Image description
 

দীর্ঘ ছয় বছর পর গত বছরের ৯ সেপ্টেম্বর উৎসবমুখর পরিবেশে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ (ডাকসু) নির্বাচন অনুষ্ঠিত হলেও নির্বাচনের পূর্বে দেওয়া ইশতেহার পূরণ করতে হিমশিম খাচ্ছেন নির্বাচিত প্রতিনিধিরা। বাজেট স্বল্পতায় পড়েছে নির্বাচিত এই ছাত্র সংসদ। ডাকসু ও হল সংসদকে যে পরিমাণ অর্থ বরাদ্দ দেয়া হয়েছে; তাতে ইশতেহার পূরণ অসম্ভব বলে মনে করছে সংশ্লিষ্টরা।

গত ২০১৯ সালের ডাকসুতে কোনো প্রকার আন্দোলন বা রেজিস্ট্রার বিল্ডিং ঘেরাও কর্মসূচি ছাড়াই ডাকসুর দ্বিতীয় কার্যনির্বাহী সভায় বাজেট অনুমোদন দেয়া হয়েছিল ১ কোটি ৮৯ লাখ টাকা কিন্তু ২০২৫ সালের ডাকসুর দ্বিতীয় কার্যনির্বাহী সভায় কোন প্রকার বাজেট অনুমোদন দেয়া হয়নি। পরে ডাকসু ও হল সংসদ ১৯৯০ সাল থেকে ২০২৫ সাল পর্যন্ত ৩৫ বছরের শিক্ষার্থীদের দেয়া ডাকসু ও হল সংসদ ফি- এর হিসাব চেয়ে প্রশাসন বরাবর আবেদন করলে ২০১৯ থেকে ২০২৫ সালের টাকার আয়ের হিসাব দিতে পারলেও ব্যয়ের হিসাব ও ১৯৯০ থেকে ২০১৮ সাল পর্যন্ত ডাকসু ও হল সংসদের ফি-এর টাকার কোন হিসাব দিতে পারেনি প্রশাসন।

পরবর্তীতে রেজিস্ট্রার বিল্ডিং ঘেরাও এবং প্রশাসনের সঙ্গে দীর্ঘ দেন-দরবারের পর গত ৩০ অক্টোবর অর্থাৎ নির্বাচনের ৫০ দিন পর প্রথমবারের মতো একটি প্রাথমিক বাজেট দেয়া হয়; যেখানে ডাকসুর জন্য ২৫ লাখ এবং ১৮টি হলের জন্য ১ লাখ করে মোট ৪৩ লাখ টাকা দেওয়া হয়েছে। 

ডাকসু সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এই নামমাত্র বরাদ্দ দিয়ে শিক্ষার্থীদের দেওয়া নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি বা ইশতেহারের অধিকাংশ কাজই করা সম্ভব নয়। হলের সাহিত্য, সংস্কৃতি ও ক্রীড়া কার্যক্রম পরিচালনার জন্য ১ লাখ টাকা অত্যন্ত নগণ্য।

কবি জসীম উদ্দিন হল সংসদের সহ-সভাপতি (ভিপি) ওসমান গনি দ্য ডেইলি ক্যম্পাসকে বলেন, ইশতেহার বাস্তবায়নের জন্য যতটুকু বাজেট প্রয়োজন প্রশাসন সে পরিমান বাজেট দেয়নি। আমরা  অনুদান নিয়ে আর কত ইশতেহার পুরনণ করব? হল সংসদের ফান্ডে যে টাকা আছে; তা দিয়ে হল সংসদ পরিচালনা অসম্ভব। শিক্ষার্থীদের থেকে এত বছর যে ‘ফি’ প্রশাসন নিয়েছে তা ডাকসু ও হল সংসদের একাউন্টে ফিরিয়ে দিক আমরা সব ইশতেহার পুরণ করে দিয়ে যাব।
 
শহীদ সার্জেন্ট জহুরুল হক হল সংসদের সাধারণ সম্পাদক (জিএস) খালেদ হাসান দ্য ডেইলি ক্যম্পাসকে বলেন, সরকারের বিভিন্ন মন্ত্রণালয় ও কোম্পানি সাথে যোগাযোগ করে হলের রাস্তা নির্মাণ ও টিন শেড সংস্কারে প্রায় পৌনে দুই কোটি টাকার কাজ করা হয়েছে। হল পুকুরের ওয়াক ওয়ে ও হল অডিটরিয়ামের কাজটা অনুমোদন পেলে আরও কয়েক কোটি টাকার কাজ হবে। প্রশাসন থেকে যে ১ লাখ টাকা দিয়েছে তা দিয়ে হল সংসদ এক মাস ও চলতে পারেনা। 

স্যার সলিমুল্লাহ মুসলিম হল সংসদের সাধারণ সম্পাদক (জিএস) সাদমান আব্দুল্লাহ দ্য ডেইলি ক্যম্পাসকে বলেন, বাজেট না থাকায় ইশতেহারগুলো পুরণ করতে পারব না। আমাদের মুখ বন্ধ করার জন্য মুলা ঝুলানো একটা বাজেট দিয়েছে প্রশাসন। হল সংসদের বাজেট কখনো রাউন্ড ফিগার বা ১ লাখ  হতে পারে না। আমরা শিক্ষার্থীদের দেয়া হল সংসদ ফি হল সংসদ একাউন্টে ফেরত চাই।

