বাংলাদেশের ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও গণভোটের দিন ভোটকেন্দ্রের ৪০০ গজের মধ্যে মোবাইল ফোন নেওয়ার ওপর নির্বাচন কমিশন নিষেধাজ্ঞা আরোপ করার পর এ নিয়ে তীব্র প্রতিক্রিয়া দেখা দিয়েছে।
বিশ্লেষকরা বলছেন, এ নিষেধাজ্ঞার কারণে ভোটাররা কেন্দ্রে যেতে অনুৎসাহিত বোধ করতে পারেন। সেই সাথে নির্বাচন কমিশনেরই অনুমোদিত পর্যবেক্ষক ও সাংবাদিকদের জন্য পেশাগত দায়িত্ব পালন করা অসম্ভব হয়ে দাঁড়াবে বলে মনে করছেন তারা।
আবার ভোট কেন্দ্রের ভেতরে থাকা প্রার্থীদের এজেন্টরাও নিজ নিজ কেন্দ্রে কোনো ধরনের অনিয়ম বা কারচুপি হতে দেখলে সেটি নিজ প্রার্থী বা তার প্রতিনিধিকে জানাতে পারবেন না।
ফলে সব মিলিয়ে ইসির এ নিষেধাজ্ঞা বহাল থাকলে নির্বাচনের ওপর এর প্রভাব নিয়ে এক ধরনের উদ্বেগ তৈরি হয়েছে অনেকের মধ্যে, প্রতিক্রিয়া আসছে রাজনৈতিক দলগুলোর দিক থেকেই।
ওদিকে এ নিয়ে তীব্র সমালোচনার মুখে নির্বাচন কমিশনার আব্দুর রহমানেল মাছউদ এ বিধিনিষেধে পরিবর্তন আনার আভাস দিয়েছেন। তিনি বলেছেন, গোপন কক্ষ ছাড়া আর সব ক্ষেত্রে সাংবাদিকরা তাদের দায়িত্ব পালন করতে পারবেন।
কিন্তু কী কারণে এই বিধিনিষেধ দেওয়া হয়েছে এবং এই নিষেধাজ্ঞা পুরোপুরি উঠিয়ে না নিলে সাংবাদিক ও পর্যবেক্ষকরা কীভাবে কাজ করতে পারবেন তার বিস্তারিত ব্যাখ্যা তিনি দেননি।
নির্বাচন কমিশনের সাবেক অতিরিক্ত সচিব জেসমিন টুলি বলছেন, ২০০৮ সালের সংসদ নির্বাচনে শুধু ভোটারদের জন্য ভোটকেন্দ্রের ভেতরে মোবাইল নেওয়ার ওপরে বিধিনিষেধ ছিল।
এরপর ২০১৮ সালের নির্বাচনের সময় গোপন বুথে মোবাইল নেওয়ার ওপর নিষেধাজ্ঞা দিয়েছিল নির্বাচন কমিশন।
তখন কমিশনের সিদ্ধান্তে বলা হয়েছিল যে, আগামী ৩০ ডিসেম্বর একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ভোট দেওয়ার সময় মোবাইল ফোন বাইরে রেখেই ভোটারদের ভোটকেন্দ্রে প্রবেশ করতে হবে।
তবে তখনকার প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) কে এম নুরুল হুদা এক সংবাদ সম্মেলনে বলেছিলেন, কেবলমাত্র সাংবাদিক ও নির্বাচন পর্যবেক্ষকরা পেশাগত কাজের কারণে যথাযথ পরিচয় দিয়ে ভোটকেন্দ্রে মোবাইল ফোন নিয়ে প্রবেশ করতে পারবেন।
এরপর ২০২২ সালের জেলা পরিষদ নির্বাচনে ভোটকক্ষে মোবাইল ফোন নিয়ে প্রবেশ করতে ভোটারদের নিষেধ করেছিল নির্বাচন কমিশন।
এতে বলা হয়েছে, ভোটকক্ষে ভোটাররা যাতে মোবাইল ফোন নিয়ে প্রবেশ করতে না পারে অথবা ভোটকক্ষে ভোটদান বিশেষ করে গোপন কক্ষে ভোট প্রদানের ছবি তুলতে না পারে তা নিশ্চিত করতে হবে।
নতুন সিদ্ধান্তের প্রভাব কী হবে
টিআইবির নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান ইসির বিধিনিষেধ প্রত্যাহারের দাবি করে বলেছেন, এটি বহাল থাকলে স্বচ্ছ নির্বাচনে বাধা তৈরি হবে এবং ভোটাররা ভোটদানে আগ্রহী হবেন না।
