গণঅভ্যুত্থানের পর দেশের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পাশাপাশি জনগণের চিন্তাও পাল্টিয়েছে। মোট ভোটারদের এক চতুর্থাংশ তরুণ। যারা চায়, তাদের মতোই চিন্তা ও কাজ করতে পারবেন এমন মানুষ দেশ পরিচালনার দায়িত্বে গ্রহণ করুক। জাতীয় নির্বাচনে যার প্রভাব লক্ষ্য করা গেছে, এবার পরিবর্তনের চিন্তার প্রভাব পড়তে পারে স্থানীয় সরকার নির্বাচনে।
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পর আলোচনা শুরু হয়েছে স্থানীয় নির্বাচন নিয়ে। নির্বাচন কমিশন জানিয়েছে, প্রথমেই ঢাকা দক্ষিণ ও উত্তর সিটি করপোরেশন করার প্রস্তুতি রয়েছে তাদের।
জাতীয় নির্বাচনে ভোটের মাঠে বেশ সাফল্য দেখিয়েছে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী। ইতিহাসে প্রথমবারের মতো অর্ধশতাধিক আসনে জিতে সংসদে যাচ্ছে বিরোধীদল হিসেবে। ঢাকা সিটি করপোরেশনের দেখিয়েছে চমক। বিশেষ করে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন জামায়াত জোটের ভোট বিএনপি জোট থেকে সাড়ে ২৭ হাজারের বেশি।
ঢাকা ১১-১৮ পর্যন্ত আসনগুলোর অবস্থান উত্তর সিটি করপোরেশনে। এসব আসনে ত্রয়োদশ নির্বাচনে শুধু জামায়াত দাঁড়িপাল্লা প্রতীকে ভোট পেয়েছে ৩ লাখ ৯৭ হাজার ১৫৪টি। ১১ দলীয় জোট হিসাব করলে এই সংখ্যা দাঁড়ায় ৬ লাখ ৮৮ হাজার ৩৮১টি। অপরদিকে বিএনপি জোট ভোট পেয়েছে ৬ লাখ ৬০ হাজার ৮১৩টি। অর্থাৎ ২৭ হাজার ৫৬৮ ভোটের ব্যবধানে এগিয়ে আছে ১১ দলীয় জোট। আসন্ন সিটি করপোরেশন নির্বাচনে জামায়াত নির্বাচনী ঐক্য ধরে রেখে প্রার্থী দিলে জয়ের ব্যপক সম্ভাবনা দেখছেন তৃণমূলের নেতাকর্মীরা।
উত্তর সিটি করপোরেশন এলাকার কয়েক ডজন জামায়াত নেতাকর্মীর সঙ্গে কথা বলেছে দ্য ডেইলি ক্যাম্পাস। মিরপুর অঞ্চলের তরুণ জামায়াত নেতা তারেক আজিজ বলেন, আমরা দীর্ঘদিন ধরে এই অঞ্চলে মানবিক কাজ করছি। ঢাকা ১৪,১৫, ১৬, ১৭ আসনে আমাদের জয় এসেছে। মানুষ যে আমাদের সাদরে গ্রহণ করেছে এটা তার জ্বলন্ত প্রমাণ। ভোটারদের চাহিদার আলোকে সঠিক প্রার্থী দিলে অবশ্যই আমরা জামায়াত থেকে একজন যোগ্য মেয়র পাবো।
ঢাকা উত্তর সিটি কর্পোরেশনের নির্বাচনে এখনো আনুষ্ঠানিকভাবে নিজেদের প্রার্থী ঠিক করেনি জামায়াত। তবে সম্প্রতি ওই এলাকায় বিভিন্ন সামাজিক কাজ শুরু করেছেন দলটির ঢাকা মহানগর উত্তরের আমির সেলিম উদ্দীন। ইসলামী ছাত্রশিবিরের সাবেক এই সভাপতি গেল সংসদ নির্বাচনে সিলেট-৬ থেকে নির্বাচন করে সফলতার মুখ দেখেননি। ফলে এখন ঢাকা থেকে দলীয় মনোনয়ন পেতে দৌড়ঝাঁপ শুরু করেছেন। সূত্রের খবর, সিলেটের বিভিন্ন স্তরের নেতা ও ব্যবসায়ীদের মাধ্যমে প্রার্থী হতে জোর তদবির চলছে। তবে ভোটারদের চাহিদা ও চিন্তাভাবনার আলোকে প্রার্থী ঠিক করতে চায় জামায়াত।
