চট্টগ্রাম হালিশহরে একটি বাসায় রান্নাঘরে জমে থাকা গ্যাস বিস্ফোরণে তিন শিশুসহ ৯ জন দগ্ধ হয়েছেন। এরমধ্যে ঢাকায় নেয়ার পথে একজন মারা গেছেন। চিকিৎসকরা জানিয়েছেন, দগ্ধ বাকি ৮ জনের অবস্থা আশঙ্কাজনক। উন্নত চিকিৎসার জন্য তাদেরকে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ (চমেক) হাসপাতাল থেকে ঢাকায় জাতীয় বার্ন অ্যান্ড প্লাস্টিক সার্জারি ইনস্টিটিউটে পাঠানো হয়েছে। সোমবার ভোর ৫টার দিকে নগরীর হালিশহরের এইচ- ব্লকের হালিমা মঞ্জিল নামে একটি ভবনের ৩য় তলায় এ বিস্ফোরণের ঘটনা ঘটে। দুর্ঘটনায় দগ্ধরা একই পরিবারের সদস্য। তারা সে সময় সেহ্রি করছিলেন। দগ্ধরা হলেন- শাখাওয়াত হোসেন (৪৬), মো. শিপন (৩০), মো. সুমন (৪০), মো. শাওন (১৭), মো. আনাস (৭), মো. আইমান (৯), আয়েশা আক্তার (৪) ও পাখি আক্তার (৩৫) ও রানী আক্তার (৪০)। এরমধ্যে ঢাকায় নেয়ার পথে কুমিল্লায় রানী আক্তার মারা যান।
জানা যায়, গ্যারেজ মালিক সাখাওয়াত হোসেন ওই ফ্ল্যাটটি ভাড়া নিয়েছিলেন দেড় বছর আগে। সেখানে তিনি দুই সন্তান, স্ত্রী এবং তার গ্যারেজের এক কর্মচারীসহ পাঁচজন থাকেন। ক’দিন আগে তার ছোট ভাই পরিবার নিয়ে তার বাসায় আসেন ডাক্তার দেখাতে। সাখাওয়াতের গ্যারেজটি হালিশহর এলাকায়।
সোমবার ভোরে হালিশহরের এইচ-ব্লকের হালিমা মঞ্জিল নামে ৬তলা ভবনটির তৃতীয় তলার একটি বাসায় জমে থাকা গ্যাস বিস্ফোরণ হয়। এতে পুরো বাসায় আগুন ছড়িয়ে পড়ে। বাসায় থাকা শিশুসহ ৯জন দগ্ধ হয়। ফায়ার সার্ভিস ঘটনাস্থলে পৌঁছার আগে স্থানীয়রা আগুনে দগ্ধদের উদ্ধার করে চট্টগ্রাম মেডিকেলে নিয়ে যায়। পরে ফায়ার সার্ভিসের ২টি ইউনিট গিয়ে আগুন নেভায়। বিস্ফোরণে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে পুরো ভবন। দ্বিতীয়, চতুর্থ, পঞ্চম তলা পর্যন্ত প্রতি ইউনিটের দরজা ভেঙে গেছে এবং ছিঁড়ে গেছে ভবনের লিফ্ট। ঘটনাস্থলে গিয়ে দেখা যায়, ছয়তলা ভবনটির নিচ তলায় গাড়ি পার্কিংয়ের জায়গা। অন্য তলাগুলোতে চারটি করে ইউনিট আছে। তৃতীয় তলায় যে ফ্ল্যাটটিতে আগুন ধরে যায় সেটি ছাড়াও ভবনের দ্বিতীয় থেকে পঞ্চমতলা পর্যন্ত প্রত্যেকটি ফ্ল্যাটের দরজা-জানালা ভেঙে গেছে। তৃতীয় তলায় লিফটের দরজা ভেঙে গেছে আর দ্বিতীয় ও চতুর্থ তলায় লিফটের দরজা বাঁকা হয়ে গেছে। তৃতীয় তলায় সাখাওয়াত হোসেনের যে ফ্ল্যাটে বিস্ফোরণের ঘটনা ঘটে, সেটি ছাড়াও আরও তিনটি ফ্ল্যাট রয়েছে সেখানে। একটিতে পরিবার নিয়ে থাকেন