মিয়ানমার সীমান্তের পরিস্থিতি দিন দিন ভয়াবহ রূপ নিচ্ছে। নাফ নদে থেকে স্থল সীমান্ত—সব জায়গায় এখন নিয়ন্ত্রণ বিস্তার করেছে বিদ্রোহী গোষ্ঠী আরাকান আর্মি। সশস্ত্র এ সংগঠন একদিকে মাদক ও অস্ত্র চোরাচালান চালাচ্ছে, অন্যদিকে বাংলাদেশের জেলেদের অপহরণ করে মুক্তিপণ আদায় করছে। সীমান্তে বাড়তি সতর্কতা সত্ত্বেও বিজিবি ও কোস্টগার্ডের জন্য পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখা বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
সম্প্রতি কক্সবাজারের টেকনাফের নাফ নদে শাহপরীরদ্বীপ সংলগ্ন সাগর থেকে মাছ ধরার সময় আরাকান আর্মি কর্তৃক বিভিন্ন সময়ে ধরে নিয়ে যাওয়া জেলেদের এখনো ফেরত দেওয়া হয়নি, যার ফলে তাদের পরিবারগুলো চরম দুর্দশায় দিন কাটাচ্ছে এবং উপার্জনক্ষম ব্যক্তিরা বন্দি থাকায় পরিবারের সদস্যরা কষ্টে আছে। এই ঘটনা জেলেদের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ বাড়াচ্ছে।
গত দেড়মাস আগে সাগরে মাছ ধরতে গিয়ে মিয়ানমারের বিদ্রোহী গোষ্ঠী আরকান আর্মির (এএ) এর হাতে অপহৃত হন টেকনাফ উপজেলার শাহপরীরদ্বীপ ডাংগর পাড়ার বাসিন্দা জেলে কবির আহম্মদ ও তার ছেলে মঞ্জুর আলম। পরিবারের সদস্যরা জানেন না তারা বেঁচে আছেন নাকি মারা গেছেন। উপার্জনক্ষম স্বামী সন্তান হারিয়ে জীবনযাপন করাটা দায় হয়েছে কবির আহম্মদরে স্ত্রী সুফিয়া খাতুনের।
শনিবার (১৭ জানুয়ারি) সরেজমিনে অপহৃতদের বাড়িতে গেলে অসহায়ত্বের কথা তুলে ধরেন সুফিয়া খাতুন। তিনি বলেন, প্রতিনিয়ত আতঙ্কে থাকি যদি কোনো দুঃসংবাদ আসে। তারা বেঁচে আছে কিনা তাও জানি না। ট্রলার মালিক সমিতির নেতাদের সঙ্গে যোগাযোগ করেছি। কোনো ব্যবস্থা করা যায় কিনা। কিন্তু কেউ কোনো আশ্বাস দিতে পারছে না। প্রশাসনের কোনো সহযোগিতা পাচ্ছি না। কী করে চলব জানি না। আমি ছেলে ও স্বামীকে ফেরত চাই।
ট্রলার মালিকদের দেওয়া তথ্য বলছে, শুধু সুফিয়ার পরিবারের দুইজন নয়, টেকনাফ নাফ নদী নির্ভর ১০১ জন জেলে আরকান আর্মির হাতে অপহৃত হয়ে এখনো নিখোঁজ রয়েছেন। নিখোঁজের দেড় থেকে দুইমাস পার হলেও তাদের কোনো খোঁজ পাওয়া যাচ্ছে না।
আরকান আর্মির হাতে অপহৃত জসিম উদ্দিনের মা ফেরুজা খাতুন বলেন, শাহপরীরদ্বীপ ঘাট থেকে মাছ ধরতে গিয়ে আমার ছেলে আরকান আর্মির হাতে অপহৃত হয়েছে বলে শুনেছি। এখনো ছেলের কোনো খবর পাচ্ছি না। ছেলের চিন্তায় দিন কাটছে।
জেলেদের দেওয়া সর্বশেষ তথ্য মতে, গেল ২৭ ফেব্রুয়ারি আরাকান আর্মির হাতে থেকে ২৯ জেলে ফিরে এসেছিলেন। তাদের মধ্যে ১৫ জন বাংলাদেশি এবং ১৪ জন রোহিঙ্গা জেলে রয়েছে। অন্ধকারের সুযোগ নিয়ে কৌশলে এসব জেলেরা পালিয়ে আসতে সমর্থ হয়েছেন বলে জানিয়েছেন ট্রলারটির মালিক টেকনাফ উপজেলার সাবরাং ইউনিয়নের শাহপরীর দ্বীপের মোহাম্মদ হাসান।
সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, নাফনদে মাছ ধরতে গিয়ে অপহরণের শিকার হচ্ছে বাংলাদেশি জেলেরা। এরইমধ্যে আরকান রাজ্য দখল নিয়ে আরকান আর্মি এবং রোহিঙ্গা সশস্ত্র বিদ্রোহী গোষ্ঠীর মধ্যে দফায় দফায় গোলাগুলির ঘটনা ঘটছে। ফলে অজানা আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ছে অপহৃত পরিবারের মাঝে।
সর্বশেষ টেকনাফ হোয়াইক্যং ইউনিয়নের তেচ্ছিপুল ব্রিজ এলাকার সীমান্তে গোলাগুলিতে হুজাইফা আফনান নামে এক শিশু গুলিবিদ্ধ হন। এ ঘটনায় ঢাকায় অবস্থিত মিয়ানমারের রাষ্ট্রদূত কিয়াউ সোয়ে মোকে তলব করে প্রতিবাদ ও গভীর উদ্বেগের কথা জানিয়েছে বাংলাদেশ পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়। মিয়ানমার রাষ্ট্রদূত আশ্বস্ত করেছেন তার সরকার এমন ঘটনার পুনরাবৃত্তি রোধে পদক্ষেপ নেবে এবং আহত ও তার পরিবারের প্রতি আন্তরিক সমবেদনা প্রকাশ করেছেন।
অথচ, এর পরের দিন ১২ জানুয়ারি সীমান্তে স্থলমাইন বিস্ফোরণে মো. হানিফ (২৮) নামের এক যুবকের বাম পা উড়ে গেছে। এ অবস্থায় অপহৃত জেলে পরিবারের সদস্যরা জীবিত আছে কিনা তা নিয়ে আতঙ্ক উদ্বেগ দেখা দিয়েছে।
বোট মালিক সমিতির সভাপতি সাজেদ আহম্মদ বলেন, গত চার মাসের মধ্যে শাহপরীর দ্বীপ জেলে ঘাট থেকে মাছ ধরতে গিয়ে ১০১ জন জেলে আরকান আর্মির হাতে অপহৃত হয়েছেন। অপহৃতদের সঙ্গে আমরা কোনোভাবে যোগাযোগ করতে পারছিনা। তারা কোথায় আছে, কীভাবে আছে, বেঁচে আছে নাকি মারা গেছে তারও কোনো হিসেব পাচ্ছি না। আমরা বিজিবির, কোস্টগার্ডকে বিষয়গুলো অবহিত করেছি। আশাবাদী আমরা আশায় বুক বেঁধে আছি।
তিনি বলেন, এখন জেলে পরিবারগুলো আতঙ্কে দিন কাটাচ্ছে। অনেক পরিবার অনাহারে, অর্ধাহারে দিনানিপাত করছে তা বলে বুঝানো সম্ভব না। আমি সভাপতি হিসেবে অনেক পরিবারকে যতটুকু পারি সহযোগিতা করেছি।
টেকনাফ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. ইমামুল হাফিজ নাদিম বলেন, যাদের ধরে নিয়ে গেছে তাদের বিষয়টি সীমান্ত রক্ষাকারী বাহিনীর সঙ্গে আমাদের কথা হয়েছে। তাদের ফেরত আনার যে প্রক্রিয়া আছে সে প্রক্রিয়া মেনে ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য বলা হয়েছে তাদের। যেটি থানা পুলিশও অবগত রয়েছে। এখন পর্যন্ত এটাই আপডেট। অপহৃত কোন জেলে পরিবার যদি কষ্টে থাকে, তারা যদি আবেদন করে তাহলে প্রশাসনের পক্ষ থেকে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে। এ সব বিষয় ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানানো হয়েছে।