সংসদ নির্বাচনের ভোট গ্রহণের সময় ১২ ফেব্রুয়ারি ঘনিয়ে আসার সঙ্গে নিরাপত্তা নিয়ে বাড়ছে ভয় ও শঙ্কা। এই ভয়-শঙ্কা ভর করেছে খোদ সরকারের ভিতর ও বাইরে। এজন্য বহুলপ্রত্যাশার এ ভোট নিয়ে চরম অস্বস্তিতে রয়েছেন সাধারণ ভোটাররা।
তারা বলছেন, উৎসবের ভোটে যেন কোনোভাবেই নিরাপত্তার ঘাটতি না হয়। সরকারের উচিত হবে তা নিশ্চিত করা। কিন্তু স্থানীয় প্রশাসন, কেন্দ্রীয় প্রশাসন, জেলা প্রশাসন এবং পুলিশের বিভিন্ন পর্যায়ে একটি গ্রুপ সরকারকে সহযোগিতা করছে না, এমন অভিযোগ খোদ সরকারেরই। যার ফলে অন্তর্বর্তী সরকারের ভিতরেও নির্বাচনি নিরাপত্তা নিয়ে ভয় ও শঙ্কা জেঁকে বসেছে। অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূসের কার্যালয় এবং নির্বাচন কমিশন (ইসি) সূত্রে এসব তথ্য জানা গেছে।
সরকারের পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে পুরো ঢাকার ২০টি আসনের প্রতিটি এলাকাই ঝুঁকিপূর্ণ। তবে ঢাকার ভিতরে ৮, ১২, ১৭, ১৮ আসনকে অধিক ঝুঁকিপূর্ণ ঘোষণা করেছে ইসি। এ ছাড়া ঠাকুরগাঁও, পঞ্চগড়, ব্রাহ্মণবাড়িয়া, গোপালগঞ্জ, মাদারীরপুর, ফরিদপুর, নরসিংদী ও কুমিল্লায় থাকবে বিশেষ নজরদারি। স্থানীয় প্রশাসন, পুলিশ বিভাগের একাংশের অসহযোগিতায় অস্বস্তিতে রয়েছে অন্তর্বর্তী সরকার। এর সঙ্গে যোগ হয়েছেন প্রশাসনের ভিতরে থাকা আওয়ামী লীগপন্থি কর্মকর্তা-কর্মচারীরা। শুধু তা-ই নয়, সরকারি চাকরিজীবী যারা নতুন পে-স্কেলের গেজেট প্রকাশের জন্য আন্দোলন করছেন তারাও যুক্ত হয়েছেন সরকারকে অসহযোগিতাকারীদের দলে। সূত্র জানায়, দেশজুড়ে যেন সহিংসতা না হয় সেজন্য সারা দেশে ১ লাখ সেনাসদস্য মোতায়েন করা হয়েছে। এ
কই সঙ্গে একটি সুষ্ঠু ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচন আয়োজনের জন্য ভোটের আগেই আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক ও নিয়ন্ত্রণে রাখা অত্যন্ত জরুরি বলে জানিয়েছেন সেনা সদরের সামরিক অপরেশন্স পরিদপ্তরের পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল দেওয়ান মোহাম্মদ মনজুর হোসেন। সে লক্ষ্যেই বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর সদস্যসংখ্যা ধাপে ধাপে বাড়িয়ে বর্তমানে এক লাখে উন্নীত করা হয়েছে। তিনি বলেন, ‘১০ জানুয়ারি আমাদের মোতায়েন সেনাসংখ্যা ছিল ৩৫ হাজার। পরে তা বাড়িয়ে ৫০ হাজার করা হয় এবং ২০ জানুয়ারি থেকে ১ লাখ সেনা মোতায়েন করা হয়েছে।
পাশাপাশি নৌবাহিনীর ৫ হাজার এবং বিমানবাহিনীর ৩ হাজার ৭৩০ জন সদস্য মোতায়েন করা হয়।’ তাঁর দেওয়া তথ্যমতে, বাংলাদেশ সেনাবাহিনী দেশের ৬৪ জেলার মধ্যে ৬২ জেলায়, ৪১১টি উপজেলায় এবং বিভিন্ন মেট্রোপলিটন শহরে ৫৪৪টি অস্থায়ী ক্যাম্প স্থাপন করেছে। এসব ক্যাম্প থেকে নিয়মিত টহল, যৌথ অভিযান, চেকপোস্ট পরিচালনা এবং অস্ত্র উদ্ধার কার্যক্রম চলমান রয়েছে। সরকারের একটি ঘনিষ্ঠ সূত্র জানায়, দেশজুড়ে সহিংসতার ঘটনা বেশি ঘটলে বিলম্বিত হতে পারে ফলাফল ঘোষণা। সেই প্রস্তুতিও নিয়ে রাখতে বলা হয়েছে। এজন্য ওই অতিরিক্ত সময়ে দেশে যেন কোনো রকম বিশৃঙ্খলা, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি না ঘটে বা প্রাণহানির মতো নৃশংস ঘটনা