রাত পোহালেই ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন। দেশজুড়ে যখন ভোটের আমেজ, ঠিক তখনই পর্দার আড়ালে সরকারের গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিদের মধ্যে শুরু হয়েছে ‘লাল পাসপোর্ট’ (ডিপ্লোমেটিক পাসপোর্ট) সমর্পণের হিড়িক। ক্ষমতার মেয়াদের একেবারে শেষ মুহূর্তে এসে অন্তত পাঁচজন উপদেষ্টা এবং পুলিশ মহাপরিদর্শক (আইজিপি) বাহারুল আলম তাদের কূটনৈতিক পাসপোর্ট জমা দিয়ে সাধারণ বা সবুজ পাসপোর্ট গ্রহণ করেছেন। নির্বাচন-পরবর্তী সম্ভাব্য আইনি জটিলতা বা বিদেশ ভ্রমণে সরকারি আদেশের (জিও) বাধ্যবাধকতা এড়াতেই এই ‘তড়িঘড়ি’ বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।
এছাড়া লাল পাসপোর্ট থেকে সবুজ পাসপোর্ট নেওয়ার দৌড়ে রয়েছেন আরও অন্তত তিনজন উপদেষ্টা। সম্প্রতি ঢাকা পোস্টের হাতে আসা নথি, পাসপোর্ট অধিদপ্তর ও স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের ঊর্ধ্বতন দায়িত্বশীল একাধিক সূত্র এসব তথ্য নিশ্চিত করেছে।
নির্বাচনের ঠিক আগমুহূর্তে মেয়াদের শেষ দিকে এসে অন্তত পাঁচজন উপদেষ্টা ও আইজিপির লাল পাসপোর্ট সমর্পণ করাকে বিশেষজ্ঞরা ‘সেফ এক্সিট’ বা নিরাপদ প্রস্থানের কৌশল হিসেবে দেখছেন। কূটনৈতিক পাসপোর্টে বিদেশ ভ্রমণে সরকারি আদেশের (GO) বাধ্যবাধকতা থাকলেও সবুজ পাসপোর্টে তা নেই। বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, নির্বাচন-পরবর্তী সম্ভাব্য আইনি জটিলতা বা জবাবদিহিতা এড়াতেই তড়িঘড়ি করে এই পরিবর্তন করা হয়েছে, যা নৈতিকতা ও প্রশাসনিক প্রটোকলের চরম পরিপন্থি
বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, ক্ষমতায় থাকা অবস্থায় উপদেষ্টাদের লাল পাসপোর্ট ছেড়ে সবুজ পাসপোর্ট নেওয়ার ঘটনা নজিরবিহীন, অনৈতিক ও প্রোটোকলবিরোধী। এতে রাষ্ট্রীয় প্রশাসন, আইনি কাঠামো ও সরকারের প্রতি জনগণের আস্থা মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হবে। তারা বলছেন, এটি আইন ভাঙার শামিল, গুরুদায়িত্বে থাকা ব্যক্তিদের পক্ষ থেকে দায় এড়ানোর চেষ্টা এবং প্রশাসনিক নীতিমালার প্রতি সরাসরি আঘাত। তাদের মতে, এই আচরণ ইঙ্গিত দেয় উপদেষ্টারা নির্বাচন-পরবর্তী সম্ভাব্য আইনগত বা রাজনৈতিক জটিলতা এড়াতে আগেভাগেই পিছু হটার পথ তৈরি করছেন।
সবুজ পাসপোর্ট নিলেন যারা
ঢাকা পোস্টের অনুসন্ধান বলছে, এখন পর্যন্ত মোট পাঁচজন উপদেষ্টা লাল পাসপোর্ট ছেড়ে সবুজ পাসপোর্ট গ্রহণ করেছেন। তাদের মধ্যে তিনজন বর্তমান উপদেষ্টা পরিষদে রয়েছেন। অপরদিকে, পদত্যাগ করেছেন এমন উপদেষ্টা রয়েছেন দুজন। এছাড়া অন্তত তিনজন উপদেষ্টা বর্তমানে সবুজ পাসপোর্টের ‘পাইপলাইনে’ রয়েছেন।
• আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়া
ঢাকা পোস্টের হাতে আসা নথিতে দেখা গেছে, উপদেষ্টাদের মধ্যে সবার আগে লাল পাসপোর্ট ছেড়ে সবুজ পাসপোর্টের জন্য চেষ্টা করেন স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রণালয় এবং যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয়ের সাবেক উপদেষ্টা আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়া। নথি বলছে, এই উপদেষ্টা তার কূটনৈতিক পাসপোর্ট (যাহার নাম্বার D-00018...) জমা দিয়ে অনেক আগেই সবুজ পাসপোর্টের জন্য আবেদন করেন এবং তা সংগ্রহ করেন।
সাবেক উপদেষ্টা নাহিদ ইসলাম ও নিরাপত্তা বিশ্লেষকরা এই ঘটনাকে গণঅভ্যুত্থানের চেতনার সঙ্গে সরাসরি বিশ্বাসঘাতকতা এবং আস্থার সংকট হিসেবে চিহ্নিত করেছেন। তাদের মতে, রাজপথে জীবন দেওয়া সাধারণ মানুষের ওপর ভরসা না করে উপদেষ্টারা নিজেদের ব্যক্তিগত ভবিষ্যৎ নিশ্চিত করতে রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে ‘লিয়াজোঁ’ বা আঁতাত করছেন। দায়িত্ব পালনকালে এমন বিচ্যুতি রাষ্ট্রের উচ্চপদস্থ ব্যক্তিদের প্রতি জনগণের বিশ্বাসকে মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করবে এবং এটি একটি প্রশাসনিক বিশৃঙ্খলার নজির
• অধ্যাপক ড. বিধান রঞ্জন রায় পোদ্দার
ক্ষমতার মসনদে থেকেও প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা অধ্যাপক ড. বিধান রঞ্জন রায় পোদ্দার এবং তার স্ত্রী একইসঙ্গে লাল পাসপোর্ট বা কূটনৈতিক পাসপোর্ট ছেড়ে সবুজ পাসপোর্ট নিয়েছেন। নথি বলছে, এই উপদেষ্টা এবং তার স্ত্রী ডা. রুমা সাহা কূটনৈতিক পাসপোর্ট (যাহার নাম্বার D-00018... এবং D-00018...) জমা দিয়ে সাধারণ পাসপোর্ট বা সবুজ পাসপোর্ট গ্রহণ করেছেন।
• আদিলুর রহমান খান
ক্ষমতায় থেকেও কূটনৈতিক পাসপোর্ট ছেড়েছেন সাবেক মানবাধিকারকর্মী, অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের গৃহায়ন ও গণপূর্ত, শিল্প, স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা আদিলুর রহমান খানও। এই উপদেষ্টা তার কূটনৈতিক পাসপোর্ট (যাহার নাম্বার D-00019...) জমা দিয়ে নিয়েছেন সাধারণ পাসপোর্ট।
• খোদা বকশ চৌধুরী
সম্প্রতি স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব থেকে পদত্যাগ করেছেন প্রধান উপদেষ্টার বিশেষ সহকারী খোদা বকশ চৌধুরী। তিনি এই মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বপালনকালে কূটনৈতিক পাসপোর্ট গ্রহণ করেন। তিনিও কূটনৈতিক পাসপোর্ট (যাহার নাম্বার D-00017...) জমা দিয়ে সাধারণ পাসপোর্টের জন্য আবেদন করেন। সেই আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় থেকে তার আবেদন মঞ্জুর করে সাধারণ পাসপোর্ট প্রদানের জন্য নির্দেশ দেওয়া হয় পাসপোর্ট অধিদপ্তরকে।