১৯৯০ সাল থেকে ২০২৫  সাল পর্যন্ত ডাকসু ও হল সংসদের আয় ব্যয়ের হিসাব চেয়ে আবেদন করেছি। ২০১৮ সাল থেকে ২০২৫ সাল পর্যন্ত ডাকসু ও হল সংসদের যে আয় তার ডকুমেন্টসগুলো পেয়েছি। তবে ১৯৯০ থেকে ২০১৮ সাল পর্যন্ত ডাকসুর আয় ও ব্যয়ের কোনো হিসাব পাইনি। কোষাধ্যক্ষ অফিস থেকে জানানো হয়েছে এই ধরনের কোনো তথ্য দেওয়া সম্ভব নয়। তার অফিস সেই নথিগুলো সংরক্ষণ করা হয়নি।-মুহিউদ্দিন খান, এজিএস

সবচেয়ে বড় অসংগতি দেখা দিয়েছে শিক্ষার্থীদের প্রদত্ত ‘ডাকসু ও হল সংসদ ফি’ নিয়ে। নিয়ম অনুযায়ী প্রতি বছর ভর্তির সময় শিক্ষার্থী প্রতি হল সংসদ ও ডাকসুর জন্য একটি নির্দিষ্ট ফি নেওয়া হয়। ১৯৯০ সাল থেকে ২০২৫ সাল পর্যন্ত কয়েক লাখ শিক্ষার্থীর কাছ থেকে আদায়কৃত ফি-র কোনো হিসাব লিখিতভাবে চাওয়া হলেও তার কোনো সদুত্তর দিতে পারেনি বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন।

ডাকসুর এজিএস মুহিউদ্দিন খান দ্য ডেইলি ক্যম্পাসকে জানান, ১৯৯০ সাল থেকে ২০২৫  সাল পর্যন্ত ডাকসু ও হল সংসদের আয় ব্যয়ের হিসাব চেয়ে আবেদন করেছি। ২০১৮ সাল থেকে ২০২৫ সাল পর্যন্ত ডাকসু ও হল সংসদের যে আয় তার ডকুমেন্টসগুলো পেয়েছি। আমরা আরও দুইটি বিষয়ে তথ্য চেয়েছিলাম। তবে ১৯৯০ থেকে ২০১৮ সাল পর্যন্ত  ডাকসুর আয় ও ব্যয় এর কোনো হিসাব পাইনি। কোষাধ্যক্ষ অফিস থেকে জানানো হয়েছে এই ধরনের কোনো তথ্য দেওয়া সম্ভব নয়। তার অফিস সেই নথিগুলো সংরক্ষণ করা হয়নি। তিনি আরও বলেন, ২০১৯ সালের ডাকসুর যে বাজেট বরাদ্দ হয়েছিল তা কিভাবে ব্যয় হয়েছে তার নিরপেক্ষ অডিট চেয়েছিলাম। বারবার যোগাযোগ করা সত্ত্বেও কোনো আপডেট পাইনি। বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন ডাকসু ও  হল সংসদের জন্য যে অপ্রতুল বাজেট প্রদান করা হয়েছে তার মাধ্যমে ইশতেহার গুলো বাস্তবায়ন করা সম্ভব নয় বলেই আমাদের অন্য মডেলে হাঁটতে হচ্ছে।

মুহিউদ্দিন আক্ষেপ নিয়ে বলেন, প্রশাসনকে চাপ প্রয়োগের মাধ্যমে পলিসিগত ইশতেহারগুলো বাস্তবায়ন করতে পারলেও কাঠামোগত ইশতেহার বাস্তবায়ন করতে হচ্ছে রাষ্ট্রীয় এবং ব্যক্তি মালিকানাধীন প্রতিষ্ঠানের অনুদানে। যেমন সর্বশেষ সান্ধ্যকালীন যে বাস সার্ভিস চালু করা হয়েছে তা ইউজিসির অর্থায়নে করা হয়েছে।

ডাকসুর সহ-সম্পাদক বলেন, এখন পর্যন্ত ডাকসু ও হল সংসদের জন্য যে প্রাথমিক বাজেট দেওয়া হয়েছে তা ইশতেহার বাস্তবায়নে একেবারেই অপ্রতুল। ডাকসুর বাজেট সংক্রন্ত মিটিংয়ে বলা হয়েছিল প্রথমিক বাজেট বরাদ্দের মাধ্যমে প্রক্রিয়াটি শুরু করা হয়েছে; পরবর্তীতে আরও বাজেট দেওয়া হবে। বাজেট বরাদ্দের বিষয়ে প্রশাসন নির্দিষ্ট কোনো এমাউন্ট আমাদের জানায়নি যে কী পরিমান বাজেট বরাদ্দ দেয়া হবে। তবে আমরা মনে করি সেই পরিমান বাজেট বরাদ্দ দেয়া দরকার যাতে এই প্রতিষ্ঠানগুলো যথাযথ ভাবে কাজ করতে পারে।

