Image description

জয়মনিরঘোল এমন একটি জনপদ, যার পশ্চিমে পশুর নদ আর দক্ষিণ-পূর্বে শ্যালা নদী। নদ–নদী পার হলে আর কোনো বসতি নেই। প্রায় তিন দিকে সুন্দরবন। আরও দক্ষিণে গেলে বঙ্গোপসাগর। যেন পাখির ঠোঁটের মতো এক চিলতে জনপথ। এ জন্য এর অন্য নাম জয়মনির ঠোঁটা। এরপর বাংলাদেশের আর কোনো বসতি নেই।

বঙ্গোপসাগর উপকূলে সুন্দরবনঘেরা এই গ্রামের শেষ মাথায় ছোট একটি চায়ের দোকান চালান মঞ্জু বেগম। গতকাল মঙ্গলবার দুপুরের দিকে তাঁর দোকানে গিয়ে তেমন কোনো ক্রেতার দেখা পেলাম না। স্মার্টফোনে মনোযোগ দিয়ে কী যেন দেখছিলেন মঞ্জু বেগম। কী দেখছেন জানতে চাইলে লাজুক হাসি দিয়ে বললেন, ‘টিকটক, রিলস দেখছি।’ কিসের টিকটক, রিলস? বললেন, ভোটের।

নির্বাচন সম্পর্কে জানতে চাইলে মঞ্জু বেগম বলেন, ‘এটি রাজার নির্বাচন। ভোট আমি দেব। অন্যরাও ভোট দেবে বলে আলাপ-আলোচনা করছে।’ গণভোট সম্পর্কে জানতে চাইলে মঞ্জু বেগম তেমন কিছু জানেন না বলে জানান।

জয়মনিরঘোল গ্রামটি পড়েছে বাগেরহাট জেলার মোংলা উপজেলার চিলা ইউনিয়নে। এটি বাগেরহাট-৩ (মোংলা ও রামপাল) আসনে পড়েছে। পাঁচজন প্রার্থী লড়ছেন এ আসনে। রামপাল ও মোংলা দুই উপজেলাতেই বিএনপির প্রার্থী শেখ ফরিদুল ইসলাম ও জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থী মোহাম্মদ আবদুল ওয়াদুদ সেখের ব্যানার-পোস্টার, নির্বাচনী ক্যাম্প চোখে পড়েছে। স্থানীয় ভোটারদের মধ্যে আলোচনা—দুই প্রার্থীর মধ্যে লড়াই হবে হাড্ডাহাড্ডি। কারণ, দুই প্রার্থীই তাঁদের কাছে সজ্জন।

তবে বিএনপির বাগেরহাট সদরের সাবেক সংসদ সদস্য এম এ এইচ সেলিম বাগেরহাট-৩সহ তিনটি আসনে স্বতন্ত্র প্রার্থী হয়েছেন। তাঁর প্রভাব সদরে যতটা, ততটা মোংলা-রামপালে দেখা যায়নি। তারপরও তিনি কিছু ভোট কাটবেন বলে স্থানীয়দের ধারণা। এ ছাড়া ইসলামী আন্দোলনের প্রার্থী শেখ জিল্লুর রহমানেরও পক্ষেও মাইকে প্রচার শোনা গেছে।

অন্তর্বর্তী সরকার দেড় বছর দেশ চালিয়েছে। এখন মানুষ মনে করছে, নির্বাচিত সরকার এলে দেশ ভালো চলবে। এ জন্য ভোটের প্রতি আগ্রহ।
নূর আলম, সম্পাদক, মোংলা শাখা, সুজন

মোংলা বন্দর, ইপিজেড এবং বহু শিল্পকারখানার কারণে বাগেরহাট-৩ আসন এমনিতেই কর্মব্যস্ত। মোংলার সুন্দরবনসংলগ্ন এলাকার মানুষ মাছ, কাঁকড়া আর বনের ওপর নির্ভর করে জীবিকা নির্বাহ করেন। গতকাল মোংলা বন্দর হয়ে খেয়াঘাট পার হয়ে প্রত্যন্ত গ্রামের ভেতর গিয়ে দেখা গেল, অধিকাংশ দোকানপাট বন্ধ। রাস্তাঘাটে মানুষের চলাচল খুবই কম। স্থানীয় লোকজন জানালেন, সকাল থেকে পুরুষেরা সুন্দরবন ও নদী-সাগরে ছুটে যান। আর নারীরা দল বেঁধে যান ইপিজেডে কাজ করতে। বিকেলের দিকে দোকানপাট-লোকালয়ে মানুষের আনাগোনা বেশি হয়। বিকেলে ফেরার পথে দোকানপাটে মানুষের আনাগোনা বেশি দেখা গেল। মোংলা খেয়াঘাট, রামপালের দিগরাজ বাজারে জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে ভোটের ট্রাক নিয়ে গানে গানে প্রচার করতে দেখা গেছে। বিশেষ করে গণভোট কীভাবে দিতে হবে, সেই প্রচারে বেশি জোর দেওয়া হচ্ছে।

