Image description

রাজধানীর মিরপুর যেন এখন চার শীর্ষ সন্ত্রাসীর ভাগ করা রাজ্য। ‘ফোর স্টার গ্রুপ’ নামে পরিচিত এই অপরাধী চক্র বিদেশে বসেই মিরপুরকে ৪ ভাগে ভাগ করে নিয়ন্ত্রণ করছে চাঁদাবাজি, মাদক কারবার, ভূমি দখল, পরিবহন খাত ও ভাড়ায় খুনসহ ভয়ংকর সব অপরাধ। সর্বশেষ এই অপরাধ সাম্রাজ্যের বলি হয়েছেন পল্লবী থানা যুবদল নেতা গোলাম কিবরিয়া।

সরেজমিন অনুসন্ধান, স্থানীয় বাসিন্দা ও ব্যবসায়ীদের সাক্ষাৎকার, আইনশৃঙ্খলা রক্ষা বাহিনীর কর্মকর্তা এবং একাধিক গোয়েন্দা প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী—মফিজুর রহমান মামুন, ‘কিলার’ ইব্রাহীম, শাহাদাত হোসেন ও মোক্তার হোসেন—এই চারজনই ‘ফোর স্টার গ্রুপ’-এর মূল নিয়ন্ত্রক। চারজনই বিদেশে পলাতক থেকেও শতাধিক ক্যাডার দিয়ে এলাকায় আধিপত্য বজায় রেখেছেন।

চাঁদা না দিলে ব্যবসা চালানো যায় না

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক পল্লবীর এক আবাসন ব্যবসায়ী বলেন, স্থানীয় সন্ত্রাসীদের প্রতি মাসে মোটা অঙ্কের চাঁদা দিয়েই ব্যবসা চালাতে হয়। ক্ষমতা যখন যার, চাঁদাও তখন তার। গত বছরের ৫ আগস্টের পর কয়েক মাস চাঁদাবাজি বন্ধ ছিল। এরপর এক সন্ত্রাসীর নামে চাঁদা দিতে হয়েছে, এখন আরেক ভাইয়ের নামে।

তিনি জানান, চাঁদার নিয়ন্ত্রণ নিয়ে প্রায়ই এলাকায় সংঘর্ষ হয়। পল্লবী থানা যুবদল নেতা গোলাম কিবরিয়া হত্যাকাণ্ডের পেছনেও চাঁদার ভাগাভাগি ছিল—এমন তথ্য উঠে এসেছে পুলিশের গোয়েন্দা প্রতিবেদনে।

চার ভাগে ভাগ মিরপুর, চার দেশে গডফাদার

গোয়েন্দা সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, রাজধানীর বৃহত্তর মিরপুর এলাকাকে চার ভাগে ভাগ করে বিদেশে বসেই নিয়ন্ত্রণ করছে চার শীর্ষ সন্ত্রাসী। ‘ফোর স্টার গ্রুপ’ নামে পরিচিত এই অপরাধী চক্রের গডফাদাররা বর্তমানে চারটি ভিন্ন দেশে অবস্থান করে নিজ নিজ নিয়ন্ত্রণাধীন এলাকায় চাঁদাবাজি, মাদক কারবার, ভূমি দখল ও সহিংস অপরাধ পরিচালনা করছে।

মালয়েশিয়ায় অবস্থানরত শীর্ষ সন্ত্রাসী মফিজুর রহমান মামুন নিয়ন্ত্রণ করছেন মিরপুর ১২, পল্লবী, সাগুফতা ও বাউনিয়া এলাকা। ফ্রান্সে পলাতক ‘কিলার’ ইব্রাহীমের নিয়ন্ত্রণে রয়েছে মিরপুর ১৩, মিরপুর ১৪, ভাসানটেক ও কালশী। ইতালিতে আত্মগোপনে থাকা শাহাদাত হোসেন নিয়ন্ত্রণ করছেন মিরপুর ১, মিরপুর ২, মিরপুর ৬ ও মিরপুর ৭ এলাকা। আর ভারতে অবস্থানরত শীর্ষ সন্ত্রাসী মোক্তার হোসেনের দখলে রয়েছে মিরপুর ১০ ও মিরপুর ১১ নম্বর সেকশন।