• আলী ইমাম মজুমদার
এদিকে, ক্ষমতায় থেকেও খাদ্য ও ভূমি মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বে থাকা উপদেষ্টা এবং সাবেক মন্ত্রীপরিষদ সচিব আলী ইমাম মজুমদারও নাম লিখিয়েছেন এই তালিকায়। এই উপদেষ্টা তার কূটনৈতিক পাসপোর্ট (যাহার নাম্বার D-00017...) জমা দিয়ে সাধারণ পাসপোর্টের জন্য আবেদন করেন। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় থেকে তার আবেদনও মঞ্জুর করে পাসপোর্ট অধিদপ্তরে পাঠানো হয়।

তালিকার বাইরে সবুজ পাসপোর্ট পাননি কোনো উপদেষ্টা
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের এক অতিরিক্ত সচিব ঢাকা পোস্টকে বলেন, উপদেষ্টাদের মধ্যে পাঁচজনের বাইরে অন্য কাউকে (উপদেষ্টা) কূটনৈতিক পাসপোর্ট থেকে সবুজ পাসপোর্ট দেওয়ার অনুমতি দেওয়া হয়নি। তবে, তিনজন উপদেষ্টা পাইপলাইনে রয়েছেন। তবে, তারা কারা— এ বিষয়ে বলা যাবে না। ওই কর্মকর্তা আরও বলেন, ‘অনেক পত্রিকায় মুখরোচক অনেক কথাই ছড়ানো হচ্ছে। বলা হচ্ছে, ১৩ জনের অধিক উপদেষ্টা লাল পাসপোর্ট জমা দিয়েছেন, বিষয়টি সঠিক নয়। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের অনুমতি ছাড়া কেউ সবুজ পাসপোর্ট পাবেন না। আমরা যাদের বিষয়ে অনুমতি দিয়েছি শুধু তারাই সবুজ পাসপোর্ট পেয়েছেন।
লাল পাসপোর্ট থেকে সবুজ পাসপোর্ট চাইছেন— এমন পাইপলাইনে থাকা উপদেষ্টাদের মধ্যে বর্তমান স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা লেফটেন্যান্ট জেনারেল (অব.) জাহাঙ্গীর আলম চৌধুরীও রয়েছেন। অপর একটি সূত্র বলছে, এই তালিকায় রয়েছেন প্রাণিসম্পদ উপদেষ্টা ফরিদা আখতারও। তবে, স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টার আবেদন মন্ত্রণালয়েই রয়েছে। তিনি চাইলে এটি মঞ্জুর করে পাসপোর্ট অধিদপ্তরে পাঠানো হবে— বলছেন সংশ্লিষ্টরা
পাইপলাইনে স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা
ঢাকা পোস্টের অনুসন্ধান বলছে, লাল পাসপোর্ট থেকে সবুজ পাসপোর্ট চাইছেন— এমন পাইপলাইনে থাকা উপদেষ্টাদের মধ্যে বর্তমান স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা লেফটেন্যান্ট জেনারেল (অব.) জাহাঙ্গীর আলম চৌধুরীও রয়েছেন। অপর একটি সূত্র বলছে, এই তালিকায় রয়েছেন প্রাণিসম্পদ উপদেষ্টা ফরিদা আখতারও। তবে, স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টার আবেদন মন্ত্রণালয়েই রয়েছে। তিনি চাইলে এটি মঞ্জুর করে পাসপোর্ট অধিদপ্তরে পাঠানো হবে— বলছেন সংশ্লিষ্টরা।
লাল পাসপোর্ট ছেড়েছেন আইজিপিও
