Image description

১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচন হতে যাচ্ছে বাংলাদেশের ইতিহাসে সবচেয়ে অনিশ্চয়তায় ভরা নির্বাচন। ভোটের আর বাকি মাত্র ৯ দিন। কিন্তু এখন পর্যন্ত ভোটারদের মুখে তালা। ভোটাররা কাকে পছন্দ করছেন তা বোঝা ভার।

অনেকেই মনে করছেন, দীর্ঘদিন পর ভোটাধিকার প্রয়োগের সুযোগ পেয়েছেন সেজন্যই তাঁরা অনেক বেশি সতর্ক।

এবারের নির্বাচনে বিপুলসংখ্যক তরুণ ভোটার ভোট দেবেন। জাতীয় যুবনীতি-২০১৭ অনুযায়ী ১৮ থেকে ৩৫ বছর বয়সি নাগরিকরা যুবক। ভোটারদের বয়স পর্যালোচনা করলে দেখা যায় আগামী নির্বাচনে তরুণ ভোটার সাড়ে ৪ কোটির কিছু বেশি।

বিগত তিনটি বিতর্কিত নির্বাচনের কারণে ২০০৯ সালের জানুয়ারি থেকে এ পর্যন্ত যারা ভোটার হয়েছেন তাদের অধিকাংশই এবারই প্রথমবার জাতীয় নির্বাচনে ভোট দেবেন। রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, আগামীতে সরকার গঠনে সবচেয়ে বড় ফ্যাক্টর হবে তরুণদের ভোট। যেসব রাজনৈতিক দল রাষ্ট্র ও রাজনীতির ইতিবাচক পরিবর্তনের প্রতিশ্রুতি দেবে, তাদের বাক্সে যেতে পারে তরুণদের ব্যালট। তবে বাংলাদেশের তরুণরা নানা মত ও পথে বিভক্ত।
সাম্প্রতিক সময়ে, অনুষ্ঠিত বিভিন্ন পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র সংসদ নির্বাচন পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, শিক্ষার্থীরা বিভিন্ন আদর্শে বিভক্ত। ২৪ এর গণ অভ্যুত্থানের পর ছাত্র সমাজের বিভাজন আরও স্পষ্ট। কাজেই সাড়ে ৪ কোটি তরুণের ভোট যে এক বাক্সে যাবে না, এটা হলফ করেই বলা যায়। তরুণ প্রজন্মের ভোটাররা এবার নির্বাচনে কোনো বিশেষ দলের প্রতি একজোট হয়ে ভোট দেবে না। তাই তারা নির্বাচনে ফলাফল নির্ধারণে মূল প্রভাবক হতে পারবে না।
জুলাই আন্দোলনে সব দলের তরুণদের অংশগ্রহণ ছিল। সবাই যার যার অবস্থান থেকে স্বৈরাচার মুক্তির লক্ষ্যে ঐক্যবদ্ধ হয়েছিল। আন্দোলনের পর যে যার ঘরে ফিরে গেছে। তাই তরুণরা ভোট দেবেন তাদের দলীয় আনুগত্যের ভিত্তিতে।

 

এবারের নির্বাচনে নারী ভোটারের সংখ্যা ৬ কোটি ২৮ লাখ ৭৯ হাজার ৪২ জন। দেশে প্রায় অর্ধেক ভোটার নারী হলেও নারী প্রার্থীর সংখ্যা আশঙ্কাজনক হারে কমে গেছে এ নির্বাচনে। নির্বাচন কমিশনের তথ্যমতে, ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে মোট ১ হাজার ৯৮১ জন প্রার্থী প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন, যার মধ্যে নারী প্রার্থী মাত্র ৮০, অর্থাৎ মোট প্রার্থীর ৪ দশমিক ০৪ শতাংশ। ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি) জানিয়েছে, দলবদ্ধ প্রার্থীর মধ্যে নারীর অংশ মাত্র ৩ দশমিক ৩৮ শতাংশ, যেখানে স্বতন্ত্র প্রার্থীর মধ্যে নারীর অংশ ১০ শতাংশ।

