দা! আমি হোটেলে ছিলাম না। আর ওই বাসায় থেকে বের হয়েছি ৯টার পর। এয়ারপোর্টে পৌঁছেছি ১০টার পর। এসবের রেকর্ড আমি যে রাইড শেয়ারিং অ্যাপ ব্যবহার করেছি তাতে আছে। আমার হোয়াটসঅ্যাপে আছে। কারণ আমি অনেককে আমার লোকেশনের বিষয়ে আপডেট রাখছিলাম।"

 

ক্রিপ্ট কারেন্সি পাওয়ার বিষয়টি ভুয়া স্ক্রিনশট দিয়ে প্রথমে ছড়ায় আওয়ামী লীগ

বিবিসি বাংলা একজন গোয়েন্দা কর্মকর্তার বরাতে লিখেছে, "ওই সূত্রটিই বলেছে যে, পরবর্তী সময়ে খরচের জন্য ক্রিপ্টো-কারেন্সি নিয়ে ভারতে এসেছিলেন মাহদী হাসান এবং তার পরিমাণ বাংলাদেশি টাকায় ৪০ লক্ষেরও বেশি।"

বিবিসির প্রতিবেদনের বর্ণনা থেকে স্পষ্ট যে, ভারতীয় গোয়েন্দা কর্মকর্তারা ১৭ তারিখ দুপুরের পর থেকে মাহদীর গতিবিধি পর্যবেক্ষণ শুরু করলেও পরদিন ১৮ তারিখ সকাল ৯টার পর তিনি যখন বিমানবন্দরে প্রবেশ করেন তার আগে মাহদীকে ভারতীয় কোন কর্তৃপক্ষের সামনে পড়তে হয়নি। অর্থাৎ, মাহদীর কোন ডিভাইসে প্রবেশের সুযোগ ভারতীয় কর্তৃপক্ষের ছিল না।

কিন্তু ১৭ তারিখ রাত বাংলাদেশ সময় ১০টা ৯ মিনিটে 'Amar Habiganj' নামে একটি অনলাইন পোর্টালের ফেসবুক পেইজে একটি পোস্ট করে দাবি করা হয় মাহদীর ক্রিপ্টো আইডিতে ২১ হাজার মার্কিন ডলারের সন্ধান পেয়েছে ভারতীয় একটি ‍গোয়েন্দা সংস্থা।

'Amar Habiganj' পত্রিকাটি হবিগঞ্জ ভিত্তিক এবং এটির মালিক ও সম্পাদক পলাতক আওয়ামী লীগের নেতা এবং অনলাইন এক্টিভিস্ট সুশান্ত দাস গুপ্ত; যিনি এ-টিম নামে আওয়ামী লীগের একটি প্রোপাগান্ডা টিমের সদস্য।

'Amar Habiganj' এর পোস্টে লেখা হয়েছে, "বানিয়াচং থানার এসআই সনন্তোষ হ/ত্যা মা/মলার আ/সামী ও বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন হবিগঞ্জ জেলা শাখার সদস্য সচিব মাহদী হাসানের Mehediwarn0 নামে একটি ক্রিপ্টো আইডিতে আনুমানিক ২১ হাজার মার্কিন ডলারের সন্ধান পেয়েছে কলকাতা ‍গোয়েন্দা সংস্থা ন্যাশনাল টেকনিক্যাল রিসার্চ অর্গানাইজেশন। যার বাংলাদেশী টাকায় ৩৮ লাখ টাকার সমপরিমাণ অর্থ রয়েছে বলে জানা গেছে। ভারতে পা/লিয়ে থাকা মাহদীকে শীঘ্রই তাকে গ্রেফারের আওতায় আনা হবে বলে সংবাদ মাধ্যমকে জানিয়েছেন সংস্থাটি।"

পোস্টের সাথে দুটি স্ক্রিনশট যুক্ত করা হয়েছে, যার একটি মাহদীর পাসপোর্টের ছবি এবং অন্যটি মাহদীর কথিত ক্রিপ্টো আইডির ব্যালেন্সের একটি স্ক্রিনশট; ওই আইডির ব্যবহারকারীর ডিভাইস থেকে তোলা নির্দেশ করে।

দ্য ডিসেন্ট নিশ্চিত হয়েছে, পোস্ট যুক্ত পাসপোর্টের ছবিটি সঠিক কিন্তু ক্রিপ্টো আইডির স্ক্রিনশটটি এডিট করে তৈরি করা।

মাহদী দ্য ডিসেন্টকে জানান, তিনি এক শুভাকাঙ্ক্ষীর মাধ্যমে দিল্লিতে বাংলাদেশ হাইকমিশনের অনুরোধে তার পাসপোর্টের একটি কপি হাইকমিশনের কর্মকর্তাদেরকে পাঠান ১৭ তারিখ সন্ধ্যা ৬টা ৩৯ মিনিটে (ভারতীয় সময়, বাংলাদেশ সময় তখন সন্ধ্যা ৭টা ৯ মিনিট)।