গোয়েন্দা প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, এই চার শীর্ষ সন্ত্রাসী মোবাইল অ্যাপ, এনক্রিপটেড কল, হোয়াটসঅ্যাপ ও ভিওআইপি প্রযুক্তি ব্যবহার করে তাদের অপরাধী নেটওয়ার্ক পরিচালনা করছে। মাঠ পর্যায়ে তাদের হয়ে কাজ করছে অন্তত দেড় শতাধিক সক্রিয় ক্যাডার। বিদেশে বসেই নির্দেশ দিয়ে এলাকায় আধিপত্য বজায় রাখা এবং অপরাধ কার্যক্রম চালিয়ে যাওয়াই এই সিন্ডিকেটের মূল কৌশল।

মামুন: শীর্ষে থাকা ‘গডফাদার’

‘ফোর স্টার গ্রুপ’-এর এক নম্বর হিসেবে পরিচিত মফিজুর রহমান মামুন পল্লবী থানার তালিকাভুক্ত যাবজ্জীবন সাজাপ্রাপ্ত ফেরারি আসামি। তার বিরুদ্ধে চাঁদাবাজি, খুন, মাদক কারবার, অস্ত্র ও ডাকাতিসহ অন্তত ২৭টি মামলা রয়েছে।

মাঠে তার হয়ে কাজ করেন বড় ভাই জামিলুর রহমান ও ছোট ভাই মশিউর রহমান। তাদের অধীনে রয়েছে দেলোয়ার হোসেন রুবেল, নাটা আলমগীর, কালা মোতালেব, রাজন, সানি, ‘ল্যাংড়া রুবেল’সহ বহু কুখ্যাত সন্ত্রাসী।

নাম প্রকাশ না করে রাজধানীর পল্লবীর একজন আবাসন ব্যবসায়ী এভাবে অবৈধ চাঁদা দেওয়া নিয়ে তার বিড়ম্বনার বর্ণনা দেন। তিনি বলেন, ‘এই চাঁদা আদায়ে আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে প্রায়ই পল্লবীতে সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে। সম্প্রতি পল্লবী থানা ওয়ার্ড যুবদল নেতা গোলাম কিবরিয়া খুন হওয়ার পেছনেও চাঁদার টাকার ভাগাভাগি রয়েছে বলে পুলিশের গোয়েন্দা প্রতিবেদনে উঠে আসে। এসব সন্ত্রাসীর কাছে যেখানে রাজনৈতিক ব্যক্তি নিরাপদ নয়, আমরা চাঁদা না দিয়ে কী করব?’

যুবদল নেতা কিবরিয়া হত্যা: চাঁদাবাজির প্রতিবাদই কাল

গত ১৭ নভেম্বর পল্লবীর একটি দোকানে ঢুকে গুলি করে যুবদল নেতা গোলাম কিবরিয়াকে হত্যা করা হয়। পুলিশ জানায়, দুবাইয়ে থাকা মামুনের নির্দেশে মশিউরের ক্যাডার জনি, পাতা সোহেল ও দর্জি মাসুম এই হত্যাকাণ্ড ঘটায়।

স্থানীয়রা জানান, চাঁদাবাজির বিরুদ্ধে সোচ্চার থাকায় কিবরিয়া এলাকাবাসীর কাছে জনপ্রিয় ছিলেন। এই কারণেই তাঁকে টার্গেট করা হয়।

ইব্রাহীম ও শাহাদাত: ভাসানটেক থেকে স্বাধীন মার্কেট

ভাসানটেক ও কালশী এলাকায় ‘কিলার’ ইব্রাহীমের নামেই আতঙ্ক। ফাঁসির সাজাপ্রাপ্ত এই আসামি ফ্রান্সে থেকে জমি দখল, চাঁদাবাজি ও খুন পরিচালনা করছেন। তার অনুসারীদের বিরুদ্ধে একাধিক হত্যা মামলার তথ্য রয়েছে।

অন্যদিকে, ইতালিতে থাকা শাহাদাত হোসেনের নির্দেশে মিরপুর–১ স্বাধীন মার্কেটে ১০ লাখ টাকা চাঁদা না পেয়ে ভাঙচুর চালানো হয়। এ ঘটনায় গ্রেপ্তার আসামি স্বীকার করেছেন, শাহাদাতের নাম ব্যবহার করেই তারা চাঁদাবাজি করতেন।

