বেসরকারি খাতের চারটি প্রকল্প অতিমাত্রায় বিনিয়োগ দেখিয়ে সরকারের কাছ থেকে প্রায় ৩৫ হাজার কোটি টাকা হাতিয়ে নেয়ার ছক কষেছে। বেশি বিনিয়োগ এবং ঋণ দেখাতে পারলে বেশি করে ক্যাপাসিটি চার্জ পাওয়া যায়। এ সংক্রান্ত আইনের এমন সুযোগ কাজে লাগিয়েছে সামিটের ৫৮৩ মেগাওয়াটের মেঘানাঘাট-২, ৫৮৪ মেগাওয়াটের ইউনিক মেঘনাঘাট, ৭১৮ মেগাওয়াটের জেরা মেঘনাঘাট এবং ৫৮৩ মেগাওয়াটের ইউনাইটেড আনোয়ারা বিদ্যুৎকেন্দ্র। এর মধ্যে ইউনাইটেড আনোয়ারা এখনো উৎপাদনে আসেনি। কিন্তু বিনিয়োগের উসুলের পরিকল্পনা বা ক্যাপাসিটি চার্জ আদায়ের চুক্তি করে ফেলেছে তারা। এ ধরনের লুটপাটকে তদন্তসংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা উল্লেখিত চার কোম্পানির ‘বিশেষ কেরামতি’ বলে মন্তব্য করেন। আর এভাবে টাকা লুটে নেওয়ার সুযোগ করে দিয়েছে পতিত আওয়ামী লীগ সরকার।
বিগত সরকারের সময়ে বিদ্যুৎ খাতে অনিয়ম তদন্তে গঠিত জাতীয় কমিটির প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বড় বড় বিদ্যুৎকেন্দ্রের ট্যারিফ বা বিদ্যুৎ কেনার মূল্য পর্যালোচনা করেছে পৃথক অন্য একটি কমিটি। সেই কমিটির প্রতিবেদন জাতীয় কমিটি যাচাই করে চাঞ্চল্যকর তথ্য পেয়েছে। প্রতিবেদনে বলা হয়, সামিট-২ বিদ্যুৎকেন্দ্রের মেয়াদ বাকি আছে ২১ বছর। এই সময়ে বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডকে (পিডিবি) ক্যাপাসিটি চার্জ দিতে হবে ১৩৫ কোটি ৩১ লাখ ৭০ হাজার ডলার। কিন্তু এই প্রকল্পের খরচ অন্যান্য প্রকল্পের সঙ্গে তুলনা করে দেখা গেছে, সামিট বেশি বিনিয়োগ দেখিয়ে ২১ বছরে ৬১ কোটি ৯৮ লাখ ডলার, যা বাস্তবতার চেয়ে ৪৫ দশমিক ৭ শতাংশ বেশি।
ইউনিক মেঘনাঘাট বিদ্যুৎকেন্দ্র প্রকল্পে ২১ বছরে আদায় করা হবে ১৩২ কোটি ৬২ লাখ ২৯ হাজার ডলার। প্রকৃতপক্ষে তা হওয়া উচিত ছিল ৭১ কোটি ৭৩ লাখ ডলার। এই প্রকল্পে পিডিবি বা সরকারের কাছ থেকে ইউনিক ৬০ কোটি ৫৬ লাখ ডলার বেশি আদায় করছে। জেরা ২২ বছরে ক্যাপাসিটি চার্জের নামে বিনিয়োগ উসুল করবে ১৮১ কোটি ৩৭ লাখ ১০ হাজার ডলার। অথচ এই প্রকল্পে এই সময়ে সর্বোচ্চ ক্যাপাসিটি চার্জ হওয়ার কথা ৯৮ কোটি ৭ লাখ ৩ হাজার ডলার। এই প্রকল্পে বেশি ব্যয় দেখানো হয়েছে ৪৫ দশমিক ৬ শষতাংশ। এছাড়া প্রকল্পটি শুরু থেকেই জাল-জালিয়াতিতে ভরা। ভারত থেকে পুরোনো মেশিন এনে রিলায়েন্স গ্রুপ বাংলাদেশের মেঘনাঘাটে বসিয়ে পিডিবির সঙ্গে বিদ্যুৎ বিক্রির চুক্তি করেছে। অথচ পরে এই বিদ্যুৎকেন্দ্র জাপানের জেরা কোম্পানির কাছে বিক্রি করে বাংলাদেশ থেকে চলে যায় রিলায়েন্স গ্রুপ।
