Image description

নির্বাচন-পরবর্তী আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখতে কঠোর বার্তা দিয়েছে পুলিশ সদর দপ্তর। নির্বাচনের পর ৪৮ ঘণ্টায় ৭৬টি সহিংসতার ঘটনা ঘটেছে। পুলিশ সদর দপ্তর থেকে হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করে বলা হয়েছে, পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ করতে ব্যর্থ হলে তাদের এর দায় নিতে হবে। প্রয়োজনে বিভাগীয় শাস্তির মুখোমুখি হতে হবে তাদের। নির্বাচন শেষ হলেও দায়িত্ব শেষ হয়নি। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, নির্বাচনের দুই দিন আগে থেকে দেশের সব জেলাকে বিশেষ মনিটরিংয়ে রাখে পুলিশ সদর দপ্তর। এর আগে কয়েক দফায় পুলিশ সুপারদের সতর্ক করেছেন খোদ পুলিশ মহাপরিদর্শক (আইজিপি)।

সদর দপ্তর সূত্র জানায়, ভোট গ্রহণ শেষে সম্ভাব্য সহিংসতা, প্রতিহিংসামূলক হামলা, ভাঙচুর ও সংঘর্ষ ঠেকাতে আগাম প্রস্তুতি নিতে বলা হয়েছে। যেকোনো ধরনের বিশৃঙ্খলা রোধে দ্রুত ব্যবস্থা নিতে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি) তাদের ব্যারাকে ফিরে গেলেও সেনাসহ অন্যান্য বাহিনীর সঙ্গে সমন্বয় করে দায়িত্ব পালন করতে বলা হয়েছে।

খুলনা রেঞ্জের ডিআইজি রেজাউল হক বাংলাদেশ প্রতিদিনকে বলেন, পুলিশ সদর দপ্তর থেকে আমাদের নির্দেশনা ছিল কেবল ভোটের নিরাপত্তা-সংক্রান্ত। এর বাইরে কোনো কিছু নিয়ে মাথা না ঘামাতে আইজিপির স্পষ্ট নির্দেশনা ছিল। এটা আমাদের জন্য বড় একটি টনিক হিসেবে কাজ করেছে।