পরিবহন খাত: দিনে ২ কোটি ২১ লাখ টাকার চাঁদা

সরকারি তদন্তে উঠে এসেছে ভয়াবহ তথ্য—ঢাকা শহরের ৫৩টি পরিবহন টার্মিনাল ও স্ট্যান্ড থেকে প্রতিদিন গড়ে ২ কোটি ২১ লাখ টাকা চাঁদাবাজি হয়। মাসে যার পরিমাণ ৬৬ কোটি টাকা ছাড়িয়ে যায়।

টোকেন ও রশিদের যুগ শেষ। এখন ‘নৈশপ্রহরী, পরিচ্ছন্নতা ও লাইনম্যানের বেতন’ দেখিয়ে নগদ ও বিকাশে আদায় হচ্ছে টাকা। তদন্তে দেখা গেছে, এই অর্থের বড় অংশ যাচ্ছে রাজনৈতিক নেতৃত্ব, পরিবহন মালিক-শ্রমিক সংগঠন ও কিছু সিটি করপোরেশন সংশ্লিষ্টদের কাছে।

সড়ক ও জনপথ অধিদপ্তর সূত্র থেকে জানা গেছে, শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর একটি গোয়েন্দা সংস্থার তদন্তে আরও দেখা গেছে যে স্থানীয় প্রভাবশালী এবং রাজনৈতিক দলের নেতারা, বিশেষ করে বিএনপির সঙ্গে সংশ্লিষ্টরা এই চাঁদাবাজির সঙ্গে জড়িত।

গত ১১ ফেব্রুয়ারি সড়ক ও জনপথ অধিদপ্তরে প্রতিবেদনটি জমা দেওয়া হয়। প্রতিবেদনে বলা হয়, আওয়ামী লীগের শাসনামলে দলটির নেতাকর্মীরা চাঁদাবাজির একটি ব্যবস্থা কায়েম করেছিলেন। তারা একটা টোকেন ব্যবহার করতেন। তবে এটি ছিল ঝুঁকিপূর্ণ কারণ চাঁদাবাজির চিহ্ন রয়ে যেত কাগজে। কিন্তু আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর এই ব্যবস্থার দখল নেয় স্থানীয়ভাবে প্রভাবশালী ব্যক্তিরা, বিশেষ করে বিএনপি এবং এর অঙ্গ সংগঠনের নেতারা।

বর্তমানে রাজধানী এবং এর আশেপাশের এলাকায় বাস, ট্রাক, মাইক্রোবাস, পিকআপ, হিউম্যান হলার (লেগুনা) এবং অটোরিকশাসহ ৯৫ ধরনের টার্মিনাল এবং স্ট্যান্ড রয়েছে। এর মধ্যে ৬৬টি টার্মিনাল এবং স্ট্যান্ডই রয়েছে রাজধানীতে।

এর মধ্যে রয়েছে ৩৭টি লেগুনা স্ট্যান্ড, সাতটি স্থানীয় বাস স্ট্যান্ড, পাঁচটি পিকআপ স্ট্যান্ড, চারটি স্থানীয় এবং আন্তঃজেলা বাস স্ট্যান্ড, চারটি অটোরিকশা স্ট্যান্ড, তিনটি আন্তঃজেলা বাস টার্মিনাল, তিনটি সিএনজিচালিত অটোরিকশা স্ট্যান্ড, দুটি ট্রাক স্ট্যান্ড এবং একটি মাইক্রোবাস স্ট্যান্ড। ৫৬টি টার্মিনালে তদন্ত চালানো হলে ৫৩টিতেই চাঁদাবাজির প্রমাণ পাওয়া যায়।

নিয়ন্ত্রণে পালাবদল

২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর পরিবহন খাতের নিয়ন্ত্রণ হাতছাড়া হয়ে যায়, বিএনপি-সমর্থিত নেতারা বিভিন্ন মালিক সমিতির পাশাপাশি টার্মিনালের কিছু গুরুত্বপূর্ণ পদ দখল করে নেন।

এনা পরিবহনের মালিক খন্দকার এনায়েত উল্লাহ, যিনি টানা চতুর্থবারের মতো বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন মালিক সমিতির মহাসচিব ছিলেন, তাকে সরিয়ে তার জায়গায় স্থলাভিষিক্ত হন কুমিল্লা (উত্তর) বিএনপির আহ্বায়ক সাইফুল ইসলাম। গত বিএনপি আমলে সাইফুল ঢাকা সড়ক পরিবহন মালিক সমিতির দুইবারের সাধারণ সম্পাদক ছিলেন।

