ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আনুষ্ঠানিক ফল প্রকাশ করেছে নির্বাচন কমিশন (ইসি)। বিজয়ী এমপিদের গেজেট প্রকাশের জন্য গতকাল শুক্রবার রাতে তাদের নামের তালিকা বিজি প্রেসে পাঠিয়েছে নির্বাচন কমিশন সচিবালয়। এই গেজেট আজ সকালের মধ্যে প্রকাশ করা হবে।
একাধিক সূত্র জানায়, এমপিদের শপথ হতে পারে রোববার বা সোমবার সকালে। এরপর সোমবার সন্ধ্যায় নতুন সরকারের মন্ত্রী-প্রতিমন্ত্রীদের শপথ অনুষ্ঠান হতে পারে। অবশ্য এমপিদের কে শপথ পড়াবেন–তার ওপরও শপথের দিনক্ষণ নির্ভর করছে।
সংবিধানের ১৪৮ (১) অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, বিদায়ী স্পিকার নতুন এমপিদের শপথ পাঠ করাবেন। গণঅভ্যুত্থানের পর ২০২৪ সালের ২ সেপ্টেম্বর জাতীয় সংসদের স্পিকার শিরীন শারমিন চৌধুরী পদত্যাগ করেন। সংবিধান অনুযায়ী, পদত্যাগ করলেও তিনিই স্পিকার হিসেবে শপথ পড়ানোর কথা। বিগত সংসদের ডেপুটি স্পিকার শামসুল হক টুকু কারাগারে আছেন। তিনি এখনও পদত্যাগ করেননি।
সংবিধানের ১৪৮ (২) অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে, স্পিকারের মনোনীত কোনো ব্যক্তির কাছেও এমপিরা শপথ নিতে পারবেন। ১৪৮ (২ক) অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে, গেজেট প্রকাশের তিন দিনের মধ্যে যদি স্পিকার বা তাঁর মনোনীত ব্যক্তি সংসদ সদস্যদের শপথ না পড়ান, তাহলে পরবর্তী তিন দিনের মধ্যে প্রধান নির্বাচন কমিশনার শপথ পড়াবেন।
অর্থাৎ পদত্যাগ করলেও এমপিদের শপথ পড়ানো বিদায়ী স্পিকারের দায়িত্ব। এর জন্য সংবিধানে তিন দিন সময় নির্ধারণ করা আছে।
কোনো কারণে তিনি ব্যর্থ হলে পরের তিন দিনের মধ্যে প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) এমপিদের শপথ পড়াবেন।
প্রধান উপদেষ্টার কার্যালয় সূত্রে জানা যায়, বিজয়ী সংসদ সদস্যদের শপথ কে পড়াবেন এ নিয়ে সিদ্ধান্ত গ্রহণের জন্য গতকাল প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূসের সভাপতিত্বে কয়েকজন উপদেষ্টার বিশেষ বৈঠক হয়েছে। বৈঠকে সংবিধান অনুযায়ী সিইসি বিজয়ী সংসদ সদস্যদের শপথ পড়াবেন মর্মে আলোচনা হয়। সূত্র জানায়, ইতোমধ্যে এর প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে।
রাজনৈতিক দলগুলোর সূত্রগুলো জানায়, এই পরিস্থিতির উদ্ভব না হলে গেজেট প্রকাশের পরপরই এমপিদের শপথ গ্রহণ করা যেত। অতীতেও তা-ই হয়েছিল।
আবার জাতীয় সংসদের কার্যপ্রণালী বিধির ৫ এর ১ ধারায় বলা হয়েছে, ‘স্পিকার ও ডেপুটি স্পিকার উভয় পদ শূন্য থাকলে স্পিকার নির্বাচিত না হওয়া পর্যন্ত সংসদ সদস্যদের শপথ পরিচালনা ও সংসদে সভাপতিত্ব করার উদ্দেশ্যে রাষ্ট্রপতি কর্তৃক মনোনীত কোনো ব্যক্তির সম্মুখে শপথ গ্রহণ করবেন বা ঘোষণা করবেন এবং তাতে স্বাক্ষর করবেন।’