একাধিক দায়িত্বশীল সূত্র নিশ্চিত করেছে, পাঁচ উপদেষ্টার পাশাপাশি পুলিশের মহাপরিদর্শক বাহারুল আলম লাল পাসপোর্ট জমা দিয়ে সবুজ পাসপোর্ট নিচ্ছেন। তার আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় থেকে সব প্রক্রিয়া শেষ করে পাসপোর্ট অধিদপ্তরে পাঠানো হয়েছে। ফলে তার সবুজ পাসপোর্ট পেতে আর কোনো প্রতিবন্ধকতা থাকছে না। তবে, নির্বাচনের গুরুদায়িত্ব কাঁধে নিয়ে পুলিশপ্রধানের এমন সিদ্ধান্তে প্রশ্ন উঠেছে প্রশাসনের ভেতর-বাইরে।

জটিলতা ছিল আসিফ মাহমুদের পাসপোর্ট নিয়ে
ঢাকা পোস্টের অনুসন্ধান বলছে, সবার আগে সবুজ পাসপোর্টের জন্য আবেদন করেও লম্বা সময় ধরে অপেক্ষা করতে হয়েছে খোদ স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রণালয় এবং ক্রীড়া মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বে থাকা উপদেষ্টা আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়াকে। জানা গেছে, আসিফ মাহমুদকে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার সবুজ পাসপোর্ট দেবে কি দেবে না, তা নিয়ে একটি উচ্চপর্যায়ের বৈঠক হয় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে। ওই বৈঠকে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বে থাকা প্রধান উপদেষ্টার বিশেষ সহকারী খোদা বকশ চৌধুরীকে সাধারণ পাসপোর্ট দেওয়ার সিদ্ধান্ত হয়। তবে, আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়াকে সবুজ পাসপোর্ট দেওয়ার বিষয়ে অংশগ্রহণকারীদের একাংশ মত দিলেও কয়েকজন ‘এই সিদ্ধান্ত নির্বাচিত সরকার নিলেই ভালো হবে’— এমন মন্তব্য করেন। ফলে আসিফ মাহমুদের সবুজ পাসপোর্ট পাওয়া অনেকটা অনিশ্চিত হয়ে পড়ে। তবে, এই সরকারের মেয়াদের শেষদিকে অন্য উপদেষ্টাদের সঙ্গে তার অনুকূলেও সবুজ পাসপোর্ট প্রদানের সিদ্ধান্ত নেয় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়।
কেন জরুরি সবুজ পাসপোর্ট
নিয়ম অনুযায়ী সরকারের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে থাকা ব্যক্তিরা লাল পাসপোর্ট বা কূটনৈতিক পাসপোর্ট গ্রহণ করে থাকেন। এই পাসপোর্ট দিয়ে দেশের বাইরে ভ্রমণের ক্ষেত্রে যেমন নানা সুবিধা রয়েছে, তেমনি রয়েছে কিছু জটিলতাও। কূটনৈতিক পাসপোর্ট নিয়ে দেশের বাইরে যেতে হলে অবশ্যই সরকারি আদেশ বা জিও প্রয়োজন হয়। ফলে চাইলেই একজন কর্মকর্তা দেশের বাইরে যেতে পারেন না। এক্ষেত্রে তাদের সরকারি আদেশ থাকা বাধ্যতামূলক। অপরদিকে, সবুজ পাসপোর্টধারীরা চাইলে সরকারি অনুমতি ছাড়াই দেশের বাইরে ভ্রমণ করতে পারেন। এক্ষেত্রে সম্ভাব্য সব আইনি জটিলতা এড়ানো সম্ভব।
ক্ষমতায় থেকেও কেন পাসপোর্ট ছাড়ছেন উপদেষ্টারা
