ফেব্রুয়ারিতে অনুষ্ঠেয় জাতীয় নির্বাচন দেশের অর্থনীতিতে আস্থা ফেরাতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। নির্বাচন সামনে রেখে একটি সমৃদ্ধ বাংলাদেশ বিনির্মাণের স্বপ্ন দেখছেন উদ্যোক্তা- বিনিয়োগকারী ও ব্যবসায়ী-শিল্পপতিরা। এই মুহূর্তে দেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ও উন্নয়নে দেশি-বিদেশি বিনিয়োগ খুবই গুরুত্বপূর্ণ। এর জন্য রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা অপরিহার্য।
রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা যখন বিরাজ করে, তখন দেশি-বিদেশি বিনিয়োগকারীদের মধ্যে উদ্বেগ ও দ্বিধা তৈরি হয়। তারা নিশ্চিত হতে পারে না, তাদের বিনিয়োগ কতটা নিরাপদ থাকবে কিংবা ভবিষ্যতে সরকারের নীতিমালায় কোনো হঠাৎ পরিবর্তন আসবে কিনা। রাজনৈতিক সহিংসতা কিংবা সরকার পরিবর্তনের শঙ্কা একটি দেশের ব্যবসাবান্ধব পরিবেশকে হুমকিতে ফেলে। বিনিয়োগকারীরা সাধারণত স্থিতিশীলতা ও নীতির ধারাবাহিকতা চান, যাতে তারা দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা ও প্রকল্প বাস্তবায়ন করতে পারে। তাই সরকারের দায়িত্ব হলো একটি বিশ্বাসযোগ্য, স্বচ্ছ এবং নিরপেক্ষ প্রশাসনিক ও আইনগত কাঠামো গড়ে তোলা, যাতে ব্যবসায়ীরা নিরাপদ পরিবেশে কাজ করতে পারেন।
এ প্রসঙ্গে সম্প্রতি গণমাধ্যমের সঙ্গে কথা বলেছেন গবেষণা প্রতিষ্ঠান সিপিডির ডিস্টিংগুইস ফেলো ও প্রথম নির্বাহী পরিচালক ড. দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য, ল্যাবএইড ক্যান্সার হাসপাতাল এ্যান্ড সুপার স্পেশালিটি সেন্টারের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও অর্থনৈতিক বিশ্লেষক সাকিফ শামীম ও সিটি ব্যাংক পিএলসির ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও এ্যাসোসিয়েশন অব ব্যাংকারস বাংলাদেশের চেয়ারম্যান মাসরুর আরেফিন।
তাঁদের মতে, বর্তমান পরিস্থিতিতে আস্থাহীনতায় পড়েছেন বিনিয়োগকারীরা। দেশী বিনিয়োগের অবস্থাও নাজুক। এতে কমেছে শিল্পের উৎপাদন। ব্যবসায় চলছে মন্থরগতি, কর্মসংস্থান সৃষ্টির বিপরীতে বাড়ছে বেকারত্বের হার। এ পরিস্থিতি থেকে উত্তরণে বিনিয়োগকারীদের মধ্যে আস্থা বাড়ানোর বিকল্প নেই। অনেকেই প্রত্যাশা করছেন, দেশে নির্বাচিত সরকার ক্ষমতায় এলে দীর্ঘমেয়াদি নীতি ও রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা ফিরে আসবে। তখন বিনিয়োগে মনোযোগী হবেন উদ্যোক্তারা। বর্তমান বাংলাদেশে শুধু রাজনীতিবিদ নন, সবার কাছেই অগ্রাধিকার পাচ্ছে অর্থনীতি। সংকটের মধ্যেও ঘুরে দাঁড়ানোর অন্তর্নিহিত শক্তি আছে দেশের অর্থনীতির। বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণ করতে হলে রাজনৈতিক স্থিতিশীলতার পাশাপাশি প্রাতিষ্ঠানিক পর্যায়ে সুশাসন, স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করতে হবে।
