Image description

পরিবহন খাতে মালিক-শ্রমিক সংগঠনের নামে তোলা চাঁদাবাজিকে অনেকটাই বৈধতা দিলেন নতুন সড়ক পরিবহন, রেল ও নৌপরিবহনমন্ত্রী শেখ রবিউল আলম। তিনি মনে করেন, এই টাকাটা সমঝোতার ভিত্তিতে তোলা হচ্ছে। জোর করে আদায় করছে না। এ জন্য চাঁদা বলা যাচ্ছে না।

গতকাল বৃহস্পতিবার সড়ক পরিবহন মন্ত্রণালয়ের এক সংবাদ সম্মেলনে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে এ মনোভাবের কথা জানান মন্ত্রী রবিউল আলম। নতুন সরকারের দায়িত্ব নেওয়ার পর গতকাল প্রথম আনুষ্ঠানিকভাবে গণমাধ্যমের সঙ্গে কথা বলতে বিকেলে নিজ দপ্তরে সংবাদ সম্মেলন ডাকেন মন্ত্রী। এ সময় ওই তিন মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী হাবিবুর রশিদ ও মো. রাজিব আহসান উপস্থিত ছিলেন।

সংবাদ সম্মেলনে রেল সম্প্রসারণ, সড়কে শৃঙ্খলা ফেরানো, খাল পুনঃখনন ও সমন্বিত পরিবহন ব্যবস্থাপনায় জোর দেওয়া হয়। এসব খাতে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে ৮০ দিনের কর্মপরিকল্পনা নেওয়ার কথা আলোচনা হয়।

পরিবহন খাতে চাঁদাবাজি প্রসঙ্গে মন্ত্রীর বক্তব্যের সঙ্গে দ্বিমত পোষণ করছেন এই খাতের বিশেষজ্ঞরা। তাঁরা মনে করেন, পরিবহন খাতে নানা উপায়ে বছরে হাজার কোটি টাকা চাঁদা তোলা হয়। এই খাতের বিশৃঙ্খলার পেছনে মূল কারণ চাঁদাবাজি। চাঁদাবাজি বন্ধ না হলে পরিবহন খাতে শৃঙ্খলা আনা যাবে না।

২০২৪ সালের ৫ মার্চ ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) প্রকাশ করা এক গবেষণা প্রতিবেদন অনুসারে, দেশে ব্যক্তিমালিকানাধীন বাস ও মিনিবাস থেকে বছরে ১ হাজার ৫৯ কোটি টাকা চাঁদাবাজি হয়। এই চাঁদার ভাগ পান দলীয় পরিচয়ধারী ব্যক্তি বা গোষ্ঠী, ট্রাফিক ও হাইওয়ে পুলিশ, বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষের (বিআরটিএ) কর্মকর্তা-কর্মচারী, মালিক-শ্রমিক সংগঠন ও পৌরসভা বা সিটি করপোরেশনের প্রতিনিধিরা।

গবেষণায় আরও এসেছে, দেশের বৃহৎ বাস কোম্পানির প্রায় ৯২ শতাংশ পরিচালনার সঙ্গে রাজনীতিবিদেরা সম্পৃক্ত। এর মধ্যে ৮০ শতাংশই ক্ষমতাসীন দলের সঙ্গে যুক্ত।
সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো বলছে, বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে পরিবহন খাতের চাঁদার নিয়ন্ত্রণ করতেন ক্ষমতাসীন দলের নেতারা। আওয়ামী লীগের পতনের পর এর নিয়ন্ত্রণ চলে এসেছে বিএনপিপন্থী পরিবহননেতাদের হাতে।

গতকালের সংবাদ সম্মেলনে পরিবহন খাতের চাঁদাবাজি প্রসঙ্গে এক প্রশ্নের জবাবে শেখ রবিউল আলম বলেন, ‘সড়কে পরিবহনের চাঁদা যেটা বলা হয়, সেভাবে আমি চাঁদা দেখি না। মালিক সমিতি, শ্রমিক সমিতি আছে, তারা তাদের কল্যাণে এটা ব্যয় করে।

এটা অলিখিত বিধির মতো। চাঁদা আমি সেটাকে বলতে চাই, যেটা কেউ দিতে চায় না বা বাধ্য করা হয়। মালিক সমিতি নির্দিষ্ট হারে টাকা তুলে মালিকদের কল্যাণে ব্যবহার করতে চায়। কতটুকু ব্যবহার হয়, সেটা নিয়ে হয়তো বিতর্ক আছে। কিন্তু তারা সমঝোতার ভিত্তিতে এ কাজটা করে।’

