Image description

রাত পোহালেই ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন। এতদিন প্রচার-প্রচারণা ও জনসংযোগে ভোটারের হিসাব মিলিয়েছেন প্রার্থী ও তাদের সমর্থকরা। এবার ভোটারদের হিসাব মেলানোর পালা। ব্যালটের মাধ্যমে আগামী ৫ বছরের জন্য জনপ্রতিনিধি নির্বাচন করবেন তারা।

সিলেটের ছয়টি আসনে ৩৩ জন প্রার্থী প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন। আসনগুলোর চারটিতে বিএনপি দলীয় প্রার্থীরা এগিয়ে আছেন বলে দলটির দাবি। আর বাকি দুটি আসনে তাদের জয়ের আশা ‘ফিফটি-ফিফটি’। পক্ষান্তরে জামায়াতের নেতাকর্মীদের দাবি, কেবল সিলেট-২ আসন ছাড়া বিএনপির প্রার্থীরা আর কোথাও এগিয়ে নেই, জামায়াত একটিতে এগিয়ে রয়েছে, অন্যগুলোতে হাড্ডাহাড্ডি লড়াই হবে।

অবশ্য রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, আওয়ামী লীগবিহীন এই নির্বাচনে সব আসনে নীরব ভোটার বেশি। নির্বাচনের ফলফল নির্ধারণ করবেন ৪০ শতাংশের বেশি নীরব ভোটাররা। রাজনৈতিক নেতারাও তাদের জয়-পরাজয়ের হিসাব কষছেন।

সিলেট-১
সিলেটের মর্যাদাপূর্ণ এই আসন নিয়ে মিথ রয়েছে—সিলেট যার, সরকার তার।

স্বাধীনতা পরবর্তী সময় থেকে দেখা গেছে সিলেট-১ আসনে যে দলের প্রার্থী বিজয়ী হন, সে দলই সরকার গঠন করে।

এই আসনে আট প্রার্থী প্রতিদ্বন্দ্বিতা করলেও মূল লড়াইয়ে আছেন ধানের শীষ প্রতীকে বিএনপির প্রার্থী খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির এবং ১১ দলীয় জোট মনোনীত দাঁড়িপাল্লা প্রতীকে জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থী হাবিবুর রহমান। এই দুই প্রার্থীর মধ্যে হাড্ডাহাড্ডি লড়াই হবে।

খন্দকার মুক্তাদির দীর্ঘদিন ধরে এই আসনে প্রচারণা চালিয়েছেন। ব্যবসায়ী ও রাজনীতিবিদ হিসেবে হাবিবুর রহমানও লড়াইয়ে অবতীর্ণ হন।

খন্দকার আব্দুল মুক্তাদিরের বাবা খন্দকার আবদুল মালিক সিলেট বিএনপির প্রতিষ্ঠাতাদের একজন। তিনি ১৯৭৯ সালের দ্বিতীয় জাতীয় সংসদ নির্বাচনে সিলেট-৮ আসন থেকে বিএনপির প্রার্থী হিসেবে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। ১৯৯১ সালের পঞ্চম ও ১৫ ফেব্রুয়ারি ১৯৯৬ সালের ষষ্ঠ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে তিনি সংসদ সদস্য হন। তার কনিষ্ঠ ছেলে বিএনপির চেয়ারম্যানের উপদেষ্টা খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির ২০১৮ সালেও বিএনপির হয়ে জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের প্রার্থী ছিলেন।

এদিকে, বিএনপির অন্যতম প্রতিদ্বন্দ্বী জামায়াতে ইসলামীর কেন্দ্রীয় মজলিসে শুরা সদস্য, সিলেট জেলার আমির হাবিবুর রহমান। তাকে নিয়ে দলে কোনো কোন্দল নেই, নেই কোনো অসন্তোষ। ইসলামী ছাত্রশিবির দিয়ে রাজনীতির পথ চলা শুরু হাবিবুরের। ১৯৮২ সালে জামায়াতে ইসলামীতে যোগ দেন। তিনি সিলেট জেলা শাখার আমির থেকে শুরু করে বিভিন্ন পদে দায়িত্ব পালন করেছেন। এর আগে হাবিবুর রহমান সিলেট-৬ আসন থেকে নির্বাচন করেছেন।

রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, প্রচারণার প্রথম দিকে ভোটের মাঠে হাবিবুর রহমানের চেয়ে যোজন যোজন এগিয়েছিলেন মুক্তাদির। কিন্তু সময় যত গড়িয়েছে, ততই ভোটের সমীকরণ পাল্টেছে। সিলেটে ভোটার সংখ্যার আধিক্যে অর্ধেকের বেশি নারী ভোটার। সেসব ভোটারকে টার্গেট করে জামায়াতের নারী কর্মীরা বাসা-বাড়িতে ‘ডোর টু ডোর’ ক্যাম্পেইন করে দাঁড়িপাল্লার পক্ষে ভোটে প্রভাব বিস্তার করেছেন। পক্ষান্তরে বিএনপির প্রার্থীর প্রচারণার পুরোটা সময় রাজপথে, সভা-সমাবেশ, উঠান বৈঠক বেশি হয়েছে। তাছাড়া তরুণ ভোটার ও বস্তির লোকজনকে আয়ত্তে নিয়েছেন। এ কারণে সিলেট-১ আসনে ভোটের মাঠে বিএনপি ও জামায়াত প্রার্থীর মধ্যে হাড্ডাহাড্ডি লড়াই হবে বলে ধারণা করছেন ভোটাররা।

এই আসনে অন্য প্রার্থীরা হলেন—সিপিবির মোহাম্মদ আনোয়ার হোসেন (কাস্তে), বাসদের প্রণব জ্যোতি পাল (মই), ইনসানিয়াত বিপ্লব বাংলাদেশের শামীম মিয়া (আপেল), গণঅধিকার পরিষদের আকমল হোসেন (ট্রাক), ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ মাহমুদুল হাসান (হাতপাখা), বাসদ-মার্কসবাদীর সঞ্জয় কান্তি দাস (কাঁচি)।

সিলেট-২: নির্ভার লুনা
বিশ্বনাথ-ওসমানীনগর উপজেলা নিয়ে গঠিত সিলেট-২ আসনে এক সময় সংসদ সদস্য ছিলেন বিএনপি নেতা এম ইলিয়াস আলী। তিনি নিখোঁজ হওয়ার পর তার স্ত্রী তাহসিনা রুশদীর লুনা বিএনপির রাজনীতিতে আসেন। এবার তিনি ধানের শীষ নিয়ে লড়াই করছেন। তার মূল প্রতিদ্বন্দ্বী ১১ দলীয় জোটের প্রার্থী খেলাফত মজলিসের দেওয়াল ঘড়ি প্রতীকের প্রার্থী মুহাম্মদ মুনতাসির আলী। এই ‍দুই প্রার্থীর মধ্যে তীব্র লড়াই হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে বলে স্থানীয় ভোটারদের ধারণা।

স্থানীয়দের ধারণা তারা মনে করেন, ইলিয়াস আলীর কারণে এখানে ব্যাপক জনপ্রিয় তাহসিনা রুশদীর লুনা। তিনি ভোটের প্রচারে ইলিয়াস আলীর সময়ে হওয়া উন্নয়ন কর্মকাণ্ড তুলে ধরছেন।

এ আসনে গণফোরামের মুজিবুল হক (উদীয়মান সূর্য), ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের আমির উদ্দিন (হাতপাখা), জাতীয় পার্টির মাহবুবুর রহমান চৌধুরী (লাঙ্গল) প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন।