"এরপর ঘণ্টাখানেক পর আমি অনলাইনে যারা আমার বিরুদ্ধে ক্যাম্পেইন করছিল তাদের পোস্টে আমার পাসপোর্টের ওই ছবির ক্রপ করা একটি অংশ দেখতে পাই। আমরা ধারণা, হাইকমিশন থেকেই কেউ আওয়ামী লীগের লোকজনের কাছে আমার পাসপোর্টের কপি লিক করেছে। এর আগে সারাদিন আমার ভিডিও এবং অন্যান্য তথ্য অনলাইনে ছড়ালেও পাসপোর্টের ছবি ছিল না ওদের কাছে। হাইকমিশনে সহায়তার জন্য আমি একটি কপি পাঠানোর পর থেকে সেই কপি অনলাইনে দেখতে পেলাম", দ্য ডিসেন্টকে বলেছেন মাহদী হাসান।

নিজের পাসপোর্টের একটি স্ক্যান করা কপি তিনি দ্য ডিসেন্ট-এর শেয়ার করেছেন, যার মাঝখানের অংশ অনলাইনে ছড়ানো 'ক্রপ করা' কপিটির সাথে হুবহু মিলে যায়।

এদিকে গোয়েন্দাদের মাধ্যমে 'মাহদী ক্রিপ্টো আইডির স্ক্রিনশট' বলে 'Amar Habiganj' এর প্রকাশ করা স্ক্রিনশটটি এডিট করে তৈরি করা বলে বিশ্লেষণে নিশ্চিত হয়েছে দ্য ডিসেন্ট।

প্রথমত, ক্রিপ্টোর স্ক্রিনশটটি একাধিক ফটো ফরেনসিক টুল যাচাই করে দেখা গেছে আইডিটির প্রোফাইলের ছবি এবং ব্যালেন্স অংশ এডিট করা হয়েছে।

দ্বিতীয়ত, বিবিসির প্রতিবেদন এবং মাহদীর নিজের বক্তব্য অনুযায়ী এটা নিশ্চিত যে, ১৮ তারিখ সকাল ১০টার পর বিমানবন্দরে প্রবেশের আগে মাহদীকে গোয়েন্দারা জিজ্ঞাসাবাদ করতে পারেনি। ফলে, আগের রাত ১০টার দিকে মাহদীর ডিভাইস থেকে লগইন করা অবস্থায় ক্রিপ্টো একাউন্টের স্ক্রিনশট 'গোয়েন্দারা পেয়েছেন'-- এমন দাবি (যা আওয়ামীপন্থী বিভিন্ন পেইজে করা হয়েছে) ভিত্তিহীন।

তৃতীয়ত, আওয়ামীপন্থী পেইজগুলোতে দাবি করা হয় যে, মাহদীর ক্রিপ্টো আইডিতে টাকা থাকার সন্ধান পেয়েছে "কলকাতা ‍গোয়েন্দা সংস্থা ন্যাশনাল টেকনিক্যাল রিসার্চ অর্গানাইজেশন"। বাস্তবে ''ন্যাশনাল টেকনিক্যাল রিসার্চ অর্গানাইজেশন'' ভারতের একটি প্রযুক্তিগত গোয়েন্দা সংস্থা, যার শাখা বিভিন্ন রাজ্যে রয়েছে। কিন্তু দিল্লিতে অবস্থানরত মাহদীর ক্রিপ্টো একাউন্টের স্ক্রিনশট ওই সংস্থার কলকাতার শাখা কর্তৃক পাওয়ার দাবিটি অসঙ্গতিপূর্ণ।

চতুর্থত, স্ক্রিনশটে দেখা যাচ্ছে ক্রিপ্টো একাউন্টের ব্যালেন্সে ডলারের পরিমাণ ২১৩৮০; যা বাংলাদেশি টাকায় ২৬ লাখ টাকার সমপরিমাণ। কিন্তু আওয়ামীপন্থী ফেসবকু পেইজগুলোতে লেখা হয়েছে, "ক্রিপ্টো আইডিতে আনুমানিক ২১ হাজার মার্কিন ডলারের সন্ধান পেয়েছে কলকাতা ‍গোয়েন্দা সংস্থা ন্যাশনাল টেকনিক্যাল রিসার্চ অর্গানাইজেশন। যার বাংলাদেশী টাকায় ৩৮ লাখ টাকার সমপরিমাণ অর্থ রয়েছে বলে জানা গেছে।"

এখানেও ২৬ লাখকে ৩৮ লাখ হিসেবে প্রচার করা আরেকটি অসঙ্গতি। বিবিসির রিপোর্টে নামহীন গোয়েন্দাদের একজন বলেছেন ক্রিপ্টোতে পাওয়া টাকার পরিমাণ "বাংলাদেশি টাকায় ৪০ লক্ষেরও বেশি"।

পঞ্চমত, আরেকটি অসঙ্গতি হচ্ছে, কথিত ক্রিপ্টো একাউন্টের নামের ক্ষেত্রে। পোস্টে দাবি করা হয়েছে একাউন্টের নাম, 'Mehediwarn0' (১১ ডিজিট); কিন্তু স্ক্রিনশটে নামটি লেখা দেখাচ্ছে, 'me**hi*w***n0' (১৩ ডিজিট)। স্ক্রিনশটটি মাহদী একাউন্টের অসম্পাদিত ছবি হলে সেখানে ইউজারনেইমে বিভিন্ন ডিজিটের মাঝখানে স্টার (*) চিহ্ন থাকার কথা না।