জাতীয় ঐকমত্য কমিশন প্রণীত জুলাই জাতীয় সনদ ২০২৫-এর ধারা ২২(খ)-(ঘ) অনুযায়ী, প্রতিটি রাজনৈতিক দলকে এবারের সংসদীয় নির্বাচনে ন্যূনতম ৫ শতাংশ নারী প্রার্থী মনোনয়ন নিশ্চিত করতে হবে। পরবর্তী নির্বাচনগুলোতে তা ধাপে ধাপে বাড়িয়ে ৩৩ শতাংশে উন্নীত করার লক্ষ্য নির্ধারিত হয়েছে। কিন্তু জুলাই সনদ যেহেতু এখনো বাস্তবায়িত হয়নি, তাই কার্যত সেই নিয়মও এখন অচল। অথচ জাতীয় নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতাকারী ৫১টি রাজনৈতিক দলের মধ্যে ৩৫টিরই কোনো নারী প্রার্থী নেই।

নারী প্রার্থী কম থাকলেও নারীদের ভোট কেন্দ্রে উপস্থিতি কম থাকবে এমনটি ভাবার কোনো কারণ নেই। বাংলাদেশে অতীতের তিনটি নির্বাচনকে মোটামুটি নিরপেক্ষ ও গ্রহণযোগ্য মনে করা হয়। এগুলো হলো, ১৯৯১, ১৯৯৬ এবং ২০০১ সালের জাতীয় সংসদ নির্বাচন। এই তিনটি নির্বাচনের ফলাফল বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, নারীরা যখন যে দলের পক্ষে ভোট দিয়েছে, সেই দলই বিজয়ী হয়েছে। ১৯৯১ সালের নির্বাচনে বিএনপি প্রায় ৩১ শতাংশ ভোট পেয়ে ১৪৪টি আসনে জয়ী হয়েছিল। ওই নির্বাচনে নারী ভোটারদের ৫৭ শতাংশই বিএনপিকে ভোট দেয়। অর্থাৎ নারী ভোটারদের কারণেই বিএনপি সেবার বিজয়ী হয়ে সরকার গঠন করেছিল। ১৯৯৬ সালের নির্বাচনে প্রায় ৩৮ শতাংশ ভোট পেয়ে আওয়ামী লীগ জয়লাভ করেছিল। ওই নির্বাচনে বিএনপিরও ভোট বেড়েছিল। ৯১ এর ৩১ শতাংশ ভোট বেড়ে বিএনপির ভোটের হার দাঁড়ায় ৩৩ শতাংশের বেশি। কিন্তু বিএনপির নারী ভোট কমে উল্লেখযোগ্য হারে। ৯৬ এর নির্বাচনে মাত্র ৩৫ শতাংশ নারী বিএনপিকে ভোট দেয়। বিএনপি ২২ শতাংশ নারী ভোট হারিয়ে বিরোধী দলে যেতে বাধ্য হয়েছিল। আবার ২০০১ সালের নির্বাচনের ফলাফল বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, নারীরা বিএনপিকে বিপুলভাবে সমর্থন করায় বিএনপি দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে সরকার গঠন করে। ওই নির্বাচনে বিএনপি এবং আওয়ামী লীগের ভোটের ব্যবধান ছিল খুবই কম। বিএনপি পেয়েছিল, ৪১ শতাংশ ভোট আর আওয়ামী লীগ পায় ৪০ শতাংশের সামান্য বেশি। কিন্তু নারী ভোটের হিসাব ছিল অন্যরকম। এবারও ৫৭ শতাংশ নারী বিএনপিকে ভোট দেয়। অর্থাৎ পুরুষ ভোটে ২০০১ এর নির্বাচনে আওয়ামী লীগ এগিয়ে থাকলেও নারীরাই বেগম জিয়াকে ক্ষমতায় বসান। তাই, নির্বাচনে প্রার্থী যতই কম হোক, নারীরাই আসলে ভোটে সবচেয়ে বড় ফ্যাক্টর। সবচেয়ে বড় বিষয় হলো, নারীদের ভোট ভাবনা একই ধরনের। যেসব নারীরা সরাসরি রাজনৈতিক দলের সঙ্গে যুক্ত, তারা ছাড়া সাধারণ নারীরা ওই তিন নির্বাচনে প্রায় অভিন্ন দৃষ্টিভঙ্গি পোষণ করেন। তাদের ভোট ভাবনা একইরকম। এর কারণ হলো, বাংলাদেশের নারীরা একই ধরনের মনস্তত্ত্ব লালন করেন। শিক্ষিত কিংবা অশিক্ষিত, শহর কিংবা গ্রাম সব অঞ্চলের নারীদের জীবনের বাস্তবতা মোটামুটি একই ধরনের। সব নারীকেই প্রতিনিয়ত যুদ্ধ করতে হয় বৈরী পরিবেশ এবং পরিস্থিতির সঙ্গে। তাই তাদের ভাবনাগুলোর মধ্যে অনেক মিল খুঁজে পাওয়া যায়। শুধু নির্বাচন কেন? বাংলাদেশের সব আন্দোলনের মোড় ঘুরিয়ে দিয়েছেন নারীরাই। ৯০ এর গণতন্ত্রের আন্দোলনে চূড়ান্ত বিজয় আসে যখন নারীরা ঘর থেকে বেরিয়ে আসেন।