সিলেট-৩:
ফেঞ্চুগঞ্জ, বালাগঞ্জ ও দক্ষিণ সুরমা উপজেলা নিয়ে গঠিত এই আসনে বিএনপির প্রার্থী এম এ মালিক। তার সঙ্গে মূল লড়াইয়ে আছেন বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের মুসলেহ উদ্দিন রাজু। প্রখ্যাত ইসলামী চিন্তাবিদ মরহুম আল্লামা মাওলানা নুরুদ্দিন গহরপুরীর সন্তান পরিচয়ে ভোটের মাঠে সমাদৃত হচ্ছেন তিনি। তবে বিএনপি ঐক্যবদ্ধ থাকলে ভোটের ফলাফল পক্ষে আসতে পারে এম এ মালিকের।

এ আসনে ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের প্রার্থী আনওয়ারুল হক (হাতপাখা), জাতীয় পার্টির আতিকুর রহমান (লাঙ্গল), স্বতন্ত্র প্রার্থী মোস্তাকিম রাজা (ফুটবল), স্বতন্ত্র প্রার্থী মাইনুল বাকর (কম্পিউটার) প্রতিদ্বন্দ্বী।

সিলেট-৪
বিএনপি চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা, সিলেট সিটি করপোরেশনের দুইবারের সাবেক মেয়র আরিফুল হক চৌধুরী এখানে ধানের শীষের প্রার্থী। আর জামায়াতে ইসলামী থেকে দাঁড়িপাল্লা নিয়ে প্রার্থী হয়েছেন জয়নাল আবেদীন। আরিফ ও জয়নালের মধ্যে মূল লড়াই হবে, ধারণা স্থানীয়দের।

সিলেট-৫
জকিগঞ্জ ও কানাইঘাট উপজেলা নিয়ে গঠিত আসনটিতে ত্রিমুখী লড়াই হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। এরমধ্যে রয়েছেন বিএনপি থেকে বিদ্রোহী স্বতন্ত্র প্রার্থী মামুনুর রশিদ (ফুটবল)। আসনটিতে বিএনপি তার জোটের শরিক জমিয়তে উলামায়ে ইসলামের সভাপতি মাওলানা ওবায়দুল্লাহ ফারুককে ছেড়ে দিয়েছে। তিনি খেজুর গাছ প্রতীকে লড়ছেন। ২০১৮ সালেও তিনি বিএনপি জোট থেকে এই আসনে প্রার্থী হয়েছিলেন।

অন্যদিকে জামায়াতে ইসলামীর নেতৃত্বাধীন ১১ দলীয় জোটের পক্ষে এখানে প্রার্থী হয়েছেন খেলাফত মজলিসের মুফতি আব্দুল হাসান। তিনি দেওয়াল ঘড়ি প্রতীকে লড়ছেন।

তাদের সঙ্গে লড়াইয়ের ময়দানে এসেছেন আরেক আলোচিত রাজনীতিক মামুনুর রশিদ। সিলেটে তিনি ‘চাকসু মামুন’ নামেও বেশ পরিচিত। দলীয় সিদ্ধান্ত অমান্য করে বিএনপি থেকে পদ হারিয়ে বর্তমানে বেশ আলোচিত চাকসু মামুন।  তার গুরুত্ব অনুধাবন করে জেলা বিএনপির নেতারা ঘন ঘন জকিগঞ্জ ও কানাইঘাট সফর করছেন। জোট প্রার্থীর পক্ষে ভোট চাইছেন।

সবশেষ এই আসনে স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে বিজয়ী হয়েছিলেন ‘ফুলতলী হুজুর’ হিসেবে পরিচিত আব্দুল লতিফ চৌধুরীর ছেলে মাওলানা মোহাম্মদ হুছামুদ্দীন চৌধুরী।

ভোটারদের অভিমত, এই আসনে ‘ফুলতলী হুজুরের’ ব্যাপক সমর্থক রয়েছে। অতীতের নির্বাচনে দেখা গেছে, ফুলতলী হুজুরের সংগঠন ‘আনজুমানে আল ইসলাহের’ ভোট যেদিকে গেছে সেদিকেই ভোটের বাতাস তৈরি হয়েছে। এই ‘ভোট ব্যাংক’ সবসময় জয়-পরাজয়ে ভূমিকা রাখে।

