দেড় বছর পার করেছে অন্তর্বতী সরকার৷ আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি জাতীয় নির্বাচনের পর বিদায় নেবে ইউনূস সরকার৷ ৫ আগস্টের পর গঠিত অন্তর্বর্তী সরকারের আমলেও ১৪ বছর আগে নৃশংসভাবে সংঘটিত সাগর-রুনি হত্যার বিচার আলোর মুখ দেখেনি৷
বিষয়টি নিয়ে হতাশা প্রকাশ করছেন তদন্তকারীরারও৷ এই হত্যাকাণ্ডের তদন্তের জন্য অন্তর্বতী সরকারের সময়ে গঠিত টাস্কফোর্সের প্রধান অতিরিক্ত পুলিশ মহাপরিদর্শক মো. মুস্তফা কামাল ডয়চে ভেলেকে বলে, ‘‘ভবিষ্যতে কী হবে, জানি না৷ আমাদের তদন্তে এখনো কোনো অগ্রগতি নাই৷ আমরা হত্যার মোটিভ এবং আসামিদের এখনো চিহ্নিত করতে পারিনি৷ আমরা হতাশ৷ ------- ডয়েচেভেলে
সন্তান হত্যার বিচার পাওয়ার বিষয়ে হতাশ সাগরের মা সালেহা মনির বললেন, ‘‘আর কী হবে! আল্লাহর কাছে বিচার দিয়ে রেখেছি৷ কোনো সরকারই কিছু করবে বলে মনে হয় না৷''
২০১২ সালের ১১ ফেব্রুয়ারি সাংবাদিক দম্পতি সাগর সরওয়ার ও মেহেরুন রুনি তাদের ঢাকার পূর্ব রাজাবাজারের বাসায় খুন হন৷ ঘটনার পর ১৪ বছর পার হলেও এই হত্যার মোটিভ এবং প্রকৃত অপরাধীদের চিহ্নিত করতে পারেনি সরকার৷
অন্তর্বতী সরকারের আমলে ১১ বার পিছিয়েছে তদন্ত প্রতিবেদন
হত্যাকাণ্ডের ১৪ বছরে থানা পুলিশ, ডিবি ও র্যাবের পর অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব নেয়ার পর এই মামলার তদন্ত আসে পিবিআই'র হাতে৷
গত ৫ জানুয়ারি ঢাকার চিফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট (সিএমএম) আদালতে গত ৫ জানুয়ারি এই মামলার তদন্ত প্রতিবেদন দাখিলের ধার্য দিন ছিল৷ কিন্তু পিবিআই তদন্ত প্রতিবেদন জমা দিতে পারেনি৷ আগামী ৯ ফেব্রুয়ারি প্রতিবেদন জমা দেয়ার নতুন তারিখ দেয়া হয়েছে৷
এ নিয়ে এই মামলায় তদন্ত প্রতিবেদন জমার তারিখ ১২৩ বার পেছানো হলো৷ শেখ হাসিনা সরকারের সময়ে পেছানো হয়েছে ১১২ বার আর অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে পেছানো হলো ১১ বার৷
অগ্রগতি নেই অন্তর্বর্তী সরকারের টাস্কফোর্সেরও
২০২৪ সালের ৫ আগস্ট শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর দায়িত্ব নেওয়া প্রফেসর ইউনূসের নেতৃত্বে অন্তর্বর্তী সরকার ৩০ সেপ্টেম্বর উচ্চ আদালতের নির্দেশে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এই হত্যাকাণ্ডের তদন্তে চার সদস্যের উচ্চ পর্যায়ের টাস্কফোর্স গঠন করে৷ টাস্কফোর্সের প্রধান করা হয় পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশনের (পিবিআই) প্রধান অতিরিক্ত পুলিশ মহাপরিদর্শক মো. মুস্তফা কামালকে৷
এই টাস্কফোর্সকে ছয় মাসের মধ্যে মামলার তদন্ত শেষ করে উচ্চ আদালতে প্রতিবেদন জমা দিতে বলা হয়েছিল৷ সেই হিসেবে গত বছরের মার্চে তাদের প্রতিবেদন জমা দেয়ার কথা ছিলো৷ কিন্তু সময়মতো প্রতিবেদন জমা দিতে পারেনি টাস্কফোর্স৷
এরপর এই কমিটি আরো ছয় মাস সময় নিলেও আদালতে তদন্ত প্রতিবেদন দিতে পারেনি৷ এরপর গত বছরের ২৩ অক্টোবর তারা উচ্চ আদালতে আবেদন জানিয়ে আরো ছয় মাস সময় নেয়৷ আগামী এপ্রিল মাসে এই সময় শেষ হবে৷ অবশ্য এর মধ্যে অন্তর্বর্তী সরকারের বিদায় নেয়ার কথা৷
কোথায় আটকে আছে তদন্ত?
