কাঁধে ব্যাগ, হাতে ছোট শিশু, আর চোখেমুখে বাড়ি ফেরার তাড়া। কিন্তু বাস টার্মিনালগুলোতে গিয়ে মিলছে ভিন্ন এক বাস্তবতা। ঘণ্টার পর ঘণ্টা দাঁড়িয়ে থেকেও মিলছে না কাঙ্ক্ষিত বাহন; আর যাও পাওয়া যাচ্ছে, তার ভাড়া আকাশচুম্বী। ২৫০ টাকার পথ পাড়ি দিতে গুণতে হচ্ছে ৬০০ টাকা পর্যন্ত। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে কৃত্রিম যানজট। দীর্ঘ যানজটে আটকে থেকে ভোটযাত্রীরা বলছেন— ভোট দিতে যাওয়াটাই যেন এখন তাদের জন্য এক বড় ‘শাস্তি’ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
যাত্রীদের অভিযোগ, ঘরমুখো সাধারণ ভোটারদের পকেট কাটছে এক শ্রেণির পরিবহন সিন্ডিকেট। ২৫০ টাকার যাত্রার জন্য গুনতে হচ্ছে ৬০০ টাকা পর্যন্ত। বিশেষ করে ঢাকা থেকে ময়মনসিংহ রুটে যেখানে সাধারণ সময় ভাড়া ২০০ থেকে ২৫০ টাকা, সেখানে এখন ৫০০ থেকে ৬০০ টাকা আদায় করা হচ্ছে।
বাসের তীব্র সংকটে দিশেহারা মানুষ ঘণ্টার পর ঘণ্টা টার্মিনালে অপেক্ষা করে বাধ্য হয়ে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে ট্রাকে চড়ছেন। তবে রেহাই নেই সেখানেও; ট্রাকে জনপ্রতি ৩০০ থেকে ৪০০ টাকা ভাড়া দিতে হচ্ছে।

বাসের অপেক্ষায় থাকা যাত্রী মো. রফিকুল ইসলাম ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, ভোট দেওয়া তো আমাদের নাগরিক অধিকার, আর সেই অধিকারটুকু পালন করতে গিয়েই পদে পদে এমন হেনস্তা হতে হচ্ছে। প্রশাসনের নাকের ডগায় পরিবহন মালিকরা যে স্বেচ্ছাচারিতা চালাচ্ছে, তা দেখার যেন কেউ নেই।
গৃহিণী রোমানা আক্তার বলেন, সঙ্গে ছোট বাচ্চা আর বৃদ্ধ মা আছেন। কোনো বাসে উঠতে পারছি না। একে তো গাড়ি নেই, তার ওপর যেটুকু আছে সেগুলোতে তিল ধারণের জায়গা নেই। ভোট দিতে যাওয়াটা কি আমাদের পাপ? এভাবে পথে পথে কষ্ট দেওয়ার কোনো মানে হয় না।
টার্মিনাল বাসে বসে থাকা যাত্রী বেসরকারি চাকরিজীবী আশরাফুল আলম বলেন, বাস ছাড়ার নাম নেই। একদিকে বাসের ভেতর ভ্যাপসা গরম, অন্যদিকে রাস্তার জ্যাম। মালিকরা যার কাছ থেকে যা পারছে লুটে নিচ্ছে। সাধারণ মানুষের এই ভোগান্তির শেষ কোথায়?
