Image description

চট্টগ্রাম নগরের অপরাধ জগতের ইতিহাসে একটি বিশেষ ধারা বছরের পর বছর ধরে বেঁচে আছে। সেটি ডাকনাম। এখানে কোনো সন্ত্রাসীকে তার পৈত্রিক নাম বা পরিচয় দিয়ে চেনে না মানুষ। বরং পরিচিত হয় ভয় জাগানিয়া ডাকনামে।

কেউ অস্ত্র চালাতে দক্ষ হওয়ায় ‘গুলিবাপ্পা’, কেউ চাপাতি নিয়ে এলাকাজুড়ে দাপট দেখানোর কারণে ‘চাপাতি ফারুক’, আবার প্রভাবশালী কারো আত্মীয় হওয়ায় তাকে সবাই চেনে ‘ভাগিনা’ নামে। এমন ডাকনামধারী অপরাধীদের সংখ্যা এতই বেশি যে, পুলিশের ওয়ান্টেড তালিকায়ও এসব ডাকনাম উল্লেখ করা হয়।

চট্টগ্রামের পুরোনো শহরাঞ্চল-চকবাজার, সদরঘাট, বন্দর, রেলস্টেশন সংলগ্ন গলি ও কলোনিগুলোতে এই সংস্কৃতির শেকড় আরো গভীরে। স্থানীয়ভাবে পরিচয় বলতে ডাকনামই আসল পরিচয়। অনেক সময় এমনও হয়, একজনের আসল নাম কেউই জানে না। পাড়ার চায়ের দোকানি, রিকশা চালক, দোকানদারÑসবার মুখেই থাকে সেই ডাকনাম। শনিবার চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন পুলিশ (সিএমপি) ৩৩০ জন দুষ্কৃতকারীর নাম প্রকাশ করার পর অন্তত ১৫ জনের ক্ষেত্রে এ ধরনের উদ্ভট পরিচয় মিলেছে।

নামের শুরু ‘গলি-কালচার’ থেকে

চট্টগ্রামের গলিনির্ভর জীবনধারা অপরাধীদের ডাকনাম তৈরি হওয়ার সবচেয়ে বড় উৎস। জটলা বেঁধে থাকা কিশোর গ্যাং, ফুটবল দলের ঝগড়া, নেশার আড্ডা, বস্তির লাইন–এদের মধ্য থেকেই জন্ম নেয় নতুন ডাকনাম। কোনো কিশোর প্রথমবার ছুরি ধরে ভয় দেখালে তাকে হয়তো ‘ছুরি রাকিব’ বলা শুরু হয়। কেউ লাঠি হাতে ফিরে এলে হয় ‘লাঠি জসিম’। আবার যারা কোনো প্রভাবশালী মহাজনের আত্মীয়, তাদের জুটে ‘ভাগিনা’, ‘চাচা’, ‘ভাইপো’ ইত্যাদি ‘উপাধি’।

সিএমপির অতিরিক্ত পুলিশ কমিশনার (প্রশাসন ও অর্থ, অতিরিক্ত দায়িত্বে) ওয়াহিদুল হক চৌধুরী বলেন, শহরের অপরাধচক্রে ডাকনাম কীভাবে জন্ম নেয়, তার সবচেয়ে স্পষ্ট উদাহরণ ‘বার্মা সাইফুল’। তিনি বার্মা কলোনিতে থাকতেন- সেখান থেকেই তার পরিচিতি তৈরি হয় বার্মা সাইফুল। তিনি জানান, সাইফুলের বিরুদ্ধে ৩০টির বেশি মামলা আছে। এলাকায় সবাই তাকে বার্মা সাইফুল বলেই চেনে।

ওয়াহিদুল হকের মতে, পরিচয়ের এই বিকল্প রূপই অনেক সময় অপরাধীদের জন্য ঢাল হয়ে দাঁড়ায়। আসল নামের চেয়ে ডাকনামই বেশি জনপ্রিয় হয়ে ওঠে, যা তদন্তে বাড়তি জটিলতা সৃষ্টি করে। সাধারণ মানুষও বেশিরভাগ ক্ষেত্রে অপরাধীকে ডাকনামেই চেনে, ফলে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর নথিপত্রে একই ব্যক্তিকে মেলাতে বেশ সময় লেগে যায়।

চকবাজারের গণি কলোনির মুদি দোকানদার আবুল ফজল বলেন, এলাকায় কে কার ছেলে- সেটা কেউ জানে না। কিন্তু গুলিবাপ্পা, ভাগিনা বা কালা জুয়েল- এদের সবাই চেনে। ভয়ও পায়। ওদের আসল নাম ফাঁস করলে উল্টো ঝামেলা।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের অধ্যাপক ও নিরাপত্তা বিশ্লেষক এম শাহীদুজ্জামানের মতে, অপরাধীর জন্য ডাকনাম ঠিক অস্ত্রের মতোই কার্যকর। একটি নাম শুধু পরিচয় নয়, বরং এলাকায় আতঙ্ক সৃষ্টি, প্রতিপক্ষকে নিয়ন্ত্রণ এবং পুলিশের চোখ এড়িয়ে টিকে থাকার এক কৌশল।

