Image description

রাজধানীর মিন্টো রোডের ২৯ নম্বর সরকারি বাসভবন। বাড়িটি ‘লাল বাড়ি’ নামে পরিচিত। ওই বাড়িটি ফের আলোচনার কেন্দ্রে। বিরোধীদলীয় নেতার সরকারি বাসভবন হিসেবে পরিচিত ঐতিহাসিক এই ভবনটি টানা ২৫ বছর ধরে খালি পড়ে 
আছে।

সাম্প্রতিক নির্বাচনের পর নতুন করে সংস্কারকাজ শুরুর পর ফের বাড়িটি নিয়ে আলোচনা তৈরি হয়েছে। দীর্ঘ বিরতির পর কি কেউ উঠবেন এই দোতলা লাল ভবনে, নাকি আগের মতোই সুনসান থাকবে?
শনিবার বিকাল সাড়ে ৩টায় রাজধানীর মিন্টো রোডের ওই বাড়িতে প্রবেশ করতে দেখা যায়Ñ সুনসান নীরবতা। যেখানে রাজনৈতিক নেতাকর্মীদের উপস্থিতিতে সরগরম থাকার কথা সেখানে নেই কোনো কোলাহল। পুরো বাড়ি জুড়ে নিস্তব্ধ পরিবেশ। অথচ একসময় দেশের রাজনৈতিক অঙ্গনের গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত ও বৈঠকের কেন্দ্রবিন্দু ছিল এই বাড়িটিই। বাড়ির পেছনে গিয়ে দেখা মেলে তদারকের দায়িত্বে থাকা লাল মিয়ার। নামাজ শেষে চেয়ারে বসে বিশ্রাম নিচ্ছিলেন তিনি।

লাল মিয়া বলেন, গত ২৫ বছর ধরে এই বাড়িটিতে কেউ থাকেনি। দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পর বাড়িটি সংস্কার করা হয়েছিল তৎকালীন বিরোধীদলীয় নেতা জাতীয় পার্টির জিএম কাদেরের জন্য। কিন্তু পরে তিনি আর উঠেননি। এবার নির্বাচনকে ঘিরে বাড়িটির সংস্কার করা হয়েছে। বাইরের কিছু কাজ বাকি আছে। অর্ডার এলে সে কাজগুলো করা হবে বলে জানান তিনি।

বাড়িটির মূল ফটকে কয়েকজন পুলিশ দায়িত্ব পালন করছেন। প্রাচীরঘেরা প্রাঙ্গণে রয়েছে রাধাচূড়া, কৃষ্ণচূড়া, পাইনসহ বিভিন্ন প্রজাতির গাছ, যার মধ্যে কয়েকটি শতবর্ষী। আঙিনার এক পাশে পরিচ্ছন্নতাকর্মীরা সবজি চাষ করেছেন। এ ছাড়া বাড়ির ভেতরে আম, কাঁঠাল, পেঁপে ও কলাসহ বিভিন্ন ফলের গাছও রয়েছে।

বিরোধীদলীয় নেতার জন্য নির্ধারিত সরকারি বাসভবনের তিনজন কর্মচারীর মধ্যে মালি লাল মিয়া, পরিচ্ছন্নতাকর্মী কামাল হোসেন ও পানির লাইনের মিস্ত্রি আকরাম হোসেনের পরিবার থাকে বাড়ির পেছনের অংশে। দায়িত্বরতরা জানান, লাল দোতলা ভবনটির উপরে ৪টি রুম ও ৪টি ওয়াশ রুম, নিচে ৬টি রুম ও ৪টি ওয়াশ রুম আছে। ভবনটিতে নতুন টাইলস, কমোড লাগানো আছে। তবে কোনো ফার্নিচার নেই। যিনি উঠবেন তার ইচ্ছার ওপর ফার্নিচার কেনা হবে।

বাড়ির সর্বশেষ বাসিন্দা কে

মন্ত্রিপাড়া খ্যাত মিন্টো রোডের ২৯ নম্বর বাড়িটি বৃটিশ আমলে সরকারি কর্মকর্তাদের আবাসিক বাসভবন হিসেবে নির্মিত হয়। দীর্ঘ সময় এটি বিরোধীদলীয় নেতার বাসভবন হিসেবে ব্যবহৃত হয়েছে। ১৯৯১-১৯৯৬ সাল পর্যন্ত ওই বাড়িটিতে তৎকালীন বিরোধী দলীয় নেত্রী শেখ হাসিনা বসবাস করেন। ১৯৯৬-২০০১ সাল তৎকালীন বিরোধীদলীয় নেত্রী বেগম খালেদা জিয়ার জন্য বাড়িটি বরাদ্দ দেয়া হয়। ওই মেয়াদে তিনি বাড়িটিতে বসবাস না করলে রাজনৈতিক কাজে ব্যবহার করেন। ২০০১ সালে তিনি বাসাটি ছেড়ে দেয়ার পর গত ২৫ বছর ধরে এখানে আর কোনো বিরোধীদলীয় নেতা উঠেননি।

