Image description

দেশের কারাগারগুলোতে থাকা ৮৪ হাজার ৪০০ বন্দির মধ্যে ৭৮ হাজার ১৬০ জনই ত্রয়োদশ জাতীয় নির্বাচনে ভোট দেওয়ার জন্য নিবন্ধন করেননি। কারা কর্তৃপক্ষের তত্ত্বাবধানে ৭৫টি কারাগারের মাত্র ছয় হাজার ২৪০ বন্দি নির্ধারিত অ্যাপের মাধ্যমে নিবন্ধন করেছেন। গতকাল রোববার কারা-সংশ্লিষ্ট সূত্র থেকে এ তথ্য পাওয়া গেছে। 

দেশের ইতিহাসে প্রথমবারের মতো কারাগারে থাকা বন্দিদের ভোটাধিকার প্রয়োগের ব্যবস্থা করেছে সরকার। বন্দিরা পোস্টাল ব্যালটের মাধ্যমে ভোট দেওয়ার সুযোগ পাবেন।  

শুরুতে কারা কর্তৃপক্ষ সংসদ ও গণভোটে অংশ নেওয়ার জন্য কারাগারগুলোতে প্রচার চালিয়েছিল। এরপর তিন সপ্তাহ ধরে অনলাইনে নিবন্ধন প্রক্রিয়া সম্পন্ন করে। গত ৩১ ডিসেম্বর এই নিবন্ধন শেষ হয়।

কারা কর্তৃপক্ষ সূত্র জানায়, ছয় হাজার ২৪০ বন্দি নিবন্ধন করলেও গতকাল পর্যন্ত তাদের মধ্যে কারাগারে আছেন পাঁচ হাজার ৯২০ জন। নিবন্ধন করা ৩২০ জন জামিনে কারাগার থেকে মুক্ত হয়েছেন। কারা সূত্র বলছে, বন্দি হিসেবে যারা ভোট দিতে নিবন্ধন করেছেন, তাদের মধ্যে কেউ জামিন পেলেও ভোটাধিকার প্রয়োগ করতে হলে তাকে আবার কারাগারের ভেতর নির্ধারিত বুথে যেতে হবে। ভোট দেওয়া শেষ হলে তিনি কারাগার থেকে ফিরে আসবেন।  

বন্দিদের নিবন্ধন কম হওয়ার তিনটি কারণের কথা বলছে কারা কর্তৃপক্ষ। কিছু বন্দির ধারণা, তারা যে কোনো সময় জামিন পেয়ে কারাগার থেকে ছাড়া পেতে পারেন। তাই কারাগার থেকে ভোট দিতে অনলাইনে নিবন্ধন করেননি। আবার বন্দিদের মধ্যে যারা পুরোনো বন্দি, তাদের অনেকের জাতীয় পরিচয়পত্র (এনআইডি) নিবন্ধন নেই।  আর বন্দির একটি অংশ কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগ ও এর অঙ্গসংগঠনের নেতাকর্মী। তাদের মধ্যে থেকে নিবন্ধনের ব্যাপারে সাড়া কম মিলেছে। 

বন্দিদের মধ্যে যাদের এনআইডি করা নেই, তাদের কীভাবে এনআইডি করা যায়, সে ব্যাপারে পৃথক পরিকল্পনা করেছে কারা কর্তৃপক্ষ। তবে তা করা হবে নির্বাচনের পর। এ ব্যাপারে প্রয়োজনীয় সহযোগিতা চেয়ে সংশ্লিষ্ট দপ্তরে চিঠিও দিয়েছে কারা প্রশাসন। 

কারা কর্তৃপক্ষ সূত্র জানিয়েছে, ২০১৯ সাল থেকে সফটওয়্যারের মাধ্যমে বন্দিদের তথ্য সংরক্ষণ করা শুরু হয়। এরপর থেকে যারা কারাগারে গেছেন, তাদের এনআইডি-সংক্রান্ত তথ্য কারা কর্তৃপক্ষের কাছে সংরক্ষিত আছে। এর আগের অনেক বন্দির এনআইডির তথ্য কারা প্রশাসনের কাছে নেই। আবার অনেক বন্দির এনআইডি নেই। 