২০২৪ সালের কোটা সংস্কার আন্দোলন থেকে শুরু হয়ে স্বৈরাচার পতনের এক দফা আন্দোলন-বাংলাদেশের ইতিহাসে এক অনন্য অধ্যায় হয়ে আছে। সরকারি চাকরিতে কোটা সংস্কারের দাবিতে শুরু হওয়া এই আন্দোলনের শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত নারীরা ছিলেন সামনের সারিতে। রাজপথে, মিছিলে, সংগঠনে-সবখানেই নারীদের দৃপ্ত উপস্থিতি ছিল চোখে পড়ার মতো।

বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসগুলোতে বিশেষ করে নারী শিক্ষার্থীদের সরব অংশগ্রহণ ছিল স্পষ্ট। রাজপথের মিছিলে সামনে থেকেই নেতৃত্ব দিয়েছেন তারা। শুধু মিছিলেই নয়, অনেক নারী ছিলেন যারা আন্দোলনকারীদের খাবার-পানির ব্যবস্থা করেছেন, আবার কেউ কেউ আহতদের সেবা-শুশ্রƒষায় যুক্ত থেকেছেন। একেকজন নারী একেকভাবে এই আন্দোলনকে এগিয়ে নিয়েছেন।

বাংলাদেশে গণ আন্দোলনই নারীর অংশগ্রহণ ছাড়া পূর্ণতা পায়নি। ইতিহাসের পাতা উল্টালে দেখা যায়, স্বাধীনতা সংগ্রাম থেকে শুরু করে নব্বইয়ের গণ অভ্যুত্থান কিংবা ২০১৮ সালের নিরাপদ সড়ক আন্দোলন-প্রতিটি সংগ্রামে নারীদের রয়েছে সাহসিকতা ও নেতৃত্বের ভূমিকা। কিন্তু আন্দোলনের পর তাদের অবদানকে স্বীকৃতি দেওয়া হয়নি।

২০২৪-এর আন্দোলনেও নারীদের সাহসিকতা অন্য সবকিছু ছাপিয়ে গিয়েছিল। ২০২৪-এর ছাত্র আন্দোলন ছিল দীর্ঘদিনের অন্যায় ও বৈষম্যের বিরুদ্ধে একটি গণবিস্ফোরণ। যেমন ১৯৫২, ১৯৬৯, ১৯৭১, ১৯৯০-এর মতো সময়গুলোতে জনগণ শিকল ভেঙে অধিকার প্রতিষ্ঠার আকাঙ্ক্ষা নিয়ে রাস্তায় নেমেছিলেন, তেমনই ২০২৪ সালেও ঘটে নতুন এক জাগরণ। কিন্তু এই আন্দোলনের পর নারীদের অবস্থার পরিবর্তন হয়নি। বরং অনেক ক্ষেত্রেই নারীদের জন্য সৃষ্টি হয়েছে নতুন সমস্যা। নারীদের ওপর সহিংসতা বেড়েছে। বেড়েছে নারী নির্যাতন। তাই এবারের নির্বাচনে নারীরা কী ভাবছেন সেটা নির্বাচনে বড় প্রভাব ফেলবে। ২৪ এর আন্দোলনের পর নারীরা কেমন আছেন? সমাজে তাদের অবস্থান কতটা পাল্টেছে? নারীদের নিরাপত্তা কতটা নিশ্চিত হয়েছে? এসব প্রশ্নের উত্তর নিশ্চয়ই আছে সব নারীর কাছেই। নারীরা নীরব থাকেন। নিশ্চয়ই ভোটের মাধ্যমেই তারা তাদের মতামত দেবেন। কিন্তু সঠিক সময়ে সঠিক সিদ্ধান্ত নিতে তারা ভুল করে না কখনো। এবারের নির্বাচনে তাদের মতামত সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। আর এই মতামতের ভিত্তিতেই গঠিত হবে আগামীর সরকার। নারী ভোটারদের হাতেই মসনদের চাবি। এই চাবি নারীরা কাকে তুলে দেবেন তা জানা যাবে ১২ ফেব্রুয়ারি।