প্রথম ভোট দেওয়ার জন্য উদ্‌গ্রীব

মোংলা নদীর দক্ষিণ পাড়ে খেয়া পারাপারের জন্য অপেক্ষায় ছিলেন খুলনা বিএল কলেজের সমাজবিজ্ঞানের ছাত্রী ইসমত জাহান জেরিন। তাঁর বাড়ি চিলা ইউনিয়নে। ভোট সম্পর্কে জানতে চাইলে বলেন, ভোটের আগে বাড়ি ফিরে আসবেন এবং ভোট দেবেন। ২০২১ সালে ভোটার হয়েছেন জানিয়ে তিনি বলেন, আগে ভোট দিতে পারেননি, এবার দেবেন। পরিবারের অন্যরাও ভোট দেবেন।

মোংলা নদীর উত্তর পাড়ের দোকানদার লিটন শিকদার মনে করেন, এবার অন্তত ৭০ শতাংশ মানুষ ভোট দিতে যাবে। প্রচার সম্পর্কে জানতে চাইলে লিটন বলেন, এবার তো পোস্টারের কারবার নেই, মিছিলও কম। তবে প্রার্থী ও তাঁদের সমর্থকেরা ঘরে ঘরে ভোট চাইছেন। আর মানুষের হাতে হাতে মোবাইল। ফলে ভোট সম্পর্কে সব খবরই পাওয়া যায়। এমনকি সারা দেশের তথ্যও তাঁরা জানতে পারছেন। লিটন মনে করেন, বাগেরহাট-৩ আসনে লড়াই হবে ত্রিমুখী। বিএনপি, জামায়াতের সঙ্গে বিএনপির বিদ্রোহী প্রার্থী এম এ এইচ সেলিমও আলোচনায় আছেন।

জয়মনিরঘোল এলাকায় বড় খাদ্যগুদাম রয়েছে। এর গেটের সামনের দোকানে চার-পাঁচজন যুব-মধ্যবয়সী বসে আড্ডা দিচ্ছিলেন। ভোটের কথা জানতে চাইলে মো. হামজা বলেন, তিনি এবার প্রথম ভোট দেবেন, অপেক্ষায় আছেন।

আবদুস সাত্তার বলেন, তিনি সুন্দরবনে মাছ ও কাঁকড়া সংগ্রহের কাজ করেন। এলাকার লোকজন একসঙ্গে হলে ভোট নিয়ে আলোচনা করেন। নারীরাও একসঙ্গে হলে ভোট কাকে দেওয়া যায় এবং কাকে দিলে ভালো হবে—এই আলোচনা করছেন।

দোকানের আড্ডায় অংশ নিয়ে রিয়াজুল খান বলেন, তিনি জুলাই অভ্যুত্থান সম্পর্কে ধারণা রাখেন। নিয়মিত তখন খবরে, মোবাইল ফোনে অভ্যুত্থানের খবর দেখেছেন। তিনি বলেন, রাষ্ট্র সংস্কার হবে জেনেছেন। এবার তিনি গণভোটে ‘হ্যাঁ’ ভোট দেবেন।

এবার ভোটের পরিবেশ ভালো

অতীতের নির্বাচনগুলোর অনিয়ম নিয়ে শঙ্কা প্রকাশ করলেন কেউ কেউ। এবার একজনের ভোট অন্যরা দিয়ে দেবেন না, এ নিশ্চয়তা চান ভোটাররা।

গতকাল বিকেলে রামপালের ফয়লা মোড়ে জেলা প্রশাসনের ভোটের ট্রাক থেকে প্রচার চালানো হচ্ছিল। পাশেই একটি দোকানে আড্ডা দিচ্ছিলেন স্থানীয় কয়েকজন। সেখানে শিবনগর গ্রামের মাসুদ রানা বলেন, ২০১৮ সালে তিনি ভোট দিতে গিয়েছিলেন। আওয়ামী লীগের লোকজন তাঁদের সামনে সিল মারতে বললে ভোট না দিয়ে ফিরে আসেন। এরপর আর ভোট দিতে যাননি। তিনি দাবি করেন, তাঁর দাদা ২০১২ সালে মারা গেছেন। সেই মৃত দাদার ভোটও ২০১৮ সালে অন্যরা দিয়ে দেন। ‘দাদি জীবিত আছেন। মৃত দাদা ভোট দিয়ে গেল। দাদির সঙ্গে দেখা করল না। এটা কেমন করে হয়’—মজা করে বললেন মাসুদ।

রামপালের চাঁদপুর গ্রামের আস্তাইন শেখ মাটি কাটার ভিকু চালান। তিনি বলেন, এবার এখন পর্যন্ত ভোটের পরিবেশ ভালোই মনে হচ্ছে। পরিবেশ এমনটা থাকলে অবশ্যই ভোট দিতে যাবেন। ‘যে-ই জিতুক, মাল-তরকারির দাম যাতে কমায়, সেই দাবি করি’—বললেন আস্তাইন শেখ।

সুশাসনের জন্য নাগরিকের (সুজন) মোংলা শাখার সম্পাদক নূর আলম বলেন, দেশে একটা গণ-অভ্যুত্থান হয়েছে। এরপর একটি অন্তর্বর্তী সরকার দেড় বছর দেশ চালিয়েছে। এখন মানুষ মনে করছে, নির্বাচিত সরকার এলে দেশ ভালো চলবে। এ জন্য ভোটের প্রতি আগ্রহ আছে। তিনি আরও বলেন, দীর্ঘদিন একতরফা ভোট হয়েছে। অনেকে ভোট দিতে যাননি। অনেকে ভোটকেন্দ্রে গেলেও পছন্দমতো ভোট দিতে পারেননি। এবার মানুষ পছন্দের প্রার্থীকে ভোট দিতে পারবেন বলে মনে করছেন।