বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর আমির ডা. শফিকুর রহমান বলেছেন, রাজনীতির মূল লক্ষ্য হওয়া উচিত জাতিকে পথ দেখানো এবং ন্যায় ও ইনসাফভিত্তিক রাষ্ট্র উপহার দেওয়া। তিনি বলেন, এই দেশে কোনো জমিদার তৈরি হবে না। এখানে সবাই মিলেমিশে জনগণ। আমাদের পরিচয় একটাই—আমরা বাংলাদেশ।
রোববার (২৫ জানুয়ারি) দুপুরে গেন্ডারিয়ার ধুপখোলা মাঠে ঢাকা-৬ আসনের নির্বাচনী জনসভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে জামায়াত আমীর এই অঙ্গিকার ব্যক্ত করেন।
ডা. শফিকুর রহমান বলেন, স্বাধীনতার পর গত ৫৪ বছরে যারা পালাক্রমে দেশ শাসন করেছে তারা জাতির ওপর ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা করতে পারেনি। আবাল-বৃদ্ধ-বনিতার অধিকার নিশ্চিত হয়নি, সুশিক্ষার মাধ্যমে সন্তানদের খাঁটি মানুষ হিসেবে গড়ে তোলার কোনো কার্যকর কর্মসূচিও নেওয়া হয়নি।
তিনি বলেন, এর ফলেই আজ সমাজে আমরা বিপর্যয়, বিশৃঙ্খলা, নৈতিক অবক্ষয় দেখতে পাচ্ছি। আমাদের তরুণ সমাজের একটি অংশ মাদকের সঙ্গে জড়িয়ে পড়েছে, কোথাও চাঁদাবাজি করছে, কোথাও ছিনতাইয়ে জড়াচ্ছে। এর মূল কারণ রাষ্ট্র তাদের দায়িত্ব পালন করতে ব্যর্থ হয়েছে।
রাষ্ট্রের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন তুলে জামায়াত আমীর বলেন, রাষ্ট্র কেমনে এত দায়িত্বজ্ঞানহীন হয়? সরকার কেমনে এত দায়িত্বজ্ঞানহীন হয়? তিনি বলেন, একটি মানব সন্তান জন্ম নেওয়ার পর কেন সে সময়মতো উপযুক্ত চিকিৎসা ও শিক্ষা পাবে না—এ প্রশ্নের জবাব রাষ্ট্রকে দিতে হবে।
এই ব্যর্থতা কাটিয়ে ওঠার আশ্বাস দিয়ে তিনি বলেন, আল্লাহ তাআলার ইচ্ছা ও জনগণের সমর্থনে ১১ দলীয় ঐক্যজোট সরকার গঠনের সুযোগ পেলে এসব সামাজিক দায়িত্ব যথাযথভাবে পালন করা হবে।
ডা. শফিকুর রহমান বলেন, জামায়াত ক্ষমতায় গেলে দল ও ধর্মের ঊর্ধ্বে উঠে সারা বাংলাদেশকে ‘ফুলের বাগান’ হিসেবে সাজানোর চেষ্টা করা হবে। মানুষে মানুষে কোনো ভেদাভেদ থাকবে না।
তিনি বলেন, আমরা দেখতে চাই সবাই মিলে একটি পরিচয়ে পরিচিত হব—আমরাই বাংলাদেশ। কেউ যদি আমাকে জিজ্ঞেস করে তুমি কে, আমি বলব আমি একজন বাংলাদেশ।
তার ভাষায়, এই বাংলাদেশ হবে একটি সামগ্রিকতার বাংলাদেশ—যেখানে ন্যায়-ইনসাফ থাকবে, সুশিক্ষার প্রসার ঘটবে, সামাজিক নিরাপত্তা নিশ্চিত হবে, মানুষ কর্মের অধিকার পাবে এবং বিশ্ব দরবারে মাথা উঁচু করে দাঁড়াবে।
ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট তুলে ধরে জামায়াত আমীর বলেন, ১৯৪৭ সালে যারা ‘লড়কে লেঙ্গে পাকিস্তান’ স্লোগান দিয়ে স্বাধীনতার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন তারা সেই দায়িত্ব পালন করতে পারেননি। ফলে ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধ অনিবার্য হয়েছিল।
