Image description
 

'হামার বুকের ধনকে কেটা কারি নিলো রে। তোমরা হামার ব্যাটাক আনি দেও। হামার বাবা ঢাকাত থাকে। বাড়িতে এসে মা বলে হামাক কে আর ডাকবে। ঢাকা থেকে কাল হামাক দেকার জন্য বাড়িত আসচিল। কি দোষ করচিল হামার ব্যাটা। তাক কেটা ডাঙ্গিয়া মারি ফেলালো। হামি তামারঘরের বিচের চাই।'-  এভাবে নিজের ভাষায় বলছিলেন গাইবান্ধায় ছিনতাইকারী সন্দেহে গণপিটুনিতে নিহত লেবু মিয়ার মা ফুলমতি বেগম।

 

ছিনতাইকারী সন্দেহে শুক্রবার ভোরে সাদুল্লাপুর উপজেলায় গণপিটুনিতে লেবু মিয়া ওরফে ভুন্ডল (২৪) এবং মঈনুল ইসলাম (৫০) নামের দুইজন নিহত হন। এ ঘটনায় এলাকায় বেশ চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়েছে।

 

গাইবান্ধা জেলা শহর থেকে প্রায় ১৮ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত সাতারপাড়া গ্রাম। গ্রামটি পলাশবাড়ী উপজেলার বেতকাপা ইউনিয়নের অন্তর্গত। আজ শনিবার সকালে সরেজমিনে গ্রামের গিয়ে দেখা যায়, গ্রামে শোকের মাতম চলছে। নিহত লেবু মিয়ার বাড়িতে চলছে স্বজনদের আহজারি। আশপাশের লোকজন তাদের বাড়িতে আসছেন। তারা নিহতদের স্বজনদের শান্তনা দিচ্ছেন। লোকজন তাদের বাড়িতে আসা যাওয়া করছেন। অনেকেই বাড়ির উঠানে ভিড় করছেন। এ সময় লেবু মিয়ার মা ফুলমতি বেগম (৫৫) কান্নাকাটি করছেন। তিনি একবার স্বজনদের জড়িয়ে ধরে আরেকবার মাটিতে বসে আহজারি করছেন। চোখে মুখে কষ্টের ছাপ।

 

লেবু মিয়ার পরিবারের লোকজন জানান, ফুলমতি বেগমের তিন ছেলে মেয়ে। দুই মেয়ের বিয়ে হয়েছে। একমাত্র ছেলে লেবু মিয়া প্রায় তিন বছর আগে ঢাকায় যান। তিনি ঢাকায় রিকশা চালাতেন। তার স্ত্রী মিম আক্তারকে নিয়ে সেখানে থাকতেন। এদিকে গ্রামের বাড়িতে পাঁচশতক বসতভিটায় আধাপাকা ঘরে তার মা ফুলমতি বেগম থাকেন। লেবু মিয়ার এক বছরের একটি ছেলে সন্তান রয়েছে। দুইদিন আগে লেবু মিয়া একাই ঢাকা থেকে বাড়িতে বেড়াতে আসেন।

অপরদিকে একই গ্রামের মৃত দানোজ মিয়ার ছেলে নিহত মঈনুল ইসলাম (৫০)। তিনি স্ত্রী, দুই ছেলে ও এক মেয়েকে রেখে নিহত লেবু মিয়ার চাচাতো বোনকে দ্বিতীয় বিয়ে করেন। দ্বিতীয় স্ত্রীকে নিয়ে শ্বশুর বাড়ি সাতারপাড়া গ্রামে থাকতেন মইনুল। মঈনুল প্রায় ২০ বছর আগে গ্রামের জমিজমা সব বিক্রি করে পরিবার নিয়ে ঢাকায় যান। প্রথম স্ত্রীর সঙ্গে তার কোনও যোগাযোগ নেই। তার প্রথম স্ত্রী সন্তানদের নিয়ে ঢাকায় পৃথকভাবে থাকেন।

 

তিনি মাঝেমধ্যে বাড়িতে আসতেন। সাতারপাড়ায় তার কোন বাড়ি নেই। দুইদিন আগে লেবু মিয়ার সঙ্গে তিনি বাড়িতে আসেন। নিহত মঈনুল ইসলামের আত্মীয় নিলু মিয়া বলেন, শুনেছি মঈনুল ইসলাম ও লেবু মিয়ার নামে থানায় মামলা রয়েছে। গতকাল রাতে দুইজনের লাশ আনার পর দাফন করা হয়।

নিহত দুইজনের বিষয়ে জানতে চাইলে পলাশবাড়ী থানার ওসি সারোয়ারে আলম খান মুঠোফোনে বলেন, তাদের দুইজনের নামে বেশ কয়েকটি ডাকাতি ছিনতাই ও চুরির মামলা রয়েছে। তাদের নামে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা ছিল।

প্রসঙ্গত, গতকাল শুক্রবার (২০ ফেব্রুয়ারি) ভোর সাড়ে পাঁচটার দিকে ছিনতাইকারী সন্দেহে গাইবান্ধার সাদুল্লাপুর উপজেলার খোদ্দকোমরপুর ইউনিয়নের মোজাহিদপুর এলাকায় গণপিটুনিতে দুইজন নিহত হন। নিহতরা হলেন পলাশবাড়ী উপজেলার বেতকাপা ইউনিয়নের সাঁতারপাড়া গ্রামের মৃত লাল মিয়া শেখের ছেলে লেবু মিয়া ওরফে ভন্ডল (২৪) এবং একই ইউনিয়নের মোস্তফাপুর গ্রামের মৃত দানোজ উদ্দিনের ছেলে মঈনুল ইসলাম (৫০)।

সাদুল্লাপুর থানার ওসি আবদুল আলিম জানান, নিহতদের লাশ ময়নাতদন্তের জন্য গাইবান্ধা জেনারেল হাসপাতাল মর্গে পাঠানো হয়। ছিনতাইকারীদের একটি মোটরসাইকেল উদ্ধার করা হয়েছে। গণপিটুনির ঘটনার সঙ্গে জড়িতদের গ্রেপ্তারে চেষ্টা চলছে।