এ প্রসঙ্গে ড . দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য বলেন, কিছু ক্ষেত্রে সরকারের অভ্যন্তরীণ সমন্বয় কম। আর এতে করে বিনিয়োগ ও শিল্প-ব্যবসার ওপর সিদ্ধান্ত গ্রহণে কার্যকর দৃঢ়তা দেখা যায়নি। এটি ইঙ্গিত দেয় যে রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক স্থিতিশীলতা ছাড়া অর্থনৈতিক সিদ্ধান্তগুলো শক্তিশালীভাবে প্রয়োগ হচ্ছে না।
ড. দেবপ্রিয় বলেন, শুধু ভোটার নয়, রাজনীতিবিদরাও এখন নিরাপত্তাহীনতার মধ্যে রয়েছেন—আসন্ন নির্বাচনের প্রেক্ষাপটে সহিংসতা বা হামলার আশঙ্কা থাকতে পারে, এবং এটি রাজনৈতিক স্থিতিশীলতার জন্য বড় প্রশ্ন তৈরি করেছে। এই উদ্বেগ রাজনৈতিক পরিবেশকে অনিশ্চিত করে এবং বিনিয়োগসহ অর্থনৈতিক সিদ্ধান্তগুলোর ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। কিন্তু ব্যবসা-বাণিজ্য ও বিনিয়োগ বাড়াতে রাজনৈতিক স্থিতিশীল সরকার প্রয়োজন। ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামীলীগ সরকারের সমালোচনা করে তিনি বলেন, দীর্ঘ ১৭ বছরে ব্যাংকিংখাতের লুটপাট, অব্যবস্থাপনা ও অর্থপাচার দেশের অর্থনীতির মেরুদণ্ড ভেঙে দিয়েছে। অর্থনৈতিক সংস্কার কমিশন যেসব সুপারিশ করেছে সেগুলো বাস্তবায়ন হলে অনেক সঙ্কট দূর হবে বলে তিনি আশা প্রকাশ করেন।
সাকিফ শামীম বলেন, ফেব্রুয়ারিতে অনুষ্ঠেয় জাতীয় নির্বাচন দেশের অর্থনীতিতে আস্থা ফেরাতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। নির্বাচন ঘিরে রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা তৈরি হলে দেশি-বিদেশি বিনিয়োগকারীরা আবারও বিনিয়োগে আগ্রহী হতে পারেন। ফলে নানামুখী চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করে নতুন বছরে অর্থনীতি ঘুরে দাঁড়ানোর সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে।
মাসরুর আরেফিন বলেন, বিনিয়োগের জন্য প্রথম এবং প্রধান শর্ত হলো রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা। ব্যবসায়ীরা দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনা করেন, তাই রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা থাকলে নতুন বিনিয়োগ বাধাগ্রস্ত হয়। তার মতে, স্থিতিশীল পরিবেশ থাকলে বিদেশি বিনিয়োগকারীরাও আশ্বস্ত হন। স্থিতিশীলতা না ফিরলে বড় বিনিয়োগে ব্যবসায়ীরা দ্বিধাগ্রস্ত থাকেন। মার্কেট ভিত্তিক সুদের হার ব্যাংকিং খাতের জন্য যৌক্তিক। বৈধ পথে রেমিট্যান্স বাড়াতে ব্যাংকগুলোর আরও সক্রিয় হওয়া প্রয়োজন।
তিনি বলনে, কাঠামোগত সংস্কার হলে দেশের অর্থনীতি দ্রুত ঘুরে দাঁড়াবে। বিনিয়োগের জন্য টাকা বা মূলধনের চেয়ে বড় প্রয়োজন হলো আস্থার পরিবেশ। রাজনৈতিক ও নীতিগত নিশ্চয়তা থাকলে বিনিয়োগ আসবেই।
