২ ফেব্রুয়ারি, সোমবার সকাল ১০টা। এত বেলাতেও কর্মক্ষেত্রে এসে পৌঁছাননি তেঁতুলিয়া উপজেলা স্বাস্থ্য কর্মকর্তা। তাঁর কক্ষের দরজা খোলা, ভেতরে তিনি নেই। পাশের কক্ষের একজন নারী কর্মী জানালেন, উপজেলা স্বাস্থ্য কর্মকর্তা বাসায় আছেন। বাসায় বসে কম্পিউটারে অফিসের কাজ করছেন।
বাসা কোথায়? উত্তরে জানা গেল, হাসপাতালের পেছনে, ডক্টরস কোয়ার্টারে তিনি থাকেন। দেখা করতে চাইলে অপেক্ষা করতে হবে।
পঞ্চগড়ে ভারত সীমান্তের এই উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স তুলনামূলকভাবে অনেক বড়। হাসপাতালের দুটি ভবন ছাড়াও চিকিৎসক, নার্স, ওয়ার্ড বয়, আয়াদের থাকার জন্য পৃথক পৃথক ভবন চোখে পড়ল। অধিকাংশ ভবন ফাঁকা। আধা ঘণ্টা ঘুরে দেখা গেল, হাসপাতালটি অপরিচ্ছন্ন, বহু জায়গা অব্যবহৃত। নজরদারি নেই। অযত্ন আর অবহেলার ছাপ কমপ্লেক্সজুড়ে।
সকাল সাড়ে ১০টার সময় দেখা গেল একজন পিয়নের সঙ্গে বাসভবন থেকে বের হচ্ছেন তেঁতুলিয়া উপজেলার স্বাস্থ্য কর্মকর্তা সৈয়দ মাহমুদুর রহমান। উপজেলার সরকারি স্বাস্থ্যকেন্দ্রগুলোর জনবল পরিস্থিতি সম্পর্কে জানতে চাইলে সৈয়দ মাহমুদুর রহমান বলেন, পরিসংখ্যান কর্মকর্তা পিআরএলে যাওয়ার কারণে এ তথ্য দেওয়া সম্ভব নয়। এরপর তিনি শুধু জানান, উপজেলায় চিকিৎসকের পদ আছে ২৮টি, চিকিৎসক আছেন ৫ জন।
পঞ্চগড় সদর হাসপাতাল এবং ৪টি উপজেলায় চিকিৎসকের পদ আছে ১৭২টি। চিকিৎসক আছেন ৬১ জন। অর্থাৎ ১১১ বা ৬৫ শতাংশ চিকিৎসকের পদ খালি। এই জেলার শিশুদের গড় উচ্চতা, গড় ওজন জাতীয় গড়ের চেয়ে পিছিয়ে।
হাসপাতালে তো অনেক সমস্যা, জাতীয় নির্বাচন তো সামনে, কোনো প্রার্থী কি এই হাসপাতালে এসেছেন? হাসপাতালের সমস্যা জানার বা সমস্যা দূর করার কথা বলেছেন?
উত্তরে সৈয়দ মাহমুদুর রহমান ঘাড় নেড়ে বলেন, ‘না’।
দেশের অন্যান্য এলাকার মতো পঞ্চগড়েও জাতীয় সংসদ নির্বাচনে প্রার্থীরা নানা প্রতিশ্রুতি দিচ্ছেন। নির্বাচনী এলাকার মানুষের উন্নত স্বাস্থ্যসেবা দেওয়ার কথা কারও মুখে শোনা যাচ্ছে না। অন্য অনেক প্রতিশ্রুতির ভিড়ে বরাবরের মতো স্বাস্থ্য বিষয় হিসেবে অবহেলিত থেকে যাচ্ছে।
তেঁতুলিয়া থেকে পঞ্চগড় আসার পথে গুরুত্বপূর্ণ স্থান জগদল বাজার। গত রোববার দুপুরে জগদল বাজারে আল্লার দান হোটেল অ্যান্ড রেস্তোরাঁয় কথা হয় মোহাম্মদ ইসলামের সঙ্গে। বয়স ৬০ বছরের ওপর। ওই হোটেলেই কাজ করেন। কথার একপর্যায়ে আলোচনায় যোগ দেন তাঁর দুই নারী সহকর্মী। তাঁদের বয়সও পঞ্চাশের ওপর।
মোহাম্মদ ইসলাম দেখালেন, তাঁর ঘাড়ে একটা টিউমার। এটা কীভাবে সরাবেন, তা নিয়ে তাঁর চিন্তার শেষ নেই। অন্য দুই নারী সহকর্মী জানালেন, তাঁদেরও নানা শারীরিক সমস্যা আছে। দুজনের সাধারণ সমস্যা হাঁটুতে ব্যথা। তিনজনেরই জীবন চলছে কোনোরকমে। তবে তিনজনই ভোটার। জানালেন, ভোট দেবেন।
আটোয়ারী, দেবীগঞ্জ ও বোদা—এ তিন উপজেলার উপজেলা স্বাস্থ্য কর্মকর্তার কাছে জানান, নির্বাচনে কোনো দলের কোনো প্রার্থী তাঁদের হাসপাতালে এসে সমস্যা জানার বা সমস্যা দূর করার কথা বলেননি।
যাঁদের ভোট দেবেন, তাঁরা কি আপনাদের সমস্যার কথা জানেন? এ কথায় মোহাম্মদ ইসলাম পাল্টা প্রশ্ন ছোড়েন, তাঁরা কী করে জানবেন?