পালানোর সময়ে অপরাধীদের সবচেয়ে বড় ভরসা হয়ে দাঁড়ায় তাদের ডাকনাম। ডাকনামের কারণে একজন অপরাধী ট্রেন-লঞ্চ-বাসে পালিয়ে গেলে তাকে খুঁজে পাওয়া কঠিন। দেখা গেল তার আসল নাম শফিকুল হলেও পরিচিতি থাকে একেবারে অন্য নামেÑ‘চাপাতি ফারুক’। পুলিশের ডাটাবেস, মিডিয়া রিপোর্ট, সাধারণ মানুষের মুখে মুখে ঘুরে বেড়ায় এই ডাকনামগুলোই।

চট্টগ্রাম পুলিশের সহকারী কমিশনার (মিডিয়া) আমিনুর রশিদের ভাষায়, অনেক অপরাধী আসল নাম প্রকাশ করতে চায় না। তারা জানে, ভয় তৈরি করতে ডাকনামই সবচেয়ে শক্তিশালী হাতিয়ার। সাধারণ মানুষ ডাকনাম শুনলেই কেঁপে ওঠে। পুলিশের তল্লাশিপত্র, চার্জশিটÑসব জায়গায় তাই অনেক সময়ই দেখা যায় এই ডাকনামভিত্তিক পরিচয়। আর এ কারণেই আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর জন্যও তদন্তে সৃষ্টি হয় বাড়তি জটিলতা।

ডাকনামনির্ভর অপরাধ ইতিহাস

চকবাজার, সদরঘাট, বন্দর থেকে পাহাড়তলী পুরোনো শহরের বিস্তীর্ণ অংশজুড়ে গ্যাং কালচার এমনভাবে শিকড় গেড়ে বসেছে যে অনেক এলাকায় মানুষ আসল নাম উল্লেখই করে না। স্থানীয়রা ভয় ও সতর্কতার সঙ্গে বলে, এই লাইনটা ভাগিনার এলাকা, বা ওই গলিতে গুলিবাপ্পার ছেলেরা থাকে, কিংবা ওদিকে গেলে কালা জুয়েলদের লোকজন পাওয়া যাবে।

পুলিশের সন্ত্রাসী তালিকায় প্রথম নম্বরে যিনি আছেন, তাকে সবাই চেনে পিচ্চি জাহিদ নামে। কোতোয়ালী এলাকায় এই নামেই ত্রাস সৃষ্টি করে সে। একই থানার তালিকায় ৮ নম্বরে আছেন মো. ইদু মিয়া। অবশ্য এই নামে কেউ তাকে চেনে না; এলাকাবাসীর কাছে তার পরিচিতি হাত কাটা ইদু। কথায় কথায় মানুষের হাত কেটে দেওয়ার কারণে তার এই পরিচিতি। তার পৈত্রিক বাড়ি বরিশালে হলেও এখন থাকে কোতোয়ালীর বিআরটিসি এলাকার বয়লার অ্যাভিনিউতে।

একই থানার তালিকায় ১৫ নম্বরে আছেন কট নাজিম। আর ৩৬ নম্বরে থাকা ছাত্রলীগের গোলাম সামদানী জনি নামে কেউ তাকে চেনে না; সবাই চেনে হাড্ডি জনি নামে। পাহাড়তলীতে আছেন বকলেস মাসুম। ৫৯ নম্বরে থাকা ব্যক্তিকে সবাই চেনে ডাকাত ইউসুফ নামে। বায়েজিদ এলাকায় তালিকার ৭৮ নম্বরে থাকা ব্যক্তির আসল নাম কালা মানিক। সে গিট্টু মানিক নামেও পরিচিত।

তালিকার ১৩৯ নম্বরে থাকা আকবরশাহ এলাকার আলোচিত সন্ত্রাসী মিলনকে কেউ আসল নামে চেনে না। এলাকায় তার পরিচিতি অস্ত্র মিলন নামে। একইভাবে সেখানে আছে রাজন। তার পরিচয় পুলিশ রাজন হিসেবে। তালিকার ১১৬ নম্বরে থাকা আরেকজনকে এলাকার মানুষ ডাকে গলাকাটা রইন্না।

তালিকায় চট্টগ্রামে আলোচিত ডাকনামধারী অপরাধীদের মধ্যে আরো রয়েছে সাকিব ভাগিনা, হামকা জুলকাস, ছ্যাগা রাসেল, সাউথ গলি বাবুল, ডগরু রাজীব, দুধ মিজান ও ফকির।