বহু প্রতীক্ষিত ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও গণভোট আগামীকাল বৃহস্পতিবার। এই ঐতিহাসিক ভোটের লড়াই হবে সৌহার্দপূর্ণ উৎসবমুখর পরিবেশে, এমনটাই আশা অন্তর্বর্তী সরকার ও নির্বাচন কমিশনের। সকাল সাড়ে ৭টা থেকে বিকেল সাড়ে ৪টা পর্যন্ত ২৯৯ আসনে একটানা ভোট গ্রহণ চলবে। এ নির্বাচনে বিএনপি, জামায়াতে ইসলামী, জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি), ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশসহ ৫০টি দল অংশ নিচ্ছে। প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থীর সংখ্যা ২ হাজার ২৮ জন। রাজনৈতিক দলগুলোর প্রার্থীর সংখ্যা ১ হাজার ৭৫৫ জন ও স্বতন্ত্র প্রার্থী রয়েছেন ২৭৩ জন।
ভোট নিয়ে নানা শঙ্কা থাকলেও নির্বাচন কমিশন ভোট গ্রহণের সব প্রস্তুতি নিয়েছে। ভোটাররাও প্রস্তুত। গতকাল নির্বাচনের প্রচার শেষ হয়েছে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা মাঠে রয়েছেন। আজ কেন্দ্রে কেন্দ্রে পৌঁছানো হবে নির্বাচনি মালামাল। আইনশৃঙ্খলা রক্ষা, ভোট কেন্দ্রের নিরাপত্তা, পর্যবেক্ষণ ও প্রযুক্তিগত নজরদারিসহ সব দিক থেকেই নির্বাচন আয়োজনের প্রস্তুতি শেষ বলে জানিয়েছে কমিশন। নির্বাচন কমিশন বলছে, অতীতের যেকোনো সময়ের তুলনায় এবার বেশিসংখ্যক আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহারের মাধ্যমে একটি শান্তিপূর্ণ ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচন নিশ্চিত করা হবে। ভোটারদের ব্যাপক উপস্থিতির বিষয়ে আশাবাদ ইসির। বলছে, ভোটারদের মাঝে ব্যাপক উচ্ছ্বাস দেখা যাচ্ছে। বিশেষ করে ঢাকা ছেড়ে মানুষের গ্রামে যাওয়ার ঢল দেখে ভালো ভোটার টার্নআউটের ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছে। কমিশন সব রাজনৈতিক দল ও সমর্থকদের সুন্দর ও সৌহার্দপূর্ণ পরিবেশে ভোট উৎসব সম্পন্ন করার আহ্বান জানিয়েছে। এবার স্বতন্ত্র প্রার্থীসহ ৫০টি দলের প্রার্থীরা নির্বাচনে অংশ নিচ্ছেন। বিএনপি এবং জামায়াতে ইসলামীর নেতৃত্বে বড় দুই জোট এ নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছে।
সারা দেশে নির্বাচন কমিশনের (ইসি) প্রস্তুতি সম্পন্ন হয়েছে বলে জানিয়েছেন নির্বাচন কমিশনার ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) আবুল ফজল মো. সানাউল্লাহ। নির্বাচন কমিশন ভবনে গতকাল বিকালে এক ব্রিফিংয়ে তিনি বলেন, নির্বাচন আয়োজনের জন্য কমিশন পুরোপুরি প্রস্তুত এবং সার্বিক আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি সন্তোষজনক।
আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির মূল্যায়ন করতে গিয়ে তিনি বলেন, ‘বর্তমানে বিরাজমান আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতিতে নির্বাচন কমিশন সন্তুষ্ট। তবে নির্বাচনি তফসিল ঘোষণার পর বিচ্ছিন্ন কিছু অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা ঘটেছে। এসব ঘটনা না ঘটলে পরিবেশ আরও সুসংহত হতো।’