তিনি বলেন, নিরাপত্তা বিষয়টি বিবেচনা করে অনেকেই কেন্দ্রে যেতে চাইবেন না, যার ফলে অবাধ ও নিরপেক্ষ নির্বাচন বাধাগ্রস্ত হবে।
নির্বাচন বিশেষজ্ঞ জেসমিন টুলি বলছেন, সাংবাদিক ও পর্যবেক্ষকদের জন্য কাজের গুরুত্বপূর্ণ উপকরণ হলো মোবাইল এবং সে কারণে এ বিষয়ে সিদ্ধান্তগুলো সুবিবেচনাপ্রসূত হওয়া উচিত।
তিনি বলেন, ৪০০ গজের মধ্যে মোবাইল নিতে না পারলে সাংবাদিকরা কাজ করবে কীভাবে। গোপন বুথে নিষেধাজ্ঞা আগেও ছিল। ২০০৮ সালে ভোটারদের মোবাইল নিয়ে কেন্দ্রের ভেতরে ঢোকার বিষয়ে নিষেধাজ্ঞা ছিল। কিন্তু সাংবাদিক পর্যবেক্ষকদের তো কাজের সুযোগ দিতে হবে।
বাংলাদেশে গত কয়েকটি নির্বাচনের অনিয়ম ও কারচুপির খবর জনসম্মুখে এসেছিল মোবাইলে তোলা ছবি বা ভিডিওর মাধ্যমেই। এছাড়া মোবাইল সাংবাদিকতার অনেক বেশি বিস্তৃত হয়েছে দেশজুড়ে। এমনকি যারা নির্বাচন পর্যবেক্ষণ করেন তাদের জন্যও মোবাইল গুরুত্বপূর্ণ উপকরণ।
আবার ভোটাররা মোবাইল ঘরে রেখে ভোটকেন্দ্রে যেতে কতটা উৎসাহিত হবেন সেই প্রশ্নও আছে
নির্বাচন বিশেষজ্ঞ আব্দুল আলীম বলছেন, এবার যেভাবে বিধিনিষেধ দেওয়া হলো তা আগে দেখিনি। মানুষ ৪০০ গজের বাইরে কোথায় কার কাছে ফোন রেখে ভোটের লাইনে দাঁড়াবে। ফলে এই বিধিনিষেধের কারণে হয়তো অনেকে ভোট কেন্দ্রেই যাবে না। ফলে টার্নওভার কম হবে।
তাছাড়া কেন্দ্রে বিভিন্ন প্রার্থীর পোলিং এজেন্টরা আগে পোলিং অফিসারের কাছে মোবাইল ফোন রেখে দায়িত্ব পালন করতেন। জরুরি প্রয়োজন হলে পোলিং অফিসারের অনুমতি নিয়ে ফোন ব্যবহার করতেন।
আব্দুল আলীম বলেন, এখন দীর্ঘ সময় বিচ্ছিন্ন থাকতে হবে এটা ভেবে অনেক এজেন্টই হয়তো থাকতে চাইবে না। প্রার্থীরা এজেন্টরা প্রয়োজন হলে প্রার্থীর সাথেই বা যোগাযোগ কীভাবে করবেন? এছাড়া সাংবাদিক ও পর্যবেক্ষকদের কাজ ব্যাপকভাবে বাধাগ্রস্ত হবে। সিদ্ধান্তটি নেওয়ার আগে এসব বিষয় ভাবা উচিত ছিল।
দলগুলোর প্রতিক্রিয়া
বিএনপির নির্বাচন পরিচালনা কমিটির সদস্য সচিব রুহুল কবির রিজভী বলছেন, কমিশনের সিদ্ধান্ত মোটেও যুক্তিসঙ্গত হয়নি এবং ভোটার, সাংবাদিক ও পর্যবেক্ষকদের জন্য পেশাগত দায়িত্ব পালনের পরিবেশ নিশ্চিত করতে হবে কমিশনকেই।
জামায়াতে ইসলামীর সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ার এক বিবৃতিতে বলেছেন, ভোটকেন্দ্রে মোবাইল নিষিদ্ধ করার সিদ্ধান্ত ভোটারদের মধ্যে ভয় ও শঙ্কা সৃষ্টি করতে পারে এবং একটি অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচনের জন্য বাধা সৃষ্টি করতে পারে।
ওদিকে ঢাকায় এক জনসভায় এনসিপির আহবায়ক নাহিদ ইসলাম বলেছেন, নির্বাচন কমিশনকে এই বিধিনিষেধ আজ সোমবার দিনের মধ্যেই পরিবর্তন না করলে কাল তারা কমিশন ঘেরাও করবেন।