মোহাম্মদ ইমরান নামের এক গার্মেন্টস কর্মী বলেন, বাসের টিকিট না পেয়ে শেষমেশ ট্রাকে উঠেছি। সেখানেও জনপ্রতি ৪০০ টাকা করে নিচ্ছে। গরু-ছাগলের মতো ট্রাকে করে ভোট দিতে যাচ্ছি।
মূলত শিল্পাঞ্চলের ছুটি শুরু হয়ে যাওয়ায় ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ভোট দিতে রাজধানী ঢাকা থেকে বাড়ি ফেরার মানুষের ঢল নেমেছে। কেউ কেউ ঐচ্ছিক ছুটি নিয়েও পরিবার নিয়ে ছুটছেন বাড়ির পথে। এতে ঢাকা–ময়মনসিংহ মহাসড়কসহ আশপাশের সড়কগুলোতে তীব্র যানজটের সৃষ্টি হয়েছে। বাস সংকটের সুযোগে কয়েকগুণ বাড়তি ভাড়া আদায়ের অভিযোগ উঠেছে পরিবহন শ্রমিকদের বিরুদ্ধে। ঘণ্টার পর ঘণ্টা যানজটে আটকে এবং অতিরিক্ত ভাড়া গুনে চরম ভোগান্তিতে পড়েছেন ঘরমুখো যাত্রীরা।
আয়নাল হুসেন নামে এক যাত্রী বলেন, গাজীপুরে একটা কারখানায় কাজ করি। ভোট দিতে বাড়ি যাব। কিন্তু টার্মিনালে এসে দেখি ভাড়া দিগুণ। পকেটে যা ছিল তার অর্ধেক ভাড়াতেই শেষ।
মো. শরিফুল নামে এক বেসরকারি চাকরিজীবী অভিযোগ করে বলেন, বাস কম থাকার সুযোগে হেলপাররা যাত্রীদের সাথে খুব খারাপ ব্যবহার করছে। বেশি ভাড়া না দিলে বাস থেকে নামিয়ে দিচ্ছে।

ব্যাংকার শফিক আহমেদ বলেন, অনেক কষ্ট করে অফিস থেকে দুই দিনের ঐচ্ছিক ছুটি নিয়ে পরিবার নিয়ে বের হলাম। ভেবেছিলাম জ্যাম কম হবে। কিন্তু এখন দেখছি রাস্তার যে অবস্থা, ভোগান্তি আরও কয়েকগুণ হবে।
ময়মনসিংহের একজন ভোটার কামরুল ইসলাম বলেন, বাসে সিট না পেয়ে পরিবার নিয়ে ট্রাকের পেছনে উঠেছি। খোলা ট্রাকে রোদে পুড়ছি, ধুলোবালি খাচ্ছি। তবুও ভোট দিতে বাড়ি যেতে হবে। কিন্তু ২৫০ টাকার বদলে ট্রাকেই আমাদের থেকে ৪০০ টাকা করে নেওয়া হয়েছে।
মহাসড়ক ঘুরে দেখা গেছে, রাস্তার পাশে বিভিন্ন বাসস্ট্যান্ডে শত-শত মানুষজন দাঁড়িয়ে আছে। আব্দুল্লাহপুর থেকে গাজীপুর চৌরাস্তা পর্যন্ত মহাসড়কে ধীরগতির যান চলাচল দেখা গেছে। কলেজগেট ও গাজীপুরা এলাকায় যানজট আরও তীব্র আকার ধারণ করেছে। আবার আন্তঃজেলা ও অন্তঃজেলার বাসগুলোও বাড়তি আয়ের আশায় স্বাভাবিক রুট ছেড়ে একাধিক ট্রিপ মারছে বলে অভিযোগ করেছেন যাত্রীরা। এতে সাধারণ যাত্রীদের দুর্ভোগ আরও বেড়েছে।
প্রসঙ্গত, ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন উপলক্ষ্যে সরকার তিনদিন সাধারণ ও বিশেষ ছুটি ঘোষণা করেছে। সরকার ১১ ফেব্রুয়ারি সাধারণ ছুটি ঘোষণা করেছে। নির্বাচন দিবস ১২ ফেব্রুয়ারি সাধারণ ছুটি থাকবে, যা আগেই ঘোষিত ছিল। এছাড়া শিল্পাঞ্চলের শ্রমিকদের ভোটাধিকার নিশ্চিত করতে ১০ ফেব্রুয়ারি বিশেষ ছুটি ঘোষণা করা হয়েছে।