কারা মহাপরিদর্শক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল সৈয়দ মো. মোতাহের হোসেন সমকালকে বলেন, প্রথমবারের মতো কারাগারে থেকেও বন্দিরা ভোট দিতে পারবেন– এটি ভালো উদ্যোগ। ভোট দিতে যারা ইচ্ছুক, তারা এরই মধ্যে নিবন্ধন করেছেন। তিনি বলেন, ‘আমাদের ধারণা ছিল, বন্দিদের মধ্যে নিবন্ধনের সংখ্যা আরও বেশি হবে। তবে এনআইডি না থাকাসহ কয়েকটি কারণে নিবন্ধন আশানুরূপ হয়নি।’ 

কারা মহাপরিদর্শক বলেন, পোস্টাল ব্যালট হাতে পাওয়ার পর বন্দিরা ভোটাধিকার প্রয়োগ করবেন। বন্দিদের নিজ নিজ নির্বাচনী আসনে কারা কোন প্রতীকে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন, তা জানাতে তাদের বুকলেট আকারে তথ্য সরবরাহ করা হবে। এতে তারা প্রার্থী ও প্রতীক সম্পর্কে জানতে পারবেন। তিনি বলেন, ‘কেউ ভোট দিতে চাইলে আমরা তাকে যথাযথভাবে ভোট দেওয়ার পরিবেশ তৈরি করে দেওয়ার ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে পারি। কিন্তু ভোট দেওয়ার জন্য জোর করার সুযোগ নেই।’

কোথায় কতজন নিবন্ধন করেছেন

কারা সূত্র জানায়, কারাগারের সাংগঠনিক কাঠামোতে ঢাকা বিভাগ দুটি ভাগে বিভক্ত। কেরানীগঞ্জ কেন্দ্রীয় কারাগারসহ ১০টি কারাগার ঢাকা বিভাগ-১-এর আওতাভুক্ত। গাজীপুরের কাশিমপুরের চারটি কারাগারসহ ১০টি কারাগার ঢাকা বিভাগ-২-এর আওতাধীন। ঢাকা বিভাগ-১-এর ১০টি কারাগারের এক হাজার ৪০৯ বন্দি অনলাইনে ভোট প্রদানে নিবন্ধন করেছেন। ঢাকা বিভাগ-২-এ ৯৬০ জন নিবন্ধন করেছেন। 

চট্টগ্রাম বিভাগে সব কারাগারে এক হাজার ১০১, খুলনায় বিভাগে ৬৯০, রংপুর ৩০৫, রাজশাহী ৬৯৪, বরিশাল ২৩৪, ময়মনসিংহ ১৫৮ এবং সিলেট বিভাগের কারাগারগুলোতে ৫১০ জন নিবন্ধন করেছেন।  

কেরানীগঞ্জে ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারের ৯৯০ বন্দি ভোট দিতে অনলাইনে আবেদন করেছেন। গতকাল পর্যন্ত সেখানে বন্দির সংখ্যা ছিল ৯ হাজার ৮৭৪ জন। 

এ ছাড়া কেরানীগঞ্জের বিশেষ কারাগারের ৮৯, ফরিদপুর জেলা কারাগারের ৫২, নারায়ণগঞ্জে ৮৮, মুন্সীগঞ্জে ২৭, রাজবাড়ীতে ৯৭, মাদারীপুরে ২৫, গোপালগঞ্জে ৩৩, শরীয়তপুরের সাতজন বন্দি নিবন্ধন করেছেন।

গাজীপুরের কাশিমপুর কেন্দ্রীয় কারাগার-১-এ ১০১ জন নিবন্ধন করেছেন। কাশিমপুর কেন্দ্রীয় কারাগার-২-এ ৫ হাজার ২০০ বন্দির মধ্যে নিবন্ধন করেছেন ১৩৭। কাশিমপুর নারী কারাগারের ৪৬, টাঙ্গাইলে ৭১, কিশোরগঞ্জে ১৫, গাজীপুরে ১৪, নরসিংদীতে ২৮, মানিকগঞ্জে ২৭ জন নিবন্ধন করেছেন। 

