দেশে জঙ্গিবাদ ও চরমপন্থী আগের তুলনায় অনেক কমেছে বলে মন্তব্য করেছেন স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা লেফটেন্যান্ট জেনারেল (অব.) জাহাঙ্গীর আলম চৌধুরী। তিনি বলেছেন, ‘জঙ্গিবাদ এখন নাই বললেই চলে। ফ্যাসিস্ট জঙ্গি রয়েছে, তবে তারা বিভিন্ন দেশে অবস্থান করছে। বিদেশে আশ্রয় নেওয়া ফ্যাসিস্ট জঙ্গিগুলোকে ফেরত এনে আইনের মুখোমুখি করতে চাই।’
আজ রোববার সকালে রাজশাহীর সারদায় বাংলাদেশ পুলিশ একাডেমিতে শিক্ষানবিস সহকারী পুলিশ সুপারদের সমাপনী কুচকাওয়াজ অনুষ্ঠান শেষে সাংবাদিকদের এক প্রশ্নের জবাবে তিনি এসব কথা বলেন।
স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা বলেন, পুলিশের লুট হওয়া যেসব অস্ত্র এখনো উদ্ধার হয়নি, সেগুলো নির্বাচনকালীন সময়ে ব্যবহার করা যাবে না-এটি তিনি নিশ্চিত করছেন। সীমান্ত দিয়ে কিছু অস্ত্র প্রবেশের চেষ্টা হলেও সেগুলো নিয়মিত উদ্ধার করা হচ্ছে বলে জানান তিনি।
তিনি আরও জানান, আসন্ন জাতীয় নির্বাচনকে সামনে রেখে প্রথমবারের মতো সব আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে নির্বাচনকালীন বিশেষ প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়েছে, যাতে কোনো দুষ্টচক্র সহিংসতা সৃষ্টি করতে না পারে।
পুলিশের মধ্যে ভয় কাজ করছে-এমন অভিযোগ নাকচ করে তিনি বলেন, পুলিশের মধ্যে কোনো ভয় নেই। বরং তারা আরও বেশি উদ্যম ও পেশাদারিত্ব নিয়ে নির্বাচনে দায়িত্ব পালন করবে।
পুলিশ কমিশন আইন প্রসঙ্গে স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা বলেন, ‘এই আইন জনগণের স্বার্থে করা হয়েছে। এর মাধ্যমে একটি জনবান্ধব পুলিশ ব্যবস্থা গড়ে তোলাই সরকারের লক্ষ্য। পুলিশ কোনো রাজনৈতিক দলের রক্ষক নয়, তারা জনগণের সেবক।’
এর আগে কুচকাওয়াজ অনুষ্ঠানে নির্বাচনকালীন দায়িত্ব প্রসঙ্গে তিনি বলেন, আসন্ন জাতীয় সংসদ নির্বাচন অবাধ, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষভাবে সম্পন্ন করতে পুলিশ বাহিনী সম্পূর্ণ প্রস্তুত। নির্বাচনকালীন নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে প্রায় এক লক্ষ পুলিশ সদস্যকে বিশেষ প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়েছে।
এ সময় নির্বাচনী দায়িত্ব পালনের সময় শতভাগ নিরপেক্ষ থাকার আহ্বান জানিয়ে স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা বলেন,কোনো অনৈতিক সুবিধা বা আপ্যায়ন গ্রহণ করা যাবে না। ভোটকেন্দ্রে কোনো বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি হলে রিটার্নিং অফিসারের পরামর্শ অনুযায়ী তা কঠোরভাবে দমন করতে হবে।
তিনি বলেন, বাংলাদেশ পুলিশ কোনো সাধারণ বাহিনী নয়; এটি রাষ্ট্র ও জনগণের সেবক হিসেবে কাজ করবে। নতুন বাংলাদেশ গড়তে হলে পুলিশের ভিত্তি হতে হবে জ্ঞান, নৈতিকতা, স্বচ্ছতা, জবাবদিহিতা এবং জনবান্ধব সেবা।