রবিউল আলম আরও বলেন, ‘শ্রমিক কল্যাণ ফেডারেশনসহ অনেক সংস্থা আছে। তারা এটা সমঝোতার ভিত্তিতে করে (টাকা তোলে)। সেখানে আবার প্রাধান্য পায় যখন যার প্রভাব থাকে, এমন মালিকদের বা দলের প্রভাব থাকে। যে দল ক্ষমতায় থাকে সেই দলের শ্রমিক সংগঠনের একটা আধিপত্য থাকে। কিন্তু এটা চাঁদা আকারে আমাদের কাছে দেখার সুযোগ হচ্ছে না। কারণ, তারা সমঝোতার ভিত্তিতে করছে।’

তবে সমঝোতার ভিত্তিতে তোলা চাঁদাটা বাড়তি বা কাউকে বঞ্চিত করা হচ্ছে কি না, তা সরকার খতিয়ে দেখবে বলে জানান সড়ক পরিবহনমন্ত্রী রবিউল আলম।

কল্যাণের কথা বললেও কল্যাণ হয় না

পরিবহন খাতের সূত্রগুলো বলছে, দেশে সব মিলিয়ে বাণিজ্যিক যানবাহন আছে ৯ লাখের বেশি। বছরে দুই হাজার কোটি টাকার বেশি চাঁদা আদায় হয়। এর বাইরে অঘোষিত চাঁদার তো কোনো হিসাব নেই।

মালিক-শ্রমিকদের কল্যাণের কথা বলে এসব চাঁদা আদায় হলেও করোনাভাইরাসের দুর্দিনে তাঁদের পাশে মালিক-শ্রমিক সংগঠনগুলোকে দেখা যায়নি।

পরিবহনবিশেষজ্ঞ ও বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) পুরকৌশল বিভাগের অধ্যাপক সামছুল হক প্রথম আলোকে বলেন, পরিবহন খাতের পরিচালন ব্যয়ের বাইরে যেকোনো ‘ছায়া’ খরচ অবৈধ। চাঁদা কিংবা কল্যাণ খরচ যেভাবেই দেখানো হোক না কেন, তা জনগণের ওপর চাপ তৈরি করে। পরিবহন খাতে পুলিশ, মালিক-শ্রমিক, রাজনৈতিক পক্ষের নামে চাঁদা তোলা হয়, এটা প্রকাশ্য। তিনি বলেন, বর্তমান সরকার জনগণের শক্ত রায় নিয়ে ক্ষমতায় এসেছে। শুরুতেই চাঁদাবাজি বন্ধের সদিচ্ছা দেখাতে হবে। নতুবা পরে পারবে না। আর চাঁদাবাজি বন্ধ না হলে পরিবহন খাতে শৃঙ্খলাও আসবে না।

শ্রমিক কল্যাণ সম্পর্কে অধ্যাপক সামছুল হক বলেন, আইন অনুসারে নিয়োগপত্র এবং মাসিক বেতন পাওয়া শ্রমিকের অধিকার। এটা নিশ্চিত করা গেলেই কল্যাণ হয়। চাঁদা তুলে কল্যাণ করার কোনো প্রয়োজন নেই। তিনি আরও বলেন, কল্যাণের নামে যে চাঁদা তোলা হয়, এর কোনো নিরীক্ষা হয় না। ফলে কীভাবে এবং কারা খরচ করে, তা কেউ জানে না।

চাঁদা বৈধতার ইতিহাস

সড়ক পরিবহন মন্ত্রণালয় সূত্র জানায়, ২০০২ সালের দিকে বিএনপি সরকারের তৎকালীন যোগাযোগমন্ত্রী প্রয়াত নাজমুল হুদার সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত সড়ক পরিবহন উপদেষ্টা পরিষদের সভায় পরিবহন খাতে চাঁদার বিষয়ে একটি নীতিমালা প্রণয়নের উদ্যোগ নেওয়া হয়। এর জন্য একটি উপকমিটি গঠন করা হয়। তারা একটি সুপারিশও তৈরি করেছিল। কিন্তু বৈধতার প্রশ্ন নিয়ে সমালোচনা হলে তৎকালীন সরকার তা বাস্তবায়ন করেনি।

২০০৯ সালে আওয়ামী লীগ সরকারের যোগাযোগ মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব পান প্রয়াত সৈয়দ আবুল হোসেন। বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন শ্রমিক ফেডারেশনের কার্যকরী সভাপতি ছিলেন আওয়ামী লীগের সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য শাজাহান খান। তাঁরা ২০১১ সালের দিকে বিএনপি সরকারের সময় করা সুপারিশ পরিমার্জন ও সংশোধন করে নতুন সুপারিশ তৈরি করেন এবং একটি নীতিমালা প্রণয়নের উদ্যোগ নেন।

