রাষ্ট্রায়ত্ত বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সে কান্ট্রি ম্যানেজার পদায়ন ঘিরে সাবেক এমডির নেতৃত্বে প্রভাব বিস্তার ও অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে। যোগ্যতা, অভিজ্ঞতা ও মেধাকে পাশ কাটিয়ে বিভিন্ন দেশে কান্ট্রি ম্যানেজার হিসাবে অযোগ্য ব্যক্তিদের বসানোর ঘটনায় তোলপাড় চলছে। কান্ট্রি ম্যানেজার পদে স্বামী-স্ত্রী ও ভাতিজা তথা এক পরিবারের তিনজনের পদায়ন নতুন বিতর্কের জন্ম দিয়েছে। লোক দেখানো মৌখিক পরীক্ষার মাধ্যমে কান্ট্রি ম্যানেজার পদে পদায়নের প্রক্রিয়াটিকে বৈধতার মোড়ক দেওয়া হয় বলে ভুক্তভোগীদের অভিযোগ। এ ছাড়া একাধিক প্রার্থীর বিরুদ্ধে স্বজনপ্রীতির মাধ্যমে পছন্দের স্টেশন বাগিয়ে নেওয়ার অভিযোগও উঠেছে। বেসামরিক বিমান ও পর্যটন মন্ত্রণালয়ে লিখিত অভিযোগে এসব বিষয় জানিয়েছেন বাদ পড়া কয়েকজন ভুক্তভোগী। যারা মনে করেন, যোগ্যতা থাকা সত্ত্বেও সিন্ডিকেটের লোক না হওয়ায় তাদের বাদ দিয়ে অযোগ্যদের পদায়ন করা হয়েছে।
ট্রান্সফারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান বলেন, যোগ্যতা ও মেধাকে উপেক্ষা করে স্বজনপ্রীতি ও আর্থিক লেনদেনের মাধ্যমে রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠানে গুরুত্বপূর্ণ পদে যদি লোক বসানো হলে তা গুরুতর প্রাতিষ্ঠানিক দুর্নীতির শামিল। লোক দেখানো মৌখিক পরীক্ষার মাধ্যমে এমন পদায়ন প্রক্রিয়াকে বৈধতা দেওয়ার চেষ্টা সুশাসনের মৌলিক নীতির লঙ্ঘন। তিনি বলেন, রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠানে এ ধরনের সিন্ডিকেটভিত্তিক নিয়োগ কেবল প্রশাসনিক শৃঙ্খলাই ভেঙে দেয় না, জনস্বার্থ ও রাষ্ট্রীয় স্বচ্ছতার ওপর জনগণের আস্থাকেও মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করে। তিনি বলেন, অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে হওয়া এ অভিযোগের নিরপেক্ষ ও বিশ্বাসযোগ্য তদন্ত নিশ্চিত করে দায়ীদের বিরুদ্ধে দৃষ্টান্তমূলক ব্যবস্থা নিতে হবে। সূত্র মতে, গত ২৮ ডিসেম্বর বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের বিভিন্ন দেশে কান্ট্রি ম্যানেজার পদে পদায়নের জন্য মৌখিক পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হয়। এ পরীক্ষায় মোট ২৩ জন প্রার্থী অংশ নেন। তবে যোগ্যতা, অভিজ্ঞতা ও মেধাকে উপেক্ষা করে অযোগ্য ব্যক্তিদের কান্ট্রি ম্যানেজার হিসাবে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে বলে অভিযোগ ওঠে। এর ফলে যোগ্যতা ও অভিজ্ঞতাসম্পন্ন (সিনিয়র) কর্মকর্তারা বাদ পড়েন।
যুগান্তরের হাতে আসা পদায়নের তালিকা পর্যালোচনা করে দেখা যায়, গ্রাউন্ড সার্ভিস বিভাগের সহকারী ব্যবস্থাপক শামিমা পারভিনকে (পি-৩৬৫০৫) কুয়েত স্টেশনে ম্যানেজার পদে পদায়ন করা হয়েছে। অথচ ওই স্টেশনে আগে থেকেই কর্মরত আছেন তার স্বামী শাহজাহান। বিশেষ তদবিরের মাধ্যমে শাহজাহানের স্ত্রীর এই পদায়ন নিশ্চিত করেন বলে অভিযোগে বলা হয়। পদোন্নতি প্রার্থী তালিকায় শামিমা পারভিনের অবস্থান ছিল ২১ নম্বরে।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে শামিমা পারভিন বলেন, এ বিষয়ে আমি কোনো মন্তব্য করতে চাই না। বিস্তারিত জানতে চাইলে আমাদের পিআর সেকশনের সঙ্গে যোগাযোগ করতে পারেন। একই স্টেশনে তার স্বামী বর্তমানে কর্মরত আছেন-এমন প্রশ্নে তিনি ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া জানিয়ে বলেন, আমি আগেই বলেছি, এ বিষয়ে কিছু বলতে পারব না।
