Image description

সংসদ নির্বাচনের আগে রাষ্ট্রের প্রয়োজনীয় সংস্কার করা দরকার মনে করেন দেশের ৫১ শতাংশ মানুষ। কিন্তু গত দেড় বছরে রাষ্ট্রের বিভিন্ন স্তরে সংস্কারের উদ্যোগ নেওয়া হলেও ‘ডিপ স্টেট’ ও আমলাতন্ত্রের প্রতিরোধের মুখে পিছিয়ে এসেছে অন্তর্বর্তী সরকার। আসন্ন নির্বাচনের পর আমলাতন্ত্র তাদের ক্ষমতা প্রয়োগ করে সংস্কারের প্রক্রিয়া থামিয়ে দিতে পারে।

ব্র্যাক ইনস্টিটিউট অব গভর্ন্যান্স অ্যান্ড ডেভেলপমেন্টের (বিআইজিডি) গত দেড় বছরে অন্তর্বর্তী সরকারের অর্থনীতি, সামাজিক ও রাজনৈতিক পরিস্থিতির মূল্যায়ন প্রতিবেদনে এ শঙ্কা প্রকাশ করা হয়েছে।

বৃহস্পতিবার ‘২০২৪-এর অভ্যুত্থান-পরবর্তী বাংলাদেশের রাজনীতি, সমাজ ও অর্থনীতির রূপান্তর’ শীর্ষক এ প্রতিবেদন প্রকাশ করা হয়। প্রতিবেদনের একটি অংশে জরিপের ফলাফল প্রকাশ করা হয়েছে।

‘শেষ পর্যন্ত যে যেদিক দিয়ে চাপ দিয়েছে, তিনি (প্রধান উপদেষ্টা) সেদিকে চলে গেছেন। তিনি ঘোষণা দিচ্ছেন এটা করব, কিন্তু শেষ পর্যন্ত দেখা গেল সেটা করলেন না।
মির্জা হাসান, উপদেষ্টা, বিআইজিডি

ডিপ স্টেট বলতে বোঝায় অনির্বাচিত ব্যক্তিদের সংগঠিত বলয়, যারা রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষেত্রে প্রভাব বিস্তার করে এবং নিজেদের স্বার্থকে সমুন্নত রাখে।

জরিপে দেখা যাচ্ছে, দেশের ৫১ শতাংশ মানুষ মনে করেন, নির্বাচনের আগে প্রয়োজনীয় সংস্কার করা উচিত। ২০২৪ সালের গণ-অভ্যুত্থানের পর দেশের ৭১ শতাংশ মানুষ মনে করতেন, দেশ রাজনৈতিকভাবে সঠিক পথে আছে। ২০২৫ সালের জুলাইয়ে এমন মনে করেন ৪২ শতাংশ মানুষ। ২০২৪ সালের আগস্টে ৬০ শতাংশ মানুষ মনে করতেন, দেশ অর্থনৈতিকভাবে সঠিক পথে আছে। ২০২৫ সালের জুলাইয়ে তা মনে করেন ৪৫ শতাংশ মানুষ।

বিআইজিডির প্রতিবেদনে গত দেড় বছরে অন্তর্বর্তী সরকারের চরিত্র বিশ্লেষণ করে অন্তর্বর্তী সরকারকে ‘দুর্বল শক্তির ভারসাম্য (ইকোলিব্রিয়াম অব দ্য উইক)’ হিসেবে আখ্যা দেওয়া হয়েছে। তাদের প্রতিবেদন বলছে, শুরুতে সংস্কারের পক্ষে প্রধান উপদেষ্টার যে বৈধতা ও জনসমর্থন ছিল, তা তিনি ব্যবহার করতে পারেননি। অন্যদিকে কিছু ক্ষেত্রে সরকার সংস্কারের উদ্যোগ নিলেও আমলাতন্ত্র বা ডিপ স্টেটের বাধার মুখে তা কার্যকর করা কঠিন হয়ে পড়েছে।

