Image description

ইউরোপের অন্যতম বৃহৎ এবং যুক্তরাজ্যের দ্বিতীয় সর্ববৃহৎ নগর বার্মিংহাম। একই সঙ্গে এটি একটি বাঙালি অধ্যুষিত শহর। অথচ এই গুরুত্বপূর্ণ নগরীতে অবস্থিত বাংলাদেশ সহকারী হাইকমিশন কার্যত নেতৃত্বহীন অবস্থায় পরিচালিত হচ্ছে। সহকারী হাইকমিশনার ছাড়াই চলমান এই কূটনৈতিক মিশনকে ঘিরে যুক্তরাজ্যপ্রবাসী বাংলাদেশি কমিউনিটির মধ্যে উদ্বেগ বাড়ছে।

স্থানীয় বাঙালিদের আশঙ্কা, মিশনের প্রধান কর্তা না থাকায় প্রায় দুই লাখ প্রবাসী বাংলাদেশি সেবাবঞ্চিত হওয়ার ঝুঁকিতে পড়তে পারেন!

অনুসন্ধানে জানা গেছে, সহকারী হাইকমিশনার না থাকায় পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের নির্দেশে তাঁর আবাসিক বাসা ছেড়ে দেওয়া হয়েছে। ওই নির্দেশ বাস্তবায়নের অংশ হিসেবে বাসার কিছু আসবাব অফিস ভবনের ভেতর রাখার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, চলতি সপ্তাহেই ফ্রিজসহ কিছু জিনিস অফিস ভবনে স্থানান্তর করা হয়েছে। এতে সীমিত জায়গার এই অফিসে জায়গা সংকট দেখা দেওয়ার আশঙ্কা দেখা দেওয়ায় গুরুত্বপূর্ণ নথিপত্র সংরক্ষণ, কর্মকর্তা-কর্মচারীদের স্বাভাবিক দাপ্তরিক কার্যক্রম এবং নিয়মিত কনসুলার সেবা ব্যাহত হতে পারে বলে মনে করছেন কমিউনিটি নেতারা।

হাইকমিশন সূত্রে জানা যায়, সহকারী হাইকমিশনার আলিমুজ্জামানের বদলির আদেশ জারি হয় ২০২৪ সালের অক্টোবরে। তবে তিনি ওই আদেশ কার্যকর হওয়ার প্রায় দেড় বছর পর, ২০২৫ সালের শেষ দিকে বার্মিংহাম ত্যাগ করেন। ওই সময় সেলী সালেহিনের বার্মিংহামে যোগ দেওয়ার কথা থাকলেও তাঁকে সিডনিতে পদায়ন করা হয়। পরে ইশতিয়াক আহমেদকে বার্মিংহামে পাঠানোর সিদ্ধান্ত নেওয়া হলেও শেষ পর্যন্ত তাঁকেও নিউজিল্যান্ডে বদলি করা হয়।

একের পর এক সিদ্ধান্ত পরিবর্তনের ফলে বর্তমানে বার্মিংহাম মিশন ভারপ্রাপ্ত কর্তা কাউন্সেলর হামিদা খাতুনের নেতৃত্বেই চলছে। এরই মধ্যে মিশনের ফার্স্ট সেক্রেটারি নাজমুস সাকিবের বদলির আদেশ আসায় প্রশাসনিক সংকট আরো ঘনীভূত হয়েছে। সহকারী হাইকমিশনারের অনুপস্থিতিতে দীর্ঘদিন ধরে কাউন্সেলর হামিদা খাতুন ও নাজমুস সাকিব অতিরিক্ত দায়িত্ব নিয়ে মিশনের কার্যক্রম পরিচালনা করে আসছিলেন। নাজমুস সাকিবের স্থলাভিষিক্ত হিসেবে স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টার একান্ত ব্যক্তিগত সহকারী রাহাত বিন কুতুবকে নিয়োগ দেওয়া হলেও তিনি এখনো বার্মিংহামে যোগ দেননি। তাঁর যোগদানে অনাগ্রহ রয়েছে বলে গুঞ্জন ছড়িয়েছে।

সার্বিক বিষয়ে জানতে চাইলে ব্রিটেনে নিযুক্ত বাংলাদেশ হাইকমিশনার আবিদা ইসলাম কালের কণ্ঠের প্রশ্ন এড়িয়ে যান এবং পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে যোগাযোগের পরামর্শ দেন।