অন্যদিকে, স্টার লাইন গ্রুপের মালিক এবং এফবিসিসিআইয়ের পরিচালক হাজী আলাউদ্দিন পরিবহন মালিক সংগঠনের সভাপতি নির্বাচিত হয়েছেন। তিনি জাতীয় পার্টির শীর্ষ নেতা মশিউর রহমান রাঙ্গার স্থলাভিষিক্ত হন।

হাজী আলাউদ্দিন জাতীয় পার্টি এবং আওয়ামী লীগ দুই দলের সঙ্গেই জড়িত ছিলেন। ২০১৬ সালে আওয়ামী লীগের টিকিটে ফেনী পৌরসভার মেয়র নির্বাচিত হন তিনি। তারপর থেকে তিনি আওয়ামী লীগ থেকে মুখ ফিরিয়ে নিয়েছেন বলে পরিবহন বিভাগের সূত্রে জানা গেছে। রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর থেকে রাঙ্গা এবং এনায়েত উল্লাহ দুজনেই পলাতক।

পরিবহন শ্রমিকদের সবচেয়ে শক্তিশালী সংগঠন বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন শ্রমিক ফেডারেশনের নেতৃত্বেও একই রকম পরিবর্তন দেখা গেছে।

আওয়ামী লীগের প্রেসিডিয়াম সদস্য শাজাহান খান, যাকে একসময় সংগঠনের ‌‘অবিসংবাদিত’ নেতা হিসেবে বিবেচনা করা হতো, তার স্থলাভিষিক্ত হয়েছেন আব্দুর রহিম বক্স দুদু। সংগঠনের সাবেক সাধারণ সম্পাদক ওসমান আলীর স্থলাভিষিক্ত হয়েছেন হুমায়ুন কবির খান।

ট্রাক বহর পরিচালনা থেকে উঠে আসা আব্দুর রহিম বক্স স্থানীয় বিএনপির রাজনীতির সাথে জড়িত বলে সূত্র জানিয়েছে।

অন্যদিকে, হুমায়ুন কবির খানের ফেসবুক প্রোফাইল অনুসারে, বিএনপিতে তার পদ রয়েছে, তিনি দলে শ্রম বিষয়ক সহকারী সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন।

পুলিশের বক্তব্য

ঢাকা মহানগর পুলিশের ঊর্ধ্বতন এক কর্মকর্তা বলেন, কার নির্দেশে অপরাধচক্র চলছে এবং কারা জড়িত—সবাইকে আইনের আওতায় আনতে কাজ চলছে। ফোর স্টার গ্রুপসহ কাউকেই ছাড় দেওয়া হবে না।

সম্প্রতি পুলিশের নিয়মিত অভিযানে বিভিন্ন অপরাধে জড়িত থাকার অভিযোগে এই গ্রুপের কয়েকজন সদস্যকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) মিডিয়া শাখার উপকমিশনার মুহাম্মদ তালেবুর রহমান বলেন, কার নির্দেশে অপরাধচক্র চলছে এবং কারা এতে যুক্ত হচ্ছে, সবাইকে আইনের আওতায় নিয়ে আসতে কাজ করছে পুলিশ। শুধু ফোর স্টার গ্রুপ নয়, যেকোনো দল বা ব্যক্তি অপরাধ করে পার পাওয়ার সুযোগ নেই।

আতঙ্কে মিরপুর

মামলা, জিডি, আন্দোলন—কিছুই চাঁদাবাজদের থামাতে পারছে না। ব্যবসায়ীরা দোকান বন্ধ রাখছেন, আবাসন প্রকল্প থমকে আছে, পরিবহন খাতে নৈরাজ্য চলছে। বিদেশে বসে থাকা চার শীর্ষ সন্ত্রাসীর নির্দেশেই যেন চলছে মিরপুরের অপরাধ অর্থনীতি।

আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সামনে এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ—এই অনলাইনভিত্তিক আন্ডারওয়ার্ল্ড সিন্ডিকেট ভেঙে ফেলা। নইলে মিরপুরের নিয়ন্ত্রণ যে আবারও রক্তে রঞ্জিত হবে, তা বলাই বাহুল্য।