মৌলভীবাজারের একটি চা বাগানে বাস দুই বোন– ভেরোনিকা কেরকেটা ও খ্রিস্টিনা কেরকেটার। তাদের আরেক পরিচয়– ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর ভাষা ‘খাড়িয়ার’ শেষ দুই কথক। তাঁদের কণ্ঠ থেমে গেলে চিরতরে স্তব্ধ হয়ে যাবে ভাষাটি। কারণ, চেষ্টা করেও কাউকে শেখাতে পারেননি ভাষাটি।
ভেরোনিকা কেরকেটা আক্ষেপ নিয়ে বলেন, ‘ইচ্ছে তো করে নিজের ভাষায় কথা বলি। কিন্তু পারি না।’
তিনি জানান, এখন অনেকেই খাড়িয়া ভাষাকে উড়িয়া বা চা বাগানের অন্য ভাষার সঙ্গে মিলিয়ে ফেলেন। ফলে সামাজিক পরিসরে বাংলা ভাষাতেই কথা বলতে হয়। গ্রামে তার ছোট বোন খ্রিস্টিনা ছাড়া আর কেউ খাড়িয়া বলতে বা বুঝতে পারেন না। তাই বোনের সঙ্গে দেখা না হলে ভাষাটিও যেন নিস্তব্ধ হয়ে থাকে।
ভেরোনিকা বলেন, ‘আমি প্রায়ই অসুস্থ থাকি। তাই বোনের সঙ্গে নিয়মিত দেখা হয় না। যখন দেখা হয়, তখনই নিজেদের ভাষায় কথা বলি। সবচেয়ে বড় বেদনা—নিজেদের সন্তান-সন্ততির কাছেই ভাষাটি অপরিচিত।’ আক্ষেপ করে বলেন, ‘আমাদের ছেলে-মেয়ে বা তাদের সন্তানেরা খাড়িয়া ভাষায় কথা বললে হাসাহাসি করে। তারা আমার ভাষা বোঝে না, শিখতেও চায় না। বাংলাকেই বেশি পছন্দ করে।’
দুই বোন জানান, শৈশবে মা-বাবার মুখে মুখে শিখেছিলেন এই ভাষা। তবে ধীরে ধীরে খাড়িয়াতে কথা বলার বা বোঝার শূন্য হয়ে গেছে। চা বাগানের বহুভাষিক পরিবেশে বেড়ে উঠলেও নতুন প্রজন্মের কাছে খাড়িয়া অপ্রয়োজনীয় হয়ে পড়েছে। তারা না বলতে পারে, না বুঝতে পারে।
ছোট বোন খ্রিস্টিনা কেরকেটা বলেন, কেবল তাঁরা দুই বোন কথা বলার সময় খাড়িয়া ভাষা ব্যবহার করেন। পরিবারের অন্য কারও সঙ্গেও পারেন না। কারণ, তারাও ভাষাটি জানেন না।
তবে সেটিও এখন নিয়মিত হয় না। একই বাগানের পাশাপাশি সেকশনের কলোনিতে থাকলেও আলাদা পরিবার দুই বোনের। শুধু অবসর পেলেই দুই বোন একত্রে বসেন। তখনই ভেসে ওঠে খাড়িয়া ভাষার শব্দ, স্মৃতি আর গল্প। পরিবারের সদস্যদের খাড়িয়া শেখানোর চেষ্টা করলেও সাফল্য মেলেনি।
খ্রিস্টিনার কণ্ঠে চাপা দীর্ঘশ্বাস, ‘অনেক চেষ্টা করেছি ছেলেমেয়ে, নাতি-নাতনিদের শেখাতে। কিন্তু পারিনি। তাদের সঙ্গে কথা বলতে হয় বাংলা ভাষায়। এই দুঃখ রয়ে গেল।’
ভাষাবিদরা বলছেন, একটি ভাষা শুধু যোগাযোগের মাধ্যম নয়—এটি একটি জনগোষ্ঠীর ইতিহাস, সংস্কৃতি, বিশ্বাস ও জীবনবোধের বাহক। ভেরোনিকা ও খ্রিস্টিনা কেরকেটার গল্প তাই কেবল দুই বোনের ব্যক্তিগত কাহিনি নয়; এটি ভাষা হারানোর এক নীরব ট্র্যাজেডি।