Image description

দেশে সমাজের প্রতিটি স্তরে বিচরণ করছে সর্বনাশা মাদক। অভিভাবকরা আতঙ্কিত, উৎকণ্ঠিত। তারা শংকিত কখন মাদকের স্রোতে দিক হারিয়ে নেশার জালে আটকা পড়ে যায়, তাদের প্রিয় সন্তান। কখন ছোবল মেরে নেশাগ্রস্ত করে পাঠিয়ে দেয় মরণকূপে। এ ভয়াবহ পরিস্থিতি থেকে নিজের সন্তানকে রক্ষার জন্য মা-বাবার সঙ্গে পুরো জাতি আজ শঙ্কিত, আতঙ্কিত।

মাদকের ব্যবহার এখন জনস্বাস্থ্যের জন্য হুমকিতে পরিণত হয়েছে। জাতীয় পর্যায়ের এক গবেষণায় উঠে এসেছে, বাংলাদেশে বর্তমানে আনুমানিক ৮২ লাখ মানুষ কোনো না কোনো ধরনের অবৈধ মাদক ব্যবহার করছে, যা মোট জনসংখ্যার প্রায় ৪ দশমিক ৮৮ শতাংশ। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি ব্যবহৃত মাদক গাঁজা, যার ব্যবহারকারীর সংখ্যা প্রায় ৬১ লাখ।

বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয় (বিএমইউ) আয়োজিত রবিবার (২৫ জানুয়ারি) এক অনুষ্ঠানে এই গবেষণার ফলাফল প্রকাশ করা হয়। গবেষণায় বলা হয়েছে, মাদক ব্যবহার দেশে একটি গুরুতর জনস্বাস্থ্য, সামাজিক ও অর্থনৈতিক সমস্যায় পরিণত হয়েছে। তবে এতে সিগারেট সেবনকে মাদক ব্যবহারের আওতায় আনা হয়নি।

মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের (ডিএনসি) তত্ত্বাবধানে পরিচালিত এ গবেষণা বাংলাদেশ মেডিকেল ইউনিভার্সিটি (বিএমইউ) ও রিসার্চ অ্যান্ড ম্যানেজমেন্ট কনসালটেন্টস লিমিটেড (আরএমসিএল) যৌথভাবে সম্পন্ন করে। ২০২৫ সালের ফেব্রুয়ারি থেকে জুন পর্যন্ত সময়কালে নেটওয়ার্ক স্কেল-আপ মেথড ব্যবহার করে দেশের আটটি বিভাগের ১৩টি জেলা ও ২৬টি উপজেলায় তথ্য সংগ্রহ করা হয়।

গবেষণায় বিভাগভেদে মাদক ব্যবহারের হারে উল্লেখযোগ্য পার্থক্য দেখা গেছে। ময়মনসিংহ বিভাগে মাদক ব্যবহারের হার সবচেয়ে বেশি—৬ দশমিক ০২ শতাংশ। এরপর রয়েছে রংপুর (৬ দশমিক ০০ শতাংশ) ও চট্টগ্রাম বিভাগ (৫ দশমিক ৫০ শতাংশ)। তুলনামূলকভাবে রাজশাহী (২ দশমিক ৭২ শতাংশ) ও খুলনা বিভাগে (৪ দশমিক ০৮ শতাংশ) হার কম।

সংখ্যার হিসাবে সবচেয়ে বেশি মাদক ব্যবহারকারী ঢাকা বিভাগে—প্রায় ২২ লাখ ৯০ হাজার। এরপর চট্টগ্রাম বিভাগে ১৮ লাখ ৭৯ হাজার এবং রংপুর বিভাগে প্রায় ১০ লাখ ৮০ হাজার মানুষ মাদক ব্যবহার করে। সব মিলিয়ে দেশে যেকোনো ধরনের মাদক ব্যবহারকারীর সংখ্যা দাঁড়িয়েছে প্রায় ৮১ লাখ ৯৫ হাজার।

মাদক প্রকারভেদ বিশ্লেষণে দেখা যায়, দেশে সবচেয়ে বেশি ব্যবহৃত মাদক গাঁজা বা ক্যানাবিস—ব্যবহারকারী প্রায় ৬০ লাখ ৮০ হাজার। এরপর রয়েছে ইয়াবা বা মেথামফেটামিন (প্রায় ২৩ লাখ), অ্যালকোহল (২০ লাখ), কোডিনযুক্ত কাশির সিরাপ, ঘুমের ওষুধ ও হেরোইন। ইনজেকশনের মাধ্যমে মাদক গ্রহণকারীর সংখ্যা প্রায় ৩৯ হাজার, যাদের মধ্যে এইচআইভি ও হেপাটাইটিসসহ সংক্রামক রোগের ঝুঁকি অত্যন্ত বেশি।

গবেষণায় আরও দেখা যায়, একজন মাদক ব্যবহারকারী গড়ে প্রতি মাসে প্রায় ছয় হাজার টাকা মাদকের পেছনে ব্যয় করেন। একই ব্যক্তি একাধিক ধরনের মাদক সেবন করতেও পারে।