একাধিক সূত্রে জানা গেছে, নির্বাচনের পর সরকার পরিবর্তন হলে দেশত্যাগে যাতে কোনো প্রশাসনিক বা আইনি বাধার মুখে পড়তে না হয়, সেজন্যই উপদেষ্টারা আগেভাগে এই পথ বেছে নিয়েছেন।
‘নজিরবিহীন’ বলছেন বিশেষজ্ঞরা
ক্ষমতায় থেকে লাল পাসপোর্ট ছাড়ার বিষয়ে সাবেক মন্ত্রিপরিষদ সচিব এ এস এম আব্দুল হালিম কথা বলেন ঢাকা পোস্টের সঙ্গে। তিনি বলেন, ‘লাল পাসপোর্ট সমর্পণের বিষয়টি রাষ্ট্রীয় আচারে আছে; নিয়ম-কানুনও আছে। সেই অনুযায়ী কাজ হওয়া উচিত। সরকারও নিয়ম অনুযায়ী কার্যকর ব্যবস্থা নেবে— এটা সবাই আশা করে।’ প্রবীণ এই আমলা আরও বলেন, ‘আইনের বিরুদ্ধে গিয়ে বা নিয়মের বাইরে গিয়ে কোনো কাজ করলে জনগণ বিক্ষুব্ধ হতেই পারে। এটা করাও উচিত নয়।’
নজিরবিহীন ও অনৈতিক : মনজুর আহমেদ
সেন্টার ফর গভর্ন্যান্স স্টাডিজের (সিজিএস) চেয়ারম্যান ড. মনজুর আহমেদ চৌধুরী এই ঘটনাকে ‘নজিরবিহীন ও অনৈতিক’ হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন। তিনি বলেন, ‘ক্ষমতায় থাকা অবস্থায় কূটনৈতিক পাসপোর্ট ত্যাগ করে সাধারণ সবুজ পাসপোর্ট গ্রহণ করা জনগণের মধ্যে সরকারের প্রতি চরম আস্থার সংকট তৈরি করবে। এটি কেবল নজিরবিহীনই নয়, বরং ইঙ্গিত দেয় যে তারা হয়তো বড় ধরনের কোনো দুর্নীতির সঙ্গে জড়িত। আর সে কারণেই আগেভাগে নিরাপদ প্রস্থানের পথ বা সেফ এক্সিট তৈরি করে রাখছেন।’
তিনি যোগ করেন, দায়িত্বপালনকালীন সবুজ পাসপোর্ট নেওয়া বেআইনি। প্রশ্ন তুলে তিনি বলেন, ‘যতদিন তারা দায়িত্বে আছেন, ততদিন লাল পাসপোর্ট ব্যবহারে সমস্যা কোথায়? লাল পাসপোর্ট দিয়ে বিদেশে যেতে হলে সরকারি আদেশের (জিও) প্রয়োজন হয়। সম্ভবত তারা সেই জবাবদিহিতা এড়াতে চাইছেন। নির্বাচনের ঠিক আগে বা পরে তারা যখন দেশ ছাড়বেন, তখন কী কারণ দেখাবেন— সেই জটিলতা এড়াতেই কি এই গোপনীয়তা?’
তদন্ত ও আনুষ্ঠানিক ব্যাখ্যা চাওয়া জরুরি : ব্যারিস্টার জাহিদ
জানতে চাইলে প্রশাসনিক আইন বিশেষজ্ঞ ব্যারিস্টার জাহিদ রহমান বলেন, ‘এটি রাষ্ট্রীয় প্রশাসনের ওপর সরাসরি আঘাত এবং বিদ্যমান প্রটোকলের সুস্পষ্ট লঙ্ঘন।’ তিনি এর নেপথ্যে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করে বলেন, “এই পদক্ষেপ প্রমাণ করে যে রাষ্ট্রীয় দায়িত্ব পালনের ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের ন্যূনতম নৈতিক দায়বদ্ধতা নেই। তারা প্রটোকল না বুঝে নয়, বরং ইচ্ছাকৃতভাবে নিয়ম এড়িয়ে একটি ‘নিরাপদ পথ’ খুঁজছেন।’”
“দায়িত্বের মেয়াদ শেষ হওয়ার আগেই সবুজ পাসপোর্ট নেওয়া— স্পষ্ট সংকেত দেয় যে, তারা পরবর্তী সময়ের সম্ভাব্য আইনি বা রাজনৈতিক দায় এড়ানোর প্রস্তুতি নিচ্ছেন। এটি প্রশাসনিক নীতির পরিপন্থী ও অপেশাদারিত্বের চূড়ান্ত উদাহরণ, যা এক ধরনের ‘অসদাচরণ’ হিসেবে গণ্য হতে পারে।”