এই মামলায় বিভিন্ন সময় মোট আট জনকে গ্রেপ্তার দেখানো হয়৷ তবে পিবিআই তদন্তের দায়িত্ব পাওয়ার পর নতুন কাউকে আটক করেনি৷ যে আটজনকে আটক করা হয়েছে তাদের মধ্যে ছয়জন এখনো কারাগারে আছেন৷ বাকিরা জামিনে রয়েছেন৷
আটকদের দুইজন বাদে সবাই গ্রিল কাটা চোর ও ডাকাত দলের সদস্য৷ একজন বাসার দারোয়ান এবং আরেকজন একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তা৷
ওই আটজনসহ মোট ২৫ জনের ডিএনএ পরীক্ষা করিয়েছিলো র্যাব৷ ঘটনাস্থল থেকে তারা সাগর-রুনি ছাড়াও আরো দুইজন পুরুষের ডিএনএ পায়৷ কিন্তু যে ২৫ জনের ডিএনএ পরীক্ষা করা হয়েছে তাদের সঙ্গে অজ্ঞাত ওই দুই পুরুষসহ সন্দেজভাজন কারুর ডিএনএ ম্যাচ করেনি৷
ডয়চে ভেলের হাতে আসা তদন্ত সংশিষ্ট কিছু ডকুমেন্টে দেখা যায়, দুইজন অজ্ঞাত পুরুষের ডিএনএ ঘটনাস্থল থেকে সংগ্রহ করা হয়েছে সেই ডিএনএ'র ভিত্তিতে উন্নত প্রযুক্তি ব্যবহার করে তাদের ছবি আঁকা সম্ভব৷ সেই ছবি আঁকার জন্য যুক্তরাষ্ট্রের একটি প্রতিষ্ঠানকে অর্থও পরিশোধ করেছিলো র্যাব৷ কিন্তু সেই ছবি আর আসেনি৷
এর বাইরে হত্যায় ব্যবহৃত ছুরি, বঁটি, ছুরির বাঁট, সাগরের হাত বাঁধা ওড়না ও রুনির পরনের কাপড় ডিএনএ পরীক্ষার জন্য যুক্তরাষ্ট্রের পরীক্ষাগারে পাঠিয়েছিল র্যাব৷ পাশাপাশি সাগর-রুনির ভাড়া বাসার ভাঙা গ্রিলের অংশ, ঘটনাস্থলে পাওয়া চুল, ভাঙা গ্রিলের পাশে পাওয়া মোজা, দরজার লক, দরজার চেইন ও ছিটকিনির ডিএনএ পরীক্ষার জন্য সেখানে পাঠানো হয়৷ এখন পর্যন্ত এই মামলায় বিভিন্ন পর্যায়ে তদন্তকারীরা ১৬০ জনকে জিজ্ঞাসাবাদ করেছে৷ কিন্তু কোনো পর্যায়েই তদন্তকারীরা হত্যার মেটিভ এবং জড়িতদের ব্যাপারে নিশ্চিত হতে পারেনি৷ কার্যত ডিএনএ টেস্টের পর এই মামলা নিয়ে কোনো কাজ হয়নি৷
পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশনের (পিবিআই) প্রধান অতিরিক্ত পুলিশ মহাপরিদর্শক মো. মুস্তফা কামাল বলেন, ‘‘আসলে আমরা এখনো হত্যার মোটিভ ও আসামিদের চিহ্নত করতে পারিনি৷ এখন পর্যন্ত আমরা হতাশ৷ মামলার তদন্তে কোনো অগ্রগতি নাই৷ আগে যা ছিলো, সেই অবস্থায়ই আছে৷ ভবিষ্যতে কী হবে, তা তো বলতে পারছি না৷’’
এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘‘আগে যে আটজনকে আটক করা হয়েছে, হত্যাকাণ্ডে তাদের কোনো সংশ্লিষ্টতা আমরা এখানো পাইনি৷ আর যে ২৫ জনের ডিএনএ পরীক্ষা করা হয়েছে সেই ডিএনএ কারুর সাথে ম্যাচ করেনি৷ ফলে আমরা অন্ধকারেই আছি৷''
তার কথা, ‘‘যাদের আগে আটক করা হয়েছে তারা তো সন্দেহভাজন৷ তাদের কাছ থেকে কিছু পাওয়া যাচ্ছে না৷ আগের তদন্তকারীরা যেসব কাজ করেছেন, তদন্ত করেছেন সবই আমরা আবার দেখেছি৷ কিন্তু তাতে মামলা ডিটেকট করার মতো কোনো কিছুই আমরা পাই নাই৷ তারপরও আমরা তদন্ত চালিয়ে যাচ্ছি৷ যদিও এখনো কোনো আশার খবর নেই৷’’
"আর ধরেন ১৪ বছর আগে এই হত্যাকাণ্ড৷ যারা হত্যা করেছে তখন তাদের বয়স যদি ৩০ বছর হয়, এখন ৪৪ বছর৷ এরকম অনেক সমস্যা আছে, বলেন তিনি৷
এই মামলায় নিয়োজিত ঢাকা মহানগর আদালতের পাবলিক প্রসিকিউটর ওমর ফারুক ফারুকী ডয়চে ভেলেকে বলেন, ‘‘মামলার তদন্ত পর্যায়ে আমাদের কিছু করার নেই৷ তদন্তকারীরা চার্জশিট দিলে আমরা ন্যায় বিচার পাওয়ার জন্য কাজ করব৷ কিন্তু তদন্তকারীরা কোনো তদন্ত করছে বলে মনে হয় না৷ শুধু আদালত থেকে সময় নেয়৷ আমাদেরও প্রশ্ন যে, এই সরকারের সময়েও কেন মামলাটির তদন্ত শেষ করা গেল না৷ আস