খসড়া নীতিমালায় বলা হয়, পরিবহন মালিক সমিতি সর্বোচ্চ ৪০ টাকা, শ্রমিক ইউনিয়ন সর্বোচ্চ ২০ টাকা, বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন শ্রমিক ফেডারেশন ১০ টাকা করে চাঁদা তুলতে পারবে। কোনো টার্মিনালের শ্রমিক কমিটি থাকলে স্থানীয় শ্রমিক ইউনিয়ন ও ফেডারেশন আলোচনা করে সর্বোচ্চ ৭০ টাকা চাঁদা নিতে পারবে।
তবে সমালোচনার মুখে তৎকালীন আওয়ামী লীগ সরকার এই নীতিমালা অনুমোদন দেয়নি। পর্যায়ক্রমে পরিবহন মালিক-শ্রমিক সংগঠনের নামে ৭০ টাকা চাঁদা তোলার বিষয়টি অনেকটা স্বাভাবিক হয়ে যায়। এর সঙ্গে যুক্ত হয় আরও নানা নামের চাঁদা।

নতুন সরকারের অগ্রাধিকার

গতকালের সংবাদ সম্মেলনে সরকারের অগ্রাধিকার সম্পর্কে বলতে গিয়ে শেখ রবিউল আলম বলেন, নতুন সরকার রাষ্ট্র ব্যবস্থাপনাকে জনবান্ধব, স্বচ্ছ ও জবাবদিহিমূলক করতে কাজ শুরু করেছে। রেল সম্প্রসারণ, সড়কে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনা, খাল পুনঃখনন ও সমন্বিত পরিবহন ব্যবস্থাপনা—এসব খাতে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে ১৮০ দিনের কর্মপরিকল্পনা নেওয়া হবে।

ঢাকার প্রধান সড়কে ব্যাটারিচালিত অটোরিকশার অবাধ চলাচল ও যানজট সৃষ্টির বিষয়টি নিয়ন্ত্রণে আনার কথা জানিয়ে সড়ক পরিবহনমন্ত্রী বলেন, অটোরিকশা পুরোপুরি বন্ধ করা সম্ভব কি না, নাকি নিয়ন্ত্রণের মধ্যে এনে পর্যায়ক্রমে ব্যবস্থা নেওয়া হবে—সে বিষয়ে সিটি করপোরেশন, ট্রাফিক বিভাগ ও স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সমন্বয়ে দ্রুত কর্মপরিকল্পনা নেওয়া হবে।

রেল খাত সম্পর্কে মন্ত্রী বলেন, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান রেল খাতে বিশেষ গুরুত্ব দিয়েছেন। দেশের ভেতরেই ইঞ্জিন ও বগি তৈরি করা সম্ভব কি না, তা খতিয়ে দেখার নির্দেশ দিয়েছেন।

ভারত-বাংলাদেশ রেল যোগাযোগ আবার চালুর বিষয়ে পরীক্ষা-নিরীক্ষা চলছে উল্লেখ করে মন্ত্রী বলেন, দেশের স্বার্থ বিবেচনায় ১৫ দিনের মধ্যে সিদ্ধান্ত আসতে পারে।
আসন্ন ঈদে ঘরমুখী যাত্রীদের ভোগান্তি কমাতে আগের সফল মডেল অনুসরণ করা হবে জানিয়ে মন্ত্রী বলেন, অতিরিক্ত কিছু পদক্ষেপ যুক্ত করার বিষয়ে তিন থেকে চার দিনের মধ্যে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।

বিমানবন্দর থেকে গাজীপুর পর্যন্ত নির্মিত বাসের বিশেষ লেন (বিআরটি) প্রকল্প সম্পর্কে এক প্রশ্নের জবাবে রবিউল আলম বলেন, প্রকল্পটি রাষ্ট্রবান্ধব হয়নি—এমন প্রাথমিক ধারণা রয়েছে। তবে বিপুল অর্থ ব্যয় ও ঋণসংক্রান্ত জটিলতা বিবেচনায় তাৎক্ষণিক সিদ্ধান্ত নেওয়া সম্ভব নয়। বিষয়টি পর্যালোচনায় রয়েছে।

দুর্নীতি ও রাজনৈতিক প্রভাবের বিষয়ে প্রশ্নের জবাবে রবিউল আলম বলেন, যেখানে জনস্বার্থ, সেখানে দলীয় স্বার্থ নগণ্য। কোনো সংগঠন বা গোষ্ঠীকে প্রাধান্য বিস্তার করতে দেওয়া হবে না। স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করেই মন্ত্রণালয় পরিচালনা করা হবে।

সংবাদ সম্মেলনে সড়ক বিভাগের সচিব মোহাম্মদ জিয়াউল হক, নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়ের সচিব নুরুন্নাহার চৌধুরী, ঢাকা মাস ট্রানজিট কোম্পানির ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) ফারুক আহমেদ, বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষের (বিআরটিএ) চেয়ারম্যান আবু মমতাজ সাদ উদ্দিন আহমেদ, সড়ক ও জনপথ (সওজ) অধিদপ্তরের প্রধান প্রকৌশলী সৈয়দ মইনুল হাসান প্রমুখ উপস্থিত ছিলেন।