তিনি বলেন, একজন উপদেষ্টা বা আইজিপির মতো উচ্চপদস্থ ব্যক্তির হঠাৎ পাসপোর্ট পরিবর্তন কেবল নৈতিকতার প্রশ্ন নয়, এটি রাষ্ট্রের নিরাপত্তা, গোয়েন্দা ঝুঁকি এবং আন্তর্জাতিক যোগাযোগ ব্যবস্থার সঙ্গেও সম্পর্কিত। এই রহস্যজনক আচরণের পেছনে সরকারের পক্ষ থেকে তদন্ত ও আনুষ্ঠানিক ব্যাখ্যা চাওয়া জরুরি।
ব্যারিস্টার জাহিদের মতে, “ক্ষমতার কেন্দ্রে থেকে লাল পাসপোর্ট ছাড়ার অর্থ হলো— তারা নিজেরাই রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থার ওপর আস্থা হারিয়েছেন। এটি প্রশাসনে চরম বিশৃঙ্খলা তৈরি করবে এবং জনগণের মনে সরকারের ভাবমূর্তি মারাত্মকভাবে ক্ষুণ্ন করবে। একে কোনোভাবেই ‘সাধারণ প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত’ বলার সুযোগ নেই; এটি গভীর রাজনৈতিক ও আইনি প্রশ্নের জন্ম দেয়।”
গণঅভ্যুত্থানের চেতনার সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা : নাহিদ ইসলাম
উপদেষ্টাদের ‘সেফ এক্সিট’ বা নিরাপদ প্রস্থানের প্রবণতা নিয়ে সাবেক তথ্য উপদেষ্টা নাহিদ ইসলাম তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন। তিনি মনে করেন, রাজনৈতিক দল ও নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিদের ওপর অতিমাত্রায় আস্থা রাখাটাই ছিল তাদের বড় ভুল। নাহিদ ইসলাম বলেন, ‘রাজনৈতিক নেতা ও উপদেষ্টাদের অনেককে বিশ্বাস করা আমাদের ভুল ছিল। আমরা নাগরিক সমাজ ও রাজনৈতিক দলগুলোর ওপর যে আস্থা রেখেছিলাম, সেই জায়গায় আসলে আমরা প্রতারিত হয়েছি। অনেক উপদেষ্টা এই সুযোগে নিজেদের আখের গুছিয়েছেন এবং গণঅভ্যুত্থানের চেতনার সঙ্গে সরাসরি বিশ্বাসঘাতকতা করেছেন।’
তার মতে, সরকারকে শক্তিশালী করতে ছাত্র-নেতৃত্বের ওপরই বেশি নির্ভর করা উচিত ছিল। তিনি হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেন, ‘সময় এলে আমরা সেই সব উপদেষ্টার নাম জনসমক্ষে প্রকাশ করব যারা বিপ্লবের সঙ্গে বেইমানি করেছেন।’ তিনি অভিযোগ করেন, “উপদেষ্টাদের অনেকেই বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের সঙ্গে তলে তলে আঁতাত বা ‘লিয়াজোঁ’ করছেন এবং নিজেদের জন্য নিরাপদ প্রস্থানের পথ খুঁজছেন। এই বিচ্যুতির মাসুল এখন পুরো রাষ্ট্রকে পোহাতে হচ্ছে।”
নাহিদ ইসলামের ভাষ্যমতে, ‘এসব উপদেষ্টার মনে রাখা উচিত ছিল যে তাদের নিয়োগকর্তা কোনো দল নয়, বরং গণঅভ্যুত্থানের বিপ্লবী জনতা। যদি তারা রাজপথে জীবন দেওয়া সাধারণ মানুষের ওপর ভরসা রাখতেন, তবে আজ তাদের এমন নৈতিক বিচ্যুতি হতো না।’
দায়িত্বে অবহেলা ও পলায়নপর মনোবৃত্তি : কাজী শরীফ উদ্দিন
