Image description

রাজধানীর মিরপুর-১ নম্বরে ফুটপাতে চাঁদাবাজি নিয়ন্ত্রণ করছেন আওয়ামী লীগের প্রভাবশালী ব্যক্তিরা। আর আদায়কৃত টাকার বড় অংশ নিচ্ছেন বিএনপির স্থানীয় নেতা—অভিযোগ ভাসমান ব্যবসায়ীদের। অবৈধ দোকান, বিদ্যুৎ সংযোগ ও রাজনৈতিক পৃষ্ঠপোষকতা নিয়ে উঠেছে বিস্তর প্রশ্ন।

মিরপুর-১ নম্বর থেকে শাহ আলী মাজার পর্যন্ত প্রায় পুরো সড়কজুড়ে রয়েছে প্রায় দুই শতাধিক ভাসমান দোকান। এসব অবৈধ দোকানের কারণে সড়ক সংকুচিত হয়ে অসহনীয় যানজট সৃষ্টি হচ্ছে।

মুক্তিযোদ্ধা মার্কেট এলাকার ব্যবসায়ীদের অভিযোগ—আগে এলাকার চাঁদাবাজির নেতৃত্ব দিতেন আওয়ামী লীগের প্রভাবশালী নেতা কবির। ৫ আগস্টের পর তিনি পলাতক থাকায় বর্তমানে মূল নিয়ন্ত্রণে রয়েছেন জুয়েল বেপারী, হান্নান, হানিফ, খলিলরা। তারা বিএনপির হলেও আওয়ামী লীগের ঘনিষ্ঠ বলে অভিযোগ আছে।

দোকান মালিকদের তথ্য অনুযায়ী, ভাসমান দোকানগুলোর কাছ থেকে ‘বিদ্যুৎ বিল’ নামে মাসে আদায় করা হয় প্রায়  ২ লাখ টাকা—বছরে যার পরিমাণ দাঁড়ায় প্রায় ২৩ লাখ। এছাড়া ফুটপাত চাঁদাবাবদ নেয়া হয় প্রায় ১৮ লাখ টাকা।

এরইমধ্যে ভিডিও–প্রমাণসহ অভিযোগ উঠেছে, এই চাঁদাবাজির অর্ধেক টাকা গ্রহণ করছেন বিএনপির শাহ আলী থানা সেচ্ছাসেবক দলের যুগ্ম আহ্বায়ক রাজু আহমেদ। তবে অভিযুক্ত নেতাদের দাবি, তারা চাঁদা নয়, ভাসমান দোকানে আলো জ্বালাতে ৩০–৮০ টাকা করে নেন।

ভাসমান দোকানে বৈধ বিদ্যুৎ সংযোগ কীভাবে দেওয়া হলো—এ প্রশ্নের জবাব দিতে ডেসকো কর্তৃপক্ষও কথা বলতে রাজি হয়নি।

মিরপুর ফুটপাতের কয়েকজন দোকানদার সংবাদ মাধ্যম আরটিএনএনকে বলেন, লাইট ও বিদ্যুৎ সংযোগের অজুহাতে প্রতিদিন প্রতিটি দোকান থেকে ৪০ থেকে ১০০ টাকা চাঁদা নেওয়া হচ্ছে। ধারণা করা হচ্ছে ১২ তারিখ নির্বাচনের পর থেকে এই চাঁদার পরিমাণ অনেক গুন বেড়ে যাবে। 

ভুক্তভোগী দোকানদারদের অভিযোগ, শুধু নির্বাচনকে সামনে রেখে অপরাধচক্র আপাতত চুপচাপ আছে। তবে তারা কিছু কিছু হুমকিও পাচ্ছেন। তাই অধিকাংশ দোকানিরা আতঙ্কে রয়েছেন।

এই ইস্যুতে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক শাহ আলী থানা পুলিশের একজন কর্মকর্তা বলেন, বিষয়টা আমাদের চোখে পড়েছে। আমরা পদক্ষেপ নিতে গেলে এখন মার খাওয়ার পরিস্থিতি। তবে আমরা কারো কাছ থেকে টাকা নিই না।

সড়ক ব্যবহারকারীরা বলছেন, রাজনৈতিক পৃষ্ঠপোষকতা থাকায় হকারদের কাউকে সরানো সম্ভব হচ্ছে না। শুধু মিরপুর-১ নয়, আশপাশের আরও বহু এলাকায় অসংখ্য অবৈধ দোকান বসিয়ে নিয়মিত চাঁদাবাজি চলছে।

এ ছাড়া রাজধানীর মিরপুর ১০ নম্বর এলাকায় হকার বহুমুখী সমবায় সমিতির নামে প্রতিদিন ৫০ থেকে ৫০০ টাকা চাঁদা তোলার অভিযোগ উঠেছে।

হকারদের অভিযোগ, বিএনপি নেতা বাদশাসহ আরও কয়েকজন লাইনম্যানের মাধ্যমে এই চাঁদা তোলা হয়।তবে অভিযুক্ত নেতারা দাবি করেন, তারা চাঁদাবাজির সঙ্গে সম্পৃক্ত নন। এগুলো হকাররা মিথ্যা কথা বলছে।

শহরের চাঁদাবাজির বিষয়ে ব্র্যাক ইনস্টিটিউট অব গভর্ন্যান্স অ্যান্ড ডেভেলপমেন্টের (বিআইজিডি) ২০১৬ সালের এক গবেষণায় দেখা গেছে, দুই সিটি করপোরেশনের ৪৩০ কিলোমিটার রাস্তায় ৩ লাখেরও বেশি হকার ব্যবসা করেন। বছরে চাঁদাবাজি হয় প্রায় ১ হাজার ৮২৫ কোটি টাকার। এসব হকার প্রতিদিন ৫০ টাকা থেকে ৫০০ টাকা পর্যন্ত চাঁদা দিতে বাধ্য হন। ২০২০ সালে ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের আরেক গবেষণা প্রতিবেদনে বলা হয়, প্রত্যেক হকারকে প্রতিদিন গড়ে ১৯২ টাকা করে চাঁদা গুনতে হয়।