প্রতিবেদনের ভাষ্য, প্রধান উপদেষ্টা একেক সময় একেক দিকে তাঁর মত পরিবর্তন করেছেন।

প্রতিবেদন বলছে, সংস্কারের ক্ষেত্রে সরকার বিএনপির বিরোধিতা সামলাতে পারলেও আমলাতন্ত্রের শক্তিশালী প্রতিরোধের মুখে সংস্কারের ক্ষেত্রে পিছু হটেছে। এমন বাস্তবতায় এটা ধরে নেওয়া যায় যে নির্বাচনের পর আমলাতন্ত্র সংস্কারবিরোধী ভূমিকা নিতে পারে। গণতান্ত্রিক শাসনপ্রক্রিয়ায় রূপান্তরের যে সম্ভাবনা, আমলাতন্ত্র তার ক্ষমতা ব্যবহার করে সে রূপান্তরপ্রক্রিয়া থামিয়ে দিতে পারে।

সংস্কারের প্রস্তাব বাস্তবায়নের সময়কাল নির্ধারণ করা হয়েছে নির্বাচনের পর, যা পরবর্তী সংসদ ও রাজপথে দ্বন্দ্ব ও সংঘাতের একটা উৎস হয়ে থাকবে বলে বিআইজিডির প্রতিবেদনে ধারণা দেওয়া হয়েছে।

প্রতিবেদনে রাজনৈতিক দলগুলোর ১৯৯১ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত আদর্শিক অবস্থান পরিবর্তনের একটি চিত্র তুলে ধরা হয়েছে, যেখানে দেখা যাচ্ছে আওয়ামী লীগ ১৯৯১ সালে সেন্টার-লেফট (মধ্যবাম) অবস্থানে থাকলেও ২০২৪ সালে এসে তার রাজনৈতিক আদর্শিক অবস্থান পরিবর্তন হয়ে সেন্টার-রাইট বা মধ্যডানে রূপ নিয়েছে। বিএনপি ১৯৯১ সাল থেকে তার রাজনৈতিক অবস্থান মধ্যডান বা সেন্টার-রাইট এখনো ধরে রেখেছে। প্রতিবেদনে নতুন রাজনৈতিক দল এনসিপিকে মধ্যপন্থী হিসেবে দেখানো হয়েছে।

সংস্কারের প্রস্তাব বাস্তবায়নের সময়কাল নির্ধারণ করা হয়েছে নির্বাচনের পর, যা পরবর্তী সংসদ ও রাজপথে দ্বন্দ্ব ও সংঘাতের একটা উৎস হয়ে থাকবে বলে বিআইজিডির প্রতিবেদনে ধারণা দেওয়া হয়েছে।

অভ্যুত্থানের তিন শক্তি

বিআইজিডির প্রতিবেদনে জুলাইয়ের গণ-অভ্যুত্থানে তিন শক্তির ভূমিকাকে নির্ণায়ক হিসেবে তুলে ধরা হয়েছে। এ তিন শক্তি হলো শহুরে নিম্নবিত্ত শ্রমজীবী, শিল্পশ্রমিক ও শিক্ষার্থী। এ তিন শক্তির সম্মিলনে জনগণের একটা অজেয় শক্তি তৈরি হয়েছিল, যা সেনাবাহিনীকে জনগণের বিরুদ্ধে অবস্থান না নিতে বাধ্য করেছে।

প্রতিবেদন জানাচ্ছে, জুলাই অভ্যুত্থান–পরবর্তী সময়ে ধর্মনিরপেক্ষ ও বামপন্থী দলগুলোর প্রভাব কমে এসেছে। বিপরীতে ইসলামি দলগুলোর প্রভাব বেড়েছে। বিশেষ করে জামায়াতে ইসলামী আওয়ামী লীগ বা বিএনপির সহযোগী হিসেবে নয়, নিজেরাই স্বতন্ত্রভাবে শক্তিশালী রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে।