ডাকসুর জন্য এখনো কোনো বাজেট দেওয়া হয়নি। শুধু ডাকসু যেন তার কাজগুলো শুরু করতে পারে; তার জন্য প্রাথমিকভাবে তাৎক্ষণিক একটা বাজেট দেওয়া হয়েছে। যা আমরা ডাকসু ও হল সংসদের একাউন্টে প্রশাসনের মাধ্যমে পাঠিয়ে দিয়েছি। আমরা বিশ্ববিদ্যালয় কতৃপক্ষের কাছে গত  নভেম্বরের প্রথম সাপ্তাহে একটি বাজেট প্রস্তাবনা দিয়েছি। কিন্তু বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন থেকে বাজেট পাশ নিয়ে কোনো সাড়া পাওয়া যায়নি।- ড. এইচ এম মোশাররফ হোসাইন, ডাকসু কোষাধ্যক্ষ

ডাকসু কোষাধ্যক্ষ ড. এইচ এম মোশাররফ হোসাইন দ্য ডেইলি ক্যম্পাসকে জানান, ডাকসুর জন্য এখনো কোনো বাজেট দেওয়া হয়নি। শুধু ডাকসু যেন তার কাজগুলো শুরু করতে পারে; তার জন্য প্রাথমিকভাবে তাৎক্ষণিক একটা বাজেট দেওয়া হয়েছে। যা আমরা ডাকসু ও হল সংসদের একাউন্টে প্রশাসনের মাধ্যমে পাঠিয়ে দিয়েছি। তিনি আরও বলেন, আমরা বিশ্ববিদ্যালয় কতৃপক্ষের কাছে গত  নভেম্বরের প্রথম সাপ্তাহে একটি বাজেট প্রস্তাবনা দিয়েছি। কিন্তু বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন থেকে বাজেট পাশ নিয়ে কোনো সাড়া পাওয়া যায়নি।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে বিশ্ববিদ্যালয়ের কোষাধ্যক্ষ ড. এম জাহাঙ্গীর আলম চৌধুরী দ্য ডেইলি ক্যম্পাসকে বলেন, আমার কাছে ডাকসুর বাজেট সংক্রান্ত কোনো ডাটা নেই। বিশ্ববিদ্যালয় ও ডাকসুর সকল হিসাব ডিরেক্টর অফ একাউন্টসের কাছে।

পরে এ বিষয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের হিসাব রক্ষক মোহাম্মদ সাইফুল ইসলাম এর কাছে জানতে চাইলে তিনি দ্য ডেইলি ক্যম্পাসকে বলেন, ডকুমেন্টস এবং তথ্যগুলো অফিসে রাখা আছে। ২০১৯ সালের ডাকসুতে কত টাকা বাজেট হয়েছিল সে সম্পর্কে কোনো তথ্য আমাদের কাছে নেই। তবে কত টাকা খরচ হয়েছিল তার ডকুমেন্টসগুলো আছে।

উল্লেখ্য, ২০১৯ সালের ডাকসুর দ্বিতীয় কার্যনির্বাহী সভায় তৎকালীন উপাচার্য আখতারুজ্জামান ১ কোটি ৮৯ লাখ টাকা বাজেট অনুমোদন দিয়েছিল। ২০১৯ সালের ডাকসু দ্বিতীয় কার্যনির্বাহী  সভায় বাজেট অনুমোদন  করা হয়েছিল কিন্তু ২০২৫ সালের দ্বিতীয় কার্যনির্বাহী সভায় কোনো বাজেট অনুমোদন না হওয়ার কারন জানতে চাইলে বিশ্ববিদ্যালয় কোষাধ্যক্ষ বলেন, ২০১৯ সালে বাজেট দেওয়া হয়েছিল কিনা সেটা আমি জানি না।

ডাকসুর পক্ষ থেকে দেওয়া বাজেট প্রস্তাবনার বিষয়ে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন কি সিদ্ধান্ত নিয়েছে এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, বাজেট তৈরির যে প্রক্রিয়া সেটা এখনো শুরুই হয়নি। আগামী এক দুই মাসের মধ্যে শুরু করা হবে। মে মাসের মধ্যে বাজেট তৈরির প্রক্রিয়া শেষ করতে হবে এবং নিয়ম অনুসারে জুন মাসের মধ্যে সিনেট অধিবেশনে পাস করতে হবে।

ডাকসুর বাজেট কবে নাগাদ পাস হতে পারে জানতে চাইলে বিশ্ববিদ্যালয়ের কোষাধ্যক্ষ ড. এম জাহাঙ্গীর আলম চৌধুরী বলেন, ডাকসুর বাজেট পাস হওয়ার তো কিছু নেই গতবছর জুন-জুলাইয়ে যখন বাজেট পাস হয়েছে তখন তো ডাকসু ছিল না। এবছর জুন–জুলাইয়ে যখন বাজেট পাস হবে তখন ডাকসুর মেয়াদ থাকবে তিন মাস তখন তিন চার মাসের জন্য হয়তো কিছু একটা পেতে পারে।