ময়মনসিংহে আনন্দ মোহন সরকারি কলেজের রসায়ন বিভাগের তৃতীয় বর্ষের শিক্ষার্থী নুরুল্লাহ শাওন নিখোঁজের দুদিন পর লাশ পাওয়া গেছে। এর আগে গত ৩ জানুয়ারি নগরের জিলা স্কুলের দশম শ্রেণির শিক্ষার্থী মিফতাহুল জান্নাত নিলয় তালুকদারকে ছুরিকাঘাতে নিহত করে তারই সহপাঠীরা। এক মাসের ব্যবধানে দুই শিক্ষার্থীর মৃত্যু নিয়ে ময়মনসিংহে কিশোর গ্যাংয়ের দৌরাত্ন্য নিয়ে সর্বমহলে চলছে আলোচনা। ‘কিশোর গ্যাং’-এর অপতৎপরতা রোধে প্রশাসনকে কঠোর পদক্ষেপ নেওয়ার দাবি নাগরিক সমাজের।
শুক্রবার (২০ ফেব্রুয়ারি) রাত সাড়ে ১০টার দিকে নগরীর জয়নুল আবেদীন পার্ক সংলগ্ন ব্রহ্মপুত্র নদ থেকে নুরুল্লাহ শাওনের মরদেহ উদ্ধার করা হয়।
গত ১৮ ফেব্রুয়ারি বিকেলে জয়নুল আবেদিন উদ্যান এলাকা থেকে নুরুল্লাহ শাওন ও তার বন্ধু মঞ্জুরুল আহসান (রিয়াদ) ব্রহ্মপুত্র নদের বিপরীত পাশে বেড়াতে যান। সন্ধ্যা ৬টার দিকে তাদের দুজনকে ঘিরে ধরে সাতজনের একটি কিশোর দল। প্রতিবাদ করলে কিশোর গ্যাংয়ের সদস্যরা তাদের বেদম মারধর করে। দুই বন্ধু দৌড়ে পালানোর চেষ্টা করেন। চারজন শাওনের এবং তিনজন পিছু নেয় মঞ্জুরুলের। মঞ্জুরুল ব্রহ্মপুত্র নদে নেমে সাঁতরে পার হতে পারলেও নুরুল্লাহর সন্ধান পাওয়া যায়নি। গতকাল রাতে তার মরদেহ উদ্ধার হয়।
নিহত নুরুল্লাহ শাওন (২৫) এর বাড়ি কিশোরগঞ্জের কটিয়াদী উপজেলার জালালপুর ইউনিয়নের চর জাকালিয়া গ্রামে। সে আনন্দ মোহন কলেজের রসায়ন বিভাগের তৃতীয় বর্ষের শিক্ষার্থী।
এ খবর ছড়িয়ে পড়লে রাতেই আনন্দমোহন কলেজসহ বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীরা নগরীর টাউন হল চত্বরে সড়ক অবরোধ করে। এ সময় শহীদ মিনারে ফুল দিতে আসা সরকারি কর্মকর্তাদের গাড়ি আটকে বিক্ষোভ করে তারা। পরে রাত দেড়টার দিকে প্রশাসনের আশ্বাসে অবরোধ তুলে নেয় শিক্ষার্থীরা।
এর আগে বৃহস্পতিবার নিহত নুরুল্লাহর মা সাহিদা বেগম কোতোয়ালি মডেল থানায় মামলা করেন। মামলায় সাতজনের নাম উল্লেখ করে অজ্ঞাতপরিচয় তিন থেকে চারজনকে আসামি করা হয়। অভিযুক্ত কিশোরদের বয়স ১৩ থেকে ১৬ বছরের মধ্যে। তারা নগরের বিভিন্ন বিদ্যালয়ে সপ্তম থেকে নবম শ্রেণির শিক্ষার্থী। তারা নগরের চর জেলখানা বিন পাড়া এলাকার বাসিন্দা। সাত কিশোরই বিন সম্প্রদায়ের। তাদের মধ্যে ১৫ বছর বয়সী একজনকে গ্রেপ্তার করে আদালতের মাধ্যমে কিশোর সংশোধনাগারে পাঠানো হয়েছে।
স্থানীয়রা বাসিন্দা মোবারক হোসেন বলেন, বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের উঠতি বয়সী শিক্ষার্থীরা দল বেঁধে গ্যাং কালচারে জড়িয়ে পড়ছে। মাদকের সঙ্গেও জড়াচ্ছে। এক দল আরেক দলের সঙ্গে মারধর করে। অনেকে ছিনতাইয়ের সাথে জড়িত। এখনি এসব রোধে কার্যকর ব্যবস্থা নিতে হবে। তা না হলে এই নগরীতে কিশোর গ্যাং দৌরাত্ম্য বেড়ে যাবে।