তবে এবার বিরোধীদলীয় নেতা জামায়াত আমীর ডা. শফিকুর রহমান এখানে উঠবেন বলে আশা করা হচ্ছে। যদিও জামায়াতের পক্ষ থেকে এ বিষয়ে এখনো আনুষ্ঠানিকভাবে কিছু জানানো হয়নি। দলটির সংশ্লিষ্ট সূত্র বলছে, এখনো গণপূর্ত মন্ত্রণালয় থেকে বাড়িটির বরাদ্দের এবং সংস্কারের বিষয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে চিঠি পাননি তারা। সংস্কারের পর বাড়িটি বসবাসযোগ্য হলে বিরোধী দলের নেতা ডা. শফিকুর রহমান ভবনটিতে উঠতে পারেন। তবে নিয়মমাফিক প্রক্রিয়া হিসেবে সরকারের গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয় এরই মধ্যে ভবনটির মেরামত ও সংস্কারের কাজ জোরেশোরে চালিয়ে যাচ্ছে। দীর্ঘদিন কেউ না থাকায় বাসভবনটি অনেকটাই জরাজীর্ণ অবস্থায় রয়েছে। গণপূর্ত মন্ত্রণালয় দাবি করছে, বিরোধীদলীয় নেতার বসবাসের মতো উপযোগী করতে এখনো তাদের দেড় থেকে দুই মাস সময় লাগতে পারে।

জানা যায়, বৃটিশ আমলে আড়াই একর জায়গার ওপর নির্মিত হয় বাড়িটি। ১৯৯৬-২০০১ সময়ে ক্ষমতায় থাকা আওয়ামী লীগের বিরুদ্ধে বিএনপি, জামায়াতসহ চার দলীয় জোটের নেতৃত্বাধীন আন্দোলনের মূল কেন্দ্রবিন্দু ছিল বাড়িটি। জামায়াতের নেতৃবৃন্দ অসংখ্যবার এই বাসভবনে গিয়েছেন এবং এখানেই চারদলীয় জোটের লিয়াজোঁ কমিটির ও শীর্ষ নেতাদের বৈঠকগুলো অনুষ্ঠিত হয়েছে।

এরপর ২০১৪ সালে দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পর সেই সময়ের বিরোধীদলীয় নেতা জাতীয় পার্টির (জাপা) রওশন এরশাদ বাড়িটি বরাদ্দ চেয়ে গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ে চিঠি দেন। তবে তখন তার নামে বাড়িটি বরাদ্দ দেয়া হয়নি। ২০১৮ সালে একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পর বিরোধীদলীয় নেতা জাতীয় পার্টির (জাপা) চেয়ারম্যান প্রয়াত হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ বাড়িটি বরাদ্দের জন্য চিঠি দেন। তখন বাড়িটি তার নামে বরাদ্দ দেয়া হলেও, পরে তিনি ওঠেননি। সর্বশেষ দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পর বিরোধীদলীয় নেতা জাতীয় পার্টির জিএম কাদের বাড়িটি বরাদ্দ চেয়ে গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ে চিঠি দেন।

বর্তমানে বাড়িটির আশপাশে প্রধান নির্বাচন কমিশনারের বাসভবন, মন্ত্রিপরিষদ সচিব, বাংলাদেশ পুলিশের মহাপরিদর্শক (আইজিপি), ঢাকা বিভাগীয় কমিশনার, ডিএমপি কমিশনার, একজন বিচারপতি, একজন নির্বাচন কমিশনার, পররাষ্ট্র সচিব, প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী, ঢাকা জেলা প্রশাসকের (ডিসি) বাসভবন রয়েছে।

বাড়িটির দেখভালে থাকা গণপূর্ত অধিদপ্তরের উপবিভাগীয় প্রকৌশলী মেহবুবুর রহমান বলেন, বাড়িটির প্রায় ৯০ শতাংশ কাজ শেষ। রাস্তার অংশ ও রংয়ের ফিনিশিং বাকি। বিরোধীদলীয় নেতা উঠলে তার চাহিদা অনুযায়ী আসবাব দেয়া হবে। এবার যদি কেউ থাকেন এক থেকে দেড় মাসের মধ্যে সব প্রস্তুত করা যাবে। যিনি থাকবেন তারও কিছু নির্দেশনা থাকে, বলেন তিনি।

জামায়াত আমীরের ব্যক্তিগত কর্মকর্তা নজরুল ইসলাম মানবজমিনকে বলেন, বাড়িটিতে বসবাস করা নিয়ে এখনো কোনো সিদ্ধান্ত নেয়া হয়নি। প্রায় ২৫ বছর ধরে বাড়িটিতে কেউ বসবাস করছেন না। সংস্কার কাজ শেষ হওয়ার পর নিরাপত্তা ও বসবাসযোগ্য পরিস্থিতি রয়েছে কিনা তা বিবেচনা করে সিদ্ধান্ত নেয়া হবে।