বয়সভিত্তিক বিশ্লেষণে উদ্বেগজনক তথ্য উঠে এসেছে। প্রায় ৩৩ শতাংশ ব্যবহারকারী ৮–১৭ বছর বয়সে প্রথম মাদক গ্রহণ করে এবং ৫৯ শতাংশ শুরু করে ১৮–২৫ বছর বয়সে। বেকারত্ব, বন্ধুমহলের চাপ, আর্থিক অনিশ্চয়তা, পারিবারিক অস্থিরতা, মানসিক চাপ ও অনানুষ্ঠানিক পেশায় যুক্ত থাকা মাদক ব্যবহারের প্রধান ঝুঁকিপূর্ণ কারণ হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে। আশঙ্কাজনকভাবে, প্রায় ৯০ শতাংশ ব্যবহারকারী জানিয়েছেন—মাদক সহজেই পাওয়া যায়।

অনুষ্ঠানে বিএমইউর ভাইস-চ্যান্সেলর অধ্যাপক ডা. মো. শাহিনুল আলম বলেন, “আমরা ভাবি মাদকাসক্তরা অন্য কেউ। কিন্তু বাস্তবে আমরা এবং আমাদের সন্তানরাও ঝুঁকির মধ্যে আছি। সবাইকে ঐক্যবদ্ধভাবে এই বিপদ মোকাবিলা করতে হবে।”

মাদক নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের মহাপরিচালক মো. হাসান মারুফ বলেন, পরিবার থেকেই মাদক প্রতিরোধ শুরু করতে হবে। মাদকাসক্তদের চিকিৎসা সম্প্রসারণে ঢাকা ছাড়াও সাত বিভাগে ২০০ শয্যার পুনর্বাসন কেন্দ্র স্থাপনের প্রকল্প অনুমোদন পেয়েছে।

বিএমইউর কোষাধ্যক্ষ অধ্যাপক ডা. নাহরীন আখতার বলেন, শিশু ও তরুণদের মাদকের ভয়াবহ ক্ষতি থেকে রক্ষা করতে সরবরাহ ও চাহিদা—দুটিই কমাতে হবে।

চিকিৎসা ও পুনর্বাসনের সুযোগ নিয়েও গবেষণায় হতাশাজনক চিত্র উঠে এসেছে। মাত্র ১৩ শতাংশ মাদক ব্যবহারকারী কখনো চিকিৎসা বা পুনর্বাসন সেবা পেয়েছেন। যদিও অর্ধেকের বেশি ব্যবহারকারী মাদক ছাড়ার চেষ্টা করেছেন, পর্যাপ্ত চিকিৎসা, কাউন্সেলিং ও সামাজিক সহায়তার অভাবে অধিকাংশই সফল হতে পারেননি।

মাদক ব্যবহারকারীরা চিকিৎসা ও পুনর্বাসন (৬৯ শতাংশ), কাউন্সেলিং (৬২ শতাংশ) এবং কর্মসংস্থান সহায়তাকে (৪১ শতাংশ) সবচেয়ে জরুরি প্রয়োজন হিসেবে উল্লেখ করেছেন। পাশাপাশি ৬৮ শতাংশ ব্যবহারকারী সামাজিক ও পারিবারিক পর্যায়ে অপবাদ ও বৈষম্যের শিকার হওয়ার কথাও জানিয়েছেন।

বিশেষজ্ঞদের মতে, সীমান্ত ও আকাশপথে মাদক প্রবেশ ঠেকাতে প্রশাসনের ব্যর্থতা, বিচার ব্যবস্থার দীর্ঘসূত্রতা, রাজনৈতিক পৃষ্ঠপোষকতা, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর একাংশের সংশ্লিষ্টতা এবং সামাজিক আন্দোলনের দুর্বলতার কারণে মাদকের বিস্তার থামছে না।

 

চিকিৎসকদের মতে, মাদক শরীর ও মানসিক স্বাস্থ্যের ওপর ভয়াবহ প্রভাব ফেলে—স্বল্পমেয়াদে স্মৃতিশক্তি ও মনোযোগ হ্রাস থেকে শুরু করে দীর্ঘমেয়াদে মস্তিষ্কের ক্ষয়, ক্যানসার, মানসিক ভারসাম্যহীনতা ও আত্মহত্যার প্রবণতা পর্যন্ত তৈরি করে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, মাদক সমস্যা শুধু আইনশৃঙ্খলার বিষয় নয়; এটি একটি বহুমাত্রিক সামাজিক ও জনস্বাস্থ্য সংকট। দমনমূলক ব্যবস্থার পাশাপাশি প্রতিরোধ, চিকিৎসা, পুনর্বাসন, মানসিক স্বাস্থ্যসেবা ও সামাজিক পুনঃএকত্রীকরণ নিশ্চিত করাই এখন সময়ের দাবি।

ঢাকাটাইমস