আইন প্রয়োগ প্রসঙ্গে স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা বলেন, কঠোরতাই পুলিশের শক্তি নয়; প্রকৃত শক্তি হলো ন্যায়বিচার নিশ্চিত করা। তদন্ত, গ্রেপ্তার ও সিদ্ধান্ত গ্রহণে পুলিশকে অবশ্যই নিরপেক্ষ ও বিচক্ষণ হতে হবে। কোনো রাজনৈতিক পরিচয় বা ব্যক্তিগত চাপের কাছে নতিস্বীকার করা যাবে না। জনগণ এমন একটি পুলিশ বাহিনী চায়, যারা ভয় নয় বরং নিরাপত্তা ও আস্থার অনুভূতি সৃষ্টি করবে। মানুষের কথা মনোযোগ দিয়ে শোনা ও ভদ্র আচরণ করাই একজন দক্ষ পুলিশ কর্মকর্তার পরিচয়।
দুর্নীতিকে রাষ্ট্রের সবচেয়ে বড় শত্রু হিসেবে উল্লেখ করে তিনি বলেন, দুর্নীতি প্রতিষ্ঠানকে ভেতর থেকে ধ্বংস করে এবং জনগণের বিশ্বাস নষ্ট করে। কোনো পুলিশ সদস্য যদি ব্যক্তিগত স্বার্থ বা রাজনৈতিক সুবিধার জন্য দায়িত্বচ্যুত হয়, তবে সে রাষ্ট্রের ভিত্তিকেই দুর্বল করে দেয়। অন্যায় আদেশ বা পক্ষপাতমূলক কর্মকাণ্ডে অংশ নেওয়া যাবে না।
সাহসের সংজ্ঞা তুলে ধরে জাহাঙ্গীর আলম চৌধুরী বলেন, সাহস মানে শুধু বিপদের মুখে দাঁড়িয়ে থাকা নয়; অন্যায় আদেশে ‘না’ বলা এবং জুলুমের বিরুদ্ধে মজলুমের পক্ষে দাঁড়ানোই প্রকৃত সাহস। সততা ও নৈতিকতাই নবীন কর্মকর্তাদের সবচেয়ে বড় পরিচয় হওয়া উচিত।
তিনি আরও বলেন, পেশাগত জীবনে নানা চাপ ও সমালোচনা আসতে পারে, তবে সততা ও দেশপ্রেম থাকলে কোনো কিছুই দায়িত্ব পালনে বাধা হতে পারে না। আপনারা শুধু আজকের পুলিশ নন, আপনারাই ভবিষ্যতের বাংলাদেশের পুলিশ। জনগণের আত্মত্যাগ ও ভবিষ্যৎ প্রজন্মের প্রত্যাশাকে ধারণ করে দুর্নীতি ও পক্ষপাতিত্বমুক্ত একটি মানবিক, সাহসী ও গৌরবময় পুলিশ বাহিনী গড়ে তুলতে হবে।
সমাপনী কুচকাওয়াজে আরও উপস্থিত ছিলেন- আইজিপি বাহারুল আলম, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সচিব নাসিমুল গণি, বাংলাদেশ পুলিশ একাডেমীর প্রিন্সিপাল অ্যাডিশনাল আইজিপি তওফিক মাহবুব চৌধুরী ।
২০২৫ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারিতে শুরু হওয়া ৪১তম বিসিএস (পুলিশ) ব্যাচের ৯৬ জন প্রশিক্ষণার্থী আজকের এই প্রশিক্ষণ সমাপনী কুচকাওয়াজের মধ্য দিয়ে বাস্তব কর্মজীবনে প্রবেশ করলেন। কুচকাওয়াজে ৪১তম বিসিএস (পুলিশ) ব্যাচের ৮৭ জন ছাড়াও ২৮তম বিসিএস এর ১ জন, ৩৫তম বিসিএস এর ৩ জন, ৩৬তম বিসিএস এর ১ জন, ৩৭তম বিসিএস এর ২ জন এবং ৪০তম বিসিএস এর ২ জন প্রশিক্ষণার্থী অংশগ্রহণ করেন।
প্রশিক্ষণ সমাপনী কুচকাওয়াজে প্যারেড কমান্ডার হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন শিক্ষানবিশ সহকারী পুলিশ সুপার ধীমান কুমার মন্ডল। দীর্ঘ প্রশিক্ষণের কৃতিত্বের অংশ হিসেবে বেস্ট প্রবেশনার হওয়ার গৌরব অর্জন করেন শিক্ষানবিশ সহকারী পুলিশ সুপার মোহাম্মদ সাজ্জাদ হোসেন।
বেস্ট একাডেমিক অ্যাওয়ার্ড অর্জন করেন শিক্ষানবিশ সহকারী পুলিশ সুপার মো. মেহেদী আরিফ, বেস্ট ইন ফিল্ড অ্যাক্টিভিটিজ অ্যাওয়ার্ড অর্জন করেন শিক্ষানবিশ সহকারী পুলিশ সুপার মো. সজীব হোসেন, বেস্ট হর্সম্যানশিপ অ্যাওয়ার্ড অর্জন করেন শিক্ষানবিশ সহকারী পুলিশ সুপার মোসলেহ উদ্দীন আহমেদ এবং বেস্ট শ্যুটার হওয়ার গৌরব অর্জন করেন শিক্ষানবিশ সহকারী পুলিশ সুপার সালমান ফারুক।
সমাপনী কুচকাওয়াজ শেষে ওই সহকারী পুলিশ সুপাররা বিভিন্ন জেলায় ৬ (ছয়) মাসের বাস্তব প্রশিক্ষণ গ্রহণের জন্য পদায়িত হবেন।