প্রতিবেদন বলছে, জুলাই অভ্যুত্থানে নারীদের ব্যাপক সক্রিয় অংশগ্রহণ থাকলেও রাষ্ট্রগঠনে তাদের কোণঠাসা করে রাখা হয়েছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে রক্ষণশীল গোষ্ঠীর তৎপরতার মুখে নারীবিষয়ক সংস্কার কমিশনকে কার্যকর রাখার বিষয়ে সরকারের উদ্যোগ চোখে পড়েনি।

প্রতিবেদন জানাচ্ছে, জুলাই অভ্যুত্থান–পরবর্তী সময়ে ধর্মনিরপেক্ষ ও বামপন্থী দলগুলোর প্রভাব কমে এসেছে। বিপরীতে ইসলামি দলগুলোর প্রভাব বেড়েছে। বিশেষ করে জামায়াতে ইসলামী আওয়ামী লীগ বা বিএনপির সহযোগী হিসেবে নয়, নিজেরাই স্বতন্ত্রভাবে শক্তিশালী রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে।

‘মবক্রেসি’ শক্তিশালী হয়েছে

গণ-অভ্যুত্থানপরবর্তী সময়ে দেশে ভয়ংকর একধরনের গণপিটুনি ও সংঘবদ্ধ সহিংসতার প্রবণতা দেখা গেছে। এতে জড়িয়ে পড়েছে নানা পক্ষ—স্থানীয় রাজনৈতিক প্রতিশোধপরায়ণ গোষ্ঠী, প্রভাবশালী ক্ষমতাকেন্দ্রের দালাল, উগ্র ইসলামপন্থী নেটওয়ার্ক, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে উসকানি পাওয়া জনতা, সুযোগসন্ধানী লুটেরা এবং তথাকথিত স্বেচ্ছা বিচারকারীরা। এসব সহিংসতা কোনো কেন্দ্রীয় নেতৃত্ব ছাড়াই বিভিন্ন খণ্ডিত গোষ্ঠীর মাধ্যমে সংঘটিত হচ্ছে, যা আবেগের সংক্রমণ, নৈতিক ক্ষোভ এবং নতুন করে অর্জিত ক্ষমতা প্রদর্শনের তাড়নায় পরিচালিত।

আইন ও সালিশ কেন্দ্র জানিয়েছে, ২০২৪ সালের আগস্ট থেকে ২০২৫ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত সময়ে গণপিটুনিতে নিহত হয়েছেন ২৯৫ জন। এর মধ্যে শুধু ২০২৫ সালেই নিহত হয়েছেন ১৯৭ জন। অন্যদিকে বিআইজিডির জরিপে দেখা গেছে, ৮০ শতাংশ উত্তরদাতা গণপিটুনি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন এবং ৬২ শতাংশ নারী নিরাপত্তা নিয়ে শঙ্কা জানিয়েছেন।

জানতে চাইলে বিআইজিডির উপদেষ্টা মির্জা হাসান বলেন, প্রধান উপদেষ্টার পেছনে পুরো ছাত্রসমাজ ছিল, জনসমর্থন ছিল। তিনি চাইলে ব্যাপক সংস্কারের পক্ষে একটি অবস্থান নিতে পারতেন। মির্জা হাসান বলেন, ‘শেষ পর্যন্ত যে যেদিক দিয়ে চাপ দিয়েছে, তিনি (প্রধান উপদেষ্টা) সেদিকে চলে গেছেন। তিনি ঘোষণা দিচ্ছেন এটা করব, কিন্তু শেষ পর্যন্ত দেখা গেল সেটা করলেন না। সমঝোতা করে ফেললেন বিএনপির সঙ্গে, ছাত্রদের সঙ্গে বা আমলাতন্ত্রের সঙ্গে।’