ভোটারদের ধারণা, ‘ফুলতলী মসলকের’ একটা বড় ভোট ‘চাকসু মামুনের’ বাক্সে যেতে পারে। সেটা হয়তো মামুনের ব্যক্তি ইমেজ, দলের একাংশের সমর্থনের সঙ্গে বাড়তি শক্তি দেবে।

এ আসনে চারবার আওয়ামী লীগ, তিনবার জাতীয় পার্টি, বিএনপি, ইসলামী ঐক্যজোট ও জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থী একবার করে এবং দুবার স্বতন্ত্র প্রার্থী বিজয়ী হয়েছে।

সিলেট-৬: ত্রিমুখী লড়াইয়ের আভাস
গোলাপগঞ্জ ও বিয়ানীবাজার উপজেলা নিয়ে গঠিত এই আসনে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিএনপি প্রার্থী জেলা কমিটির সাধারণ সম্পাদক এমরান আহমদ চৌধুরী। তার সঙ্গে জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থী ঢাকা মহানগর উত্তরের আমির মুহাম্মদ সেলিম উদ্দিনের হাড্ডাহাড্ডি লড়াইয়ের সম্ভবনা তৈরি হয়েছে।

এ ছাড়া এই আসনে নিজস্ব ‘ভোট ব্যাংক’ রয়েছে জমিয়তে উলামায়ে ইসলামের ‘বিদ্রোহী’ প্রার্থী মাওলানা ফখরুল ইসলামের। তিনি লড়াইয়ের ময়দানে জোরেশোরে ছুটছেন।

এখানে বিএনপির মূল প্রতিবন্ধকতা দলীয় বিভক্তি। ২০১৮ সালে দলীয় মনোনয়ন পাওয়া ফয়সল আহমদ চৌধুরী, বিএনপির চেয়ারম্যানের উপদেষ্টা ডা. এনামুল হক চৌধুরী, বিএনপি নেত্রী সৈয়দা আদিবা হোসেন, বিএনপির নির্বাহী কমিটির সদস্য আবুল কাহের চৌধুরী এখানে মনোনয়নপ্রত্যাশী ছিলেন। বিশেষ করে ফয়সল আহমদ চৌধুরী বিএনপির বিকল্প প্রার্থী ছিলেন। পরে দলের চূড়ান্ত টিকেট পান এমরান আহমদ চৌধুরী। ভোটের মাঠে এরা কেউ প্রকাশ্যে ‘বিদ্রোহী’ হননি, তবে তাদের অসন্তোষ থাকতে পারে বলে ধারণা স্থানীয়দের। অন্যদিকে জামায়াতে ইসলামীর দুই উপজেলাতেই শক্ত ভিত্তি রয়েছে। দলে কোনো কোন্দল নেই, সেটি সেলিম উদ্দিনকে সুবিধা দিচ্ছে।

তবে কেউ কেউ এই আসনের এলাকাভিত্তিক ভোটের প্রভাবকে একেবারে নাকচ করে দিতে চান না। কারণ, জামায়াতের সেলিম উদ্দিন এবং জমিয়তে উলামায়ে ইসলামের প্রার্থী ফখরুল ইসলাম দুজনেরই বাড়ি বিয়ানীবাজার উপজেলাতে। তাই বিয়ানীবাজারের ভোট বিভিক্ত হলে বিএনপির প্রার্থী গোলাপগঞ্জ উপজেলায় ভালো অবস্থানে থাকবেন বলেও মনে করছেন তার নেতাকর্মীরা।

সিলেট বিভাগের ১৯টি আসনের মধ্যে সিলেট জেলায় ৬টি, সুনামগঞ্জে ৫টি, মৌলভীবাজার ও হবিগঞ্জে ৫টি করে আসন। ১৯টি আসনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন ১০৫ প্রার্থী।