বর্তমানে বাংলাদেশে মোট বিনিয়োগ-জিডিপি অনুপাত ২৫ শতাংশের নিচে নেমে এসেছে, যেখানে টেকসই প্রবৃদ্ধির জন্য এই হার কমপক্ষে ৩০ শতাংশ হওয়া প্রয়োজন। এই ঘাটতির একটি বড় কারণ বিনিয়োগকারীদের আস্থাহীনতা।
সাকিফ শামীম আরও বলেন, বাংলাদেশের অর্থনীতি বর্তমানে একটি সংবেদনশীল সময় অতিক্রম করছে। একদিকে উচ্চ মূল্যস্ফীতি সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় বাড়িয়ে তুলেছে, অন্যদিকে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভে চাপ, আমদানি ব্যয় বৃদ্ধি এবং ব্যাংক খাতের দীর্ঘদিনের কাঠামোগত দুর্বলতা অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে গতি কমিয়ে দিয়েছে। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে বিনিয়োগ স্থবিরতা ও কর্মসংস্থান নিয়ে উদ্বেগ। তবে এসব দৃশ্যমান সমস্যার পেছনে যে বিষয়টি সবচেয়ে বেশি কাজ করছে, তা হলো আস্থার সংকট-আর সেই সংকটের সঙ্গে রাজনৈতিক অনিশ্চয়তার সম্পর্ক গভীর ও বহুমাত্রিক। এই প্রেক্ষাপটে ফেব্রুয়ারিতে অনুষ্ঠেয় জাতীয় নির্বাচনকে কেবল একটি নিয়মিত সাংবিধানিক প্রক্রিয়া হিসেবে দেখলে বাস্তবতাকে খাটো করে দেখা হবে।
আমি মনে করি, এই নির্বাচন দেশের অর্থনীতির জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ সন্ধিক্ষণ। কারণ, অর্থনীতি শেষ পর্যন্ত সংখ্যা ও নীতির ওপর যেমন নির্ভর করে, তেমনি নির্ভর করে প্রত্যাশা, আস্থা ও স্থিতিশীলতার ওপর। রাজনৈতিক পরিবেশ অস্থির হলে সেই আস্থা তৈরি হয় না, আর আস্থা না থাকলে অর্থনীতির চাকা সচল রাখা কঠিন হয়ে পড়ে। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে এর স্পষ্ট প্রতিফলন দেখা গেছে। দেশীয় বিনিয়োগকারীদের একটি বড় অংশ বর্তমানে নতুন প্রকল্পে যাওয়ার সিদ্ধান্ত স্থগিত রেখেছেন। তারা উৎপাদন সম্প্রসারণ করতে চান, কর্মসংস্থান বাড়াতে চান, কিন্তু রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ ও নীতিগত ধারাবাহিকতা নিয়ে অনিশ্চয়তা তাদের পিছিয়ে রাখছে। একই সঙ্গে বিদেশি বিনিয়োগকারীরাও অপেক্ষা ও পর্যবেক্ষণের নীতিতে রয়েছেন। প্রত্যক্ষ বিদেশি বিনিয়োগ প্রবাহ প্রত্যাশিত মাত্রায় না বাড়ার পেছনে বৈশ্বিক পরিস্থিতির পাশাপাশি দেশের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক বাস্তবতাও ভূমিকা রাখছে। একটি অংশগ্রহণমূলক, শান্তিপূর্ণ ও গ্রহণযোগ্য জাতীয় নির্বাচন এই পরিস্থিতি বদলে দিতে পারে। নির্বাচন-পরবর্তী স্থিতিশীল রাজনৈতিক পরিবেশ বিনিয়োগকারীদের কাছে একটি স্পষ্ট বার্তা দেবে-বাংলাদেশ আবার পূর্বানুমেয়তার পথে ফিরছে। এতে দেশীয় উদ্যোক্তাদের মধ্যে নতুন করে ঝুঁকি নেওয়ার মানসিকতা তৈরি হতে পারে এবং বিদেশি বিনিয়োগকারীরাও মধ্য ও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা নিয়ে এগোতে