সকাল সাড়ে ৭টা থেকে বিকাল সাড়ে ৪টা পর্যন্ত ভোট গ্রহণ চলবে। তবে নির্ধারিত সময় শেষে কেন্দ্রের চৌহদ্দির মধ্যে ভোটার উপস্থিত থাকলে তাদের ভোট গ্রহণ করা হবে বলে ইসি জানায়।
৩০০ আসনের মধ্যে শেরপুর-৩ আসনে এক প্রার্থীর মৃত্যুর কারণে ভোট স্থগিত থাকছে। ফলে ২৯৯ আসনে জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও গণভোট একযোগে অনুষ্ঠিত হবে।
এবার নির্বাচনে ৫০টি রাজনৈতিক দল, স্বতন্ত্র প্রার্থীসহ ২ হাজার ২৮ জন প্রার্থী অংশ নিচ্ছেন। এর মধ্যে স্বতন্ত্র ২৭৩ জন, দলীয় ১ হাজার ৭৫৫ জন। নারী প্রার্থী রয়েছেন ৮৩ জন। সারা দেশে মোট ভোটারসংখ্যা প্রায় ১২ কোটি ৭৭ লাখ ১১ হাজার ৭৯৩ জন। এর মধ্যে পুরুষ ভোটার প্রায় ৬ কোটি ৪৮ লাখ ২৫ হাজার ৩৬১ জন এবং নারী ভোটার প্রায় ৬ কোটি ২৮ লাখ ৮৫ হাজার ২০০ জন। হিজড়া ১ হাজার ২৩২ জন। মোট ৪২ হাজার ৭৭৯টি কেন্দ্রে ভোট গ্রহণ অনুষ্ঠিত হবে। সাধারণ ২১ হাজার ২৭৩ কেন্দ্র। ঝুঁকিপূর্ণ ২১ হাজার ৫০৬ কেন্দ্র। ২৯৯টি কেন্দ্রে পোস্টাল ভোটের গণনা হবে। প্রায় ৫০ শতাংশ কেন্দ্রকে গুরুত্বপূর্ণ বা ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে।
নির্বাচন কমিশনার আবুল ফজল মো. সানাউল্লাহ বলেন, গত কয়েক সপ্তাহে সারা দেশে ৮৫০টির বেশি অবৈধ অস্ত্র উদ্ধার করা হয়েছে, যা সম্ভাব্য সহিংসতা প্রতিরোধে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর তৎপরতার প্রমাণ। তিনি রাজনৈতিক দল, প্রার্থী ও ভোটারদের শান্তিপূর্ণ ও উৎসবমুখর পরিবেশে নির্বাচন সম্পন্ন করার আহ্বান জানান।
পর্যবেক্ষক ও সাংবাদিক : নির্বাচন পর্যবেক্ষণে রয়েছেন ৪৫ হাজার ৩৩০ জন দেশীয় পর্যবেক্ষক এবং প্রায় ৩৫০ জন বিদেশি পর্যবেক্ষক। এ ছাড়া প্রায় ৯ হাজার ৭০০ জন সাংবাদিক নিবন্ধন করেছেন, যার মধ্যে বিদেশি সাংবাদিক রয়েছেন প্রায় ১৫৬ জন।
আইনশৃঙ্খলা ও প্রযুক্তি : নির্বাচনের নিরাপত্তায় সারা দেশে মোতায়েন করা হয়েছে প্রায় ৯ লাখ ৫৮ হাজার আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্য। পাশাপাশি দায়িত্ব পালন করছেন প্রায় ২ হাজার ১০০ জন নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট ও ৬৫৭ জন বিচারিক ম্যাজিস্ট্রেট। এবার প্রথমবারের মতো নির্বাচনে ড্রোন, বডি ওর্ন ক্যামেরা ও ব্যাপকভাবে সিসিটিভি ক্যামেরা ব্যবহার করা হচ্ছে। ইসি জানিয়েছে, ৯০ শতাংশের বেশি কেন্দ্রে সিসিটিভি নজরদারি নিশ্চিত করা হয়েছে।
ভোট গণনা ও ফলাফল : জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও গণভোটের দুটি ব্যালট একই সঙ্গে গণনা করা হবে। কেন্দ্র পর্যায়ে প্রাথমিক ফল প্রকাশের পর তা রিটার্নিং কর্মকর্তার মাধ্যমে নির্বাচন কমিশনে পাঠানো হবে। বেশির ভাগ আসনের ফলাফল মধ্যরাতের মধ্যেই পাওয়া যাবে বলে আশা করছে কমিশন।
ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) আবুল ফজল মো. সানাউল্লাহ বলেন, ‘এই পর্যন্ত যে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি আছে নির্বাচন কমিশন সন্তুষ্ট। যে বিচ্ছিন্ন ঘটনাগুলো ঘটেছে এগুলো না ঘটলে আরও ভালো হতো। অতীতের যেকোনো সময়ের চেয়ে আমরা ভালো অবস্থায় আছি। সারা দেশে প্রায় ৯ লাখ ৫৮ হাজার আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্য ডেপ্লয় হয়েছে।’
ভোটের মাঠে আইনশৃঙ্খলা পরিবেশের বিষয়ে সন্তোষ প্রকাশ করে সানাউল্লাহ বলেন, আইনশৃঙ্খলা রক্ষার্থে প্রথমবারের মতো এবার ইউএভি আনম্যানড এরিয়াল ভেহিক্যাল ব্যবহার করা হচ্ছে। ড্রোন ব্যবহার করা হচ্ছে। বডি ওর্ন ক্যামেরা ব্যবহার করা হচ্ছে। পুরো দেশেই এটা বিস্তৃত থাকবে। কিছু কিছু ক্ষেত্রে ওভারল্যাপ থাকবে। সিসিটিভি ক্যামেরা স্থাপন করা হয়েছে।
ভোটার ও প্রার্থীদের প্রতি আহ্বান জানিয়ে ইসি সানাউল্লাহ বলেন, ‘রাজনৈতিক দল, প্রার্থী, ভোটার, সমর্থক সবার প্রতি আহ্বান যে আমরা যেন এই সুন্দর পরিবেশ বজায় রাখি। যেসব জায়গায় কিছুটা হলেও এখনো টেনশন বিরাজমান সেগুলো যেন আর কন্টিনিউ না করে। সুন্দর সৌহার্দপূর্ণ উৎসবমুখর পরিবেশে আমাদের অতি প্রতীক্ষিত এই নির্বাচন অনুষ্ঠান সম্পন্ন করি।’
ভোটের হার কেমন হবে? এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘আমরা তো কোন স্পেকুলেশন করতে চাচ্ছি না। তবে আমরা ধারণা করি ইনশআল্লাহ আমরা যে ফিডব্যাক পেয়েছি মানুষের মাঝে যে উৎসব ভোটার টার্ন আউট ভালো হবে। ভোটারদের মধ্যে উচ্ছ্বাস দেখছি। আজকে (গতকাল) ঢাকার ট্রেনের দিকে তাকিয়ে দেখেন কী পরিমাণ মানুষ বাড়িতে যাচ্ছে শুধু ভোট দেওয়ার জন্য। সব দিকে উৎসবের আমেজ। ভোটারদের উচ্ছ্বাস, রাজনৈতিক দলগুলোর সম্পৃক্ততা এবং তাদের সচেতনতা ইতঃপূর্বে নির্বাচনে দেখা যায়নি। এত ফোর্স এত ক্যাপাসিটি ডেপ্লয় কখনোই করা হয়নি। সবকিছু মিলিয়ে পরিবেশ ভালো। আশা করি সব সুন্দরভাবে সম্পন্ন হবে।’
ইসি সানাউল্লাহ জানান, নির্বাচনি আচরণবিধি লঙ্ঘনের দায়ে এ পর্যন্ত ৩০০টি মামলা দায়ের এবং ৫০০টিরও বেশি তদন্ত করা হয়েছে। এ ছাড়া গত বছরের ১৩ ডিসেম্বর থেকে এ পর্যন্ত ৮৫০টি অবৈধ অস্ত্র উদ্ধার করা হয়েছে। দুষ্টচক্র সহিংসতা ঘটাতে চাইলেও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী তা নিয়ন্ত্রণে সফল হয়েছে। কুমিল্লা, যশোর, ফরিদপুরসহ বিভিন্ন স্থানে অস্ত্র উদ্ধার অভিযান তারই প্রমাণ।
ভোটারদের ব্যাপক উপস্থিতির বিষয়ে আশাবাদ ব্যক্ত করে তিনি জানান, মানুষের মাঝে ব্যাপক উচ্ছ্বাস দেখা যাচ্ছে। বিশেষ করে ঢাকা ছেড়ে মানুষের গ্রামে যাওয়ার ঢল দেখে ভালো ভোটার টার্নআউটের (ভোট প্রদান) ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছে। কমিশন সব রাজনৈতিক দল ও সমর্থকদের সুন্দর ও সৌহার্দপূর্ণ পরিবেশে ভোট উৎসব সম্পন্ন করার আহ্বান জানিয়েছে।