ফুটপাতে চাঁদাবাজি প্রসঙ্গে বাংলাদেশ হকার্স ফেডারেশনের সভাপতি এম এ কাশেম মিডিয়াকে বলেন, ফুটপাত মানেই টাকার খেলা। যেখানেই হকার, সেখানেই আছে লাইনম্যান-চাঁদাবাজ। আর লাইনম্যানদের অধিকাংশই পুলিশের সোর্স। গণঅভ্যুত্থানের পরও এই ধারা পাল্টাইনি। লাইনম্যান আগের জনই আছেন, শুধু রাজনৈতিক শক্তির বদল হয়েছে।

বাংলাদেশ হকার্স ইউনিয়নের সভাপতি আব্দুল হাসিম কবির বলেন, অভ্যুত্থানের পরও ফুটপাতে যে যার মতো করে নতুন দোকান বসাচ্ছে। আগের চেয়েও দোকানের সংখ্যা বেড়েছে। আর এতে লাখ লাখ টাকা বাণিজ্য করছে আরেকটা পক্ষ।

জানা গেছে, রাজধানীর ইস্কাটনে বহুতল ভবন ইউনিক হাইটসের চতুর্থ তলায় ঢাকা সড়ক পরিবহন ও বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন মালিক সমিতির কার্যালয়টি বেশ সুসজ্জিত ও সুপরিসর। আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে এখান থেকেই দেশের পরিবহন খাত নিয়ন্ত্রণ করা হতো। ছাত্র আন্দোলনের মুখে সরকার পতনের পর ১৩ আগস্ট কার্যালয়টির নিয়ন্ত্রণে নিয়েছেন বিএনপিপন্থী পরিবহন নেতারা।

অনুসন্ধানে এসেছে, সারাদেশে পরিবহন খাত থেকে মালিক ও শ্রমিক সংগঠনের নামে প্রায় দুই হাজার কোটি টাকার চাঁদা তোলা হয়। এর মধ্যে প্রতিটি বাস-ট্রাক থেকে প্রতিদিন প্রকাশ্যে তোলা হয় ৭০ টাকা। ‘গেটপাস বা জিপি’ কিংবা সমিতির সদস্য ফি—এ জাতীয় নানা অজুহাতে দৈনিক, মাসিক ও এককালীন আরও বিপুল টাকা চাঁদা তোলা হয়। সরকার পতনের সঙ্গে সঙ্গে সড়ক খাতের এ ব্যাপক চাঁদাবাজিরও হাতবদল হয়ে গেল বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা।

সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো বলছে, আওয়ামী লীগের গত সাড়ে ১৫ বছরের শাসনামলে ঢাকাসহ সারাদেশের মালিক সমিতির নিয়ন্ত্রণ করতেন ঢাকা মহানগর দক্ষিণ আওয়ামী লীগের সহসভাপতি খন্দকার এনায়েত উল্যাহ। তার সহযোগী ছিলেন জাতীয় পার্টির নেতা মসিউর রহমান (রাঙ্গা)। সরকার পতনের আগেই দেশ ছেড়েছেন এনায়েত। আত্মগোপনে আছেন মসিউর রহমান।

এ সুযোগে ১০ আগস্ট কুমিল্লা উত্তর জেলা বিএনপির যুগ্ম আহ্বায়ক সাইফুল ইসলাম ভূঁইয়ার নেতৃত্বে বেশ কয়েকজন পরিবহন নেতা মিছিল নিয়ে এসে ইউনিক হাইটসের কার্যালয়ের তালা ভাঙেন। এরপর ১৩ আগস্ট কার্যালয়টি দখলে নেন তাঁরা। এর পরদিন সাইফুলের নেতৃত্বে ৩১ সদস্যের আহ্বায়ক কমিটিও ঘোষণা করা হয়।

সাইফুল ইসলাম আগের দুই দফা বিএনপির শাসনামলে ঢাকা সড়ক পরিবহন মালিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক ছিলেন। দুবারই তার সভাপতি ছিলেন বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য মির্জা আব্বাস। এবারও মির্জা আব্বাসই তাদের পেছনে রয়েছেন বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে। সাইফুলের বাড়ি কুমিল্লার ইলিয়টগঞ্জে। তাঁর পরিবহন কোম্পানির নাম ইলিয়টগঞ্জ এক্সপ্রেস। আর বিএনপি-জামায়াত জোট সরকারের আমলে ঢাকা পরিবহন নামে মির্জা আব্বাসের বাস চলাচল করত।

এ বিষয়ে ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের মুখপাত্র উপকমিশনার মুহাম্মদ তালেবুর রহমান মিডিয়াকে বলেন, ফুটপাতে একদিকে উচ্ছেদ করলে তারা আরেকদিকে দোকান বসায়। এ ক্ষেত্রে ফুটপাত থেকে হকার উচ্ছেদে পুলিশের একার পক্ষে সম্ভব নয়। সবার সমন্বয় প্রয়োজন। ফুটপাতে চাঁদাবাজির ক্ষেত্রে কারও বিরুদ্ধে সুনির্দিষ্ট অভিযোগ থাকলে ব্যবস্থা নেওয়া হবে। আমরা চাই, সড়ক পরিষ্কার রাখতে ফুটপাত থেকে হকার উচ্ছেদ হোক।