মেয়ের বয়স যখন এক বছর, তখন সড়ক দুর্ঘটনায় স্ত্রী মারা যান। এরপর পেরিয়ে গেছে এক দশক। মেয়ের কষ্ট হবে ভেবে আর বিয়ে করেননি তিনি। কিন্তু আর্থিক সংকট ও সন্তানের ভবিষ্যতের কথা ভেবে সাত মাস আগে মেয়েকে ঢাকার উত্তরার এক বিত্তবান পরিবারে কাজে দিয়েছিলেন। ওই পরিবার বলেছিল যে মেয়ের বিয়েসহ যাবতীয় খরচ দেবে তারা। অথচ এই পরিবারের সদস্যদের নির্মম নির্যাতনে সেই মেয়েই এখন হাসপাতালে শয্যাশায়ী, তার শরীরজুড়ে আঘাতের চিহ্ন। সাত মাস ধরে নির্মম নির্যাতন করা হয়েছে ১১ বছরের মেয়েটিকে।
আজ মঙ্গলবার দুপুরের পর মুঠোফোনে মেয়েটির বাবার সঙ্গে কথা হয় প্রথম আলোর এই প্রতিবেদকের। তিনি প্রথম আলোকে এসব তথ্য জানিয়েছেন।
গত বছরের জুনে মেয়েটিকে তার বাবা যে বাসায় কাজে দিয়েছিলেন, সেটি রাষ্ট্রীয় বিমান পরিবহন সংস্থা বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনসের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) সাফিকুর রহমানের বাসা। মেয়েটির বাবা বলেন, গত ৩১ জানুয়ারি মেয়েকে আনতে গিয়ে তিনি দেখেন, তাঁর মেয়ের দুই হাতসহ শরীরের বিভিন্ন স্থানে গুরুতর জখম। কীভাবে এমন হলো জানতে চাইলে সাফিকুরের (বিমানের এমডি) স্ত্রী বিথী আক্তার সদুত্তর দিতে পারেননি। পরে তিনি মেয়েকে গাজীপুর শহীদ তাজউদ্দীন আহমদ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করান।
মেয়েকে নির্যাতনের অভিযোগ এনে গত রোববার উত্তরা পশ্চিম থানায় শিশু নির্যাতনের অভিযোগে একটি মামলা করেন মেয়েটির বাবা। মামলায় বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনসের এমডি সাফিকুর রহমান, তাঁর স্ত্রী বিথী আক্তারসহ অজ্ঞাতপরিচয় ব্যক্তিদের আসামি করা হয়। ওই দিনই দিবাগত রাত সাড়ে তিনটার দিকে রাজধানীর উত্তরা থেকে সাফিকুর রহমান ও তাঁর স্ত্রী বিথীসহ চারজনকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ। গতকাল সোমবার বিকেলে তাঁদের আদালতে পাঠানো হয়। ঢাকার চিফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট আদালত তাঁদের কারাগারে পাঠানোর আদেশ দেন।
আজ দুপুরের পর মেয়েটির বাবা কথা বলার সময় কান্নায় ভেঙে পড়েন। তিনি বলেন, ‘আমার মেয়ের গলা, পিঠ, হাত, পা–সহ শরীরের প্রায় সব জায়গায় আঘাতের দাগ। পুরো শরীরে পোড়া ক্ষত। সারা শরীরে গরম খুন্তি দিয়ে ছ্যাঁকা দেওয়া হয়েছে। ঠিকমতো কথা বলতেও পারে না। চিকিৎসক বলেছেন, সুস্থ হতে অন্তত দুই মাস সময় লাগতে পারে।’

মেয়েটির বাবা বলেন, তাঁদের বাড়ি পঞ্চগড়ে। তিনি আশুলিয়ার একটি হোটেলে কাজ করেন। গত বছরের জুনে বিমানের এমডির বাসার নিরাপত্তা প্রহরী জাহাঙ্গীর আলমের সঙ্গে একটি চায়ের দোকানে তাঁর পরিচয় হয়। জাহাঙ্গীর মেয়েটির বাবাকে জানিয়েছিলেন, বাসাটিতে বাচ্চা দেখাশোনার কাজে একটি ছোট মেয়ে দরকার। পরে তিনি বাসায় গিয়ে মালিক সাফিকুর রহমান ও তাঁর স্ত্রী বিথীর সঙ্গে দেখা করেন। তাঁরা আশ্বস্ত করেন যে মেয়েটির বিয়েসহ যাবতীয় খরচ তাঁরা বহন করবেন। এতে রাজি হয়ে গত বছরের জুন মাসে তিনি মেয়েকে সেখানে কাজে দেন। সর্বশেষ গত ২ নভেম্বর তিনি মেয়েকে সুস্থ অবস্থায় দেখে আসেন। এরপর কয়েকবার দেখা করতে গেলে নানা অজুহাতে তাঁকে দেখা করতে দেওয়া হয়নি। গত ৩১ জানুয়ারি দুপুরে বিথী ফোন করে জানান যে মেয়েটি অসুস্থ, তাকে নিয়ে যেতে হবে। মেয়েটির বাবা ওই বাসায় গিয়ে অপেক্ষা করেন। সন্ধ্যা সাতটার দিকে বিথী বাড়ির বাইরে এসে মেয়েকে তাঁর কাছে বুঝিয়ে দেন।