যেসব কারণে সেলিম উদ্দিন থেকে মুখ ফেরাচ্ছেন তৃণমূলের নেতাকর্মীরা
জামায়াতের রাজনীতিতে আনুগত্য বড় বিষয়। উপর মহল থেকে যে সিদ্ধান্ত আসে, সেগুলো মানতে বাধ্য হন অধস্তনরা। তবে গত নির্বাচনে বিপরীত অভিজ্ঞতার সম্মুখীন হয়েছে দলটি। নির্বাচনী ঐক্যে থাকা দলগুলোর জন্য আসন ছাড়ার ঘোষণা কেন্দ্র থেকে দেয়া হলেও তা মানেননি বেশ কয়েকটি আসনের নেতারা। যারা মেনেছেন তাদের মধ্যেও ছিল স্পষ্ট অসন্তোষের ছাপ।
সমঝোতায় আসা দলগুলোকে ছাড়া এক আসনের প্রার্থী নাম প্রকাশ না করার শর্তে দ্য ডেইলি ক্যাম্পাসকে বলেন, আমরা অনেক কষ্ট করে রাতদিন খেটে মাঠ তৈরি করেছিলাম। কিন্তু কেন্দ্রীয় সংগঠন এক ঘোষণায় আসন ছেড়ে দিয়েছেন। সেসব আসনে তারা নির্বাচিতও হয়েছেন। কিন্তু মাঠ পর্যায়ের কর্মীরা এটা ভালোভাবে নেয়নি। ভোটাররা আমাদের যোগ্য প্রার্থী চায়। তাই সংগঠনের উচিত হবে জনগণের পালস বুঝে সিটি করপোরেশন নির্বাচনে প্রার্থী ঠিক করা।
জামায়াত কর্মী সমর্থকদের দাবি, সেলিম উদ্দিনের সাধারণ মানুষের সঙ্গে মিশে যাওয়ার ইচ্ছে বা যোগ্যতা যেকোনো একটা কম আছে। অন্য নেতাদের মতো সহজেই মিশতে পারেন না। ফলে নির্বাচনের মাঠে এমন প্রার্থীর বিজয় অর্জন খুব একটা সহজ নয়। বিমানবন্দর এলাকার জামায়াতের সাংগঠনিক এক থানা সেক্রেটারি নাম প্রকাশ না করার শর্তে দ্যা ডেইলি ক্যাম্পাসকে বলেন, জামায়াতের অন্য নেতাদের মধ্যে মানুষের মাঝে মিশে যাওয়া যে প্রবণতা, সেলিম ভাইয়ের মধ্যে সেটি একটু কম। উনি সব সময় একটু এলিট থাকতেই পছন্দ করেন। আমরা যেহেতু সাংগঠনিক পদে আছি, বিষয়টি নিয়ে পরামর্শ দেয়া ছাড়া আমাদের তেমন কিছুই করার থাকে না। আসন্ন সিটি করপোরেশন নির্বাচনে সেলিম ভাইকে প্রার্থী করা হলে হিতেবিপরীত হতে পারে।
এই বক্তব্যের মিল পাওয়া যায়, গেল জাতীয় নির্বাচনে সেলিম উদ্দিনের নির্বাচনী প্রচারণা পর্যালোচনায়। জামায়াতের অন্য প্রার্থীরা রাতদিন এক করে যেখানে ভোটারের বাড়ি বাড়ি পৌঁছেছেন, সেখানে নির্বাচনের মাঠে সেলিম উদ্দিনকে প্রচারণায় তেমনভাবে পাননি ভোটাররা। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও তিনি ছিলেন ভিন্নধর্মী। ইলেকশন ক্যাম্পেইনের ভিডিও বানিয়েছেন, সংসদের সামনে হাঁটছেন কোট-স্যুট পরে। জামায়াতের বিভিন্ন প্রার্থীরা সাধারণ মানুষের সঙ্গে মিশে গেছেন। কিন্তু তার মধ্যে এটি লক্ষ্য করা যায়নি। ফলে মেয়র নির্বাচনে মনোনয়ন পেলে ভোটারদের কতটা কাছে পৌঁছাতে পারবেন সেলিম উদ্দিন তা নিয়ে প্রশ্ন তুলছে তৃণমূলের সমর্থকেরা।