তিনি বলেন, মুক্তিযুদ্ধে যারা জীবন বাজি রেখে লড়েছিলেন তারা সাম্য ও সামাজিক ন্যায়বিচারের স্বপ্ন দেখেছিলেন। কিন্তু দুঃখজনকভাবে সেই স্বপ্ন আজও পূরণ হয়নি।
নির্বাচন ও ক্ষমতা প্রসঙ্গে ডা. শফিকুর রহমান বলেন, জামায়াত কোনো ধরনের চাঁদা নেবে না এবং চাঁদা নিতে দেবে না। দুর্নীতির সঙ্গে তারা জড়াবে না, দুর্নীতিকে সহ্যও করবে না।
তিনি বলেন, আমরা এই দেশ লুটেপুটে খাওয়ার জন্য মসনদে বসতে চাই না। আমরা জামায়াতের বিজয় চাই না, আমরা চাই ১৮ কোটি মানুষের বিজয়।
আগামী ১২ ফেব্রুয়ারির ভোট প্রসঙ্গে তিনি বলেন, এই ভোট হবে আজাদি বনাম গোলামির ভোট। ‘হ্যাঁ’ মানে আজাদি, ‘না’ মানে গোলামি—এমন মন্তব্য করে তিনি জনগণকে ‘হা’ ভোট দেওয়ার আহ্বান জানান।
তিনি আশা প্রকাশ করেন, দেশবাসী আর একই গর্তে পা দেবে না এবং নিজেদের অধিকার হারাতে দেবে না।
জুলাই আন্দোলনের শহীদদের প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘জুলাই কারো একার নয়। এটি মানুষের জুলাই।’ তিনি ‘একক মাস্টারমাইন্ড’ ধারণা প্রত্যাখ্যান করে বলেন, যদি একজনকে মাস্টারমাইন্ড বলা হয়, তাহলে বাকি শহীদদের আন্ডারমাইন্ড করা হয়। এই যুদ্ধের মাস্টারমাইন্ড ছিল ১৮ কোটি মানুষ।
পররাষ্ট্রনীতির বিষয়ে জামায়াত আমীর বলেন, বাংলাদেশ সব সভ্য দেশের সঙ্গে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক রাখতে চায়। তবে কোনো দেশের চোখরাঙানি বা হস্তক্ষেপ তারা মেনে নেবে না।
তিনি বলেন, কাউকে প্রভু মানবো না, সবাইকে বন্ধু মানতে রাজি আছি। কিন্তু পারস্পরিক শ্রদ্ধা ও সাম্য থাকতে হবে।
যুব সমাজের উদ্দেশে ডা. শফিকুর রহমান বলেন, তারা বেকার ভাতা দিতে চান না; বরং কর্মসংস্থান সৃষ্টি করতে চান। তরুণদের হাতকে দেশগড়ার কারিগরের হাতে পরিণত করার প্রত্যয় ব্যক্ত করেন তিনি।
একই সঙ্গে ভোটাধিকার রক্ষায় কঠোর অবস্থানের কথা জানিয়ে তিনি বলেন, কেউ ভোটে বাধা দিতে এলে তা প্রতিহত করতে হবে। আমার ভোটে হাত দিলে হাত গুঁড়িয়ে দিতে হবে—এ বক্তব্য দিয়ে তিনি ভোট ডাকাতির বিরুদ্ধে কঠোর বার্তা দেন।
পুরান ঢাকাকে ‘সোনায় রূপান্তর’ করার প্রতিশ্রুতি দিয়ে তিনি বলেন, ন্যায্যতার ভিত্তিতে পুরান ঢাকার মানুষ তাদের প্রাপ্য অধিকার ও সম্মান পাবে।
শেষে তিনি সংসদ সদস্যদের ঋণখেলাপির প্রসঙ্গ তুলে একটি রাজনৈতিক দলকে কটাক্ষ করে বলেন, গুরুতর ঋণখেলাপিদের দিয়ে দুর্নীতি দমন সম্ভব নয়।
বক্তব্য শেষে জামায়াত আমীর ঢাকা ৮ আসনের দশ দলীয় জোটের প্রার্থী নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারীকে শাপলা কলি তুলে দিয়ে বলেন, ঢাকা ৮ আসন একটি যুদ্ধক্ষেত্র। এই যুদ্ধক্ষেত্রের সেনাপতি হিসেবে নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারীকে আমরা ছেড়েছি।