জসীম উদ্দিন নামে এক ব্যক্তি। তার ফ্ল্যাটটি সাখাওয়াতের ফ্ল্যাটের ঠিক মুখোমুখি। পাশের ফ্ল্যাটে থাকেন শামীমা আক্তার তমা নামে এক নারী। সেখানে তিনি একটি বিউটি পার্লার পরিচালনা করেন। অপর ফ্ল্যাটটির বাসিন্দারা সবাই ঢাকায় থাকার কারণে সেটি ছিল তালাবদ্ধ। ওই তলার প্রতিটি ফ্ল্যাটের দরজা-জানালা ভেঙে যাওয়াসহ কমবেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
বিউটি পার্লারের কর্ণধার শামীমা আক্তার তমা জানান, বিস্ফোরণের সময় তিনি ঘুমিয়ে ছিলেন। হঠাৎ বিকট শব্দে ঘুম ভেঙে যায় তার। এরপর দেখেন ঘরের দরজা উড়ে গিয়ে তার পার্লারের আলমারি ও শোকেসের গ্লাস ভেঙেছে। ওই বাসাটি থেকে চিৎকার শুনে দরজায় গিয়ে দেখি তারা দৌড়ে ঘর থেকে বের হচ্ছিলেন। আর ঘরের ভেতর আগুন জ্বলছিল। বের হওয়ার সময় তাদের শরীরে আগুনও দেখা গেছে। বিস্ফোরণে দগ্ধদের এক স্বজন জানিয়েছেন, ঢাকা জাতীয় বার্ন ইনস্টিটিউটে নিয়ে যাওয়ার জন্য বলেছে মেডিকেল থেকে। পুড়ে যাওয়া রোগীদের জন্য যেকোনো সময় আইসিইউ প্রয়োজন হতে পারে। এখানে আইসিইউ কম, তাই ঢাকায় নিয়ে যেতে বলা হয়েছে। আমরা এম্বুলেন্স ম্যানেজ করে ঢাকায় নিয়ে যাচ্ছি।
বার্ন ইউনিটের এক চিকিৎসক জানিয়েছেন, বিস্ফোরণে আহতদের ৩ জনের শরীর শতভাগ দগ্ধ হয়েছে। একজনের ৮০ শতাংশ, দুইজন ৪৫ শতাংশ বার্ন হয়েছে। এরা সবাই এডাল্ট পেসেন্ট। এছাড়া দুই শিশু ২৫ শতাংশ ও আরকে শিশু ২০ শতাংশ পুড়ে গেছে। বার্নের ক্ষেত্রে শিশুদের ১০ পার্সেন্ট ও এডাল্টের ১৫ পার্সেন্টের উপরে গেলে অবস্থা খারাপ বলে বিবেচনা করা হয়। তাদের যেকোনো সময় আইসিইউ লাগতে পারে। হাসপাতালের বার্ন ইউনিটের প্রধান চিকিৎসক রফিক উদ্দিন আহমেদ বলেন, দগ্ধ ৯ জনেরই শ্বাসতন্ত্র ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। তাদের অবস্থা আশঙ্কাজনক। আহতদের মধ্যে রানী মারা গেছেন। এছাড়া পাখি নামে আরেক নারী এবং শাখাওয়াত নামে এক পুরুষের শরীর শতভাগ পুড়ে গেছে। এ ছাড়া একজনের ৮০, এক জনের ৪৫ এবং বাকিদের শরীর ২০ থেকে ২৫ শতাংশ দগ্ধ হয়েছে। বিভাগীয় ফায়ার সার্ভিসের উপ-সহকারী আলমগীর হোসেন জানান, ‘ওই বাসায় এলপিজি সিলিন্ডার ব্যবহার করা হয় না। কর্ণফুলী গ্যাস ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানির গ্যাসের সংযোগ রয়েছে। কোনো কারণে চুলা থেকে হয়তো গ্যাস লিক হয়েছিল, যে কারণে রান্নাঘরে গ্যাস জমে যায়। সেই জমে থাকা গ্যাসের বিস্ফোরণে সবাই দগ্ধ হয়েছেন।’