ইউনাটেড গ্রুপের আনোয়ারা বিদ্যুৎকেন্দ্র প্রকল্পটি বেশি বিনিয়োগ দেখিয়ে বেশি লাভের ফন্দি করেছে বলে প্রমাণ পেয়েছে জাতীয় কমিটি। তাদের প্রতিবেদনে বলা হয়, ইউনাইটেড আনোয়ারা এখনো চালু হয়নি। তাদের ৫৮৩ মেগাওয়াটের প্রকল্পে যৌক্তিক বিনিয়োগ হচ্ছে ৮০ কোটি ১৪ লাখ ৫০ হাজার ডলার। কিন্তু তারা বিনিয়োগ দেখিয়েছে ১৬৬ কোটি ৭৮ লাখ ৫৮০ হাজার ডলার। সরকারি কমিটির বিনিয়োগ মূল্যায়নের চেয়ে তারা বেশি বিনিয়োগ দেখিয়েছে ৫১ দশমিক ৯ শতাংশ।
যেভাবে হাতিয়ে নিচ্ছে বিপুল অর্থ
সামিট মেঘনাঘাট-২ : প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এ প্রকল্পটিকে টাকা কামানোর মেশিন বললেও ভুল বলা হবে না। সাধারণত বিদ্যুৎকেন্দ্রের মেয়াদ যত বেশি হয়, বিনিয়োগ তত বেশি উসুল হয়ে যায়। কিন্তু সামিট মেঘনাঘাট-২ এর ক্ষেত্রে ঘটেছে উলটো। দিন যতই যাবে তত বেশি এই প্রকল্প থেকে লাভবান হবে সামিট গ্রুপ। যেমন-ক্যাপাসিটি চার্জের মাধ্যমে সামিট এই প্রকল্পের ক্যাপাসিটি চার্জ বা বিনিয়োগ উসুল করবে চুক্তি কার্যকরের দ্বিতীয় বছরে ৬ কোটি ৫৯ লাখ ১০ হাজার ডলার। কমিটির হিসাব অনুযায়ী বেশি বিনিয়োগ দেখিয়ে এই বছরে সামিট ১ কোটি ৯২ লাখ ৭০ হাজার ডলার বেশি আদায় করবে সরকারের কাছ থেকে। চুক্তি কার্যকর হওয়া বা বিদ্যুৎ বিক্রির ১২তম বছরে সামিট ক্যাপাসিটি চার্জ হিসাবে বিল নেবে ৬ কোটি ৯৯ লাখ ৬০ হাজার ডলার, যা কমিটির হিসাবে ১ কোটি ৩৬ লাখ ২০ হাজার ডলার বেশি। এরপর ওই প্রকল্পের বিনিয়োগ উসুল হয়ে যাওয়ার কথা। কিন্তু চুক্তির ১৩তম বছরে সামিট বছরে ৪ কোটি ১৮ লাখ ৫০ হাজার ডলার বেশি ক্যাপাসিটি চার্জ নেবে, যা চুক্তির ২২তম বছর পর্যন্ত বেশি নিতে থাকবে। কমিটির মন্তব্য হচ্ছে-প্রকল্পের ১১তম বছর থেকে ২২তম বছরে সামিটকে তার প্রাপ্যের চেয়ে ৪০০ গুণ ক্যাপাসিটি চার্জ দেওয়া হবে। এভাবে সামিট ‘বাড়ি ভাড়ার মতো সরকারের কাছ থেকে টাকা আদায় নিশ্চিত করেছে’।