এই তিনজন নির্বাচনী প্রচারণা শুনেছেন। হোটেলের সামনে নিয়ে প্রচারণার মাইক যায়। মাইকে নানা প্রতিশ্রুতির আওয়াজ শোনা যায়। নির্দিষ্ট প্রশ্ন করে জানা গেল, ভালো হাসপাতাল করা, উন্নত চিকিৎসার ব্যবস্থার কথা কারও মুখে শোনেননি। সাধারণ মানুষের চিকিৎসার কথাও যে নির্বাচনের সময় বলা যেতে পারে, এ কথা কিছুতেই মোহাম্মদ ইসলামের মাথায় আসে না।
উত্তরের এই জেলার জনসংখ্যা ১২ লাখের বেশি। এখানে জাতীয় সংসদের আসন দুটি। তেঁতুলিয়া ও আটোয়ারী এবং সদর উপজেলা নিয়ে পঞ্চগড়–১ আসন। এখানে ভোটার ৪ লাখ ৫৮ হাজার ৮০৭ জন। দেবীগঞ্জ ও বোদা উপজেলা নিয়ে পঞ্চগড়–২ আসন। সেখানে ভোটার ৪ লাখ ১৪ হাজার ৩৫৩ জন।
পুষ্টিবিদদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, এই জেলার পুষ্টি পরিস্থিতি জাতীয় গড় পুষ্টি পরিস্থিতির চেয়ে খারাপ। এই জেলার শিশুদের গড় উচ্চতা, গড় ওজন জাতীয় গড়ের চেয়ে পিছিয়ে।
আরও সমস্যা জানা গেল জেলার সিভিল সার্জনের কাছে থেকে। পঞ্চগড় জেলার সিভিল সার্জন মো. মিজানুর রহমান প্রথম আলোকে বলেন, সদর হাসপাতাল এবং চারটি উপজেলায় চিকিৎসকের পদ আছে ১৭২টি। চিকিৎসক আছেন ৬১ জন। অর্থাৎ ১১১ বা ৬৫ শতাংশ চিকিৎসকের পদ খালি।
এ জেলায় তো অনেক সমস্যা, কোনো প্রার্থী কি আপনার কার্যালয় এসেছেন বা জেলার স্বাস্থ্য সমস্যা জানার বা সমস্যা দূর করার কথা বলেছেন? প্রথম আলোর এসব প্রশ্নের উত্তের সিভিল সার্জনও ‘না’–সূচক উত্তর দেন।
এই প্রতিবেদক আটোয়ারী, দেবীগঞ্জ ও বোদা—এ তিন উপজেলার উপজেলা স্বাস্থ্য কর্মকর্তার কাছে মুঠোফোনে জানতে চেয়েছিলেন, কোনো দলের কোনো প্রার্থী কি আপনার হাসপাতালে এসেছেন? হাসপাতালের সমস্যা জানার বা সমস্যা দূর করার কথা বলেছেন? তাঁরা প্রত্যেকে বলেছেন, এখন পর্যন্ত কেউ আসেননি।
বিকেলে কথা হয় একটি হোটেলের কর্মচারী মো. নূর হুদার সঙ্গে। বয়স কত, তা জানতে চাইলে ইংরেজিতে বলেন, ‘এইট্টি ফাইব’ (৮৫)। ভোট দেবেন? মো. নূর হুদার স্পষ্ট উত্তর, ‘অবশ্যই দেব।’ এরপর তিনি বলেন, এত বয়সে কাজ করতে পারার কারণ তার উচ্চ রক্তচাপ, ডায়াবেটিস কিংবা হৃদ্যন্ত্রের কোনো জটিলতা নেই।
যাঁকে ভোট দেবেন, তিনি কি আপনার মতো প্রবীণ মানুষদের জন্য কিছু করার কথা বলেছেন বা করবেন বলে শুনেছেন? ‘অসম্ভব!’ জবাব আসে প্রবীণ এই ব্যক্তির কাছ থেকে।