স্বজনপ্রীতি ও তদবিরের আরেকটি অভিযোগ উঠেছে চীনের গুয়াংজু স্টেশনে ম্যানেজার পদে পদায়নকে ঘিরে। সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলোর দাবি, বিমান ফ্লাইট ক্যাটারিং সার্ভিসের (বিএফসিসি) ম্যানেজার আরিফুল ইসলামের ভাতিজা আশরাফুল হাসানকে ওই স্টেশনে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। অভিযোগ রয়েছে, স্বজনপ্রীতি ও চাচার প্রভাব খাটিয়েই এই পদায়ন নিশ্চিত করা হয়েছে। এ বিষয়ে আশরাফুল হাসানের বক্তব্য জানতে তার মুঠোফোনে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তাকে পাওয়া যায়নি।
লিখিত অভিযোগে ভুক্তভোগীরা জানান, গৃহকর্মী নির্যাতনের মামলায় কারাবন্দি ও নিয়োগ বাতিল হওয়া বিমানের সাবেক এমডি ও সিইও ড. সাফিকুর রহমান একটি শক্তিশালী সিন্ডিকেটের মাধ্যমে পুরো পদায়ন প্রক্রিয়া নিয়ন্ত্রণ করেন বলে জানা যায়। অভিযোগকারীরা বিষয়টি তদন্ত করে সব বিতর্কিত পদায়ন বাতিল এবং যোগ্য মেধাবী কর্মকর্তাদের নিয়োগ দেওয়ার দাবি জানান।
অভিযোগে আরও বলা হয়, নিয়ম ভেঙে ইয়ারত হোসেনকে দিল্লি, তন্ময় কুমার সরকারকে শারজাহ এবং মিজানুর রহমানকে মদিনা বিমানবন্দরে পদায়ন করা হয়েছে। সংশ্লিষ্টরা বলেন, প্রভাব খাটিয়ে এমন পদায়ন হলে তা প্রতিষ্ঠানটির স্বচ্ছতা ও ন্যায্য নিয়োগ প্রক্রিয়া নিয়ে প্রশ্ন তৈরি করে। অভিযোগ রয়েছে, বিমানের সাবেক সিবিএ নেতা বেলাল হোসেন তার আপন ভাতিজা মনিরুল ইসলাম প্রধানকে ব্যবস্থাপনা পরিচালকের (এমডি) তদবিরের মাধ্যমে যুক্তরাজ্যের ম্যানচেস্টারের মতো গুরুত্বপূর্ণ স্টেশনে ম্যানেজার পদে পদায়ন করিয়ে নেন।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক বিমানের একাধিক কর্মকর্তা যুগান্তরকে বলেন, পদায়ন ও নিয়োগ ঘিরে বিমানে দীর্ঘদিন ধরে একটি শক্তিশালী সিন্ডিকেট সক্রিয়। এই পদায়নটি মূলত ২০২৫ সালের মে-জুনে হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু বারবার তারিখ পরিবর্তন করে সেটিকে ডিসেম্বর পর্যন্ত টেনে নেওয়া হয়। তারা জানান, ড. সাফিকুর রহমান এমডি ও সিইও থাকাকালীন এসব অনিয়ম নিয়ে কেউ মুখ খুলতে সাহস পাননি। অনেক ক্ষেত্রে মন্ত্রণালয়ের সিদ্ধান্ত পাশ কাটিয়ে নিজের মতো করে সবকিছু করেছেন। এতে মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে বিমানের দূরত্বও তৈরি হয়। একই সিন্ডিকেটের বিরুদ্ধে সাম্প্রতিক কেবিন ক্রু নিয়োগেও আর্থিক লেনদেনের অভিযোগ ওঠে। তাদের দাবি, এমডির প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ সহযোগিতায় চক্রটি বিপুল অঙ্কের অর্থ হাতিয়ে নেয়। বিমানের এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা বলেন, ইতোমধ্যে বিষয়গুলো নিয়ে আলোচনা হয়েছে। দ্রুত এসব বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে। বিভিন্ন দেশে কান্ট্রি ম্যানেজার পদায়নে অনিয়মের অভিযোগ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের মহাব্যবস্থাপক (জনসংযোগ) বোশরা ইসলাম যুগান্তরকে বলেন, স্টেশন নির্বাচন মূলত ব্যবস্থাপনা পরিচালকের (এমডি) এখতিয়ারভুক্ত। এমডি সংশ্লিষ্ট বিভাগের পরিচালককে নির্দিষ্ট স্টেশনের জন্য প্রার্থী মনোনয়নের নির্দেশ দিতে পারেন, আবার প্রয়োজনবোধে নিজেও সিদ্ধান্ত দিতে পারেন। অনেক ক্ষেত্রে বোর্ডসভায় আলোচনা সাপেক্ষেও চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়। এ প্রক্রিয়ায় ব্যত্যয়ের যদি কোনো অভিযোগ থেকে থাকে, তা অবশ্যই তদন্তসাপেক্ষ। তদন্তে কোনো অনিয়ম প্রমাণিত হলে বিধি অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে। সাবেক এমডি বর্তমানে কারাগারে রয়েছেন। তার দায়িত্বকালে কোনো অনিয়ম হয়ে থাকলে, সেটিও তদন্তের মাধ্যমেই নির্ধারিত হবে। তদন্তে যে ফলাফল আসবে, তার ভিত্তিতেই প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণ করবে কর্তৃপক্ষ।