এসএস পাওয়ার : চট্টগ্রামের বাঁশখালীতে ১৩২০ মেগাওয়াটের বিশাল বিদ্যুৎকেন্দ্র এস আলমের এসএস পাওয়ার। এস আলম গ্রুপের নেতৃত্বে কয়লাভিত্তিক এই কেন্দ্র পরিচালিত হয়। এটি থেকে কোনো বিদ্যুৎ না নিলেও অস্বাভাবিকভাবে প্রতি মাসে ৩৯৩ কোটি টাকা ক্যাপাসিটি চার্জ দিচ্ছে পিডিবি, যা ক্যাপাসিটি চার্জ হিসেবে ২৫ বছরে পাবে ১ লাখ ১৭ হাজার কোটি টাকা। কমিটির অনুসন্ধানে বেরিয়ে এসেছে যে, জুন ২০২৪ সাল পর্যন্ত এসএস পাওয়ার বিদ্যুৎ বিক্রি করে ৬৭৪ কোটি টাকা নিয়েছে। বিদ্যুৎ উৎপাদন করেছে মাত্র ৪১৪ দশমিক ৫৯ মিলিয়ন ইউনিট। প্রতি ইউনিট বিদ্যুৎ ক্রয়মূল্য পড়েছে ১৬ দশমিক ২৬ টাকা। এছাড়া এই কেন্দ্র বসাতে বড় ধরনের জালিয়াতির আশ্রয় নেওয়া হয়েছে। সরকার ২০১২ সালের ২২ জানুয়ারি কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের জন্য আন্তর্জাতিক দরপত্র আহ্বান করা হয়। সেখানে এস আলম গ্রুপের সঙ্গে যৌথ বিনিয়োগের ভিত্তিতে দরপত্রে ৬১২ মেগাওয়াট (এসএস পাওয়ার-১) এবং বরিশালে ২৭৬ মেগাওয়াট কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র (এসএস পাওয়ার-২) বসানোর কাজ পায়। ২০১৩ সালের ৩১ অক্টোবর তাদের কার্যাদেশ দেওয়া হয়। কিন্তু কোনো কারণ ছাড়া ২০১৬ সালের ১৬ অক্টোবর দুটি কেন্দ্রকে একসঙ্গে চট্টগ্রামে বসাতে চিঠি দেয় এস আলম গ্রুপ। ২০১৭ সালের ১৫ মার্চ বিদ্যুৎ বিভাগ সেটি অনুমোদন দেয়। এর বিদ্যুৎ বিক্রির দাম নির্ধারণ করা হয়েছে ওই দুই কেন্দ্রের গড় করে, যা প্রকৃত মূল্যের চেয়ে অনেক বেশি। এ ছাড়া এস আলমকে ১৫ বছরের আয়ের কর, যন্ত্রপাতি আমদানির শুল্ক এবং বিদেশি বিনিয়োগের লাভের ওপর কর মওকুফের সুবিধা দেওয়া হয়েছে।
প্রসঙ্গত, এসএস পাওয়ার ২০২৩ সালের ১৮ সেপ্টম্বর, ইউনিক মেঘনাঘাট কেন্দ্র ২০২৪ সালের ১৯ জানুয়ারি, সামিট মেঘনাঘাট-২ কেন্দ্র ২০২৪ সালের ২৬ এপ্রিল এবং জেরার মেঘনাঘাট কেন্দ্র ২০২৫ সালের ২৮ জুলাই বাণিজ্যিক বিদ্যুৎ উৎপাদন শুরু করে।
সৌরবিদ্যুতেও নয়ছয়
২০০ মেগাওয়াটের তিস্তা, ১০০ মেগাওয়াটের এনারগন রিনিউয়েবল এবং ১০০ মেগাওয়াটের ডায়নামিক সান কোম্পানির সৌরবিদ্যুতের দাম অস্বাভাবিক। তিস্তার প্রতি ইউনিটের মূল্য ১৫ মার্কিন সেন্ট বা ১৮ টাকা, এনারগনের ১৩ দশমিক ৯০ সেন্ট বা ১৬ টাকা এবং সান কোম্পানির সৌরবিদ্যুৎ ১১ দশমিক ৯৫ সেন্ট বা ১৪ টাকার বেশি। এর মধ্যে পিডিবির সঙ্গে চুক্তিকালীন সময়ে তিস্তা সোলার ৫০ কোটি ৮৭ লাখ ২০ হাজার ডলার, এনারগন ১৮ কোটি ২৩ লাখ ৫০ হাজার ডলার এবং ডায়নামিক সান ২৩ কোটি ৬২ লাখ ১০ হাজার ডলার বেশি বিনিয়োগ দেখিয়ে ক্যাপাসিটি চার্জ হিসাবে সরকারের কাছ থেকে নিয়ে যাবে।