তবে সহকারী হাইকমিশনের এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে কালের কণ্ঠকে বলেন, বিষয়টি পুরোপুরি সঠিক নয়। কিছু ইলেকট্রনিক সরঞ্জাম অফিসে আনা হয়েছে, আর বাকি আসবাব অন্য স্থানে রাখা হয়েছে। তাঁর দাবি, সেবায় কোনো ঘাটতি নেই। তিনি বলেন, মন্ত্রণালয়ের নির্দেশেই সহকারী হাইকমিশনারের বাসাটি ছেড়ে দেওয়া হয়েছে। বাড়িটি থাকার অনুপযোগী ছিল এবং দীর্ঘদিন খালি থাকায় ভাড়া ব্যয় করা যুক্তিসংগত ছিল না। নতুন সহকারী হাইকমিশনার এলে তিনি নিজ বিবেচনায় বাসাভাড়া নিতে পারবেন।

এদিকে গত ১৫ জানুয়ারি জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের এক প্রজ্ঞাপনে সন্ত্রাসীদের গুলিতে নিহত ওসমান বিন হাদির ভাই ওমর বিন হাদিকে বার্মিংহাম মিশনের দ্বিতীয় সচিব হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়। একজন ব্যবসায়ীকে হঠাৎ করে দ্বিতীয় সচিব হিসেবে নিয়োগ দেওয়ায় কমিউনিটিতে বিরূপ প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি হয়েছে।

বার্মিংহামের বাসিন্দা ও দেশ ফাউন্ডেশন ইউকের চেয়ারম্যান ড. মিসবাহ উর রহমান বলেন, বার্মিংহাম মিশনের মাধ্যমে প্রায় দুই লাখ প্রবাসী বাংলাদেশি নিয়মিত সেবা নেন, অথচ সহকারী হাইকমিশনার আলিমুজ্জামানের বদলির পর এখানে কোনো প্রধান কর্মকর্তা দেওয়া হয়নি। তিনি বলেন, হাদি আমাদের আবেগের জায়গা। সরকার তাঁর পরিবারকে সহযোগিতা করেছে, এতে আপত্তি নেই। কিন্তু এত গুরুত্বপূর্ণ কূটনৈতিক পদে একজন অনভিজ্ঞ ব্যবসায়ীকে নিয়োগ দেওয়া কতটা যুক্তিসংগত, তা নিয়ে প্রশ্ন থেকেই যায়।

ওয়েস্ট মিডল্যান্ড বিএনপির সাবেক সাধারণ সম্পাদক আব্দুল খালিক জানান, সহকারী হাইকমিশনার না থাকার বিষয়টি সত্য হলেও নতুন কমিশনার নিয়োগের প্রক্রিয়া চলছে। বর্তমানে একজন দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা নিয়ম অনুযায়ী কার্যক্রম পরিচালনা করছেন। আগে ব্যক্তিগত পরিচয়ে অনেক কাজ সহজে হতো, এখন সব কিছু নিয়ম মেনেই হচ্ছে বলেও তিনি মন্তব্য করেন।

বালাগঞ্জ-ওসমানীনগর গরিব কল্যাণ ট্রাস্ট বার্মিংহামের সাবেক সাধারণ সম্পাদক এমদাদুর রহমান সুয়েজ বলেন, দীর্ঘদিন নেতৃত্বশূন্য থাকা শুধু প্রবাসীদের সেবায় বিঘ্ন নয়, আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বাংলাদেশের ভাবমূর্তিকেও প্রশ্নবিদ্ধ করছে। দ্রুত পূর্ণাঙ্গ সহকারী হাইকমিশনার নিয়োগ জরুরি।

ব্রিটিশ বাংলা সোশ্যাল ক্লাবের সাধারণ সম্পাদক মুসাদ্দিক আহমেদ শ্যামল বলেন, প্রধান কর্মকর্তা না থাকা যেমন অসুবিধাজনক, তেমনি লজ্জাজনকও। তিনি বলেন, আমরা সাধারণ মানুষের পক্ষে। মিশনে মানুষ সেবা পাক, এটাই আমাদের সবচেয়ে বড় চাওয়া।