পুলিশ সদর দপ্তর জানায়, ফেব্রুয়ারি রাত থেকে ১৩ ফেব্রুয়ারি রাত ১২টা থেকে পরদিন সন্ধ্যা ৬টা পর্যন্ত সারা দেশে মোট ৬৬টি সহিংস ঘটনার তথ্য পাওয়া গেছে। এসব ঘটনায় আহত হয়েছেন ৮৩ জন। তবে গত ২৪ ঘণ্টায় ফরিদপুর, নাটোর, ব্রাহ্মণবাড়িয়া, টাঙ্গাইল, টঙ্গী, কুষ্টিয়া, ফেনী, যশোর, মাদারীপুরে এবং বাগেরহাটে অন্তত ১০টি সংঘর্ষের ঘটনা ঘটেছে। এর মধ্যে বাগেরহাটের কচুয়া উপজেলায় নির্বাচন-পরবর্তী সহিংসতায় ওসমান সরদার (২৯) নামে বিএনপির ‘বিদ্রোহী’ প্রার্থীর এক সমর্থক নিহত হয়েছেন। গত শুক্রবার সন্ধ্যায় বিএনপি ও দলের ‘বিদ্রোহী’ প্রার্থীর সমর্থকদের মধ্যে সংঘর্ষে উভয় পক্ষের অন্তত ১০ জন আহত হন। গতকাল বেলা সাড়ে ১১টার দিকে খুলনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় ওসমানের মৃত্যু হয়। তিনি সদর উপজেলার পাড়নওয়াপাড়া গ্রামের শাহজাহান সরদারের ছেলে এবং বিএনপির ‘বিদ্রোহী’ প্রার্থী জেলা বিএনপির সাবেক সভাপতি এম এ এইচ সেলিমের সমর্থক ছিলেন। দলভিত্তিক বিশ্লেষণে দেখা গেছে, বিএনপি-জামায়াত সংশ্লিষ্ট ৩০টি ঘটনা ঘটেছে, এতে আহত হয়েছেন ৩০ জন। বিএনপির অভ্যন্তরীণ কোন্দল ঘিরে ৬টি ঘটনায় আহত ছয়জন। বিএনপি ও স্বতন্ত্র প্রার্থীদের সংঘাতে ১২টি ঘটনায় আহত হয়েছেন ২০ জন। আওয়ামী লীগ ও এর অঙ্গসংগঠন ঘিরে ৪টি ঘটনায় আহত ১০ জন। অন্যান্য ঘটনায় ১১টিতে আহত ১৭ জন। এ ছাড়া বিচ্ছিন্ন আরও ২টি ঘটনার তথ্য রয়েছে। পুলিশ মহাপরিদর্শক ভার্চুয়াল বৈঠকে বলেন, ফল ঘোষণার পর যেন কোথাও অস্থিরতা সৃষ্টি না হয়, সে বিষয়ে কঠোর নজরদারি রাখতে হবে। সমাজমাধ্যমে গুজব ছড়ানো বা উসকানিমূলক প্রচারের বিরুদ্ধেও তৎপর থাকার কথা জানান তিনি। নরসিংদী জেলার পুলিশ সুপার আবদুল্লাহ আল ফারুক বলেন, বড় ধরনের কোনো ঘটনা ছাড়া এবারের জাতীয় নির্বাচন সম্পন্ন করা সম্ভব হয়েছে। এজন্য পুলিশ সদর দপ্তরের অপারেশন শাখা থেকে ধন্যবাদ জানানো হয়েছে জেলার সব পুলিশ সদস্যকে। তবে এখনো আমরা সতর্ক অবস্থানে রয়েছি। ভোটের নিরাপত্তার জন্য নেওয়া বিশেষ প্যাট্রল কার্যক্রম এখনো চলছে। পুলিশ সদর দপ্তর থেকে এখনো তা মনিটরিং করা হচ্ছে।

পুলিশ সদর দপ্তর জানায়, জেলা পুলিশ সুপারদের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে গুরুত্বপূর্ণ এলাকায় টহল জোরদার করতে। ঝুঁকিপূর্ণ কেন্দ্র ও এলাকাগুলোতে বাড়তি নজরদারি রাখতে। পরাজিত ও বিজয়ী পক্ষের মধ্যে উত্তেজনা তৈরি হলে দ্রুত হস্তক্ষেপ করতে। সংখ্যালঘু ও দুর্বল জনগোষ্ঠীর নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে। যেকোনো ধরনের নাশকতা বা সহিংসতার তথ্য পেলে তাৎক্ষণিকভাবে আইনানুগ ব্যবস্থা নিতে হবে। প্রয়োজন হলে অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েনের কথাও বলা হয়েছে।

পুলিশের একাধিক কর্মকর্তা জানান, নির্বাচন-পরবর্তী সময়ে আগের ছোটখাটো বিরোধ বড় সংঘর্ষে রূপ নিতে পারে। তাই গোয়েন্দা নজরদারি বাড়ানোর নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। প্রত্যেক থানাকে নিজ নিজ এলাকার রাজনৈতিক ও সামাজিক পরিস্থিতি নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণের কথা বলা হয়েছে। মাঠপর্যায়ে দ্রুত সাড়া দিতে কন্ট্রোল রুম সক্রিয় রাখার নির্দেশ রয়েছে। জেলা প্রশাসন ও অন্যান্য আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সঙ্গে সমন্বয় করে কাজ করার ওপরও গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।

সম্প্রতি পুলিশ মহাপরিদর্শক একটি ভার্চুয়াল ব্রিফিংয়ে বলেছেন, জনগণের জানমাল রক্ষা আমাদের প্রধান দায়িত্ব। কোনো অবস্থাতেই আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়ার সুযোগ দেওয়া যাবে না।