চট্টগ্রাম কেন্দ্রীয় কারাগারে ছয় হাজার ৫৭৩ বন্দির মধ্যে ভোট নিতে নিবন্ধন করেছেন মাত্র ৩৭৮ জন। শতকরা হিসাবে তা ৫ দশমিক ৬ শতাংশ। কক্সবাজারে ৬০, খাগড়াছড়িতে ১৬, রাঙামাটিতে ৮, বান্দরবানে ৫২, কুমিল্লায় ৩২৪ এবং ব্রাহ্মণবাড়িয়া কারাগারে ১৪ জন নিবন্ধন করেছেন। 

রাজশাহী কারাগারে বন্দি দুই হাজার ৬০১ জন; ভোটের নিবন্ধন করেছেন ২৭৩ জন।

প্রশিক্ষণ নিয়েছেন কর্মকর্তারা  

কারা কর্মকর্তারা জানান, বন্দিদের ভোট গ্রহণ প্রক্রিয়ার সঙ্গে যুক্ত কারা সদস্যদের এরই মধ্যে প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়েছে। কারাগারে বন্দিরা যেখানে ভোট দেবেন, সেই স্থানে প্রয়োজনীয় কম্পিউটার, প্রিন্টার, ইন্টারনেট সুবিধাসহ অন্যান্য সরঞ্জাম রয়েছে কিনা, তা জেলা নির্বাচন কমিশন থেকে যাচাই করা হয়েছে। 

নিবন্ধিত ভোটাররা কারা কর্তৃপক্ষের মাধ্যমে ‘বহির্গামী খাম’ (ফরম-৯ক) পাবেন। এতে থাকবে জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও গণভোটের জন্য দুটি আলাদা ব্যালট পেপার, ভোট প্রদানের নির্দেশাবলি ও ঘোষণাপত্র (ফরম-৮) এবং রিটার্নিং অফিসারের ঠিকানা সংবলিত ফেরত খাম (ফরম-১০খ)। 

নির্বাচন কমিশনের নির্দেশনায় বলা হয়েছে, জেলখানার ভেতরে ভোট প্রদানের জন্য গোপন কক্ষ বা উপযুক্ত পরিবেশ নিশ্চিত করতে হবে। ভোট গ্রহণ শেষে খামগুলো সুরক্ষিতভাবে সংগ্রহ করে দ্রুত ডাক বিভাগের মাধ্যমে সংশ্লিষ্ট রিটার্নিং অফিসারের কাছে পাঠানো হবে।

যেভাবে ভোট দেওয়া যাবে

কারা সূত্র বলছে, সংশ্লিষ্ট এলাকার নিবন্ধিত ভোটারদের জন্য নির্বাচন কমিশন পৃথকভাবে খাম পাঠাবে। এতে তিনটি খামে থাকবে ভোট প্রদানের নিয়মাবলি, স্বাক্ষরের জন্য নির্ধারিত স্থান ও ব্যালট পেপার। বন্দিরা ব্যালট পেপারে ভোট দিয়ে খাম সিল করবেন। প্রতিটি কারাগারের নির্দিষ্ট একটি স্থান থাকবে, যেখানে বসে বন্দিরা ভোট দেবেন। ব্যালট পেপারের খাম ও স্বাক্ষরসংবলিত কপিটি আরেকটি খামে ভরে কারা কর্তৃপক্ষের কাছে জমা দেবেন বন্দিরা। কারা কর্তৃপক্ষ সেগুলো পোস্ট অফিসে পাঠাবেন। ডাক বিভাগ এক্সপ্রেস ব্যবস্থায় খামগুলো নির্বাচন কমিশনে পাঠাবে। এরপর নির্বাচন কমিশন সংশ্লিষ্ট নির্বাচনী এলাকায় জমা পড়া ভোটের সংখ্যা যুক্ত করবে। কারা কর্মকর্তারাও পোস্টাল ব্যালটের মাধ্যমে ভোট দিতে পারবেন। 

কারা অধিদপ্তরের সহকারী কারা মহাপরিদর্শক (উন্নয়ন) জান্নাত-উল-ফরহাদ বলেন, ‘বন্দিরা যাতে সফলভাবে তাদের ভোটাধিকার প্রয়োগ করতে পারেন, সে ব্যাপারে আমরা সচেষ্ট রয়েছি।’