আগ্রহী হতে পারেন। নির্বাচন শেষ হলে সরকারের নীতিনির্ধারণ প্রক্রিয়াতেও গতি আসার সম্ভাবনা থাকে। সাধারণত নির্বাচন-পূর্ব সময়ে সরকারগুলো কঠিন সিদ্ধান্ত নিতে সংযত থাকে। কিন্তু নির্বাচন-পরবর্তী সময়ে ব্যাংক খাত সংস্কার, খেলাপি ঋণ নিয়ন্ত্রণ, কর ব্যবস্থার আধুনিকীকরণ, জ্বালানি ও বিদ্যুৎ খাতে ভর্তুকি পুনর্বিন্যাস এবং বৈদেশিক মুদ্রা বাজারে শৃঙ্খলা ফেরানোর মতো গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ নেওয়ার সুযোগ তৈরি হয়। এসব সংস্কার দীর্ঘদিন ধরেই আলোচনায় থাকলেও রাজনৈতিক স্থিতিশীলতার অভাবে অনেক ক্ষেত্রে বাস্তবায়ন পিছিয়ে গেছে।
তবে নির্বাচন নিজে থেকেই সব সমস্যার সমাধান এনে দেবে-এমন ধারণা বাস্তবসম্মত নয়। নির্বাচন যদি সহিংসতা, সংঘাত কিংবা দীর্ঘমেয়াদি অস্থিরতার জন্ম দেয়, তাহলে অর্থনীতিতে প্রত্যাশিত ইতিবাচক প্রভাব আসবে না। বরং বাজারে আতঙ্ক বাড়তে পারে, ভোক্তা ও বিনিয়োগকারীর আস্থা আরও দুর্বল হতে পারে। ফলে নির্বাচনের মান, গ্রহণযোগ্যতা ও শান্তিপূর্ণ পরিবেশ নিশ্চিত করা অর্থনৈতিক দৃষ্টিকোণ থেকেও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, নির্বাচন-পরবর্তী রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা যেন কেবল স্বল্পমেয়াদি না হয়। দীর্ঘমেয়াদে একটি কার্যকর সংসদ, নীতিগত ধারাবাহিকতা এবং প্রাতিষ্ঠানিক শক্তিশালীকরণ ছাড়া অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধার টেকসই হবে না। বিনিয়োগকারীরা শুধু আজকের পরিস্থিতি নয়, আগামী পাঁচ থেকে দশ বছরের চিত্র বিবেচনা করেই সিদ্ধান্ত নেন।
সব দিক বিবেচনায় আমি মনে করি, ফেব্রুয়ারির জাতীয় নির্বাচন বাংলাদেশের অর্থনীতির জন্য এক ধরনের 'আস্থার পরীক্ষা'। নানামুখী চ্যালেঞ্জ থাকা সত্ত্বেও দেশের অর্থনীতির ভেতরে পুনরুদ্ধারের সক্ষমতা রয়েছে। রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করা গেলে, নীতিগত সংস্কারে দৃঢ়তা দেখানো গেলে এবং আস্থার সংকট কাটানো গেলে নতুন বছরে অর্থনীতি ঘুরে দাঁড়ানোর বাস্তব সম্ভাবনা তৈরি হতে পারে। এখন প্রয়োজন সম্মিলিত দায়িত্ববোধ-কারণ এই নির্বাচন শুধু রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ নয়, দেশের অর্থনৈতিক গতিপথও নির্ধারণ করবে।
এছাড়া শিল্প উৎপাদন বাড়াতে, এআই প্রযুক্তি, জ্বালানি সক্ষমতা বাড়ানো, নিরাপদ খাদ্য ব্যবস্থা গড়ে তোলা, খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করা, খাদ্য ও চিকিৎসা গবেষণায় জোর দেওয়া, সার উৎপাদন, স্বাস্থ্য খাতে নীতিগত সহায়তা বাড়ানো ও এ খাতে ১০ বছর ট্যাক্স হলিডে সুবিধা প্রদান, ব্যাংক সুদের হার ১০ শতাংশের নিচে নামিয়ে আনা, শুল্ক ও ভ্যাটমুক্ত সুবিধায় রি-এজেন্ট আমদানি ও স্বাস্থ্য খাতের জন্য হেলথ সিটি প্রকল্প চালু করতে হবে।