নিরাপত্তা বিশ্লেষক কর্নেল (অব.) কাজী শরীফ উদ্দিন মনে করেন, যারা রাষ্ট্রসেবার মহান দায়িত্বে ছিলেন, তারা কেবল ব্যর্থই হননি, বরং চরম আত্মস্বার্থপরতার পরিচয় দিয়েছেন। তিনি বলেন, ‘রাষ্ট্রের সেবক হয়েও তারা দায়িত্ব পালনে ব্যর্থ হয়েছেন। এখন নিজেদের পালানোর পথ সুগম করতে কূটনৈতিক পাসপোর্ট ত্যাগ করে সবুজ পাসপোর্ট গ্রহণ করছেন— এটি স্পষ্টতই নিজেদের স্বার্থ রক্ষার একটি হীন চেষ্টা।’
তার মতে, এই ব্যক্তিরা শুধু দায়িত্বজ্ঞানহীনই নন, তারা রাষ্ট্রের সম্পদ, সুযোগ-সুবিধা এবং ক্ষমতাকে ব্যক্তিগত স্বার্থে ব্যবহার করেছেন। দেশের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার চেয়ে নিজেদের জন্য ‘নিরাপদ প্রস্থানের পথ’ বা এক্সিট রুট বানানোই এখন তাদের প্রধান লক্ষ্য হয়ে দাঁড়িয়েছে।
তিনি কঠোর ভাষায় বলেন, “তারা জনগণের টাকায় সব সুবিধা নিয়েছেন, আর এখন সংকটকালে সেই জনগণকে ফেলে রেখে পালানোর প্রস্তুতি নিচ্ছেন। অর্থ, প্রভাব এবং রাষ্ট্রীয় সুবিধার যে ‘তছরুপ’ তারা করেছেন, এই পাসপোর্ট বদল সেই অপরাধেরই একটি ধারাবাহিকতা।”
কর্নেল শরীফ মনে করেন, দায়িত্বে থাকা অবস্থায় দায় এড়াতে বিদেশের পথ তৈরি করে রাখা সরাসরি নৈতিক ও প্রশাসনিক অপরাধের শামিল। দেশ যখন নির্বাচনের মতো একটি চূড়ান্ত সংকটময় মুহূর্তে দাঁড়িয়ে, তখন নিরাপত্তার দায়িত্বে থাকা ব্যক্তিদের এমন আচরণ প্রমাণ করে নাগরিক সুরক্ষা নয়, বরং নিজেদের প্রাণ বাঁচানোই তাদের কাছে বড় হয়ে দাঁড়িয়েছে। একে তিনি অত্যন্ত ‘লজ্জাজনক’ বলে অভিহিত করেন।
পাসপোর্ট পাওয়া আমার ‘নাগরিক অধিকার’ : উপদেষ্টা আলী ইমাম
নিজের অবস্থান ব্যাখ্যা করে ভূমি ও খাদ্য উপদেষ্টা আলী ইমাম মজুমদার জানান, উপদেষ্টা হিসেবে দায়িত্ব নেওয়ার আগেও তার ১০ বছর মেয়াদি সাধারণ (সবুজ) পাসপোর্ট ছিল। দায়িত্বের প্রয়োজনে কূটনৈতিক বা লাল পাসপোর্ট নিতে হয়।
তিনি জানান, তার আগের সবুজ পাসপোর্টে আমেরিকার পাঁচ বছরের একটি ভিসা লাগানো রয়েছে। মূলত সেই সুবিধাটি বহাল রাখতেই তিনি পুনরায় সবুজ পাসপোর্টের আবেদন করেছেন।
দেশ ছেড়ে চলে যাওয়ার গুঞ্জন নাকচ করে দিয়ে তিনি বলেন, ‘আল্লাহর রহমতে দেশ ছেড়ে যাওয়ার কোনো প্রয়োজন আমার নেই। বাংলাদেশ ছাড়া আমার থাকার মতো আর কোনো জায়গা নেই। তবে, সময়-সুযোগ পেলে বিদেশে বেড়াতে যাওয়ার ইচ্ছা আছে।’ মেয়াদের শেষে এসে কেন এই তড়িঘড়ি— এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘একজন নাগরিক হিসেবে আপনার যেমন পাসপোর্ট পাওয়ার অধিকার আছে, আমারও আছে। সেই আইনি অধিকার থেকেই আমি আবেদন করেছি এবং পাসপোর্ট অধিদপ্তর তা মঞ্জুর করেছে।’