সেলিম উদ্দীনের বিষয়ে কথা হয় দলটির মহানগরী উত্তরের একজন মজলিসে শূরা সদস্যদের সাথে। নাম প্রকাশ না করার শর্তে তিনি দ্য ডেইলি ক্যাম্পাসকে বলেন, জামায়াতে ইসলামীর মধ্যে যারা নেতৃত্বে আসছেন, তাদের আমরা সাদরে গ্রহণ করি। তবে আমাদের ওপর যা চাপিয়ে দেওয়া হয়, আমাদের তাই মানতে হয়। ঢাকার ভোটাররা ভাসমান; অধিকাংশই বিভিন্ন অঞ্চল থেকে ঢাকায় এসেছেন। সেলিম উদ্দীন আমাদের উত্তরের আমির হওয়ায় আমরা তাকে চিনলেও এলাকার ভোটাররা তাকে চেনেন না। ভোটারদের অধিকাংশই তরুণ; তারা তরুণ কাউকে দেখতে চায়।
মনোনয়ন পাওয়ার দৌড়ে এগিয়ে যারা
ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন নির্বাচনে মনোনয়ন পাওয়ার দৌড়ে এগিয়ে আছেন অন্তত তিনজন। এদের মধ্যে ইসলামী ছাত্রশিবিরের সাবেক কেন্দ্রীয় সভাপতি ও বাংলাদেশ শ্রমিক কল্যাণ ফেডারেশনের কেন্দ্রীয় সাধারণ সম্পাদক আতিকুর রহমান এগিয়ে আছেন। গত সংসদ নির্বাচনে ঢাকা ১১ আসনে নির্বাচন করার কথা ছিল তার। কিন্তু শেষ পর্যন্ত এনসিপির সঙ্গে জামায়াতের সমঝোতার পর দলটির আহ্বায়ক নাহিদ ইসলামকে আসনটি ছেড়ে দেন তিনি। ওই এলাকায় প্রায় এক বছরের বেশি সময় ধরে বাড়ি বাড়ি গিয়ে গণসংযোগ চালিয়েছেন সাবেক এই ছাত্রনেতা। সম্প্রতি তাকে কেন্দ্রীয় কর্মপরিশষ সদস্য করেছে জামায়াত।
মনোনয়ন পাওয়ার দৌড়ে পিছিয়ে নেই গেল সংসদ নির্বাচনে বর্তমান প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের বিপরীতে লড়াই করা জামায়াতের প্রার্থী ডা. এসএম খালিদুজ্জামান। প্রথমবারের মতো ঢাকা ১৭ আসনে নির্বাচন করে তারেক রহমানের সঙ্গে হাড্ডাহাড্ডি লড়াই করেছেন তিনি। নির্বাচনের প্রচারণায় দিনরাত এক করে মানুষের দ্বারে দ্বারে ঘুরেছেন তিনি। ফলে মেয়র নির্বাচনে তার ওপর ভরসা করতে জামায়াত।
ঢাকা উত্তরে মেয়র নির্বাচনে মনোনয়ন পাওয়ার আলোচনায় আছেন, ছাত্রশিবিরের সাবেক কেন্দ্রীয় সভাপতি ও জামায়াতের কেন্দ্রীয় মজলিশে শুরা সদস্য ইঞ্জিনিয়ার সিরাজুল ইসলাম। মৃদুভাষী ও মিশুক মানুষ হিসেবে তার গ্রহণযোগ্যতা রয়েছে। ফলে শেষ পর্যন্ত মাঠের চাহিদার আলোকে সাবেক এই ছাত্রনেতাকেও মনোনয়ন দিতে পারে জামায়াত।
জামায়াতের একাধিক সিনিয়র নেতা বলেছেন, ঢাকা উত্তরে জামায়াতের সম্ভাব্য প্রার্থী ছিলেন সেলিম উদ্দীন। সম্প্রতি জাতীয় সংসদ নির্বাচনে পরাজিত হওয়ায় আপাতত সংসদীয় রাজনীতিতেই তাকে রাখার হিসেবে চিন্তা করা হচ্ছে। ভোটারদের চাহিদার কথা মাথায় রেখে উত্তরে নতুন একজন মেয়র প্রার্থীর কথা ভাবা হচ্ছে। এক্ষেত্রে তরুণ নেতৃত্ব প্রাধান্য পাবেন বলেও ইঙ্গিত দিয়েছেন তারা।