না ঘটে, সেজন্য সেনাবাহিনীকে সজাগ থাকতে বলা হয়েছে। এ ক্ষেত্রে বাংলাদেশ পুলিশ বা সরকারের স্থানীয় বা কেন্দ্রীয় প্রশাসনের প্রতিও কঠোর নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। তবে সরকারের ভিতরে এবং প্রশাসন ও পুলিশের ভিতরে একটি অংশ নির্বাচন নিয়ে পরিস্থিতি ঘোলাটে করার চেষ্টা করছে বলে বিভিন্ন গোয়েন্দার খবরে বলা হয়েছে। যা প্রধান উপদেষ্টা, নির্বাচন কমিশন ও সেনা সদর দপ্তরকে অবহিত করা হয়েছে।
এদিকে বিএনপি ও জামায়াতের চাপ রয়েছে ভোটের দিনই দ্রুত ফলাফল ঘোষণা করতে হবে। সে চাপের কথা মাথায় রেখে ভোটের দিনই ফলাফল ঘোষণার প্রস্তুতি সম্পন্ন করেছে ইসি। তবে যদি আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির চরম অবনতি ঘটে তবে সেটার ব্যতিক্রম ঘটতে পারে। নির্বাচন কমিশন ও সরকারের তরফ থেকে এ প্রস্তুতিও রাখা হয়েছে যে কোনো কারণে ফলাফল ঘোষণা বিলম্বিত হলে সবাইকে শান্ত থাকার জন্য জাতির উদ্দেশে ভাষণও দিতে পারেন প্রধান উপদেষ্টা ও প্রধান নির্বাচন কশিনার (সিইসি)।
সূত্র জানায়, এবার জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও গণভোট একসঙ্গে হওয়ায় ইসির ওপরও অতিরিক্ত চাপ রয়েছে। একই সঙ্গে সরকারের ওপরও রয়েছে চাপ। আবার একইভাবে রয়েছে রাজনৈতিক দলগুলোর নির্বাচন সুষ্ঠু করার তাগিদ। প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী দুটি রাজনৈতিক দল বিএনপি ও জামায়াতে ইসলামীর নেতৃত্বাধীন দুই জোটের শীর্ষ নেতাদের অভিযোগ এবং পাল্টা অভিযোগের মধ্য দিয়ে ভোটের মাঠে দানা বাঁধছে নানা শঙ্কা ও ভয়। এক দিনে দুটি ভোট এবং তার বিলম্বিত ফলাফলের সুযোগে নির্বাচনি ফল পাল্টে যেতে পারে। পুরো রাষ্ট্রযন্ত্র একটি রাজনৈতিক দলের হাতে ক্ষমতা তুলে দেওয়ার সব আয়োজন সম্পন্ন করেছে এমন অভিযোগও রয়েছে। ফলে সময় ঘনিয়ে আসার সঙ্গে সঙ্গে বাড়ছে শঙ্কা ও ভয়।
জামায়াতে ইসলামীর সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল হামিদুর রহমান আযাদ নির্বাচন কমিশনে দেওয়া বিএনপির এক অভিযোগের পাল্টা অভিযোগ করে বলেছেন, ‘সরকারসহ পুরো রাষ্ট্রযন্ত্র বিএনপির হাতে ক্ষমতা তুলে দেওয়ার জন্য উদগ্রীব হয়ে আছে। তারা সেভাবেই নির্বাচনের মাঠ সাজিয়েছে। আমরা সেটা হতে দেব না। জনগণকে সঙ্গে নিয়ে যেকোনো মূল্যে আমরা সেটা প্রতিহত করব।’ জানা গেছে, অতীতের তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে নির্বাচনের প্রস্তুতির চেয়ে এবারে নির্বাচন কমিশনের প্রস্তুতি আগের তুলনায় কিছুটা ভালো। একই দিনে জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও গণভোট আয়োজনের জন্য প্রায় ২৬ কোটি ব্যালট পেপার ছাপানো প্রায় শেষ পর্যায়ে। দেড় শতাধিক আসনের ব্যালট বাক্স, প্রতীকসংবলিত ব্যালট পেপারসহ নির্বাচনি সামগ্রী এরই মধ্যে পৌঁছানো হয়েছে। ভোট কেন্দ্রের নিরাপত্তা ও সুষ্ঠু পরিবেশ নিশ্চিত করতে এরই মধ্যে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যদের সঙ্গে কয়েক ধাপে মিটিং সম্পন্ন করেছে ইসি। এখন ধাপে ধাপে রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে নিরাপত্তা ও সার্বিক শৃঙ্খলার বিষয়ে বৈঠক করে যাচ্ছে কমিশন।