এর আগে আইন উপদেষ্টা আসিফ নজরুল সাংবাদিকদের বলেছিলেন, রাষ্ট্রপতি যাকে ঠিক করে দেবেন, তিনিই নতুন এমপিদের শপথ পড়াবেন। এই লক্ষ্যে সংসদ সচিবালয় থেকে একটি সারসংক্ষেপ আইন উপদেষ্টার কার্যালয়ে পাঠানো হয়েছিল। আইন উপদেষ্টা একই সঙ্গে সংসদবিষয়ক উপদেষ্টাও।
মুদ্রণ ও প্রকাশনা অধিদপ্তর সূত্রে জানা যায়, গতকাল রাতে নির্বাচন কমিশন সচিবালয় থেকে বিজয়ী সংসদ সদস্যের নামের তালিকা মুদ্রণ ও প্রকাশনা অধিদপ্তরে (বিজি প্রেস) পাঠানো হয়েছে। তারা গেজেট প্রকাশের কাজ শুরু করেছেন। আজ শনিবার সকালে গেজেট প্রকাশ হওয়ার কথা।
সংসদ ভবনে প্রস্তুতি
গতকাল খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, শপথ অনুষ্ঠান সামনে রেখে জাতীয় সংসদ ভবনে পরিচ্ছন্নতা, রক্ষণাবেক্ষণ ও অবকাঠামোগত সংস্কারের কাজ শেষ পর্যায়ে রয়েছে। ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানের সময় ক্ষতিগ্রস্ত অংশগুলোর মেরামতও করা হয়েছে।
সংসদ সচিবালয়ের কর্মকর্তারা বলেছেন, শপথের আনুষ্ঠানিকতা, প্রটোকল, নিরাপত্তা ও প্রয়োজনীয় সেবা নিশ্চিত করতে বিভিন্ন দপ্তর কাজ করছে। স্পিকার ও রাষ্ট্রপতির অফিস কক্ষ, সরকারি ও বিরোধী দলের সভাকক্ষ, অধিবেশন কক্ষ ও শপথ কক্ষ ব্যবহারের উপযোগী করা হয়েছে।
১৫ ফেব্রুয়ারির মধ্যে সরকার গঠন হবে: মির্জা ফখরুল
বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর গতকাল ঠাকুরগাঁওয়ে নিজ বাসভবনে সংবাদকর্মীদের সঙ্গে আলাপকালে বলেছেন, ১৫ ফেব্রুয়ারির মধ্যে নতুন সরকার গঠন করা হবে। ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিএনপির নিরঙ্কুশ বিজয়কে জনগণের ভালোবাসার প্রতিফলন হিসেবে উল্লেখ করে তিনি বলেন, বিএনপি কোনো ক্যাডারভিত্তিক সংগঠন নয়, এটি জনগণের দল।
নতুন মন্ত্রীদের জন্য প্রস্তুত ৫০ গাড়ি ও বাসভবন
মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলেছেন, নতুন সরকারের মন্ত্রীদের শপথের জন্য তারা প্রস্তুতি নিয়েছেন। নতুন মন্ত্রীদের জন্য ৫০টি গাড়ি প্রস্তুত রাখা হয়েছে। মন্ত্রীদের বাসভবন প্রস্তুত রাখছে সরকারি আবাসন পরিদপ্তর।
সংবিধান সংস্কার পরিষদ গঠন
গণভোটে হ্যাঁ জয়ী হওয়ায় সংবিধান সংস্কার পরিষদ গঠন করতে হবে। এর জন্য এমপিদের আলাদাভাবে শপথ নিতে হবে। দুই শপথ একই দিনে অনুষ্ঠিত হবে।
আজ শনিবার বেলা ১১টায় রাজধানীর ফরেন সার্ভিস একাডেমিতে সংবাদ সম্মেলন ডেকেছেন প্রধান উপদেষ্টার বিশেষ সহকারী অধ্যাপক আলী রিয়াজ। তিনি সংবিধান সংস্কার কমিশনের প্রধান ছিলেন। তিনি জাতীয় ঐকমত্য কমিশনের সহসভাপতি ছিলেন। ওই কমিশন জুলাই সনদ প্রণয়ন করেছিল। ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত গণভোটে ৬০ দশমিক ২৬ শতাংশ ভোট পড়েছে। এর মধ্যে ‘হ্যাঁ’ ভোট পড়েছে চার কোটি ৮০ লাখ ৭৪ হাজার ৪২৯টি। আর ‘না’ ভোট দুই কোটি ২৫ লাখ ৬৫ হাজার ৬২৭টি। ভোট বাতিল হয়েছে ৭৭ লাখ ২১ হাজার ৮৬টি।