আনন্দ মোহন কলেজ শাখা ছাত্রদলের সাধারণ সম্পাদক মোস্তাক হাসান বলেন, ছিনতাইকারীরা শহরে বেপরোয়া হয়ে উঠলেও প্রশাসন নির্বিকার। এমন প্রশাসন আগে কখনও দেখিনি। আমরা ছিনতাই ও মাদকমুক্ত নগরী চাই।
এর আগে গত ৩ জানুয়ারি নগরের জিলা স্কুলের দশম শ্রেণির শিক্ষার্থী মিফতাহুল জান্নাত নিলয় তালুকদারকে (১৫) ছুরিকাঘাত করে তারই সহপাঠীরা। ‘কিশোর গ্যাং’-এ যোগ না দেওয়ায় স্কুল বন্ধের দিন সহপাঠীরা বাসা থেকে স্কুলে ডেকে নিয়ে পিঠে, হাতে, কোমর ও পায়ে অন্তত সাতটি ছুরিকাঘাত করে। এ ঘটনায় ১০ জানুয়ারি কোতোয়ালি মডেল থানায় একটি মামলা করেন মিফতাহুল জান্নাতের বাবা। মামলায় চারজনের নাম উল্লেখ করে অজ্ঞাতপরিচয় চার থেকে পাঁচজনকে আসামি করা হয়। আসামিরা জিলা স্কুলের দশম শ্রেণির ডে শিফটের শিক্ষার্থী। আর মিফতাহুল মর্নিং শিফটের শিক্ষার্থী ছিল।
নিহতের বাবা সাদেকুল ইসলাম বলেন, ঘটনার দিন বিকেলে আমার ছেলেকে বাসা থেকে ডেকে নিয়ে যায় তার সহপাঠীরা। স্কুলের ভেতরে কথাকাটাকাটির একপর্যায়ে ছুরিকাঘাত করে। যারা ছুরিকাঘাত করে, তারা সবাই মাদকাসক্ত। আমার ছেলেকে তাদের দলে নিতে চেয়েছিল। সে যেতে রাজি না হওয়ায় ছুরিকাঘাত করা হয়। আমি এদের বিচার চাই।
সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন) ময়মনসিংহ মহানগরের সম্পাদক আলী ইউসুফ বলেন, কিশোর গ্যাং ও ছিনতাইকারী দলের দৌরাত্ম্য ও মাদক নিয়ে নগরবাসী দীর্ঘদিন ধরেই উদ্বিগ্ন। এ জন্য আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর অবজ্ঞা দায়ী। কঠোরভাবে এগুলো নিয়ন্ত্রণ করা না গেলে পরিস্থিতি ভয়াবহ রূপ ধারণ করবে। জনপ্রতিনিধিদেরও এ বিষয়ে কাজ করতে হবে।
অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (প্রশাসন ও অর্থ) আবদুল্লাহ আল মামুন বলেন, আমরা সুরতহালে নিহত শিক্ষার্থীর শরীরে আঘাতের চিহ্ন পাইনি। পানিতে পড়ে গেলে যেসব চিহ্ন থাকে, সেগুলো ছিল। আমাদের ধারণা, পানিতে ডুবেই মৃত্যু হয়েছে। কিশোর দলটির প্ররোচনা রয়েছে। ছিনতাইয়ের জন্য তারা ধাওয়া না করলে এমন হতো না। কিশোর গ্যাং ‘তারা একজনের কমান্ডে চলে’। যখনই এক দিকে যায়, দল বেঁধে যায়। কেউ কেউ মাদক সেবনের সঙ্গে জড়িত। এদের বেশির ভাগ অপ্রাপ্তবয়স্ক। এদের খুব সফটলি হ্যান্ডেল করতে হয়।
তিনি আরও বলেন, কিশোর দলটি নিজেদের এলাকায় সন্ধ্যার দিকে যারা ঘুরতে যায়, তাদের ‘ঠেক’ দিত। তারা সবাই অপ্রাপ্তবয়স্ক এবং বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থী। ঘটনার পর থেকে দলটিকে পাওয়া যাচ্ছে না। তারা মুঠোফোনও ব্যবহার করে না। পরিবারগুলোও খুবই দরিদ্র। একজনকে ধরে কিশোর সংশোধনাগারে পাঠানো হয়েছে। রিমান্ড হলে বিস্তারিত জানতে পারা যাবে। কিন্তু অপ্রাপ্তবয়স্ক হওয়ায় সেই সুযোগ নেই। অন্যদের ধরতে পারলে হয়ত বিস্তারিত জানা যাবে, আসলে কী ঘটেছিল। আমরা এসব নিয়ে কাজ করছি।